১২:২৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম ::
Logo কৃতি শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা দিল সিলেটের বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ Logo মুরারিচাঁদ কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের অংশগ্রহণে চড়ুইভাতি Logo ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত Logo তৃণমূলে নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়াতে দলগুলোর নীতিতে পরিবর্তনের আহ্বান Logo বড়লেখায় মহিষকাণ্ডে যুবলীগ ও বিএনপি নেতাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা Logo বড়লেখায় শিক্ষার্থীদের নিয়ে অভিভাবক সমাবেশ Logo কুলাউড়ায় সাংবাদিকদের সঙ্গে স্বদেশমেইল সম্পাদক নজরুল ইসলাম খানের মতবিনিময় Logo জাতীয়তাবাদী পরিবারের উদ্যোগে দাসের বাজারে দুই শতাধিক এসএসসি উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীকে সংবর্ধনা Logo শ্রীমঙ্গলে প্রবাসীর বাসায় আগুন, পুড়ে ছাই দুই ঘর Logo প্রযুক্তি শিক্ষায় নতুন দিগন্ত, রাজধানীর বসিলায় হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়

মৌলভীবাজারের রাজপথ: দ্রোহের ৪ঠা আগস্ট

এম. আব্দুল্লাহ
  • আপডেট সময় : ১২:৩৪:৩১ অপরাহ্ন, বুধবার, ৫ অগাস্ট ২০২৬
  • / 170
যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের সর্বশেষ খবর জানতে ভিজিট করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

পুরো দেশের ওপর যেন চেপে বসেছিল এক নিকষ কালো অমাবস্যা। রাষ্ট্রযন্ত্র আর তার দোসরদের তাণ্ডবে চারপাশ পাখির মতো মানুষ হত্যার বিভীষিকায় ঢাকা পড়েছিল। কিন্তু সেই ঘোর অন্ধকারের বুকের ভেতরই পরম মায়ায় লুকিয়ে ছিল নতুন এক ভোরে পৌঁছানোর অদম্য বাসনা।

সেদিন ডাক এসেছিল “মৌলভীবাজার ব্লকেড” কর্মসূচির। আমার মোটরসাইকেলটি মৌলভীবাজার পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের পাশে নিরাপদে রেখে পায়ে হেঁটে পথ চলা শুরু করি। রাজপথে পদে পদে ছড়ানো ছিল প্রশাসন আর শাসকদলের রক্তচক্ষু। সব বাধা পেরিয়ে, মেঠো পথ আর গলি ঘুরে শেষমেশ আমরা জড়ো হতে পেরেছিলাম।

সেখান থেকেই প্রস্ফুটিত হয় আমাদের দ্রোহের স্ফুলিঙ্গ। মিছিল নিয়ে আমরা যত চৌমুহনীর দিকে এগোচ্ছিলাম, দেশীয় অস্ত্রের ঝনঝনানি নিয়ে সামনে এসে দাঁড়াচ্ছিল ছাত্রলীগ ও যুবলীগের ক্যাডাররা। কিন্তু সত্যের লড়াইয়ে পিছু হটার সুযোগ ছিল না। আল্লাহ (SWT) খাস রহমতে দীর্ঘ সময় রাজপথে মুখোমুখি লড়াই করে আমরা তাদের শহর ছাড়তে বাধ্য করি। দীর্ঘ আড়াই ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখি পুরো শহরের বুক—চলতে থাকে আমাদের মুক্তির গর্জন।

সেই উত্তাল লড়াইয়ের মাঝে ফুটে উঠেছিল এক অলৌকিক মানবিকতা। তপ্ত রোদে হাঁপিয়ে ওঠা মিছিলে আশপাশের সাধারণ মানুষ বাড়িয়ে দিয়েছিল বোতলভরা পানি। ওপরের বাসাগুলোর জানালা আর বারান্দা থেকে খসে পড়ছিল কেক আর বনরুটি। কোনো রক্তের সম্পর্ক ছাড়াই সেদিন পুরো শহর আটকে গিয়েছিল এক অদ্ভুত মায়াময় ভ্রাতৃত্বের সুতোয়।

চৌমুহনীর রাজপথে একটা উঁচু টেবিলের ওপর দাঁড়িয়ে তখন আমি কণ্ঠের শেষ শক্তি দিয়ে স্লোগান দিচ্ছিলাম।

দুপুরের দিকে, আনুমানিক বেলা ২টার দিকে মৌলভীবাজার টাউন দেওয়ানী মসজিদে নামাজ পড়ার জন্য যাই, ক্লান্তি আর ধোঁয়ায় শরীরটা ঝিমঝিম করায় নামাজ শেষে একটু বিশ্রাম নিচ্ছিলাম। জোহরের সালাত আদায় করে যখন কেবল একটু জিরিয়ে নিচ্ছি, ঠিক তখনই ঘটে সেই নারকীয় ঘটনা। বিকেল ৩টার দিকে হঠাৎ তেড়ে আসে ফ্যাসিবাদী পুলিশ বাহিনী। আমরা প্রায় ৩৫-৪০ জন আন্দোলনকারী তখন মসজিদের ভেতরে আটকা পড়ে যাই।

বাইরে থেকে ছোড়া টিয়ারগ্যাসের তীব্র, বিষাক্ত ধোঁয়া হু হু করে মসজিদের ভেতরে ঢুকতে শুরু করে। আমরা তড়িঘড়ি করে দরজা বন্ধ করে দিই। কিন্তু ততক্ষণে ভেতরে ধোঁয়া জমে এক মারাত্মক পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। টিয়ারগ্যাসের ঝাঁঝে সবার চোখ জ্বালাপোড়া করছিল, অঝোরে পানি পড়ছিল, শ্বাস নেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। সেই সংকটের মুহূর্তে মিছিলে থাকা একজন ব্যাগ থেকে একটি টুথপেস্ট বের করে আমাদের হাতে তুলে দেন। পরম মমতায় আমরা সবাই চোখের নিচে পেস্ট মেখে জ্বালাপোড়া কমানোর চেষ্টা করছিলাম—মসজিদের ভেতরের সেই বাতাস তখন আতঙ্ক আর সহমর্মিতায় ভারী হয়ে উঠেছিল।

কিছুক্ষণ পর মসজিদের বাইর থেকে পুলিশের চতুর কণ্ঠ ভেসে আসে, “আমরা তোমাদের নিরাপত্তা দেব, তোমরা বের হয়ে আসো।” কিন্তু ওদের সেই ছলনায় আমরা পা দিইনি। আবারও যখন পুলিশ দ্বিতীয়বারের মতো হেঁকে বের হতে বলল, তখন আমাদের সাথে থাকা স্থানীয় প্রবীণ মুরব্বিদের পিছে পিছে ঢাল বানিয়ে আমরা মসজিদ থেকে বের হওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। কিন্তু প্রতিশ্রুতি দেওয়া দূরে থাক, বাইরে পা রাখতেই পুলিশ ছদ্মবেশ খুলে হিংস্র হয়ে ওঠে। হঠাৎ আমাদের কয়েকজনকে জাপটে ধরে, লাঠি দিয়ে অন্ধের মতো পেটাতে শুরু করে। চোখের সামনে ভাইদের ওপর লাঠির আঘাত পড়তে দেখে প্রাণপণে দৌড় দিয়ে সেদিনের মতো কোনোমতে সটে পড়ি।

আমাদের এই জুলাই বিপ্লব কোনো নরম স্পর্শ কিংবা মায়াবী হাসির গল্প ছিল না। এ ছিল জীবন বাজি রেখে, ধোঁয়া আর রক্তের মাঝে বুক চিরে লড়াই করার উপাখ্যান। আমরা কেবল এমন এক নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন বুনেছিলাম, যে দেশে অন্তত আমাদের আগামী প্রজন্ম বুক ফুলিয়ে বেঁচে থাকার তাগিদ খুঁজে পাবে। আমাদের সেই রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বপ্নের ফসলে কতটা সোনা ফলবে, তা একমাত্র আল্লাহই ভালো জানেন।

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

মৌলভীবাজারের রাজপথ: দ্রোহের ৪ঠা আগস্ট

আপডেট সময় : ১২:৩৪:৩১ অপরাহ্ন, বুধবার, ৫ অগাস্ট ২০২৬

পুরো দেশের ওপর যেন চেপে বসেছিল এক নিকষ কালো অমাবস্যা। রাষ্ট্রযন্ত্র আর তার দোসরদের তাণ্ডবে চারপাশ পাখির মতো মানুষ হত্যার বিভীষিকায় ঢাকা পড়েছিল। কিন্তু সেই ঘোর অন্ধকারের বুকের ভেতরই পরম মায়ায় লুকিয়ে ছিল নতুন এক ভোরে পৌঁছানোর অদম্য বাসনা।

সেদিন ডাক এসেছিল “মৌলভীবাজার ব্লকেড” কর্মসূচির। আমার মোটরসাইকেলটি মৌলভীবাজার পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের পাশে নিরাপদে রেখে পায়ে হেঁটে পথ চলা শুরু করি। রাজপথে পদে পদে ছড়ানো ছিল প্রশাসন আর শাসকদলের রক্তচক্ষু। সব বাধা পেরিয়ে, মেঠো পথ আর গলি ঘুরে শেষমেশ আমরা জড়ো হতে পেরেছিলাম।

সেখান থেকেই প্রস্ফুটিত হয় আমাদের দ্রোহের স্ফুলিঙ্গ। মিছিল নিয়ে আমরা যত চৌমুহনীর দিকে এগোচ্ছিলাম, দেশীয় অস্ত্রের ঝনঝনানি নিয়ে সামনে এসে দাঁড়াচ্ছিল ছাত্রলীগ ও যুবলীগের ক্যাডাররা। কিন্তু সত্যের লড়াইয়ে পিছু হটার সুযোগ ছিল না। আল্লাহ (SWT) খাস রহমতে দীর্ঘ সময় রাজপথে মুখোমুখি লড়াই করে আমরা তাদের শহর ছাড়তে বাধ্য করি। দীর্ঘ আড়াই ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখি পুরো শহরের বুক—চলতে থাকে আমাদের মুক্তির গর্জন।

সেই উত্তাল লড়াইয়ের মাঝে ফুটে উঠেছিল এক অলৌকিক মানবিকতা। তপ্ত রোদে হাঁপিয়ে ওঠা মিছিলে আশপাশের সাধারণ মানুষ বাড়িয়ে দিয়েছিল বোতলভরা পানি। ওপরের বাসাগুলোর জানালা আর বারান্দা থেকে খসে পড়ছিল কেক আর বনরুটি। কোনো রক্তের সম্পর্ক ছাড়াই সেদিন পুরো শহর আটকে গিয়েছিল এক অদ্ভুত মায়াময় ভ্রাতৃত্বের সুতোয়।

চৌমুহনীর রাজপথে একটা উঁচু টেবিলের ওপর দাঁড়িয়ে তখন আমি কণ্ঠের শেষ শক্তি দিয়ে স্লোগান দিচ্ছিলাম।

দুপুরের দিকে, আনুমানিক বেলা ২টার দিকে মৌলভীবাজার টাউন দেওয়ানী মসজিদে নামাজ পড়ার জন্য যাই, ক্লান্তি আর ধোঁয়ায় শরীরটা ঝিমঝিম করায় নামাজ শেষে একটু বিশ্রাম নিচ্ছিলাম। জোহরের সালাত আদায় করে যখন কেবল একটু জিরিয়ে নিচ্ছি, ঠিক তখনই ঘটে সেই নারকীয় ঘটনা। বিকেল ৩টার দিকে হঠাৎ তেড়ে আসে ফ্যাসিবাদী পুলিশ বাহিনী। আমরা প্রায় ৩৫-৪০ জন আন্দোলনকারী তখন মসজিদের ভেতরে আটকা পড়ে যাই।

বাইরে থেকে ছোড়া টিয়ারগ্যাসের তীব্র, বিষাক্ত ধোঁয়া হু হু করে মসজিদের ভেতরে ঢুকতে শুরু করে। আমরা তড়িঘড়ি করে দরজা বন্ধ করে দিই। কিন্তু ততক্ষণে ভেতরে ধোঁয়া জমে এক মারাত্মক পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। টিয়ারগ্যাসের ঝাঁঝে সবার চোখ জ্বালাপোড়া করছিল, অঝোরে পানি পড়ছিল, শ্বাস নেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। সেই সংকটের মুহূর্তে মিছিলে থাকা একজন ব্যাগ থেকে একটি টুথপেস্ট বের করে আমাদের হাতে তুলে দেন। পরম মমতায় আমরা সবাই চোখের নিচে পেস্ট মেখে জ্বালাপোড়া কমানোর চেষ্টা করছিলাম—মসজিদের ভেতরের সেই বাতাস তখন আতঙ্ক আর সহমর্মিতায় ভারী হয়ে উঠেছিল।

কিছুক্ষণ পর মসজিদের বাইর থেকে পুলিশের চতুর কণ্ঠ ভেসে আসে, “আমরা তোমাদের নিরাপত্তা দেব, তোমরা বের হয়ে আসো।” কিন্তু ওদের সেই ছলনায় আমরা পা দিইনি। আবারও যখন পুলিশ দ্বিতীয়বারের মতো হেঁকে বের হতে বলল, তখন আমাদের সাথে থাকা স্থানীয় প্রবীণ মুরব্বিদের পিছে পিছে ঢাল বানিয়ে আমরা মসজিদ থেকে বের হওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। কিন্তু প্রতিশ্রুতি দেওয়া দূরে থাক, বাইরে পা রাখতেই পুলিশ ছদ্মবেশ খুলে হিংস্র হয়ে ওঠে। হঠাৎ আমাদের কয়েকজনকে জাপটে ধরে, লাঠি দিয়ে অন্ধের মতো পেটাতে শুরু করে। চোখের সামনে ভাইদের ওপর লাঠির আঘাত পড়তে দেখে প্রাণপণে দৌড় দিয়ে সেদিনের মতো কোনোমতে সটে পড়ি।

আমাদের এই জুলাই বিপ্লব কোনো নরম স্পর্শ কিংবা মায়াবী হাসির গল্প ছিল না। এ ছিল জীবন বাজি রেখে, ধোঁয়া আর রক্তের মাঝে বুক চিরে লড়াই করার উপাখ্যান। আমরা কেবল এমন এক নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন বুনেছিলাম, যে দেশে অন্তত আমাদের আগামী প্রজন্ম বুক ফুলিয়ে বেঁচে থাকার তাগিদ খুঁজে পাবে। আমাদের সেই রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বপ্নের ফসলে কতটা সোনা ফলবে, তা একমাত্র আল্লাহই ভালো জানেন।