১২:৪৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম ::
Logo কৃতি শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা দিল সিলেটের বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ Logo মুরারিচাঁদ কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের অংশগ্রহণে চড়ুইভাতি Logo ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত Logo তৃণমূলে নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়াতে দলগুলোর নীতিতে পরিবর্তনের আহ্বান Logo বড়লেখায় মহিষকাণ্ডে যুবলীগ ও বিএনপি নেতাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা Logo বড়লেখায় শিক্ষার্থীদের নিয়ে অভিভাবক সমাবেশ Logo কুলাউড়ায় সাংবাদিকদের সঙ্গে স্বদেশমেইল সম্পাদক নজরুল ইসলাম খানের মতবিনিময় Logo জাতীয়তাবাদী পরিবারের উদ্যোগে দাসের বাজারে দুই শতাধিক এসএসসি উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীকে সংবর্ধনা Logo শ্রীমঙ্গলে প্রবাসীর বাসায় আগুন, পুড়ে ছাই দুই ঘর Logo প্রযুক্তি শিক্ষায় নতুন দিগন্ত, রাজধানীর বসিলায় হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়

চলে যাওয়া মানুষটির রেখে যাওয়া অমলিন স্মৃতি

আবুল কাসেম
  • আপডেট সময় : ০২:৩৪:৩০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬
  • / 94
যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের সর্বশেষ খবর জানতে ভিজিট করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

পৃথিবী ছেড়ে কিছু মানুষের চলে যাওয়া শুধু একটি পরিবারের জন্য শূন্যতা তৈরি করে না, বরং একটি পরিচিত পরিবেশ, একটি ভালোবাসার সম্পর্কের জগৎ এবং অসংখ্য স্মৃতির ভাণ্ডারকে হঠাৎ করেই নিস্তব্ধ করে দেয়। তাঁদের অনুপস্থিতি প্রতিদিনের স্বাভাবিক জীবনের মাঝেও এক ধরনের শূন্যতার অনুভূতি তৈরি করে।

বড়লেখা সরকারি ডিগ্রি কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অফিস সহকারী, বড়লেখা পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের গাজিটেকা হেকিম বাড়ির বাসিন্দা শ্রদ্ধেয় মো. মঈন উদ্দিন আঙ্কেলের ইন্তেকালের সংবাদও তেমনই এক বেদনাবিধুর মুহূর্ত। গত ৯ আগস্ট বিকেলে তিনি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে মহান আল্লাহ তায়ালার ডাকে সাড়া দিয়েছেন।

তাঁর চলে যাওয়ার সংবাদ শুনে সবার আগে মনে পড়ল আরেকজন প্রিয় মানুষ, বড়লেখা ডিগ্রি কলেজের বায়োলজি বিভাগের শ্রদ্ধেয় শিক্ষক প্রয়াত নজরুল আঙ্কেলের কথা। মঈন আঙ্কেলের সঙ্গে আমার পরিচয়ের মাধ্যম ছিলেন তিনি। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, তিনিও একদিন হঠাৎ সড়ক দুর্ঘটনায় আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন।

পৃথিবী ছাড়লেই অনেক মানুষ আছেন তাঁরা আসলে কখনো হারিয়ে যান না। তাঁরা তাঁদের ব্যবহার, ভালোবাসা, আন্তরিকতা ও রেখে যাওয়া স্মৃতির মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে আজীবন বেঁচে থাকেন। নজরুল আঙ্কেলের মতো মঈন আঙ্কেলও ছিলেন তেমনই একজন মানুষ। তাঁকে স্মরণ করলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটি হাসিমাখা মুখ, বিনয়ী আচরণ এবং গভীর চিন্তাশীল এক সহজ-সরল মানুষের অবয়ব।

জীবনের ব্যস্ততার আড়ালে কত প্রতিভা, কত মানবিকতা আর কত ভালো গুণ যে নীরবে লুকিয়ে থাকে আমি তাঁদের কাছাকাছি গিয়েছি বলে উপলব্ধি করতে পেরেছি। দু’জনই মুক্তমনের অনন্য মানুষ।

মঈন আঙ্কেলের সঙ্গে আমার সম্পর্কের আরেকটি গভীর যোগসূত্র ছিল। তিনি ছিলেন আমার সহপাঠী বন্ধু আশরাফ উদ্দিন জুলনের পিতা। বড়লেখা সরকারি ডিগ্রি কলেজে দীর্ঘদিন অফিস সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। কর্মজীবনে তাঁর দায়িত্বশীলতা, সততা ও আন্তরিকতা তাঁকে সহকর্মী, শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের কাছে একজন সম্মানিত মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।

তবে আমার কাছে তিনি শুধু একজন অফিস সহকারী কিংবা বন্ধুর বাবাও ছিলেন না। ধীরে ধীরে তিনি আমার কাছে হয়ে উঠেছিলেন একজন অভিভাবকতুল্য মানুষ, যাঁর স্নেহ, আন্তরিকতা ও সুন্দর আচরণ হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিল।

প্রতিদিন সকাল নয়টা বা সাড়ে নয়টার দিকে যখন দোকান (মেসার্স সাজ্জাদ ট্রেডার্স, ডাক বাংলা রোড, বড়লেখা)-এর উদ্দেশ্যে বের হতাম, তখন কলেজ রোডে বাড়ির সামনে প্রায়ই মঈন আঙ্কেলের সঙ্গে দেখা হয়ে যেত। সেই দেখা যেন আমাদের প্রতিদিনের জীবনের একটি স্বাভাবিক ও সুন্দর অংশ হয়ে গিয়েছিল।

আমি সালাম দিলে তিনি যে আন্তরিকতায় হাসিমুখে সালামের উত্তর দিতেন, তা ছিল তাঁর ব্যক্তিত্বের এক অনন্য প্রকাশ। অনেক সময় মনে হতো, উত্তর চৌমুহনা ক্রস করার আগেই যেন তাঁর সঙ্গে দেখা হওয়াটা আমাদের প্রতিদিনের এক অদৃশ্য নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে!

মানুষকে আমরা অনেক সময় তাঁর পরিচয়, পদবি কিংবা সামাজিক অবস্থান দিয়ে বিচার করি। কিন্তু কিছু মানুষের প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ পায় তাঁদের আচরণে। আমার নিকট মঈন আঙ্কেলের সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল তাঁর বিনয়।

বিনয়ী এই মানুষটি বেশিরভাগ সময়ই ধ‍্যানমগ্ন হয়ে বাড়িতেই পড়ে থাকতেন। হয়ত বাহিরকে তাঁর চেনা হয়ে গিয়েছিল!
তাঁর নীরবতার মধ্যেও ছিল এক ধরনের প্রজ্ঞা। অনেক মানুষ বেশি কথা বলে নিজের জ্ঞান জাহির করার চেষ্টা করেন, কিন্তু তিনি অল্প কথায় মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যেতে পারতেন।

আশরাফের বাড়িতে যাওয়া-আসার সুবাদে তাঁকে আরও কাছ থেকে দেখার-জানার সুযোগ হয়েছে। বেশিরভাগ সময় জাহেদুলের সঙ্গেই গিয়েছি। ওর সঙ্গে কোথাও যাওয়ার সুবিধা হচ্ছে ও অন্দরমহলে চলে যায় আর আমি ড্রয়িং রুমের দিক সামলাই এবং গল্পের জন্য যথেষ্ট সময় পাই! সেই সুবাদে আমার গল্পে সঙ্গ দিতেন আশরাফের আব্বা।
আমি, আশরাফ এবং জাহেদুল- আমাদের তিনজনের জীবনে অসংখ্য অমিলের মধ্যে একটি মিল ছিল, আমরা চার ভাই এক বোন। আমি এবং জাহেদুল মেজো হলেও আশরাফ ছিল তার পরিবারে সবার ছোট।

একজন ছোট সন্তানের প্রতি পরিবারের ভালোবাসা কতটা গভীর হতে পারে, তা আশরাফের পরিবারকে দেখলে সহজেই বোঝা যেত।

আশরাফের প্রতি মায়ের ভালোবাসার কথা তার পরিচিত সবাই জানেন। তবে তাঁর পিতার হৃদয়ে আশরাফের জন্য যে কত গভীর মায়া ও ভালোবাসা ছিল, তা আমি একটি বিশেষ মুহূর্তে অনুভব করেছিলাম।

আশরাফ উচ্চতর শিক্ষার জন্য ইংল্যান্ডে চলে যায়। রমজান মাসের একদিন জাকির ভাইয়ের আমন্ত্রণে ইফতারে অংশ নিতে গিয়েছিলাম আশরাফের বাড়িতে। সেদিনের একটি মুহূর্ত আজও আমার হৃদয়ে গভীরভাবে গেঁথে আছে।

মঈন আঙ্কেল আমাকে কাছে টেনে নিয়ে জড়িয়ে ধরেছিলেন, যা এর আগে কোনদিনই আমার ভাগ্যে ঘটেনি। তারপর আবেগভরা কণ্ঠে বলেছিলেন-

“জুলন নাই তউ কিতা অইছে, এর লাগি বাড়িত আইতায় নানি?”

এই কয়েকটি শব্দের মধ্যে লুকিয়ে ছিল একজন পিতার বুকভরা ভালোবাসা, সন্তানের জন্য গভীর অপেক্ষা এবং নিজের সন্তান সংশ্লিষ্টকে কাউকে ছুঁয়ে সন্তানকে ছোঁয়ার আকাঙ্ক্ষা।

আমি তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে দেখেছিলাম, চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু তিনি দ্রুত রুমাল দিয়ে মুছে ফেলছিলেন। একজন পিতা তাঁর সন্তানের প্রতি কতটা ভালোবাসা হৃদয়ের গভীরে ধারণ করেন, সেই মুহূর্তে তা খুব কাছ থেকে অনুভব করেছিলাম।

সেদিন বুঝেছিলাম, পিতারা অনেক সময় তাঁদের ভালোবাসা মুখে প্রকাশ করেন না। তাঁরা নীরবে ভালোবাসেন, সন্তানের জন্য অপেক্ষা করেন, দূরে থেকেও প্রতিনিয়ত দোয়া করেন। আর কখনো কখনো সেই গভীর ভালোবাসা চোখের পানির মাধ্যমে প্রকাশ হয়ে যায়।

ইফতারের টেবিলে বসে সেদিন আমার নিজের চোখও অশ্রুসিক্ত হয়েছিল। সেই কান্না ছিল একজন পিতার নির্মল ভালোবাসার স্পর্শে আবেগাপ্লুত হওয়ার কান্না। তিনি চলে যাওয়াতে সেই মায়াভরা আলিঙ্গনের মুহূর্তটি স্মৃতিতে অমলিন থাকবে।

মঈন আঙ্কেলের জীবন ছিল দায়িত্ববোধ, সততা এবং পারিবারিক মূল্যবোধের এক উজ্জ্বল উদাহরণ। স্ত্রী সরকারি স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষিকা। চার ছেলে ও এক মেয়েকে তিনি সুশিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন। কর্মক্ষেত্রে তিনি ছিলেন দায়িত্বশীল ও নির্ভরযোগ্য, পরিবারে ছিলেন স্নেহময় অভিভাবক, আর পরিচিতজনদের কাছে ছিলেন হাসিমুখের একজন সহজ-সরল মানুষ।

এখন আশরাফের বাড়িতে গেলে হয়তো আর টেবিলে বসে পত্রিকা পড়া অবস্থায় তাঁকে দেখা যাবে না। সেই হাসিমাখা মুখ আর আন্তরিক কথাগুলোও আর শোনা যাবে না।

কিন্তু মানুষের জীবন শেষ হয়ে গেলেও তাঁর ভালোবাসা, তাঁর ব্যবহার এবং তাঁর রেখে যাওয়া স্মৃতিগুলো কখনো শেষ হয়না। মঈন আঙ্কেল তাঁর পরিচিত মানুষের হৃদয়ে ঠিক তেমনই এক উজ্জ্বল স্মৃতি হয়ে বেঁচে থাকবেন।

মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন সম্পদ, পদ বা পরিচিতি নয় বরং মানুষের হৃদয়ে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার একটি স্থায়ী জায়গা তৈরি করা। মঈন আঙ্কেল সেটা অর্জন করে গেছেন। তাঁর পরিচিত প্রতিটি মানুষ তাঁকে আদর্শ মানুষ হিসেবে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করবে।

“নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য এবং নিশ্চয়ই আমরা তাঁরই দিকে ফিরে যাব।”

মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমার প্রিয় আঙ্কেলকে ক্ষমা করে দেন, তাঁর কবরকে নূরের ঔজ্জ্বল্যে ভরিয়ে তোলেন এবং জান্নাতুল ফেরদৌস নসীব করেন।

 

• আবুল কাসেম, সম্পাদক ও প্রকাশক, ষাটমাকন্ঠ

 

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

চলে যাওয়া মানুষটির রেখে যাওয়া অমলিন স্মৃতি

আপডেট সময় : ০২:৩৪:৩০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ অগাস্ট ২০২৬

পৃথিবী ছেড়ে কিছু মানুষের চলে যাওয়া শুধু একটি পরিবারের জন্য শূন্যতা তৈরি করে না, বরং একটি পরিচিত পরিবেশ, একটি ভালোবাসার সম্পর্কের জগৎ এবং অসংখ্য স্মৃতির ভাণ্ডারকে হঠাৎ করেই নিস্তব্ধ করে দেয়। তাঁদের অনুপস্থিতি প্রতিদিনের স্বাভাবিক জীবনের মাঝেও এক ধরনের শূন্যতার অনুভূতি তৈরি করে।

বড়লেখা সরকারি ডিগ্রি কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অফিস সহকারী, বড়লেখা পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের গাজিটেকা হেকিম বাড়ির বাসিন্দা শ্রদ্ধেয় মো. মঈন উদ্দিন আঙ্কেলের ইন্তেকালের সংবাদও তেমনই এক বেদনাবিধুর মুহূর্ত। গত ৯ আগস্ট বিকেলে তিনি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে মহান আল্লাহ তায়ালার ডাকে সাড়া দিয়েছেন।

তাঁর চলে যাওয়ার সংবাদ শুনে সবার আগে মনে পড়ল আরেকজন প্রিয় মানুষ, বড়লেখা ডিগ্রি কলেজের বায়োলজি বিভাগের শ্রদ্ধেয় শিক্ষক প্রয়াত নজরুল আঙ্কেলের কথা। মঈন আঙ্কেলের সঙ্গে আমার পরিচয়ের মাধ্যম ছিলেন তিনি। ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, তিনিও একদিন হঠাৎ সড়ক দুর্ঘটনায় আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন।

পৃথিবী ছাড়লেই অনেক মানুষ আছেন তাঁরা আসলে কখনো হারিয়ে যান না। তাঁরা তাঁদের ব্যবহার, ভালোবাসা, আন্তরিকতা ও রেখে যাওয়া স্মৃতির মাধ্যমে মানুষের হৃদয়ে আজীবন বেঁচে থাকেন। নজরুল আঙ্কেলের মতো মঈন আঙ্কেলও ছিলেন তেমনই একজন মানুষ। তাঁকে স্মরণ করলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটি হাসিমাখা মুখ, বিনয়ী আচরণ এবং গভীর চিন্তাশীল এক সহজ-সরল মানুষের অবয়ব।

জীবনের ব্যস্ততার আড়ালে কত প্রতিভা, কত মানবিকতা আর কত ভালো গুণ যে নীরবে লুকিয়ে থাকে আমি তাঁদের কাছাকাছি গিয়েছি বলে উপলব্ধি করতে পেরেছি। দু’জনই মুক্তমনের অনন্য মানুষ।

মঈন আঙ্কেলের সঙ্গে আমার সম্পর্কের আরেকটি গভীর যোগসূত্র ছিল। তিনি ছিলেন আমার সহপাঠী বন্ধু আশরাফ উদ্দিন জুলনের পিতা। বড়লেখা সরকারি ডিগ্রি কলেজে দীর্ঘদিন অফিস সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। কর্মজীবনে তাঁর দায়িত্বশীলতা, সততা ও আন্তরিকতা তাঁকে সহকর্মী, শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের কাছে একজন সম্মানিত মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল।

তবে আমার কাছে তিনি শুধু একজন অফিস সহকারী কিংবা বন্ধুর বাবাও ছিলেন না। ধীরে ধীরে তিনি আমার কাছে হয়ে উঠেছিলেন একজন অভিভাবকতুল্য মানুষ, যাঁর স্নেহ, আন্তরিকতা ও সুন্দর আচরণ হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিল।

প্রতিদিন সকাল নয়টা বা সাড়ে নয়টার দিকে যখন দোকান (মেসার্স সাজ্জাদ ট্রেডার্স, ডাক বাংলা রোড, বড়লেখা)-এর উদ্দেশ্যে বের হতাম, তখন কলেজ রোডে বাড়ির সামনে প্রায়ই মঈন আঙ্কেলের সঙ্গে দেখা হয়ে যেত। সেই দেখা যেন আমাদের প্রতিদিনের জীবনের একটি স্বাভাবিক ও সুন্দর অংশ হয়ে গিয়েছিল।

আমি সালাম দিলে তিনি যে আন্তরিকতায় হাসিমুখে সালামের উত্তর দিতেন, তা ছিল তাঁর ব্যক্তিত্বের এক অনন্য প্রকাশ। অনেক সময় মনে হতো, উত্তর চৌমুহনা ক্রস করার আগেই যেন তাঁর সঙ্গে দেখা হওয়াটা আমাদের প্রতিদিনের এক অদৃশ্য নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে!

মানুষকে আমরা অনেক সময় তাঁর পরিচয়, পদবি কিংবা সামাজিক অবস্থান দিয়ে বিচার করি। কিন্তু কিছু মানুষের প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ পায় তাঁদের আচরণে। আমার নিকট মঈন আঙ্কেলের সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল তাঁর বিনয়।

বিনয়ী এই মানুষটি বেশিরভাগ সময়ই ধ‍্যানমগ্ন হয়ে বাড়িতেই পড়ে থাকতেন। হয়ত বাহিরকে তাঁর চেনা হয়ে গিয়েছিল!
তাঁর নীরবতার মধ্যেও ছিল এক ধরনের প্রজ্ঞা। অনেক মানুষ বেশি কথা বলে নিজের জ্ঞান জাহির করার চেষ্টা করেন, কিন্তু তিনি অল্প কথায় মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যেতে পারতেন।

আশরাফের বাড়িতে যাওয়া-আসার সুবাদে তাঁকে আরও কাছ থেকে দেখার-জানার সুযোগ হয়েছে। বেশিরভাগ সময় জাহেদুলের সঙ্গেই গিয়েছি। ওর সঙ্গে কোথাও যাওয়ার সুবিধা হচ্ছে ও অন্দরমহলে চলে যায় আর আমি ড্রয়িং রুমের দিক সামলাই এবং গল্পের জন্য যথেষ্ট সময় পাই! সেই সুবাদে আমার গল্পে সঙ্গ দিতেন আশরাফের আব্বা।
আমি, আশরাফ এবং জাহেদুল- আমাদের তিনজনের জীবনে অসংখ্য অমিলের মধ্যে একটি মিল ছিল, আমরা চার ভাই এক বোন। আমি এবং জাহেদুল মেজো হলেও আশরাফ ছিল তার পরিবারে সবার ছোট।

একজন ছোট সন্তানের প্রতি পরিবারের ভালোবাসা কতটা গভীর হতে পারে, তা আশরাফের পরিবারকে দেখলে সহজেই বোঝা যেত।

আশরাফের প্রতি মায়ের ভালোবাসার কথা তার পরিচিত সবাই জানেন। তবে তাঁর পিতার হৃদয়ে আশরাফের জন্য যে কত গভীর মায়া ও ভালোবাসা ছিল, তা আমি একটি বিশেষ মুহূর্তে অনুভব করেছিলাম।

আশরাফ উচ্চতর শিক্ষার জন্য ইংল্যান্ডে চলে যায়। রমজান মাসের একদিন জাকির ভাইয়ের আমন্ত্রণে ইফতারে অংশ নিতে গিয়েছিলাম আশরাফের বাড়িতে। সেদিনের একটি মুহূর্ত আজও আমার হৃদয়ে গভীরভাবে গেঁথে আছে।

মঈন আঙ্কেল আমাকে কাছে টেনে নিয়ে জড়িয়ে ধরেছিলেন, যা এর আগে কোনদিনই আমার ভাগ্যে ঘটেনি। তারপর আবেগভরা কণ্ঠে বলেছিলেন-

“জুলন নাই তউ কিতা অইছে, এর লাগি বাড়িত আইতায় নানি?”

এই কয়েকটি শব্দের মধ্যে লুকিয়ে ছিল একজন পিতার বুকভরা ভালোবাসা, সন্তানের জন্য গভীর অপেক্ষা এবং নিজের সন্তান সংশ্লিষ্টকে কাউকে ছুঁয়ে সন্তানকে ছোঁয়ার আকাঙ্ক্ষা।

আমি তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে দেখেছিলাম, চোখের কোণে জমে থাকা অশ্রু তিনি দ্রুত রুমাল দিয়ে মুছে ফেলছিলেন। একজন পিতা তাঁর সন্তানের প্রতি কতটা ভালোবাসা হৃদয়ের গভীরে ধারণ করেন, সেই মুহূর্তে তা খুব কাছ থেকে অনুভব করেছিলাম।

সেদিন বুঝেছিলাম, পিতারা অনেক সময় তাঁদের ভালোবাসা মুখে প্রকাশ করেন না। তাঁরা নীরবে ভালোবাসেন, সন্তানের জন্য অপেক্ষা করেন, দূরে থেকেও প্রতিনিয়ত দোয়া করেন। আর কখনো কখনো সেই গভীর ভালোবাসা চোখের পানির মাধ্যমে প্রকাশ হয়ে যায়।

ইফতারের টেবিলে বসে সেদিন আমার নিজের চোখও অশ্রুসিক্ত হয়েছিল। সেই কান্না ছিল একজন পিতার নির্মল ভালোবাসার স্পর্শে আবেগাপ্লুত হওয়ার কান্না। তিনি চলে যাওয়াতে সেই মায়াভরা আলিঙ্গনের মুহূর্তটি স্মৃতিতে অমলিন থাকবে।

মঈন আঙ্কেলের জীবন ছিল দায়িত্ববোধ, সততা এবং পারিবারিক মূল্যবোধের এক উজ্জ্বল উদাহরণ। স্ত্রী সরকারি স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষিকা। চার ছেলে ও এক মেয়েকে তিনি সুশিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন। কর্মক্ষেত্রে তিনি ছিলেন দায়িত্বশীল ও নির্ভরযোগ্য, পরিবারে ছিলেন স্নেহময় অভিভাবক, আর পরিচিতজনদের কাছে ছিলেন হাসিমুখের একজন সহজ-সরল মানুষ।

এখন আশরাফের বাড়িতে গেলে হয়তো আর টেবিলে বসে পত্রিকা পড়া অবস্থায় তাঁকে দেখা যাবে না। সেই হাসিমাখা মুখ আর আন্তরিক কথাগুলোও আর শোনা যাবে না।

কিন্তু মানুষের জীবন শেষ হয়ে গেলেও তাঁর ভালোবাসা, তাঁর ব্যবহার এবং তাঁর রেখে যাওয়া স্মৃতিগুলো কখনো শেষ হয়না। মঈন আঙ্কেল তাঁর পরিচিত মানুষের হৃদয়ে ঠিক তেমনই এক উজ্জ্বল স্মৃতি হয়ে বেঁচে থাকবেন।

মানুষের জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন সম্পদ, পদ বা পরিচিতি নয় বরং মানুষের হৃদয়ে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার একটি স্থায়ী জায়গা তৈরি করা। মঈন আঙ্কেল সেটা অর্জন করে গেছেন। তাঁর পরিচিত প্রতিটি মানুষ তাঁকে আদর্শ মানুষ হিসেবে শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করবে।

“নিশ্চয়ই আমরা আল্লাহর জন্য এবং নিশ্চয়ই আমরা তাঁরই দিকে ফিরে যাব।”

মহান আল্লাহ তায়ালার কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আমার প্রিয় আঙ্কেলকে ক্ষমা করে দেন, তাঁর কবরকে নূরের ঔজ্জ্বল্যে ভরিয়ে তোলেন এবং জান্নাতুল ফেরদৌস নসীব করেন।

 

• আবুল কাসেম, সম্পাদক ও প্রকাশক, ষাটমাকন্ঠ