১১:৪৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম ::
Logo কৃতি শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা দিল সিলেটের বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ Logo মুরারিচাঁদ কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের অংশগ্রহণে চড়ুইভাতি Logo ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত Logo তৃণমূলে নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়াতে দলগুলোর নীতিতে পরিবর্তনের আহ্বান Logo বড়লেখায় মহিষকাণ্ডে যুবলীগ ও বিএনপি নেতাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা Logo বড়লেখায় শিক্ষার্থীদের নিয়ে অভিভাবক সমাবেশ Logo কুলাউড়ায় সাংবাদিকদের সঙ্গে স্বদেশমেইল সম্পাদক নজরুল ইসলাম খানের মতবিনিময় Logo জাতীয়তাবাদী পরিবারের উদ্যোগে দাসের বাজারে দুই শতাধিক এসএসসি উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীকে সংবর্ধনা Logo শ্রীমঙ্গলে প্রবাসীর বাসায় আগুন, পুড়ে ছাই দুই ঘর Logo প্রযুক্তি শিক্ষায় নতুন দিগন্ত, রাজধানীর বসিলায় হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়

১৮০ বছরের অপেক্ষা: চা শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্র কি এবার এগিয়ে আসবে?

অজিত রবিদাস, গণমাধ্যমকর্মী
  • আপডেট সময় : ০৪:৫২:০৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ২ অগাস্ট ২০২৬
  • / 168
যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের সর্বশেষ খবর জানতে ভিজিট করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫৫ বছর পূর্ণ হতে চলেছে। এই সময়ে দেশের অর্থনীতি, অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও প্রযুক্তিসহ প্রায় প্রতিটি খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। নিম্ন আয়ের দেশ থেকে বাংলাদেশ আজ নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে, উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উত্তরণের পথও সুদৃঢ় হয়েছে। কিন্তু এই উন্নয়নের বিস্তৃত চিত্রের আড়ালে এমন একটি জনগোষ্ঠী রয়েছে, যাদের জীবনযাত্রায় পরিবর্তনের ছোঁয়া খুব সামান্যই লেগেছে। তারা হলেন বাংলাদেশের চা বাগানের শ্রমিক ও তাঁদের উত্তরসূরিরা।

চা বাংলাদেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী রপ্তানিমুখী শিল্প। দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও বাংলাদেশের চা পরিচিত একটি পণ্য। এই শিল্পের প্রতিটি সাফল্যের পেছনে রয়েছে হাজার হাজার শ্রমিকের নীরব শ্রম, ঘাম এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে চলা ত্যাগ। কিন্তু বিস্ময়কর হলেও সত্য, যাঁদের শ্রমে এই শিল্প টিকে আছে, সেই শ্রমিকদের একটি বড় অংশ এখনও দারিদ্র্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা, অনিরাপদ আবাসন, ভূমির অনিশ্চয়তা এবং সামাজিক বঞ্চনার মধ্যে জীবন কাটাচ্ছেন।

প্রশ্ন হলো- এটি কি শুধু একটি অর্থনৈতিক সমস্যা, নাকি এটি রাষ্ট্রের সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার সক্ষমতারও পরীক্ষা?

বাংলাদেশের চা শ্রমিকদের ইতিহাস কেবল শ্রমের ইতিহাস নয় বরং এই ইতিহাস উপনিবেশ, স্থানচ্যুতি এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার ইতিহাসও।

উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকেরা ভারতের বিহার, উড়িষ্যা, ছত্তিশগড়, ঝাড়খণ্ড, তামিলনাড়ুসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বহু আদিবাসী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষকে চুক্তিভিত্তিক শ্রমিক হিসেবে তৎকালীন আসামের সুরমা উপত্যকা ও বর্তমান বাংলাদেশের চা বাগানগুলোতে নিয়ে আসে। উন্নত জীবনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে তাঁদের জন্য অপেক্ষা করছিল কঠোর শ্রম, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং প্রায় বন্দিদশার জীবন।

স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র বদলেছে, সংবিধান বদলেছে, নাগরিকত্ব বদলেছে কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই বদলায়নি তাঁদের জীবনযাত্রার মৌলিক বাস্তবতা।

আজও বাংলাদেশের অধিকাংশ চা শ্রমিক পরিবার সেই বাগানকেন্দ্রিক জীবনেই আবদ্ধ। কয়েক প্রজন্ম ধরে একই শ্রমচক্রের মধ্যে থেকে শিক্ষা, বিকল্প কর্মসংস্থান ও সামাজিক গতিশীলতার সুযোগ সীমিত হওয়ায় দারিদ্র্য প্রজন্মান্তরে স্থানান্তরিত হয়েছে।

চা শ্রমিকদের জীবনমানের প্রশ্নটি কোনো দাতব্য সহায়তা বা রাজনৈতিক সদিচ্ছার বিষয় নয় বরং এটি বাংলাদেশের সংবিধান স্বীকৃত নাগরিক অধিকারের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৫ রাষ্ট্রকে নাগরিকের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা এবং সামাজিক নিরাপত্তার মতো মৌলিক প্রয়োজন পূরণের দায়িত্ব দিয়েছে।

অনুচ্ছেদ ১৭ সকল নাগরিকের জন্য শিক্ষার সমান সুযোগ নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেছে। অনুচ্ছেদ ১৯ সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করে সবার জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টিকে রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম মৌলিক নীতি হিসেবে ঘোষণা করেছে। অন্যদিকে অনুচ্ছেদ ২০ শ্রমকে মর্যাদা প্রদান এবং শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে।

অর্থাৎ চা শ্রমিকদের উন্নয়ন কোনো অনুগ্রহ নয় বরং এটি সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ (সংশোধিত)-এ শ্রমিকের নিয়োগপত্র, চাকরির শর্ত, নিরাপত্তা, কল্যাণ এবং শ্রমিকের অধিকার সম্পর্কে সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে।

আইন অনুযায়ী একজন শ্রমিককে লিখিত নিয়োগপত্র প্রদান, চাকরির শর্ত নির্ধারণ এবং আইনসম্মত সুবিধা নিশ্চিত করা নিয়োগকর্তার দায়িত্ব। একইভাবে কর্মপরিবেশ, স্বাস্থ্যসেবা, মাতৃত্বকালীন সুবিধা এবং শ্রমিক কল্যাণ তহবিল সম্পর্কেও আইন স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে।

কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা ও বিভিন্ন গবেষণা বলছে, চা খাতে আইনের অনেক বিধান এখনও পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। ফলে আইনের কাগুজে সুরক্ষা এবং বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতার মধ্যে একটি বড় ব্যবধান রয়ে গেছে।

বাংলাদেশে দারিদ্র্য কমেছে, শিশু মৃত্যুহার কমেছে, শিক্ষার হার বেড়েছে, নারীর কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পেয়েছে-এসব সাফল্য নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।

কিন্তু জাতীয় গড় উন্নয়নের ভেতরে এমন কিছু জনগোষ্ঠী রয়েছে, যাদের অবস্থান আলাদাভাবে বিশ্লেষণ না করলে প্রকৃত বৈষম্যের চিত্র দৃশ্যমান হয় না। চা শ্রমিকরা সেই জনগোষ্ঠীগুলোর অন্যতম।

নীতিনির্ধারণে প্রায়ই জাতীয় গড়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু গড়ের আড়ালে থাকা এই বৈষম্যই উন্নয়নের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ একটি রাষ্ট্রের সাফল্য নির্ধারিত হয় শুধু রাজধানীর উন্নয়ন দিয়ে নয় বরং সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা মানুষের জীবনমান কতটা উন্নত হয়েছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

চা বাগানের একজন শিশুর শিক্ষার সুযোগ, একজন গর্ভবতী নারীর চিকিৎসা পাওয়ার নিশ্চয়তা কিংবা একজন শ্রমিক পরিবারের নিরাপদ আবাসন- এসব সূচকই প্রকৃত অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের মানদণ্ড।

এই বাস্তবতা থেকে স্পষ্ট যে চা শ্রমিকদের প্রশ্নটি কেবল শ্রমনীতি নয় বরং এটি সামাজিক ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা এবং সাংবিধানিক সমতার প্রশ্ন।

বাংলাদেশের চা শিল্পের ইতিহাস যেমন পুরোনো, তেমনি পুরোনো এই খাতের শ্রমিকদের বঞ্চনার ইতিহাসও। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে মজুরি বৃদ্ধি পেলেও প্রশ্ন থেকে গেছে- এই মজুরি কি একজন শ্রমিক ও তাঁর পরিবারের জন্য মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করতে পারে?

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) এক গবেষণায় দেখিয়েছে, বাংলাদেশের চা বাগানগুলোতে শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ, সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা ও ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করতে এখনও বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। গবেষণাটি শ্রমিকদের জন্য “Decent Work” বা মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছে।

সাম্প্রতিক একটি আইনবিষয়ক গবেষণায়ও বলা হয়েছে, বাংলাদেশের চা শ্রমিকদের বর্তমান ন্যূনতম মজুরি সংবিধানে স্বীকৃত মানবিক মর্যাদা ও জীবনযাপনের অধিকারের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ-সে বিষয়ে নতুন করে মূল্যায়ন প্রয়োজন। গবেষণাটি ন্যায্য মজুরি নির্ধারণে আইনগত সংস্কারের সুপারিশ করেছে।

এখানে মূল প্রশ্নটি কেবল “কত টাকা মজুরি” নয় বরং সেই মজুরিতে একজন শ্রমিক তাঁর সন্তানের শিক্ষা, পরিবারের চিকিৎসা, পুষ্টি, বাসস্থান এবং ভবিষ্যতের জন্য ন্যূনতম সঞ্চয় করতে পারেন কি না।

পৃথিবীর যেসব দেশ দারিদ্র্য কমাতে সফল হয়েছে, তারা শিক্ষা খাতকে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করেছে। কিন্তু বাংলাদেশের অধিকাংশ চা বাগান এলাকায় এখনও মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত।

বিদ্যালয়ে পৌঁছাতে দীর্ঘ পথ হাঁটা, ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা, সামাজিক বৈষম্য এবং পারিবারিক দারিদ্র্যের কারণে বহু শিশু প্রাথমিক স্তরেই পড়াশোনা ছেড়ে দেয়। ফলে একটি শিশুর সামনে দুটি পথই যেন খোলা থাকে তা হচ্ছে- চা বাগানে শ্রমিক হওয়া অথবা অদক্ষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করা।

এই বাস্তবতা শুধু একটি পরিবারের নয় বরং এটি একটি জনগোষ্ঠীর প্রজন্মান্তরের দারিদ্র্যকে স্থায়ী করে তোলে।

বাংলাদেশের সংবিধান চিকিৎসাসেবাকে রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্বের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু বহু চা বাগানে এখনও পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স, প্রশিক্ষিত ধাত্রী, পরীক্ষাগার কিংবা প্রয়োজনীয় ওষুধের অভাব রয়েছে।

নিরাপদ পানির সংকট, অপুষ্টি, মাতৃস্বাস্থ্যের ঝুঁকি এবং প্রতিরোধযোগ্য রোগের উচ্চ উপস্থিতি চা শ্রমিকদের জীবনমানকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।

একই স্থানে কয়েক প্রজন্ম ধরে বসবাস করেও অধিকাংশ শ্রমিক পরিবারের বসতভিটার কোনো আইনগত মালিকানা নেই। ফলে তারা ব্যাংক ঋণ নিতে পারে না, ঘর সংস্কারে বিনিয়োগ করতে পারে না কিংবা ভূমি নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হলে কার্যকর আইনি সুরক্ষাও পায় না।

অর্থনীতিবিদদের মতে, সম্পদের ওপর আইনি অধিকার না থাকলে দরিদ্র জনগোষ্ঠী কখনোই টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের অংশ হতে পারে না।

বাংলাদেশের চা শিল্পে নারীদের অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন চা পাতা সংগ্রহের প্রধান দায়িত্ব তাঁদের কাঁধেই থাকে। কিন্তু সমান শ্রম দিলেও তাঁরা বহুমাত্রিক বৈষম্যের মুখোমুখি হন। কর্মক্ষেত্রে মাতৃত্বকালীন সুরক্ষা, স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন, শিশু পরিচর্যা এবং নিরাপদ পরিবেশের ঘাটতির বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে।

বাংলাদেশ দারিদ্র্য হ্রাস, নারীর ক্ষমতায়ন, প্রাথমিক শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যসেবায় আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। তবে উন্নয়নের সুফল সব জনগোষ্ঠীর কাছে সমানভাবে পৌঁছায়নি।

চা বাগান এলাকায় সীমিত শিক্ষা, দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা, অনিরাপদ আবাসন, কম মজুরি এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা মিলিয়ে প্রজন্মান্তরের দারিদ্র্যের চক্র তৈরি হয়েছে।

চা শ্রমিকদের প্রশ্নকে কেবল শ্রমিক-মালিকের মজুরি বিরোধ হিসেবে দেখলে চলবে না।

এটি একই সঙ্গে-

* মানবাধিকার,
* সংবিধান,
* সামাজিক ন্যায়বিচার,
* অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন,
* এবং টেকসই অর্থনীতির প্রশ্ন।

চা শিল্প টিকিয়ে রাখতে হলে শুধু উৎপাদন বাড়ানো নয়, উৎপাদনের মূল শক্তি- শ্রমিকদের জীবনমানও উন্নত করতে হবে। কারণ কোনো শিল্পই তার শ্রমিকদের মানবিক মর্যাদা উপেক্ষা করে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হতে পারে না।

চা শিল্প কেবল একটি কৃষিভিত্তিক উৎপাদন খাত নয়। এই খাত বাংলাদেশের ইতিহাস, অর্থনীতি এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সামাজিক বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু এই শিল্পের টেকসই ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে শুধু উৎপাদন বাড়ানোর ওপর নয়, বরং যাঁদের শ্রমে এই শিল্প টিকে আছে, তাঁদের জীবনমান কতটা উন্নত করা যায় তার ওপর।

বিশ্বের অনেক চা উৎপাদনকারী দেশ-যেমন শ্রীলঙ্কা, ভারত ও কেনিয়া-চা শিল্পের প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, আবাসন ও সামাজিক নিরাপত্তায় ধাপে ধাপে বিনিয়োগ করেছে। বাংলাদেশের বাস্তবতা ভিন্ন হলেও একটি বিষয় স্পষ্ট: শ্রমিকের মানবিক উন্নয়ন ছাড়া শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন সম্ভব নয়।

চা শ্রমিকদের উন্নয়নকে বিচ্ছিন্ন প্রকল্প হিসেবে নয়, একটি সমন্বিত জাতীয় নীতি হিসেবে দেখা প্রয়োজন। সে লক্ষ্যে কয়েকটি বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে।

প্রথমত, ন্যায্য মজুরি নির্ধারণ। মজুরি এমন হতে হবে যাতে একজন শ্রমিক ও তাঁর পরিবার খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার ন্যূনতম ব্যয় বহন করতে পারে। মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে শ্রমিক, মালিক, সরকার এবং স্বাধীন অর্থনীতিবিদদের অংশগ্রহণে নিয়মিত পর্যালোচনার ব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার।

দ্বিতীয়ত, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন। চা বাগান এলাকায় সরকারি বিদ্যালয়, কারিগরি শিক্ষা এবং বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের সম্প্রসারণ ছাড়া প্রজন্মান্তরের দারিদ্র্য ভাঙা কঠিন। শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি, আবাসিক সুবিধা এবং ঝরে পড়া রোধে বিশেষ কর্মসূচিও প্রয়োজন।

তৃতীয়ত, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি। প্রতিটি বড় চা বাগান ক্লাস্টারে মানসম্মত সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র, প্রশিক্ষিত ধাত্রী, মাতৃস্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ পানির ব্যবস্থা এবং পুষ্টি কর্মসূচি চালু করা জরুরি।

চতুর্থত, ভূমির নিরাপত্তা। বহু প্রজন্ম ধরে বসবাসকারী শ্রমিক পরিবারগুলোর বসতভিটার আইনি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য একটি স্বচ্ছ ও ন্যায়সঙ্গত নীতিমালা প্রণয়ন করা যেতে পারে। ভূমির নিরাপত্তা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতারও ভিত্তি।

পঞ্চমত, প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিনিধিত্ব। চা শ্রমিকদের নিয়ে যেকোনো নীতিনির্ধারণী কমিটি বা কমিশনে তাঁদের নিজস্ব প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা উচিত। যাঁদের জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, তাঁদের কণ্ঠস্বর সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় থাকা গণতান্ত্রিক শাসনেরই অংশ।

উন্নয়ন তখনই অর্থবহ, যখন কেউ পিছিয়ে থাকে না।

বাংলাদেশ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs) অর্জনের অঙ্গীকার করেছে। সেই লক্ষ্যগুলোর অন্যতম মূলনীতি হলো-“Leave No One Behind”, অর্থাৎ উন্নয়নের পথে কাউকে পিছিয়ে রাখা যাবে না।

চা শ্রমিকদের বাস্তবতা এই অঙ্গীকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাক্ষেত্র।

যদি একটি জনগোষ্ঠী প্রজন্মের পর প্রজন্ম একই ধরনের বঞ্চনার মধ্যে থাকে, তবে সেটি কেবল অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিষয় নয় বরং এটি নীতিনির্ধারণের সীমাবদ্ধতারও ইঙ্গিত বহন করে। তাই চা শ্রমিকদের উন্নয়নকে দয়া বা অনুদানের বিষয় হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন কৌশলের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখতে হবে।

বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে চা শ্রমিকদের মজুরি, জীবনমান ও অধিকার নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে ইতিবাচক অগ্রগতিও হয়েছে। কিন্তু বিচ্ছিন্ন উদ্যোগে এই দীর্ঘমেয়াদি সংকটের সমাধান সম্ভব নয়।

প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদি “জাতীয় চা শ্রমিক উন্নয়ন কর্মপরিকল্পনা”, যেখানে থাকবে নির্দিষ্ট সময়সীমা, বাজেট, জবাবদিহি এবং অগ্রগতি মূল্যায়নের ব্যবস্থা। এই পরিকল্পনায় শ্রম মন্ত্রণালয়, ভূমি মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ চা বোর্ড, বাগান কর্তৃপক্ষ, শ্রমিক প্রতিনিধি এবং নাগরিক সমাজ- সব পক্ষের অংশগ্রহণ থাকা উচিত।

চা শিল্প বাংলাদেশের বার্ষিক রপ্তানি আয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অথচ এই শিল্পের মূল চালিকাশক্তি-এই দেশের চা শ্রমিকরা আজও কম মজুরিতে অতি-দারিদ্র্যের চক্রে আবদ্ধ-“নিজভূমে পরবাসী”।

আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী দৈনিক ১.৯১ ডলার (২৩১ টাকা)-এর কম আয়কে অতি-দারিদ্র্য বলা হয়। বর্তমানে বাংলাদেশের চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি মাত্র ১৮৭ টাকা। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে একজন চা শ্রমিক ৩৫০ থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত মজুরি পান। এই বৈষম্যমূলক মজুরিতে বাড়তে থাকা দ্রব্যমূল্যের সাথে তাল মিলিয়ে বাঁচা তাদের পক্ষে অসম্ভব। তবুও এই চা শ্রমিকদের দারিদ্র্যের বিষয়টি PRSP বা সপ্তম পঞ্চ-বার্ষিকী পরিকল্পনার কোথাও উল্লেখ করা হয়নি-যার ফলে তারা সমন্বিত উন্নয়নের সুযোগ থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত।

বাংলাদেশের ১৭০টি চা বাগানের মধ্যে একটি বাগানেও কোনো কলেজ নেই। হাইস্কুল আছে মাত্র ৯টি, সেগুলোও সীমিত সম্পদে চা বাগানের ছাত্র-যুবকদের দ্বারা পরিচালিত। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে হাতে গোনা কয়েকটি। ৫-৬ কিলোমিটার পায়ে হেঁটে স্কুলে যেতে হয় শিশুদের। ভাষাগত ও শারীরিক পার্থক্যের কারণে মূলধারার শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বৈষম্য ও লাঞ্ছনার শিকার হয়ে তারা প্রাথমিক পাঠ শেষ হওয়ার আগেই ঝরে পড়ে। পিছিয়ে পড়া অন্যান্য জনগোষ্ঠীর জন্য শিক্ষা ও চাকরিতে কোটা থাকলেও চা জনগোষ্ঠীর জন্য তেমন কোনো বিশেষ ব্যবস্থা নেই।

চা চাষের জন্য সরকার কর্তৃক ১,১১,৬৬৩.৮৩ হেক্টর জমি লিজ মঞ্জুর হয়েছে, একর প্রতি বার্ষিক লিজ মাত্র ৫০০ টাকা। অথচ চা শ্রমিকদের নিজেদের ভূমির কোনো দলিল নেই। ফলে তারা ব্যাংক ঋণ পায় না, নিজেদের ঘর বাড়াতে পারে না এবং প্রভাবশালীদের ভূমি দখলের বিরুদ্ধে আইনি প্রতিকার পায় না। চান্দপুর-বেগমখান চা বাগানের ১,২৫০টি পরিবারের ৫১১.৮৩ একর কৃষিজমি দখল করে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল করার চেষ্টা চলছে। চলাখাই চা বাগানের ৭০টি পরিবারের ১০০ একর জমি দখল করা হয়েছে। লাক্কাতুরা চা বাগানের শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ না দিয়েই তাদের জমিতে নির্মিত হয়েছে সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম।

চা শ্রমিকদের বঞ্চনার অবসানে এই উদ্যোগগুলো অপরিহার্য। চা শ্রমিকদের মজুরি কমপক্ষে ৫০০ টাকা নিশ্চিত করা। জাতীয় গণশুমারিতে চা জনগোষ্ঠীকে পরিচয়ভিত্তিকভাবে পৃথকভাবে গণনা ও স্বীকৃতি প্রদান করুন, যাতে তাদের প্রকৃত সংখ্যা, অবস্থান ও প্রয়োজন নির্ভুলভাবে জানা যায় এবং উন্নয়ন পরিকল্পনায় তারা অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৮০ বছর ধরে বসবাসকারী চা শ্রমিক পরিবারগুলোর বসতভিটার স্থায়ী স্বত্বাধিকার নিশ্চিত করতে একটি বিশেষ ভূমি কমিশন গঠন করা। ভূমি দখলকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া এবং দখলকৃত জমি ফিরিয়ে দেওয়া। শ্রম আইনের বাধ্যতামূলক নিয়োগপত্র প্রদান ও ৩ মাস পর স্থায়ীকরণের বিধান কার্যকর করতে বিশেষ মনিটরিং সেল গঠন এবং আইন লঙ্ঘনকারী বাগান মালিকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া। প্রতিটি চা বাগানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চা বাগান অঞ্চলে উচ্চ বিদ্যালয়, কারিগরি বিদ্যালয় ও কলেজ প্রতিষ্ঠার একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে। চা জনগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ বৃত্তি চালু। শিশুশ্রম বন্ধ করতে কার্যকর পদক্ষেপ এবং ঝরে পড়া রোধে বিশেষ প্রণোদনা প্রদান। প্রতিটি চা বাগান ক্লাস্টারে কমপক্ষে একটি পূর্ণাঙ্গ সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপন, যেখানে থাকবে প্রশিক্ষিত চিকিৎসক, ধাত্রী, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও সরঞ্জাম। বিশুদ্ধ পানি সরবরাহে পার্বত্য এলাকার বিশেষ প্রযুক্তি ব্যবহার করে নলকূপ বা পানি শোধনাগার স্থাপন। চা শ্রমিকদের জন্য মানসম্মত আবাসন নির্মাণে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে একটি বিশেষ আবাসন প্রকল্প চালু করতে হবে। বিদ্যুৎ সংযোগ, পয়ঃনিষ্কাশন ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। চা জনগোষ্ঠীর ১১৬টি জনগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যময় ভাষা, সংস্কৃতি, লোকশিল্প, উৎসব ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের জন্য একটি “চা জনগোষ্ঠী কালচারাল একাডেমি” প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। এটি হবে তাদের পরিচয়ের সংরক্ষণাগার এবং নতুন প্রজন্মের আত্মপরিচয়ের উৎস। জাতীয় বাজেটে চা জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের জন্য পৃথক বরাদ্দ নিশ্চিতকরণ এবং এই অর্থের ব্যয়ের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে একটি স্বাধীন মনিটরিং কমিটি গঠন। চা বাগানের বহুমাত্রিক সমস্যা সমাধানে একটি পূর্ণাঙ্গ “চা জনগোষ্ঠী উন্নয়ন কমিশন” বা পৃথক মন্ত্রণালয় গঠন করা। দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্রঋণ ও আর্থিক অনুদানের মাধ্যমে চা বাগানের বেকার যুব-পুরুষ ও নারীদের আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে হবে। নৃ-তাত্ত্বিকভাবে চা জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন সম্প্রদায় প্রাক-দ্রাবিড়ীয়, আদি অস্ট্রালয়েড ও মঙ্গোলীয় আদিবাসীর অন্তর্ভুক্ত। তাদেরকে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সরকারি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে উচ্চশিক্ষা ও সরকারি চাকরিতে কোটা সংরক্ষণ নিশ্চিত করুন। এই একটি পদক্ষেপই তাদের আগামী প্রজন্মের জীবন বদলে দিতে পারে। শ্রম আইনের ৩২(১) ধারাসহ চা শ্রমিকস্বার্থের সাথে সাংঘর্ষিক সকল ধারা-উপধারা সংশোধন করুন। আইন বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে চা বাগান পরিদর্শন ব্যবস্থা শক্তিশালী করুন এবং শ্রমিকদের আইনি সহায়তা প্রদানের জন্য বিশেষ আইনি সেবা চালু করুন।

একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন কেবল তার উঁচু সেতু, আধুনিক মহাসড়ক বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড হলো- রাষ্ট্র তার সবচেয়ে প্রান্তিক নাগরিকের জীবন কতটা মর্যাদাপূর্ণ করতে পেরেছে।

চা শ্রমিকরা বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রান্তিক নয়, বরং মৌলিক অংশীদার। তাঁদের শ্রমে দেশের একটি ঐতিহ্যবাহী শিল্প টিকে আছে। তাই তাঁদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা কোনো বিশেষ সুবিধা নয় বরং এটি সংবিধানের চেতনা, আইনের শাসন এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের অপরিহার্য দাবি।

১৮০ বছরের এই ইতিহাস নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করবে কি না, তার উত্তর নির্ভর করছে রাষ্ট্রের নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর। যদি সরকার, বাগান কর্তৃপক্ষ এবং সমাজ সম্মিলিতভাবে এই জনগোষ্ঠীর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাসন, ন্যায্য মজুরি এবং ভূমির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে, তবে কেবল চা শ্রমিকদের জীবনই বদলাবে না- বাংলাদেশও আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, ন্যায়ভিত্তিক এবং মানবিক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার পথে এক ধাপ এগিয়ে যাবে।

এখন সময় চা শ্রমিকদের উন্নয়নকে বিচ্ছিন্ন কল্যাণমূলক উদ্যোগের পরিবর্তে একটি জাতীয় নীতিগত অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করার। ন্যায্য মজুরি, শ্রম আইনের কঠোর বাস্তবায়ন, বসতভিটার আইনি নিরাপত্তা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং সামাজিক সুরক্ষা-এসব বিষয়ে একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন জরুরি। একই সঙ্গে বাংলাদেশ চা বোর্ড, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বাগান কর্তৃপক্ষ, শ্রমিক প্রতিনিধি ও নাগরিক সমাজকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

১৮০ বছরের বঞ্চনার ইতিহাস আর দীর্ঘ হওয়া উচিত নয়। বাংলাদেশের উন্নয়নের গল্প তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন চা বাগানের শ্রমিক পরিবারও সেই গল্পের সমান অংশীদার হবে।

• অজিত রবিদাস, গণমাধ্যমকর্মী

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

১৮০ বছরের অপেক্ষা: চা শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্র কি এবার এগিয়ে আসবে?

আপডেট সময় : ০৪:৫২:০৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ২ অগাস্ট ২০২৬

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫৫ বছর পূর্ণ হতে চলেছে। এই সময়ে দেশের অর্থনীতি, অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও প্রযুক্তিসহ প্রায় প্রতিটি খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। নিম্ন আয়ের দেশ থেকে বাংলাদেশ আজ নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে, উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উত্তরণের পথও সুদৃঢ় হয়েছে। কিন্তু এই উন্নয়নের বিস্তৃত চিত্রের আড়ালে এমন একটি জনগোষ্ঠী রয়েছে, যাদের জীবনযাত্রায় পরিবর্তনের ছোঁয়া খুব সামান্যই লেগেছে। তারা হলেন বাংলাদেশের চা বাগানের শ্রমিক ও তাঁদের উত্তরসূরিরা।

চা বাংলাদেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী রপ্তানিমুখী শিল্প। দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও বাংলাদেশের চা পরিচিত একটি পণ্য। এই শিল্পের প্রতিটি সাফল্যের পেছনে রয়েছে হাজার হাজার শ্রমিকের নীরব শ্রম, ঘাম এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে চলা ত্যাগ। কিন্তু বিস্ময়কর হলেও সত্য, যাঁদের শ্রমে এই শিল্প টিকে আছে, সেই শ্রমিকদের একটি বড় অংশ এখনও দারিদ্র্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতা, অনিরাপদ আবাসন, ভূমির অনিশ্চয়তা এবং সামাজিক বঞ্চনার মধ্যে জীবন কাটাচ্ছেন।

প্রশ্ন হলো- এটি কি শুধু একটি অর্থনৈতিক সমস্যা, নাকি এটি রাষ্ট্রের সামাজিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার সক্ষমতারও পরীক্ষা?

বাংলাদেশের চা শ্রমিকদের ইতিহাস কেবল শ্রমের ইতিহাস নয় বরং এই ইতিহাস উপনিবেশ, স্থানচ্যুতি এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতার ইতিহাসও।

উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসকেরা ভারতের বিহার, উড়িষ্যা, ছত্তিশগড়, ঝাড়খণ্ড, তামিলনাড়ুসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বহু আদিবাসী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষকে চুক্তিভিত্তিক শ্রমিক হিসেবে তৎকালীন আসামের সুরমা উপত্যকা ও বর্তমান বাংলাদেশের চা বাগানগুলোতে নিয়ে আসে। উন্নত জীবনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে তাঁদের জন্য অপেক্ষা করছিল কঠোর শ্রম, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা এবং প্রায় বন্দিদশার জীবন।

স্বাধীনতার পর রাষ্ট্র বদলেছে, সংবিধান বদলেছে, নাগরিকত্ব বদলেছে কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই বদলায়নি তাঁদের জীবনযাত্রার মৌলিক বাস্তবতা।

আজও বাংলাদেশের অধিকাংশ চা শ্রমিক পরিবার সেই বাগানকেন্দ্রিক জীবনেই আবদ্ধ। কয়েক প্রজন্ম ধরে একই শ্রমচক্রের মধ্যে থেকে শিক্ষা, বিকল্প কর্মসংস্থান ও সামাজিক গতিশীলতার সুযোগ সীমিত হওয়ায় দারিদ্র্য প্রজন্মান্তরে স্থানান্তরিত হয়েছে।

চা শ্রমিকদের জীবনমানের প্রশ্নটি কোনো দাতব্য সহায়তা বা রাজনৈতিক সদিচ্ছার বিষয় নয় বরং এটি বাংলাদেশের সংবিধান স্বীকৃত নাগরিক অধিকারের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।

বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৫ রাষ্ট্রকে নাগরিকের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা এবং সামাজিক নিরাপত্তার মতো মৌলিক প্রয়োজন পূরণের দায়িত্ব দিয়েছে।

অনুচ্ছেদ ১৭ সকল নাগরিকের জন্য শিক্ষার সমান সুযোগ নিশ্চিত করার অঙ্গীকার করেছে। অনুচ্ছেদ ১৯ সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করে সবার জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টিকে রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম মৌলিক নীতি হিসেবে ঘোষণা করেছে। অন্যদিকে অনুচ্ছেদ ২০ শ্রমকে মর্যাদা প্রদান এবং শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে।

অর্থাৎ চা শ্রমিকদের উন্নয়ন কোনো অনুগ্রহ নয় বরং এটি সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬ (সংশোধিত)-এ শ্রমিকের নিয়োগপত্র, চাকরির শর্ত, নিরাপত্তা, কল্যাণ এবং শ্রমিকের অধিকার সম্পর্কে সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে।

আইন অনুযায়ী একজন শ্রমিককে লিখিত নিয়োগপত্র প্রদান, চাকরির শর্ত নির্ধারণ এবং আইনসম্মত সুবিধা নিশ্চিত করা নিয়োগকর্তার দায়িত্ব। একইভাবে কর্মপরিবেশ, স্বাস্থ্যসেবা, মাতৃত্বকালীন সুবিধা এবং শ্রমিক কল্যাণ তহবিল সম্পর্কেও আইন স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে।

কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা ও বিভিন্ন গবেষণা বলছে, চা খাতে আইনের অনেক বিধান এখনও পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। ফলে আইনের কাগুজে সুরক্ষা এবং বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতার মধ্যে একটি বড় ব্যবধান রয়ে গেছে।

বাংলাদেশে দারিদ্র্য কমেছে, শিশু মৃত্যুহার কমেছে, শিক্ষার হার বেড়েছে, নারীর কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পেয়েছে-এসব সাফল্য নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়।

কিন্তু জাতীয় গড় উন্নয়নের ভেতরে এমন কিছু জনগোষ্ঠী রয়েছে, যাদের অবস্থান আলাদাভাবে বিশ্লেষণ না করলে প্রকৃত বৈষম্যের চিত্র দৃশ্যমান হয় না। চা শ্রমিকরা সেই জনগোষ্ঠীগুলোর অন্যতম।

নীতিনির্ধারণে প্রায়ই জাতীয় গড়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু গড়ের আড়ালে থাকা এই বৈষম্যই উন্নয়নের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ একটি রাষ্ট্রের সাফল্য নির্ধারিত হয় শুধু রাজধানীর উন্নয়ন দিয়ে নয় বরং সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা মানুষের জীবনমান কতটা উন্নত হয়েছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

চা বাগানের একজন শিশুর শিক্ষার সুযোগ, একজন গর্ভবতী নারীর চিকিৎসা পাওয়ার নিশ্চয়তা কিংবা একজন শ্রমিক পরিবারের নিরাপদ আবাসন- এসব সূচকই প্রকৃত অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের মানদণ্ড।

এই বাস্তবতা থেকে স্পষ্ট যে চা শ্রমিকদের প্রশ্নটি কেবল শ্রমনীতি নয় বরং এটি সামাজিক ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা এবং সাংবিধানিক সমতার প্রশ্ন।

বাংলাদেশের চা শিল্পের ইতিহাস যেমন পুরোনো, তেমনি পুরোনো এই খাতের শ্রমিকদের বঞ্চনার ইতিহাসও। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে মজুরি বৃদ্ধি পেলেও প্রশ্ন থেকে গেছে- এই মজুরি কি একজন শ্রমিক ও তাঁর পরিবারের জন্য মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত করতে পারে?

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (ILO) এক গবেষণায় দেখিয়েছে, বাংলাদেশের চা বাগানগুলোতে শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ, সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা ও ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করতে এখনও বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। গবেষণাটি শ্রমিকদের জন্য “Decent Work” বা মর্যাদাপূর্ণ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছে।

সাম্প্রতিক একটি আইনবিষয়ক গবেষণায়ও বলা হয়েছে, বাংলাদেশের চা শ্রমিকদের বর্তমান ন্যূনতম মজুরি সংবিধানে স্বীকৃত মানবিক মর্যাদা ও জীবনযাপনের অধিকারের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ-সে বিষয়ে নতুন করে মূল্যায়ন প্রয়োজন। গবেষণাটি ন্যায্য মজুরি নির্ধারণে আইনগত সংস্কারের সুপারিশ করেছে।

এখানে মূল প্রশ্নটি কেবল “কত টাকা মজুরি” নয় বরং সেই মজুরিতে একজন শ্রমিক তাঁর সন্তানের শিক্ষা, পরিবারের চিকিৎসা, পুষ্টি, বাসস্থান এবং ভবিষ্যতের জন্য ন্যূনতম সঞ্চয় করতে পারেন কি না।

পৃথিবীর যেসব দেশ দারিদ্র্য কমাতে সফল হয়েছে, তারা শিক্ষা খাতকে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করেছে। কিন্তু বাংলাদেশের অধিকাংশ চা বাগান এলাকায় এখনও মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার সুযোগ অত্যন্ত সীমিত।

বিদ্যালয়ে পৌঁছাতে দীর্ঘ পথ হাঁটা, ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা, সামাজিক বৈষম্য এবং পারিবারিক দারিদ্র্যের কারণে বহু শিশু প্রাথমিক স্তরেই পড়াশোনা ছেড়ে দেয়। ফলে একটি শিশুর সামনে দুটি পথই যেন খোলা থাকে তা হচ্ছে- চা বাগানে শ্রমিক হওয়া অথবা অদক্ষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করা।

এই বাস্তবতা শুধু একটি পরিবারের নয় বরং এটি একটি জনগোষ্ঠীর প্রজন্মান্তরের দারিদ্র্যকে স্থায়ী করে তোলে।

বাংলাদেশের সংবিধান চিকিৎসাসেবাকে রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্বের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু বহু চা বাগানে এখনও পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স, প্রশিক্ষিত ধাত্রী, পরীক্ষাগার কিংবা প্রয়োজনীয় ওষুধের অভাব রয়েছে।

নিরাপদ পানির সংকট, অপুষ্টি, মাতৃস্বাস্থ্যের ঝুঁকি এবং প্রতিরোধযোগ্য রোগের উচ্চ উপস্থিতি চা শ্রমিকদের জীবনমানকে আরও অনিশ্চিত করে তুলেছে।

একই স্থানে কয়েক প্রজন্ম ধরে বসবাস করেও অধিকাংশ শ্রমিক পরিবারের বসতভিটার কোনো আইনগত মালিকানা নেই। ফলে তারা ব্যাংক ঋণ নিতে পারে না, ঘর সংস্কারে বিনিয়োগ করতে পারে না কিংবা ভূমি নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হলে কার্যকর আইনি সুরক্ষাও পায় না।

অর্থনীতিবিদদের মতে, সম্পদের ওপর আইনি অধিকার না থাকলে দরিদ্র জনগোষ্ঠী কখনোই টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নের অংশ হতে পারে না।

বাংলাদেশের চা শিল্পে নারীদের অংশগ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিদিন চা পাতা সংগ্রহের প্রধান দায়িত্ব তাঁদের কাঁধেই থাকে। কিন্তু সমান শ্রম দিলেও তাঁরা বহুমাত্রিক বৈষম্যের মুখোমুখি হন। কর্মক্ষেত্রে মাতৃত্বকালীন সুরক্ষা, স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন, শিশু পরিচর্যা এবং নিরাপদ পরিবেশের ঘাটতির বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনায় রয়েছে।

বাংলাদেশ দারিদ্র্য হ্রাস, নারীর ক্ষমতায়ন, প্রাথমিক শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যসেবায় আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছে। তবে উন্নয়নের সুফল সব জনগোষ্ঠীর কাছে সমানভাবে পৌঁছায়নি।

চা বাগান এলাকায় সীমিত শিক্ষা, দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা, অনিরাপদ আবাসন, কম মজুরি এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা মিলিয়ে প্রজন্মান্তরের দারিদ্র্যের চক্র তৈরি হয়েছে।

চা শ্রমিকদের প্রশ্নকে কেবল শ্রমিক-মালিকের মজুরি বিরোধ হিসেবে দেখলে চলবে না।

এটি একই সঙ্গে-

* মানবাধিকার,
* সংবিধান,
* সামাজিক ন্যায়বিচার,
* অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন,
* এবং টেকসই অর্থনীতির প্রশ্ন।

চা শিল্প টিকিয়ে রাখতে হলে শুধু উৎপাদন বাড়ানো নয়, উৎপাদনের মূল শক্তি- শ্রমিকদের জীবনমানও উন্নত করতে হবে। কারণ কোনো শিল্পই তার শ্রমিকদের মানবিক মর্যাদা উপেক্ষা করে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হতে পারে না।

চা শিল্প কেবল একটি কৃষিভিত্তিক উৎপাদন খাত নয়। এই খাত বাংলাদেশের ইতিহাস, অর্থনীতি এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সামাজিক বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু এই শিল্পের টেকসই ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে শুধু উৎপাদন বাড়ানোর ওপর নয়, বরং যাঁদের শ্রমে এই শিল্প টিকে আছে, তাঁদের জীবনমান কতটা উন্নত করা যায় তার ওপর।

বিশ্বের অনেক চা উৎপাদনকারী দেশ-যেমন শ্রীলঙ্কা, ভারত ও কেনিয়া-চা শিল্পের প্রতিযোগিতা ধরে রাখতে শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়ন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, আবাসন ও সামাজিক নিরাপত্তায় ধাপে ধাপে বিনিয়োগ করেছে। বাংলাদেশের বাস্তবতা ভিন্ন হলেও একটি বিষয় স্পষ্ট: শ্রমিকের মানবিক উন্নয়ন ছাড়া শিল্পের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন সম্ভব নয়।

চা শ্রমিকদের উন্নয়নকে বিচ্ছিন্ন প্রকল্প হিসেবে নয়, একটি সমন্বিত জাতীয় নীতি হিসেবে দেখা প্রয়োজন। সে লক্ষ্যে কয়েকটি বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে।

প্রথমত, ন্যায্য মজুরি নির্ধারণ। মজুরি এমন হতে হবে যাতে একজন শ্রমিক ও তাঁর পরিবার খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার ন্যূনতম ব্যয় বহন করতে পারে। মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে শ্রমিক, মালিক, সরকার এবং স্বাধীন অর্থনীতিবিদদের অংশগ্রহণে নিয়মিত পর্যালোচনার ব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার।

দ্বিতীয়ত, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়ন। চা বাগান এলাকায় সরকারি বিদ্যালয়, কারিগরি শিক্ষা এবং বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের সম্প্রসারণ ছাড়া প্রজন্মান্তরের দারিদ্র্য ভাঙা কঠিন। শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি, আবাসিক সুবিধা এবং ঝরে পড়া রোধে বিশেষ কর্মসূচিও প্রয়োজন।

তৃতীয়ত, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি। প্রতিটি বড় চা বাগান ক্লাস্টারে মানসম্মত সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র, প্রশিক্ষিত ধাত্রী, মাতৃস্বাস্থ্যসেবা, নিরাপদ পানির ব্যবস্থা এবং পুষ্টি কর্মসূচি চালু করা জরুরি।

চতুর্থত, ভূমির নিরাপত্তা। বহু প্রজন্ম ধরে বসবাসকারী শ্রমিক পরিবারগুলোর বসতভিটার আইনি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য একটি স্বচ্ছ ও ন্যায়সঙ্গত নীতিমালা প্রণয়ন করা যেতে পারে। ভূমির নিরাপত্তা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতারও ভিত্তি।

পঞ্চমত, প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিনিধিত্ব। চা শ্রমিকদের নিয়ে যেকোনো নীতিনির্ধারণী কমিটি বা কমিশনে তাঁদের নিজস্ব প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা উচিত। যাঁদের জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, তাঁদের কণ্ঠস্বর সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় থাকা গণতান্ত্রিক শাসনেরই অংশ।

উন্নয়ন তখনই অর্থবহ, যখন কেউ পিছিয়ে থাকে না।

বাংলাদেশ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs) অর্জনের অঙ্গীকার করেছে। সেই লক্ষ্যগুলোর অন্যতম মূলনীতি হলো-“Leave No One Behind”, অর্থাৎ উন্নয়নের পথে কাউকে পিছিয়ে রাখা যাবে না।

চা শ্রমিকদের বাস্তবতা এই অঙ্গীকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাক্ষেত্র।

যদি একটি জনগোষ্ঠী প্রজন্মের পর প্রজন্ম একই ধরনের বঞ্চনার মধ্যে থাকে, তবে সেটি কেবল অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিষয় নয় বরং এটি নীতিনির্ধারণের সীমাবদ্ধতারও ইঙ্গিত বহন করে। তাই চা শ্রমিকদের উন্নয়নকে দয়া বা অনুদানের বিষয় হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন কৌশলের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখতে হবে।

বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে চা শ্রমিকদের মজুরি, জীবনমান ও অধিকার নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে ইতিবাচক অগ্রগতিও হয়েছে। কিন্তু বিচ্ছিন্ন উদ্যোগে এই দীর্ঘমেয়াদি সংকটের সমাধান সম্ভব নয়।

প্রয়োজন একটি দীর্ঘমেয়াদি “জাতীয় চা শ্রমিক উন্নয়ন কর্মপরিকল্পনা”, যেখানে থাকবে নির্দিষ্ট সময়সীমা, বাজেট, জবাবদিহি এবং অগ্রগতি মূল্যায়নের ব্যবস্থা। এই পরিকল্পনায় শ্রম মন্ত্রণালয়, ভূমি মন্ত্রণালয়, শিক্ষা মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ চা বোর্ড, বাগান কর্তৃপক্ষ, শ্রমিক প্রতিনিধি এবং নাগরিক সমাজ- সব পক্ষের অংশগ্রহণ থাকা উচিত।

চা শিল্প বাংলাদেশের বার্ষিক রপ্তানি আয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অথচ এই শিল্পের মূল চালিকাশক্তি-এই দেশের চা শ্রমিকরা আজও কম মজুরিতে অতি-দারিদ্র্যের চক্রে আবদ্ধ-“নিজভূমে পরবাসী”।

আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী দৈনিক ১.৯১ ডলার (২৩১ টাকা)-এর কম আয়কে অতি-দারিদ্র্য বলা হয়। বর্তমানে বাংলাদেশের চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি মাত্র ১৮৭ টাকা। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে একজন চা শ্রমিক ৩৫০ থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত মজুরি পান। এই বৈষম্যমূলক মজুরিতে বাড়তে থাকা দ্রব্যমূল্যের সাথে তাল মিলিয়ে বাঁচা তাদের পক্ষে অসম্ভব। তবুও এই চা শ্রমিকদের দারিদ্র্যের বিষয়টি PRSP বা সপ্তম পঞ্চ-বার্ষিকী পরিকল্পনার কোথাও উল্লেখ করা হয়নি-যার ফলে তারা সমন্বিত উন্নয়নের সুযোগ থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত।

বাংলাদেশের ১৭০টি চা বাগানের মধ্যে একটি বাগানেও কোনো কলেজ নেই। হাইস্কুল আছে মাত্র ৯টি, সেগুলোও সীমিত সম্পদে চা বাগানের ছাত্র-যুবকদের দ্বারা পরিচালিত। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে হাতে গোনা কয়েকটি। ৫-৬ কিলোমিটার পায়ে হেঁটে স্কুলে যেতে হয় শিশুদের। ভাষাগত ও শারীরিক পার্থক্যের কারণে মূলধারার শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বৈষম্য ও লাঞ্ছনার শিকার হয়ে তারা প্রাথমিক পাঠ শেষ হওয়ার আগেই ঝরে পড়ে। পিছিয়ে পড়া অন্যান্য জনগোষ্ঠীর জন্য শিক্ষা ও চাকরিতে কোটা থাকলেও চা জনগোষ্ঠীর জন্য তেমন কোনো বিশেষ ব্যবস্থা নেই।

চা চাষের জন্য সরকার কর্তৃক ১,১১,৬৬৩.৮৩ হেক্টর জমি লিজ মঞ্জুর হয়েছে, একর প্রতি বার্ষিক লিজ মাত্র ৫০০ টাকা। অথচ চা শ্রমিকদের নিজেদের ভূমির কোনো দলিল নেই। ফলে তারা ব্যাংক ঋণ পায় না, নিজেদের ঘর বাড়াতে পারে না এবং প্রভাবশালীদের ভূমি দখলের বিরুদ্ধে আইনি প্রতিকার পায় না। চান্দপুর-বেগমখান চা বাগানের ১,২৫০টি পরিবারের ৫১১.৮৩ একর কৃষিজমি দখল করে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল করার চেষ্টা চলছে। চলাখাই চা বাগানের ৭০টি পরিবারের ১০০ একর জমি দখল করা হয়েছে। লাক্কাতুরা চা বাগানের শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ না দিয়েই তাদের জমিতে নির্মিত হয়েছে সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়াম।

চা শ্রমিকদের বঞ্চনার অবসানে এই উদ্যোগগুলো অপরিহার্য। চা শ্রমিকদের মজুরি কমপক্ষে ৫০০ টাকা নিশ্চিত করা। জাতীয় গণশুমারিতে চা জনগোষ্ঠীকে পরিচয়ভিত্তিকভাবে পৃথকভাবে গণনা ও স্বীকৃতি প্রদান করুন, যাতে তাদের প্রকৃত সংখ্যা, অবস্থান ও প্রয়োজন নির্ভুলভাবে জানা যায় এবং উন্নয়ন পরিকল্পনায় তারা অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৮০ বছর ধরে বসবাসকারী চা শ্রমিক পরিবারগুলোর বসতভিটার স্থায়ী স্বত্বাধিকার নিশ্চিত করতে একটি বিশেষ ভূমি কমিশন গঠন করা। ভূমি দখলকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া এবং দখলকৃত জমি ফিরিয়ে দেওয়া। শ্রম আইনের বাধ্যতামূলক নিয়োগপত্র প্রদান ও ৩ মাস পর স্থায়ীকরণের বিধান কার্যকর করতে বিশেষ মনিটরিং সেল গঠন এবং আইন লঙ্ঘনকারী বাগান মালিকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া। প্রতিটি চা বাগানে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চা বাগান অঞ্চলে উচ্চ বিদ্যালয়, কারিগরি বিদ্যালয় ও কলেজ প্রতিষ্ঠার একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে। চা জনগোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ বৃত্তি চালু। শিশুশ্রম বন্ধ করতে কার্যকর পদক্ষেপ এবং ঝরে পড়া রোধে বিশেষ প্রণোদনা প্রদান। প্রতিটি চা বাগান ক্লাস্টারে কমপক্ষে একটি পূর্ণাঙ্গ সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র স্থাপন, যেখানে থাকবে প্রশিক্ষিত চিকিৎসক, ধাত্রী, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও সরঞ্জাম। বিশুদ্ধ পানি সরবরাহে পার্বত্য এলাকার বিশেষ প্রযুক্তি ব্যবহার করে নলকূপ বা পানি শোধনাগার স্থাপন। চা শ্রমিকদের জন্য মানসম্মত আবাসন নির্মাণে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে একটি বিশেষ আবাসন প্রকল্প চালু করতে হবে। বিদ্যুৎ সংযোগ, পয়ঃনিষ্কাশন ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। চা জনগোষ্ঠীর ১১৬টি জনগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যময় ভাষা, সংস্কৃতি, লোকশিল্প, উৎসব ও ঐতিহ্য সংরক্ষণের জন্য একটি “চা জনগোষ্ঠী কালচারাল একাডেমি” প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। এটি হবে তাদের পরিচয়ের সংরক্ষণাগার এবং নতুন প্রজন্মের আত্মপরিচয়ের উৎস। জাতীয় বাজেটে চা জনগোষ্ঠীর উন্নয়নের জন্য পৃথক বরাদ্দ নিশ্চিতকরণ এবং এই অর্থের ব্যয়ের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে একটি স্বাধীন মনিটরিং কমিটি গঠন। চা বাগানের বহুমাত্রিক সমস্যা সমাধানে একটি পূর্ণাঙ্গ “চা জনগোষ্ঠী উন্নয়ন কমিশন” বা পৃথক মন্ত্রণালয় গঠন করা। দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্রঋণ ও আর্থিক অনুদানের মাধ্যমে চা বাগানের বেকার যুব-পুরুষ ও নারীদের আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে হবে। নৃ-তাত্ত্বিকভাবে চা জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন সম্প্রদায় প্রাক-দ্রাবিড়ীয়, আদি অস্ট্রালয়েড ও মঙ্গোলীয় আদিবাসীর অন্তর্ভুক্ত। তাদেরকে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সরকারি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে উচ্চশিক্ষা ও সরকারি চাকরিতে কোটা সংরক্ষণ নিশ্চিত করুন। এই একটি পদক্ষেপই তাদের আগামী প্রজন্মের জীবন বদলে দিতে পারে। শ্রম আইনের ৩২(১) ধারাসহ চা শ্রমিকস্বার্থের সাথে সাংঘর্ষিক সকল ধারা-উপধারা সংশোধন করুন। আইন বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে চা বাগান পরিদর্শন ব্যবস্থা শক্তিশালী করুন এবং শ্রমিকদের আইনি সহায়তা প্রদানের জন্য বিশেষ আইনি সেবা চালু করুন।

একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন কেবল তার উঁচু সেতু, আধুনিক মহাসড়ক বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড হলো- রাষ্ট্র তার সবচেয়ে প্রান্তিক নাগরিকের জীবন কতটা মর্যাদাপূর্ণ করতে পেরেছে।

চা শ্রমিকরা বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রান্তিক নয়, বরং মৌলিক অংশীদার। তাঁদের শ্রমে দেশের একটি ঐতিহ্যবাহী শিল্প টিকে আছে। তাই তাঁদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা কোনো বিশেষ সুবিধা নয় বরং এটি সংবিধানের চেতনা, আইনের শাসন এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের অপরিহার্য দাবি।

১৮০ বছরের এই ইতিহাস নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করবে কি না, তার উত্তর নির্ভর করছে রাষ্ট্রের নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর। যদি সরকার, বাগান কর্তৃপক্ষ এবং সমাজ সম্মিলিতভাবে এই জনগোষ্ঠীর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাসন, ন্যায্য মজুরি এবং ভূমির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে, তবে কেবল চা শ্রমিকদের জীবনই বদলাবে না- বাংলাদেশও আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, ন্যায়ভিত্তিক এবং মানবিক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার পথে এক ধাপ এগিয়ে যাবে।

এখন সময় চা শ্রমিকদের উন্নয়নকে বিচ্ছিন্ন কল্যাণমূলক উদ্যোগের পরিবর্তে একটি জাতীয় নীতিগত অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করার। ন্যায্য মজুরি, শ্রম আইনের কঠোর বাস্তবায়ন, বসতভিটার আইনি নিরাপত্তা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণ, বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং সামাজিক সুরক্ষা-এসব বিষয়ে একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন জরুরি। একই সঙ্গে বাংলাদেশ চা বোর্ড, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বাগান কর্তৃপক্ষ, শ্রমিক প্রতিনিধি ও নাগরিক সমাজকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

১৮০ বছরের বঞ্চনার ইতিহাস আর দীর্ঘ হওয়া উচিত নয়। বাংলাদেশের উন্নয়নের গল্প তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন চা বাগানের শ্রমিক পরিবারও সেই গল্পের সমান অংশীদার হবে।

• অজিত রবিদাস, গণমাধ্যমকর্মী