১১:৪৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম ::
Logo কৃতি শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা দিল সিলেটের বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ Logo মুরারিচাঁদ কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের অংশগ্রহণে চড়ুইভাতি Logo ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত Logo তৃণমূলে নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়াতে দলগুলোর নীতিতে পরিবর্তনের আহ্বান Logo বড়লেখায় মহিষকাণ্ডে যুবলীগ ও বিএনপি নেতাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা Logo বড়লেখায় শিক্ষার্থীদের নিয়ে অভিভাবক সমাবেশ Logo কুলাউড়ায় সাংবাদিকদের সঙ্গে স্বদেশমেইল সম্পাদক নজরুল ইসলাম খানের মতবিনিময় Logo জাতীয়তাবাদী পরিবারের উদ্যোগে দাসের বাজারে দুই শতাধিক এসএসসি উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীকে সংবর্ধনা Logo শ্রীমঙ্গলে প্রবাসীর বাসায় আগুন, পুড়ে ছাই দুই ঘর Logo প্রযুক্তি শিক্ষায় নতুন দিগন্ত, রাজধানীর বসিলায় হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়

হাওরের গেরিলা যোদ্ধা জগৎজ্যোতি দাস: ‘দাস পার্টি’র দুর্ধর্ষ কমান্ডার

দেব রায় সৌমেন
  • আপডেট সময় : ০৩:৪৫:০৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৬ অগাস্ট ২০২৬
  • / 102
যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের সর্বশেষ খবর জানতে ভিজিট করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এমন অনেক বীর আছেন, যাঁদের অবদান যুদ্ধের গতিপথ বদলে দিলেও জাতীয় স্মৃতিতে তাঁদের নাম প্রত্যাশিত আলো পায়নি। হাওরাঞ্চলের কিংবদন্তি গেরিলা কমান্ডার জগৎজ্যোতি দাস তাঁদেরই একজন। মাত্র ২২ বছরের জীবনে তিনি এমন এক প্রতিরোধের ইতিহাস রচনা করেছিলেন, যা আজও সুনামগঞ্জ–হবিগঞ্জের হাওরজুড়ে মানুষের মুখে মুখে ফিরে আসে। তাঁর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ‘দাস পার্টি’ ছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর জন্য ছিল এক আতঙ্কের নাম।

শৈশব থেকেই হাওরের মানুষের মুখে ‘দাস পার্টি’র গল্প শুনে বড় হয়েছি। তবে ২০১৯ সালে হবিগঞ্জের একটি নাট্যদলের মঞ্চে জগৎজ্যোতি দাস নাটক দেখার পর তাঁর জীবন সম্পর্কে জানার আগ্রহ আরও গভীর হয়। পরে তাঁকে নিয়ে প্রকাশিত নানা গবেষণা, স্মৃতিকথা ও গ্রন্থ পড়ার সুযোগ হয়েছে। বিশেষ করে হাসান মোরশেদের দাস পার্টির খোঁজে বইটি জগৎজ্যোতির সংগ্রাম, নেতৃত্ব ও আত্মত্যাগকে নতুন দৃষ্টিতে বুঝতে সাহায্য করেছে।

১৯৪৯ সালের ২৬ এপ্রিল হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জ উপজেলার জলসুখা গ্রামে জন্ম জগৎজ্যোতি দাসের। সুনামগঞ্জ কলেজে অধ্যয়নকালে তিনি ছাত্র ইউনিয়নের মেনন গ্রুপের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

১৯৭১ সালের মার্চে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তাঁর জীবনের গতিপথও বদলে যায়। ২৮ মার্চ সুনামগঞ্জের অস্ত্রাগার ভেঙে অস্ত্র সংগ্রহের অভিযানে অংশ নেন। এরপর সরাসরি প্রতিরোধযুদ্ধে যোগ দেন।

জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে বিশেষ গেরিলা প্রশিক্ষণ শেষে ৩৬ জন মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে টেকেরঘাট সাব-সেক্টরে একটি বিশেষ দল গঠন করা হয়। এই দলের অধিনায়ক ছিলেন জগৎজ্যোতি দাস। পরে দলটি ‘দাস পার্টি’ নামে পরিচিতি লাভ করে।

তাঁদের দায়িত্ব ছিল ভাটি অঞ্চলকে শত্রুমুক্ত রাখা এবং ভৈরব–আজমিরীগঞ্জ–শেরপুর নৌপথকে পাকিস্তানি বাহিনীর জন্য কার্যত অচল করে দেওয়া। এই জলপথ দিয়েই শত্রুপক্ষ অস্ত্র, রসদ ও সৈন্য পরিবহন করত।

সিলেট–সুনামগঞ্জ সড়কের জয়কলস সেতু ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ। সেটি ধ্বংসের দায়িত্ব পান জগৎজ্যোতি।

জুলাইয়ের শেষ দিকে তিনি দল নিয়ে অভিযানে বের হন। কিন্তু পথে হঠাৎ রাজাকারদের সঙ্গে সংঘর্ষ বাধে। গোলাগুলির শব্দে জয়কলস সেতুর পাহারারত রাজাকাররাও সতর্ক হয়ে যায়।

পরিস্থিতি মুহূর্তেই মূল্যায়ন করে জগৎজ্যোতি পরিকল্পনা বদলে ফেলেন। লক্ষ্য হয় সদরপুর সেতু।

অভিযানের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক ছিল- তাঁর দল কোনো গুলি না ছুড়েই সেতুর পাহারায় থাকা রাজাকারদের আটক করতে সক্ষম হয়। এরপর বিস্ফোরক দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া হয় সদরপুর সেতু। পাকিস্তানি বাহিনীর যোগাযোগব্যবস্থায় এটি ছিল বড় ধরনের আঘাত।

জগৎজ্যোতি ও তাঁর সহযোদ্ধাদের ধারাবাহিক গেরিলা অভিযানে ভৈরব–শেরপুর নৌপথ ক্রমেই পাকিস্তানি বাহিনীর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

নৌযান ডুবিয়ে দেওয়া, সেতু ও কালভার্ট ধ্বংস, আকস্মিক হামলা- সব মিলিয়ে শত্রুর সরবরাহব্যবস্থা বিপর্যস্ত হতে থাকে।

একপর্যায়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী জীবিত কিংবা মৃত-যেভাবেই হোক জগৎজ্যোতিকে ধরিয়ে দিতে পারলে পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা দেয়।

নৌপথের পাশাপাশি আশুগঞ্জ থেকে শাহজীবাজার হয়ে বাহুবল পর্যন্ত বিস্তৃত বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন ধ্বংসের দায়িত্বও দেওয়া হয়েছিল তাঁকে। তাঁর দলের সদস্যরা এ ধরনের নাশকতার জন্য বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত ছিলেন।

১৯৭১ সালের ১৬ নভেম্বর ভোরে জগৎজ্যোতি বাহুবলের উদ্দেশে রওনা হন। পথে বদলপুর এলাকায় একদল রাজাকারকে দেখে তিনি ৩০ জন মুক্তিযোদ্ধাকে পেছনে রেখে ১২ জনকে সঙ্গে নিয়ে ধাওয়া করেন। কিন্তু সেটি ছিল শত্রুর পূর্বপরিকল্পিত ফাঁদ।

রাজাকাররা তাঁদের খৈয়াগোপির বিলের দিকে টেনে নিয়ে যায়, যেখানে আগে থেকেই ওঁত পেতে ছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনী।

ত্রিমুখী আক্রমণের মুখে শুরু হয় অসম যুদ্ধ। শেষ পর্যন্ত ১৬ নভেম্বর শহীদ হন জগৎজ্যোতি দাস।

সহযোদ্ধা ইলিয়াস প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে তাঁর মরদেহ কচুরিপানা ও কাদার নিচে লুকিয়ে রেখে রাতের অন্ধকারে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন। কিন্তু পরদিন সকালে রাজাকাররা মরদেহটি খুঁজে পায়।

রাজাকার ও পাকিস্তানি সেনারা জগৎজ্যোতির মরদেহ নিয়ে তাঁর বাড়ির সামনে এসে উল্লাস করে। সেই সময় তাঁর মা নিজের সন্তানের মরদেহ শনাক্ত করতে অস্বীকৃতি জানান।

সন্তানকে তিনি চিনতে পারেননি- এ কথা বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই। বরং শত্রুকে বিভ্রান্ত করতে, পরিবারকে রক্ষা করতে এবং নিজের বুকভাঙা শোককে সংযত রাখতে তিনি এই অসাধারণ মানসিক দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছিলেন।

পরে রাজাকাররা মরদেহ ট্রলারে করে হাওরের বিভিন্ন হাটে প্রদর্শন করে। শেষ পর্যন্ত আজমিরীগঞ্জ বাজারে একটি বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়।

সেদিন ছিল ঈদের আগের রাত- চাঁদরাত।

যে রাতে মানুষের ঘরে ঘরে উৎসবের প্রস্তুতি থাকার কথা, সেই রাতে হাজারো মানুষ স্বাধীনতার জন্য জীবন দেওয়া এক তরুণের ক্ষতবিক্ষত মরদেহের সামনে নির্বাক দাঁড়িয়ে ছিলেন।

বাজারের এক আলোকচিত্রী পাকিস্তানি বাহিনীর নির্দেশে তাঁর শেষ ছবি তোলেন। পরে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ছবিটির একটি কপি গোপনে সংরক্ষণ করে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক সালেহ চৌধুরীর কাছে পৌঁছে দেন। সেই ছবিই আজ ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল।

‘দাস পার্টি’। মাত্র ৩৬ জনের একটি দল। কিন্তু সেই ছোট্ট দলই টেকেরঘাট থেকে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী পর্যন্ত বিস্তৃত হাওরাঞ্চলে পাকিস্তানি বাহিনীর জন্য ভয় ও অনিশ্চয়তার প্রতীক হয়ে উঠেছিল।

অসংখ্য সফল গেরিলা অভিযান পরিচালনা করে ‘দাস পার্টি’ মুক্তিযুদ্ধে অনন্য অবদান রাখে। দলের শহীদ সিরাজসহ তিনজন মুক্তিযোদ্ধা বীর বিক্রম খেতাব অর্জন করেন।

জগৎজ্যোতির মৃত্যুর পর অল ইন্ডিয়া রেডিও, আকাশবাণী ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র তাঁকে ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ হিসেবে উল্লেখ করেছিল। তবে ১৯৭৩ সালের সরকারি গেজেটে তাঁর নাম প্রকাশিত হয় ‘বীর বিক্রম’ হিসেবে।

সামরিক সুপারিশের ভিত্তিতে চূড়ান্ত হওয়া বীরত্বসূচক খেতাবের তালিকায় এই অসাধারণ বেসামরিক গেরিলা যোদ্ধা বীরশ্রেষ্ঠ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হননি। বিষয়টি আজও গবেষক ও ইতিহাসবিদদের আলোচনায় ফিরে আসে।

হাওরের যুদ্ধ ছিল মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে কঠিন যুদ্ধক্ষেত্রগুলোর একটি। চারদিকে বিস্তীর্ণ জলরাশি, অসংখ্য বিল, নদী আর প্রতিকূল ভূপ্রকৃতির মধ্যেই যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হয়েছিল মুক্তিযোদ্ধাদের।

সেই প্রতিকূলতাকেই শক্তিতে রূপ দিয়েছিলেন জগৎজ্যোতি দাস। অসাধারণ নেতৃত্ব, দুর্দান্ত কৌশল এবং অদম্য সাহস দিয়ে তিনি হাওরাঞ্চলকে গড়ে তুলেছিলেন মুক্তিযুদ্ধের এক শক্তিশালী প্রতিরোধঘাঁটিতে।

স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করা সেই তরুণ জগৎজ্যোতি দাস হাওরের বাতাসে, বর্ষার ঢেউয়ে, কুয়াশা ভেজা বিলের নীরবতায় আজও যেন ভেসে আসে তাঁর পদচারণার প্রতিধ্বনি। যে খৈয়াগোপির বিল একদিন তাঁর রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল, সেই জলরাশিই আজও সাক্ষ্য দেয় এক তরুণের অসম সাহস, অদম্য দেশপ্রেম আর আত্মত্যাগের। তাঁর নেতৃত্বে ‘দাস পার্টি’ প্রমাণ করেছিল- যুদ্ধ জেতার শক্তি শুধু অস্ত্রে নয়, মানুষের অদম্য সাহস, প্রজ্ঞা এবং মাতৃভূমির প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসায়।

সময়ের স্রোতে অনেক নামই ইতিহাসের ধুলায় চাপা পড়ে যায়। কিন্তু যাঁরা নিজের জীবন দিয়ে একটি জাতির ভবিষ্যৎ লিখে দেন, তাঁদের কখনো বিস্মৃত করা যায় না। স্বাধীনতার প্রতিটি সূর্যোদয়, প্রতিটি লাল-সবুজ পতাকার দোলায় তাই নীরবে উচ্চারিত হয় জগৎজ্যোতি দাসের নাম।

আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি, বইপত্রে কিংবা জীবিত মুক্তিযোদ্ধাদের নিকট শুনেছি সেইসব বীরত্বের গল্প, সেই গল্পের এক মহানায়ক জগৎজ্যোতি দাস, বীরবিক্রম। যিনি জনতার বীরশ্রেষ্ঠ। আমাদের অন্তরে তিনি স্বমহিমায় চির অম্লান হয়ে আছেন, থাকবেন।

 

*** তথ‍্যসূত্র: দাস পার্টির খোঁজে-হাসান মোরশেদ। / বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: সেক্টর ভিত্তিক ইতিহাস সেক্টর ৫ / বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্র ১০ম খণ্ড

 

• দেব রায় সৌমেন
contactwithdev23@gmail.com

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

হাওরের গেরিলা যোদ্ধা জগৎজ্যোতি দাস: ‘দাস পার্টি’র দুর্ধর্ষ কমান্ডার

আপডেট সময় : ০৩:৪৫:০৭ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৬ অগাস্ট ২০২৬

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এমন অনেক বীর আছেন, যাঁদের অবদান যুদ্ধের গতিপথ বদলে দিলেও জাতীয় স্মৃতিতে তাঁদের নাম প্রত্যাশিত আলো পায়নি। হাওরাঞ্চলের কিংবদন্তি গেরিলা কমান্ডার জগৎজ্যোতি দাস তাঁদেরই একজন। মাত্র ২২ বছরের জীবনে তিনি এমন এক প্রতিরোধের ইতিহাস রচনা করেছিলেন, যা আজও সুনামগঞ্জ–হবিগঞ্জের হাওরজুড়ে মানুষের মুখে মুখে ফিরে আসে। তাঁর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ‘দাস পার্টি’ ছিল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর জন্য ছিল এক আতঙ্কের নাম।

শৈশব থেকেই হাওরের মানুষের মুখে ‘দাস পার্টি’র গল্প শুনে বড় হয়েছি। তবে ২০১৯ সালে হবিগঞ্জের একটি নাট্যদলের মঞ্চে জগৎজ্যোতি দাস নাটক দেখার পর তাঁর জীবন সম্পর্কে জানার আগ্রহ আরও গভীর হয়। পরে তাঁকে নিয়ে প্রকাশিত নানা গবেষণা, স্মৃতিকথা ও গ্রন্থ পড়ার সুযোগ হয়েছে। বিশেষ করে হাসান মোরশেদের দাস পার্টির খোঁজে বইটি জগৎজ্যোতির সংগ্রাম, নেতৃত্ব ও আত্মত্যাগকে নতুন দৃষ্টিতে বুঝতে সাহায্য করেছে।

১৯৪৯ সালের ২৬ এপ্রিল হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জ উপজেলার জলসুখা গ্রামে জন্ম জগৎজ্যোতি দাসের। সুনামগঞ্জ কলেজে অধ্যয়নকালে তিনি ছাত্র ইউনিয়নের মেনন গ্রুপের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

১৯৭১ সালের মার্চে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তাঁর জীবনের গতিপথও বদলে যায়। ২৮ মার্চ সুনামগঞ্জের অস্ত্রাগার ভেঙে অস্ত্র সংগ্রহের অভিযানে অংশ নেন। এরপর সরাসরি প্রতিরোধযুদ্ধে যোগ দেন।

জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে বিশেষ গেরিলা প্রশিক্ষণ শেষে ৩৬ জন মুক্তিযোদ্ধাকে নিয়ে টেকেরঘাট সাব-সেক্টরে একটি বিশেষ দল গঠন করা হয়। এই দলের অধিনায়ক ছিলেন জগৎজ্যোতি দাস। পরে দলটি ‘দাস পার্টি’ নামে পরিচিতি লাভ করে।

তাঁদের দায়িত্ব ছিল ভাটি অঞ্চলকে শত্রুমুক্ত রাখা এবং ভৈরব–আজমিরীগঞ্জ–শেরপুর নৌপথকে পাকিস্তানি বাহিনীর জন্য কার্যত অচল করে দেওয়া। এই জলপথ দিয়েই শত্রুপক্ষ অস্ত্র, রসদ ও সৈন্য পরিবহন করত।

সিলেট–সুনামগঞ্জ সড়কের জয়কলস সেতু ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথ। সেটি ধ্বংসের দায়িত্ব পান জগৎজ্যোতি।

জুলাইয়ের শেষ দিকে তিনি দল নিয়ে অভিযানে বের হন। কিন্তু পথে হঠাৎ রাজাকারদের সঙ্গে সংঘর্ষ বাধে। গোলাগুলির শব্দে জয়কলস সেতুর পাহারারত রাজাকাররাও সতর্ক হয়ে যায়।

পরিস্থিতি মুহূর্তেই মূল্যায়ন করে জগৎজ্যোতি পরিকল্পনা বদলে ফেলেন। লক্ষ্য হয় সদরপুর সেতু।

অভিযানের সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক ছিল- তাঁর দল কোনো গুলি না ছুড়েই সেতুর পাহারায় থাকা রাজাকারদের আটক করতে সক্ষম হয়। এরপর বিস্ফোরক দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া হয় সদরপুর সেতু। পাকিস্তানি বাহিনীর যোগাযোগব্যবস্থায় এটি ছিল বড় ধরনের আঘাত।

জগৎজ্যোতি ও তাঁর সহযোদ্ধাদের ধারাবাহিক গেরিলা অভিযানে ভৈরব–শেরপুর নৌপথ ক্রমেই পাকিস্তানি বাহিনীর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।

নৌযান ডুবিয়ে দেওয়া, সেতু ও কালভার্ট ধ্বংস, আকস্মিক হামলা- সব মিলিয়ে শত্রুর সরবরাহব্যবস্থা বিপর্যস্ত হতে থাকে।

একপর্যায়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী জীবিত কিংবা মৃত-যেভাবেই হোক জগৎজ্যোতিকে ধরিয়ে দিতে পারলে পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা দেয়।

নৌপথের পাশাপাশি আশুগঞ্জ থেকে শাহজীবাজার হয়ে বাহুবল পর্যন্ত বিস্তৃত বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন ধ্বংসের দায়িত্বও দেওয়া হয়েছিল তাঁকে। তাঁর দলের সদস্যরা এ ধরনের নাশকতার জন্য বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত ছিলেন।

১৯৭১ সালের ১৬ নভেম্বর ভোরে জগৎজ্যোতি বাহুবলের উদ্দেশে রওনা হন। পথে বদলপুর এলাকায় একদল রাজাকারকে দেখে তিনি ৩০ জন মুক্তিযোদ্ধাকে পেছনে রেখে ১২ জনকে সঙ্গে নিয়ে ধাওয়া করেন। কিন্তু সেটি ছিল শত্রুর পূর্বপরিকল্পিত ফাঁদ।

রাজাকাররা তাঁদের খৈয়াগোপির বিলের দিকে টেনে নিয়ে যায়, যেখানে আগে থেকেই ওঁত পেতে ছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনী।

ত্রিমুখী আক্রমণের মুখে শুরু হয় অসম যুদ্ধ। শেষ পর্যন্ত ১৬ নভেম্বর শহীদ হন জগৎজ্যোতি দাস।

সহযোদ্ধা ইলিয়াস প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে তাঁর মরদেহ কচুরিপানা ও কাদার নিচে লুকিয়ে রেখে রাতের অন্ধকারে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন। কিন্তু পরদিন সকালে রাজাকাররা মরদেহটি খুঁজে পায়।

রাজাকার ও পাকিস্তানি সেনারা জগৎজ্যোতির মরদেহ নিয়ে তাঁর বাড়ির সামনে এসে উল্লাস করে। সেই সময় তাঁর মা নিজের সন্তানের মরদেহ শনাক্ত করতে অস্বীকৃতি জানান।

সন্তানকে তিনি চিনতে পারেননি- এ কথা বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই। বরং শত্রুকে বিভ্রান্ত করতে, পরিবারকে রক্ষা করতে এবং নিজের বুকভাঙা শোককে সংযত রাখতে তিনি এই অসাধারণ মানসিক দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছিলেন।

পরে রাজাকাররা মরদেহ ট্রলারে করে হাওরের বিভিন্ন হাটে প্রদর্শন করে। শেষ পর্যন্ত আজমিরীগঞ্জ বাজারে একটি বৈদ্যুতিক খুঁটির সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়।

সেদিন ছিল ঈদের আগের রাত- চাঁদরাত।

যে রাতে মানুষের ঘরে ঘরে উৎসবের প্রস্তুতি থাকার কথা, সেই রাতে হাজারো মানুষ স্বাধীনতার জন্য জীবন দেওয়া এক তরুণের ক্ষতবিক্ষত মরদেহের সামনে নির্বাক দাঁড়িয়ে ছিলেন।

বাজারের এক আলোকচিত্রী পাকিস্তানি বাহিনীর নির্দেশে তাঁর শেষ ছবি তোলেন। পরে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ছবিটির একটি কপি গোপনে সংরক্ষণ করে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক সালেহ চৌধুরীর কাছে পৌঁছে দেন। সেই ছবিই আজ ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল।

‘দাস পার্টি’। মাত্র ৩৬ জনের একটি দল। কিন্তু সেই ছোট্ট দলই টেকেরঘাট থেকে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী পর্যন্ত বিস্তৃত হাওরাঞ্চলে পাকিস্তানি বাহিনীর জন্য ভয় ও অনিশ্চয়তার প্রতীক হয়ে উঠেছিল।

অসংখ্য সফল গেরিলা অভিযান পরিচালনা করে ‘দাস পার্টি’ মুক্তিযুদ্ধে অনন্য অবদান রাখে। দলের শহীদ সিরাজসহ তিনজন মুক্তিযোদ্ধা বীর বিক্রম খেতাব অর্জন করেন।

জগৎজ্যোতির মৃত্যুর পর অল ইন্ডিয়া রেডিও, আকাশবাণী ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র তাঁকে ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ হিসেবে উল্লেখ করেছিল। তবে ১৯৭৩ সালের সরকারি গেজেটে তাঁর নাম প্রকাশিত হয় ‘বীর বিক্রম’ হিসেবে।

সামরিক সুপারিশের ভিত্তিতে চূড়ান্ত হওয়া বীরত্বসূচক খেতাবের তালিকায় এই অসাধারণ বেসামরিক গেরিলা যোদ্ধা বীরশ্রেষ্ঠ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হননি। বিষয়টি আজও গবেষক ও ইতিহাসবিদদের আলোচনায় ফিরে আসে।

হাওরের যুদ্ধ ছিল মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে কঠিন যুদ্ধক্ষেত্রগুলোর একটি। চারদিকে বিস্তীর্ণ জলরাশি, অসংখ্য বিল, নদী আর প্রতিকূল ভূপ্রকৃতির মধ্যেই যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হয়েছিল মুক্তিযোদ্ধাদের।

সেই প্রতিকূলতাকেই শক্তিতে রূপ দিয়েছিলেন জগৎজ্যোতি দাস। অসাধারণ নেতৃত্ব, দুর্দান্ত কৌশল এবং অদম্য সাহস দিয়ে তিনি হাওরাঞ্চলকে গড়ে তুলেছিলেন মুক্তিযুদ্ধের এক শক্তিশালী প্রতিরোধঘাঁটিতে।

স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করা সেই তরুণ জগৎজ্যোতি দাস হাওরের বাতাসে, বর্ষার ঢেউয়ে, কুয়াশা ভেজা বিলের নীরবতায় আজও যেন ভেসে আসে তাঁর পদচারণার প্রতিধ্বনি। যে খৈয়াগোপির বিল একদিন তাঁর রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল, সেই জলরাশিই আজও সাক্ষ্য দেয় এক তরুণের অসম সাহস, অদম্য দেশপ্রেম আর আত্মত্যাগের। তাঁর নেতৃত্বে ‘দাস পার্টি’ প্রমাণ করেছিল- যুদ্ধ জেতার শক্তি শুধু অস্ত্রে নয়, মানুষের অদম্য সাহস, প্রজ্ঞা এবং মাতৃভূমির প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসায়।

সময়ের স্রোতে অনেক নামই ইতিহাসের ধুলায় চাপা পড়ে যায়। কিন্তু যাঁরা নিজের জীবন দিয়ে একটি জাতির ভবিষ্যৎ লিখে দেন, তাঁদের কখনো বিস্মৃত করা যায় না। স্বাধীনতার প্রতিটি সূর্যোদয়, প্রতিটি লাল-সবুজ পতাকার দোলায় তাই নীরবে উচ্চারিত হয় জগৎজ্যোতি দাসের নাম।

আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি, বইপত্রে কিংবা জীবিত মুক্তিযোদ্ধাদের নিকট শুনেছি সেইসব বীরত্বের গল্প, সেই গল্পের এক মহানায়ক জগৎজ্যোতি দাস, বীরবিক্রম। যিনি জনতার বীরশ্রেষ্ঠ। আমাদের অন্তরে তিনি স্বমহিমায় চির অম্লান হয়ে আছেন, থাকবেন।

 

*** তথ‍্যসূত্র: দাস পার্টির খোঁজে-হাসান মোরশেদ। / বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: সেক্টর ভিত্তিক ইতিহাস সেক্টর ৫ / বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্র ১০ম খণ্ড

 

• দেব রায় সৌমেন
contactwithdev23@gmail.com