বিদায়ী জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. সারওয়ার আলমের শেষ চমক
শাহজালাল মাজারের দানের ডেগে ৩ দিনে ১৭ লাখের বেশি!
- আপডেট সময় : ০২:১৯:৪২ অপরাহ্ন, সোমবার, ২২ জুন ২০২৬
- / 36
সিলেটের হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের দীর্ঘদিনের দান ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন এনে জনসম্মুখে দানের অর্থ গণনার উদ্যোগ নিয়েছেন বিদায়ী জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. সারওয়ার আলম। প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে মাজার প্রাঙ্গণেই দানবাক্স ও দান ডেগ খুলে অর্থ গণনার এই উদ্যোগকে কেন্দ্র করে সিলেটজুড়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
সোমবার (২২ জুন) দুপুর থেকে মাজার প্রাঙ্গণে জেলা প্রশাসনের উপস্থিতিতে দানের অর্থ গণনার কার্যক্রম শুরু হয়। জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম নিজে উপস্থিত থেকে দুটি ঐতিহ্যবাহী দান ডেগ এবং প্রশাসনের স্থাপন করা নতুন দানবাক্স খুলে গণনার কার্যক্রম তদারকি করেন।
ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের সঙ্গে তাৎক্ষণিকভাবে কথা না বললেও পরে এ বিষয়ে ভিডিওবার্তার মাধ্যমে বক্তব্য দেওয়ার কথা জানান তিনি।
এর আগে রোববার (২১ জুন) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহার করে মন্ত্রণালয়ের উপসচিব পদে ন্যস্ত করা হয়। তবে প্রত্যাহারের কারণ সম্পর্কে প্রজ্ঞাপনে কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, হযরত শাহজালাল (রহ.) ১৩০৩ সালে সিলেটে আগমন করেন এবং ইসলাম প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৩৪৬ সালে তাঁর ইন্তেকালের পর সিলেটেই তাঁকে সমাহিত করা হয়। সেই থেকে মাজারের খাদেম ও মুতাওয়াল্লিরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মাজারের সার্বিক ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করে আসছেন।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ভক্তদের দেওয়া দান নির্ধারিত নিয়মে মাজার কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে খোলা ও হিসাব করা হতো। সাধারণত এ কার্যক্রম জনসম্মুখে অনুষ্ঠিত হয়নি এবং এর বিস্তারিত হিসাবও প্রকাশ করা হতো না।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, সোমবার বিকেল ৩টার দিকে সিলগালা করা দান ডেগগুলো খোলা হয়। একইসঙ্গে প্রশাসনের উদ্যোগে স্থাপিত দানবাক্সও উন্মুক্ত করা হয়। পরে সবার উপস্থিতিতে দানের অর্থ গণনা শুরু হয়।
গণনা শেষে দানবাক্স থেকে মোট ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৫৯ টাকা পাওয়া যায়। এছাড়া প্রায় সাত আনা স্বর্ণ, দুটি সৌদি রিয়াল, ডলার, পাউন্ডসহ বিভিন্ন দেশের মুদ্রাও পাওয়া যায়।
প্রতিবছর দেশ-বিদেশ থেকে আগত হাজারো ভক্ত ও দর্শনার্থী মাজারে নগদ অর্থ, স্বর্ণালঙ্কার এবং বিদেশি মুদ্রা দান করে থাকেন। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
এর আগে গত ১৮ জুন জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে মাজারের ঐতিহাসিক তিনটি দান ডেগ সিলগালা করা হয়। একই সঙ্গে নতুন দানবাক্স স্থাপন এবং নিরাপত্তা জোরদারে আনসার সদস্য মোতায়েন করা হয়। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মাসুদ রানার উপস্থিতিতে এসব পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছিল।
পরদিন মাজার পরিদর্শনকালে জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম মাজারের আয়-ব্যয় ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, দান ব্যবস্থাপনাকে আরও সুশৃঙ্খল, নিরাপদ ও স্বচ্ছ করতেই নতুন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
তবে প্রশাসনের এই পদক্ষেপকে কেন্দ্র করে মাজারের খাদেম, ভক্ত ও আশেকানদের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। গত বৃহস্পতিবার রাতে মাজার প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। বিক্ষোভকারীরা প্রশাসনের পদক্ষেপকে মাজারের ঐতিহ্যবাহী ব্যবস্থাপনায় হস্তক্ষেপ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। ‘আশেকানে আউলিয়া বাংলাদেশ’সহ কয়েকটি সংগঠনও এ বিষয়ে সমালোচনামূলক অবস্থান নেয়।
এদিকে সারওয়ার আলমের প্রত্যাহার আদেশ বাতিল ও তাঁকে পুনর্বহালের দাবিতে সোমবার সিলেটে মানববন্ধন, অবস্থান কর্মসূচি, বিক্ষোভ সমাবেশ এবং সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালিত হয়।
জেলা প্রশাসক কার্যালয় প্রাঙ্গণ ও নগরীর কোর্ট পয়েন্ট এলাকায় ‘সিলেটের সর্বস্তরের জনগণ’ এবং ‘সিলেট কল্যাণ সংস্থা’র ব্যানারে আয়োজিত কর্মসূচিতে অংশগ্রহণকারীরা বিভিন্ন স্লোগান দেন এবং সারওয়ার আলমকে পুনর্বহালের দাবি জানান।
বক্তারা অভিযোগ করেন, জেলা প্রশাসককে প্রত্যাহারের পেছনে বিশেষ মহলের প্রভাব রয়েছে। একই সঙ্গে তারা দাবি করেন, দায়িত্ব পালনকালে সারওয়ার আলম জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন এবং চলমান উন্নয়ন ও সংস্কার কার্যক্রমের স্বার্থে তাঁকে আরও সময় দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়া উচিত।

























