বামন মাছরাঙার সঙ্গে এক স্বপ্নপূরণের গল্প
- আপডেট সময় : ০৫:৩১:৫২ অপরাহ্ন, রবিবার, ৭ জুন ২০২৬
- / 122
বন্যপ্রাণীর ছবি তোলার যাত্রাটা শুরু হয়েছিল ২০২৪ সালে। তখন “Birds Bangladesh” নামের একটি ফেসবুক গ্রুপে যুক্ত হয়েছিলাম। সেখানে দেশের নানা প্রান্তের আলোকচিত্রী ও পাখিপ্রেমীরা বাংলাদেশের প্রকৃতিতে দেখা পাওয়া দুর্লভ পাখিদের ছবি ও ভিডিও শেয়ার করতেন। একদিন হঠাৎ চোখ আটকে গেল ছোট্ট এক অপার্থিব সুন্দর পাখির ছবিতে বামন মাছরাঙা।
ছবিতে আগে দেখলেও, বাংলাদেশের বনেও যে এমন রঙের বিস্ময় লুকিয়ে আছে, তা জানা ছিল না। সৃষ্টিকর্তার অপূর্ব এই সৃষ্টি মুহূর্তেই জায়গা করে নেয় মনের ভেতর। সেদিন থেকেই এক অদম্য ইচ্ছা জন্ম নেয় অন্তত একবার নিজের চোখে দেখব পাখিটিকে, ক্যামেরায় বন্দি করব তার রঙিন সৌন্দর্য।
দীর্ঘ দেড় বছর অপেক্ষার পর অবশেষে এলো সেই বহু প্রতীক্ষিত দিন।
এই অভিযানে আমার সঙ্গে ছিলেন মৌলভীবাজার থানার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও বন্যপ্রাণী আলোকচিত্রী নোবেল চাকমা এবং জুড়ী উপজেলার সংবাদকর্মী ও প্রকৃতিপ্রেমী খোর্শেদ আলম। আমাদের লক্ষ্য একটাই ভারতের সীমান্তঘেঁষা মৌলভীবাজারের গভীর চিরসবুজ বনে গিয়ে খুঁজে বের করা দুর্লভ বামন মাছরাঙাকে।

পথ মোটেও সহজ ছিল না। পাথুরে ঝিরিপথ, খাড়া পাহাড়, পিচ্ছিল ঢাল আর ঘন জঙ্গল পেরিয়ে এগোতে হচ্ছিল। বর্ষাকাল হওয়ায় কিছুক্ষণ পরপরই জোঁক উঠে যাচ্ছিল হাত-পায়ে। খোরশেদ ভাই আগে বহুবার এই বনে এসেছেন, তাই পথঘাট তাঁর চেনা ছিল। আমরা তাঁকে অনুসরণ করেই এগিয়ে যাচ্ছিলাম, যদিও মাঝেমধ্যে আমি কিছুটা পিছিয়ে পড়ছিলাম।
বনের গভীরে ঢুকতে ঢুকতে দেখা মিলছিল একের পর এক পাহাড়ি পাখির এসিয়ান নীলপরি, কেশরী ফিঙে, ভীমরাজ, কালো-মাথা বুলবুল, কালো-ঝুঁটি বুলবুল, সাদা-ভ্রু পিকুলেট, নীলকান মাছরাঙাসহ আরও অনেকের। প্রায় ১০ কিলোমিটার পাহাড়ি ট্রেকিং শেষে শরীর ক্লান্ত হয়ে পড়লেও খোরশেদ ভাইয়ের সঙ্গে আনা নিজের বাগানের কমলালেবু আর জাম্বুরা যেন নতুন শক্তি জুগিয়েছিল।
কিছুদূর এগোতেই হঠাৎ ঝিরিপথে ভেসে এলো এক পরিচিত ডাক। হৃদস্পন্দন যেন বেড়ে গেল বামন মাছরাঙা! মনে হচ্ছিল বহুদিনের প্রতীক্ষা বুঝি শেষ হতে চলেছে।
অনেক খোঁজাখুঁজির পরও পাখিটির দেখা মিলছিল না। তখন নোবেল দা ও খোরশেদ ভাই আরও ভেতরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন। কিন্তু আমি থেকে গেলাম সেখানেই। মনে হচ্ছিল, যেহেতু ডাক শুনেছি, নিশ্চয়ই কাছেই কোথাও এর টেরিটরি।
নিস্তব্ধ বনের ভেতর একা অপেক্ষা করতে করতে হঠাৎ পাহাড়ি ঝোপের দিক থেকে ভেসে এলো কাঠময়ূরের কর্কশ ডাক। ঠিক সেই সময় আবারও শুনতে পেলাম বামন মাছরাঙার ডাক। কয়েক কদম এগোতেই চোখের সামনে ধরা দিল বহুদিনের স্বপ্ন ছোট্ট রঙিন পাখিটি খাবার নিয়ে নিজের বাসায় ঢুকছে!
কিছুক্ষণ পর বাসা থেকে বের হতেই প্রথমবারের মতো ক্যামেরায় বন্দি করতে পারলাম তাকে। সেই মুহূর্তের অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। বনের গভীরে নেটওয়ার্ক না থাকায় কাউকে খবর দিতে পারিনি, কিন্তু নিজের চোখে দেখা আর ছবি তুলতে পারার আনন্দেই মন ভরে গিয়েছিল।
পাখিটি বারবার বাসায় আসা-যাওয়া করছিল, তাই আর বেশি কাছে যাইনি। কারণ বামন মাছরাঙা অত্যন্ত সংবেদনশীল স্বভাবের পাখি। সামান্য বিরক্তিও প্রজনন মৌসুমে তাদের বাসা ত্যাগ করতে বাধ্য করতে পারে।
পরে নোবেল দা ও খোর্শেদ ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হলে ছবিগুলো দেখালাম। ফেরার পথে হঠাৎ দেখি ঝিরির ওপর ঝুলে থাকা একটি ডালে বসে আছে একটি পুরুষ বামন মাছরাঙা, মাছ ধরার অপেক্ষায়। মুহূর্তেই আমরা ক্যামেরা ও ট্রাইপড সেট করে ছবি ও ভিডিও ধারণ শুরু করি।
ক্যামেরার ডিসপ্লেতে যখন সরাসরি পাখিটিকে দেখছিলাম, তখন যেন বিশ্বাসই হচ্ছিল না এত রঙ কি সত্যিই একটি পাখির শরীরে থাকতে পারে!
বাংলাদেশের বনাঞ্চলের অন্যতম আকর্ষণীয় ও রঙিন পাখিদের মধ্যে বামন মাছরাঙা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এর বৈজ্ঞানিক নাম Ceyx erithaca এবং ইংরেজি নাম Black-backed Dwarf Kingfisher। আগে এটি Oriental Dwarf Kingfisher নামেও পরিচিত ছিল। ছোট আকার, উজ্জ্বল রঙ এবং লাজুক স্বভাবের কারণে এটি পাখিপ্রেমী ও বন্যপ্রাণী আলোকচিত্রীদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়।
এটি পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম মাছরাঙাদের অন্যতম। দৈর্ঘ্য মাত্র ১২.৫ থেকে ১৪ সেন্টিমিটার এবং ওজন ১৪ থেকে ২০ গ্রামের মধ্যে। আকারে ছোট হলেও প্রজনন মৌসুমে এর রঙ হয়ে ওঠে অসাধারণ উজ্জ্বল গাঢ় নীলচে-কালো পিঠ, বেগুনি-গোলাপি আভা, কমলা-হলুদ বুক এবং উজ্জ্বল লাল ঠোঁট যেন এক জীবন্ত রংধনু। এ কারণেই অনেক পাখিপ্রেমী একে “রংধনু মাছরাঙা” বলেও ডাকেন।

বাংলাদেশে এই পাখি প্রধানত পূর্বাঞ্চলের চিরসবুজ ও আধা-চিরসবুজ পাহাড়ি বনাঞ্চলে অল্প কয়েকবার দেখা গেছে। ছায়াময় ঝিরি, বাঁশঝাড় আর ঘন ঝোপঝাড়ে ঘেরা পরিবেশ এদের সবচেয়ে পছন্দের আবাসস্থল। বর্ষাকালেই এদের প্রজনন মৌসুম শুরু হয় এবং তখনই দেখা পাওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি থাকে।
যদিও নাম মাছরাঙা, এরা শুধু মাছই খায় না; ছোট মাছের পাশাপাশি ব্যাঙ, টিকটিকি, পোকামাকড়, মাকড়সা, ছোট কাঁকড়া ও শামুকও এদের খাদ্যতালিকায় থাকে। স্ত্রী পাখি সাধারণত ৪–৫টি ডিম দেয় এবং পুরুষ-স্ত্রী উভয়েই ডিমে তা দেওয়া ও বাচ্চার যত্ন নেওয়ার দায়িত্ব পালন করে।
আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ (IUCN Bangladesh, 2015) অনুযায়ী বাংলাদেশে বামন মাছরাঙা একটি ‘বিপন্ন’ প্রজাতি এবং বিশ্বব্যাপী ‘প্রায় বিপদগ্রস্ত’ শ্রেণিতে অন্তর্ভুক্ত। আমাদের দেশে এই পাখির সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত। বন উজাড়, আবাসস্থল ধ্বংস, অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন, প্লাস্টিক দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তন এদের অস্তিত্বের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
প্রকৃতির এই দুর্লভ রঙিন প্রাণীগুলো শুধু একটি সুন্দর পাখিই নয়; বরং সুস্থ বন ও জলজ বাস্তুতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। একটি বন কতটা জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ, অনেক সময় এমন সংবেদনশীল প্রজাতির উপস্থিতিই তার প্রমাণ বহন করে।
তাই শুধু ছবি তুলে মুগ্ধ হওয়াই নয়, আমাদের দায়িত্ব এই বন ও বন্যপ্রাণীদের নিরাপদ রাখাও।
এই যাত্রা শুধু একটি পাখির ছবি পাওয়ার গল্প নয় এটি প্রকৃতির প্রতি ভালোবাসা, ধৈর্য, অপেক্ষা এবং এক স্বপ্নপূরণের গল্প।
লেখক: উজ্জল দাস, বন্যপ্রাণী গবেষক ও আলোকচিত্রী























