ভাঙা সড়ক, ভাঙা জবাবদিহি; এভাবেই থমকে যায় উন্নয়নের চাকা
- আপডেট সময় : ১২:৪০:১৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২০ অগাস্ট ২০২৬
- / 89
উন্নয়নের গল্প আমরা অনেক শুনি। নতুন সড়ক, নতুন প্রকল্প, নতুন বরাদ্দ, নতুন উদ্বোধন সবকিছুরই বাহারি প্রচার আছে। কিন্তু সেই সড়ক যদি কয়েক মাসের মাথায় ভেঙে যায়, সামান্য বৃষ্টিতে পিচ উঠে যায়, গর্তে পড়ে মানুষ আহত হয়, যানবাহন ক্ষতিগ্রস্ত হয়- তাহলে প্রশ্ন করতেই হয়, এটা উন্নয়ন, নাকি উন্নয়নের নামে ব্যর্থতার প্রদর্শনী?
দেশের বহু সড়কের বর্তমান চিত্র কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয় বরং এটি দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, নিম্নমানের কাজ, দুর্বল তদারকি এবং জবাবদিহিহীন ব্যবস্থার ফল। শহরের প্রধান সড়ক থেকে শুরু করে গ্রামের সংযোগপথ- কোথাও খানাখন্দ, কোথাও জলাবদ্ধতা, কোথাও এমন ভাঙাচোরা অবস্থা যে রাস্তা দিয়ে চলাচল করাই যেন প্রতিদিনের যুদ্ধ।
বৃষ্টি হলেই রাস্তা ভাঙে- এই অজুহাত বহু পুরোনো। কিন্তু প্রশ্ন হলো, অন্য দেশেও তো বৃষ্টি হয়, ভারী যানবাহন চলে, প্রাকৃতিক দুর্যোগ আসে। সেখানে প্রতিবার বৃষ্টির পর নতুন করে রাস্তা বানাতে হয় না কেন? আমাদের এখানে যদি কয়েক মাস পরপর একই সড়ক মেরামত করতে হয়, তাহলে সমস্যাটা শুধু আবহাওয়ার নয় বরং সমস্যাটা নির্মাণব্যবস্থার ভেতরেই।
নিম্নমানের বিটুমিন, অপর্যাপ্ত পাথর, দুর্বল বেস, নিয়ম না মেনে কার্পেটিং- এসব অভিযোগ নতুন নয়। কিন্তু অভিযোগের পরিণতি কোথায়? একটি রাস্তা নির্মাণের অল্প সময়ের মধ্যেই নষ্ট হয়ে গেলে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে কতবার জবাবদিহির মুখোমুখি করা হয়েছে? প্রকৌশল তদারকিতে ব্যর্থতার দায় কতজন নিয়েছেন? সরকারি অর্থের অপচয়ের জন্য কতজনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হয়েছে?
জনগণ এসব প্রশ্নের উত্তর খুব কমই পায়।
বরং দেখা যায়, একই রাস্তার জন্য বারবার বরাদ্দ আসে। একবার নির্মাণ, কিছুদিন পর সংস্কার, তারপর আবার মেরামত। ফলে ভাঙা রাস্তা যেন কারও কারও জন্য স্থায়ী দুর্ভোগ হলেও অন্য কারও জন্য স্থায়ী প্রকল্পে পরিণত হয়। এই পুনরাবৃত্তি যদি চলতেই থাকে, তাহলে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক রাস্তা কি মানুষের চলাচলের জন্য তৈরি হচ্ছে, নাকি বারবার কাজ দেখিয়ে অর্থ ব্যয়ের সুযোগ তৈরির জন্য?
সবচেয়ে বড় ব্যর্থতাগুলোর একটি পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা। সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে, কিন্তু ড্রেন নেই আবার ড্রেন থাকলেও তা অকার্যকর বা দখল হয়ে আছে। বৃষ্টির পানি ঘণ্টার পর ঘণ্টা, কখনো দিনের পর দিন সড়কের ওপর জমে থাকে। এরপর রাস্তার নিচের স্তর দুর্বল হয়, পিচ উঠে যায়, সৃষ্টি হয় গর্ত। তারপর শুরু হয় তথাকথিত সংস্কার।
অর্থাৎ রোগের চিকিৎসা নয়, ক্ষতের ওপর বারবার ব্যান্ডেজ লাগানো হচ্ছে।
এভাবে সড়ক ব্যবস্থাপনা চলতে পারে না।
একটি সড়ক ভাঙা মানে শুধু যানবাহনের ঝাঁকুনি নয়। এর অর্থ অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ, বেশি পরিবহন ব্যয়, দীর্ঘ যাত্রাসময়, দুর্ঘটনার ঝুঁকি এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি। একজন কৃষক যখন তার পণ্য সময়মতো বাজারে নিতে পারেন না, একজন রোগী যখন অ্যাম্বুলেন্সে ভাঙা রাস্তায় আটকে থাকেন, একজন শিক্ষার্থী যখন সময়মতো প্রতিষ্ঠানে পৌঁছাতে পারেন না- তখন ভাঙা রাস্তার মূল্য শুধু টাকায় হিসাব করা যায় না।
এই ক্ষতি সমাজের সবচেয়ে সাধারণ মানুষকেই বহন করতে হয়।
অথচ সড়ক প্রকল্পের সাফল্য মাপা হয় প্রায়ই কত কিলোমিটার রাস্তা নির্মাণ হলো, কত টাকা বরাদ্দ হলো, কত প্রকল্প উদ্বোধন হলো এসব দিয়ে। খুব কমই প্রশ্ন করা হয়, সেই রাস্তা তিন বছর পরও টিকে আছে কি না। কাজ শেষ হওয়ার পর মান যাচাইয়ের সংস্কৃতি দুর্বল, দীর্ঘমেয়াদি দায়বদ্ধতা আরও দুর্বল।
এখানেই উন্নয়ন ব্যবস্থাপনার বড় সংকট।
একটি রাস্তার প্রকৃত সাফল্য ফিতা কাটা দিয়ে নয়, বরং কয়েক বছর পর বোঝা যায়। যদি সেই সময়ও রাস্তা সচল থাকে, নিরাপদ থাকে এবং মানুষের উপকারে আসে তবেই সেটি উন্নয়ন। অন্যথায় তা কেবল একটি ব্যয়বহুল প্রকল্প!
আরও কঠিনভাবে বলতে হয়, জবাবদিহি ছাড়া টেকসই সড়ক সম্ভব নয়।
কোনো ঠিকাদার নিম্নমানের কাজ করলে তাকে কালো তালিকাভুক্ত করতে হবে। দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলীর অবহেলা প্রমাণিত হলে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিতে হবে। কাজের গুণগত মান স্বাধীনভাবে পরীক্ষা করতে হবে। প্রকল্পের ব্যয়, মেয়াদ, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান, ব্যবহার করা উপকরণ এবং রক্ষণাবেক্ষণের দায় জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত।
জনগণের টাকায় রাস্তা হলে জনগণের প্রশ্নেরও উত্তর দিতে হবে।
অনিয়মের প্রমাণ থাকলে সেটিকে “কারিগরি ত্রুটি” বা “অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত” বলে চাপা দেওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। কারণ নিম্নমানের কাজের দায় যদি কেউ না নেয়, তাহলে নিম্নমানের কাজ বন্ধ হওয়ারও কোনো কারণ নেই।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে দৃশ্যমান প্রকল্পের প্রতি অতিরিক্ত ঝোঁক, কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণে অনীহা। নতুন সড়ক উদ্বোধনে প্রচার আছে, পুরোনো সড়ক রক্ষায় তেমন আগ্রহ নেই। অথচ একটি টেকসই অবকাঠামো ব্যবস্থায় নির্মাণের মতো রক্ষণাবেক্ষণও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
আমাদের উন্নয়নের দর্শন তাই বদলাতে হবে।
“নতুন কিছু নির্মাণ” করলেই উন্নয়ন হয় না বরং যা নির্মাণ করা হয়েছে সেটি টিকিয়ে রাখাও উন্নয়ন। বছরে বছরে একই রাস্তা মেরামতের চেয়ে একবার সঠিকভাবে নির্মাণ করা অনেক বেশি সাশ্রয়ী এবং দায়িত্বশীল।
ভাঙা সড়ক শুধু প্রকৌশল ব্যর্থতার ছবি নয় বরং এটি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার দুর্বলতারও চিত্র। যেখানে মান নিয়ন্ত্রণ দুর্বল, তদারকি প্রশ্নবিদ্ধ, দায় নির্ধারণ অস্পষ্ট এবং দুর্নীতির অভিযোগের কার্যকর নিষ্পত্তি হয় না, সেখানে রাস্তা ভাঙবেই।
তারপর সেই ভাঙা রাস্তা আবার নতুন বরাদ্দের জন্ম দেবে।
এই চক্র ভাঙতেই হবে।
কারণ নিরাপদ সড়ক কোনো দয়া নয়, কোনো বিলাসিতা নয়। এটি নাগরিকের অধিকার। জনগণ কর দেয়, রাষ্ট্র প্রকল্প নেয়, ঠিকাদার কাজ করে- তার বিনিময়ে মানুষের অধিকার রয়েছে মানসম্মত ও টেকসই সড়ক পাওয়ার।
প্রশ্ন তাই খুব সরল- একটি রাস্তা যদি নির্ধারিত আয়ুষ্কালের আগেই ভেঙে যায়, দায় নেবে কে?
এই প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট উত্তর যতদিন না পাওয়া যাবে, ততদিন “উন্নয়ন” শব্দটির পাশে একটি বড় প্রশ্নচিহ্ন থেকেই যাবে।
আমরা জোড়াতালির উন্নয়ন চাই না। আমরা এমন উন্নয়ন চাই, যার স্থায়িত্ব আছে, মান আছে এবং জবাবদিহি আছে।
ভাঙা রাস্তার গর্ত শুধু সড়কে তৈরি হয় না বরং সেই গর্ত তৈরি হয় জনআস্থায়ও।
সুতরাং এখন আর শুধু গর্ত ভরাট করলে চলবে না- ভরাট করতে হবে ব্যবস্থার দুর্নীতি, অবহেলা ও জবাবদিহিহীনতার গর্তও। নইলে যত উন্নয়নের স্লোগানই দেওয়া হোক, ভাঙা পথেই থমকে থাকবে দেশের উন্নয়নের চাকা।
• আফজাল হোসেন রুমেল, হেড অব মাল্টিমিডিয়া, ষাটমাকণ্ঠ

























