কোনো অনিয়ম সহ্য করা হবে না - স্থানীয় এমপি
কুলাউড়ায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকায় অনিয়মের অভিযোগ
- আপডেট সময় : ০৬:০৪:৩৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬
- / 12
মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকের তালিকায় অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এসব তালিকায় প্রকৃত কৃষকদের বাদ দিয়ে অকৃষকদের তালিকায় রাখা হয়েছে। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বঞ্চিত কৃষকরা।
স্থানীয় কৃষকদের দাবি, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত অনেক কৃষকের নাম বাদ দেয়া হলেও তালিকায় স্থান পেয়েছেন এমন অনেক ব্যক্তি, যাদের কৃষিজমি নেই বা বন্যায় কোনো ক্ষতি হয়নি। তাদের মধ্যে অনেক প্রবাসী পরিবারও রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) সদস্য, বিএনপির ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের শীর্ষ নেতাদের সুপারিশে তালিকায় স্বজনপ্রীতি করা হয়েছে। এই তালিকা প্রণয়নে ইউনিয়ন পর্যায়ের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই করেননি।
সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তা প্রদানের লক্ষ্যে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের সহায়তায় এ তালিকা প্রস্তুত করা হয়। তালিকা তৈরির শুরু থেকেই মৌলভীবাজার-২ কুলাউড়া আসনের এমপি শওকতুল ইসলাম শকু দলীয় নেতাকর্মী, জনপ্রতিনিধি এবং তালিকা প্রণয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক করে আসছিলেন, যাতে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তবে সেই নির্দেশনা উপেক্ষা করে অনেক প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের নাম তালিকায় স্থান পায়নি বলে অভিযোগ ওঠেছে।
এদিকে গত ২৩ জুন বরমচাল ও ব্রাহ্মণবাজারে ইউনিয়নে কৃষকদের মধ্যে চাল ও নগদ টাকা বিতরণ করা হয়। ব্রাহ্মণবাজার ইউনিয়নে বিএনপি সভাপতি আফতাব মিয়া ও ইউপি সদস্য ছয়ফুল ইসলামের বিরুদ্ধে তালিকা তৈরিতে অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন বঞ্চিত কৃষকরা। তালিকায় ইউনিয়নের দাউদপুর গ্রামের মো. মতিন মিয়া নামের এক ব্যক্তি সহায়তা পেয়েছেন। যার দুই ছেলে ইউরোপের ফ্রান্সে অবস্থান করছেন এবং এক ছেলে সরকারি চাকরিতে কর্মরত। নাছনী গ্রামের বাসিন্দা দক্ষিণ আফ্রিকা প্রবাসী জলিল মিয়া ও তার ভাই খালিক মিয়া সহায়তা পেয়েছেন। সাতরা গ্রামের নাদির মিয়া সহায়তা পেয়েছেন। তার এক ছেলে কানাডায় ও অন্য ছেলে আরেক দেশে থাকে। ইউসুফ তৈয়বুন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মাসুদ আহমদ ও জামাল মিয়া নামের আরেক ব্যক্তি কৃষক না হওয়া সত্ত্বেও একইভাবে সহায়তা পেয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে বরমচাল ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডে খালেদ নামে এক ব্যক্তির বোরো ধানের জমি না থাকলেও তিনি সহায়তা পেয়েছেন। ওই ওয়ার্ডের তরিকুল ইসলাম আকুল নামে এক ইমাম, সাবেক ইউপি সদস্য মহরম আলীও একই রকমভাবে সহায়তা পেয়েছেন। এদিকে ইউনিয়নের বাসিন্দা শাহিন আহমদ নাছির ও তার ভাই সেলিম আহমদও সহায়তা পেয়েছেন। তাদের পরিবারের সদস্য আমেরিকা ও মধপ্রাচ্যে রয়েছেন।
ব্রাহ্মণবাজার ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি ছয়ফুল আলম বলেন, আমাদের ইউনিয়নের কৃষকের তালিকা তৈরিতে অনেক অনিয়ম করা হয়েছে। প্রকৃত কৃষকদের বাদ দিয়ে অনেক প্রবাসী ও ধর্নাঢ্য পরিবারের লোকদের এই সহায়তা দেয়া হয়েছে। ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আফতাব মিয়াসহ সংশ্লিষ্টদের কারণে বঞ্চিত হয়েছেন ইউনিয়নের অনেক কৃষক। বিষয়টি খতিয়ে দেখার জন্য এমপিসহ সংশ্লিষ্টদের কাছে অনুরোধ জানাচ্ছি।
অভিযোগের বিষয়ে ব্রাহ্মণবাজার ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আফতাব মিয়া বলেন, চেয়ারম্যান, ইউনিয়নের এডিসহ যাচাই-বাছাই কমিটি মিলে ৫১৮ জনের চূড়ান্ত তালিকা তৈরি করেছি। বরাদ্দ মিলেছে ১৯০ জনের। ওইসময় তাড়াহুড়ো করে তালিকা প্রস্তুতে কিছু ত্রুটি হতে পারে। বঞ্চিতরা অভিযোগ করতেই পারেন। এদিকে ইউপি সদস্য ছয়ফুল আলমের ফোনে একাধিকার কল দিলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কার্যালয় সূত্র জানায়, প্রধানমন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী মানবিক সহায়তা কর্মসূচির আওতায় ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে কুলাউড়ায় সাম্প্রতিক প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে হাওরাঞ্চলে ক্ষতিগ্রস্ত প্রকৃত কৃষকদের পুনর্বাসন ও সহায়তার লক্ষ্যে মে ও জুন মাসের জন্য পরিবার প্রতি ১৫ কেজি চাল ও নগদ ৩ হাজার টাকা করে বরাদ্দ পাওয়া যায়। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পরবর্তী মৌসুমে চাষাবাদে উৎসাহিত করাই এ কর্মসূচির মূল লক্ষ্য। এতে উপজেলার ১২টি ইউনিয়ন ও ১ পৌরসভায় মোট ১ হাজার ৫৩৭ জন কৃষকের জন্য ৪৬ দশমিক ১ মেট্রিক টন চাল ও ৯২ লক্ষ ২২ হাজার টাকা বরাদ্দ আসে। উপজেলার বরমচাল ইউনিয়নে ১৪৫ পরিবার, ভূকশিমইলে ৪৩৭, ভাটেরা ১৫০, জয়চন্ডী ৯০, ব্রাহ্মণবাজার ১৯০, কাদিপুর ১৯৫, কুলাউড়া সদর ৪০, রাউৎগাঁও ৬০, টিলাগাঁও ৩৫, হাজীপুর ৬৫, পৃথিমপাশা ৩০ ও কুলাউড়া পৌরসভায় ১০০ পরিবারের মধ্যে এই সহায়তা বিতরণ করা হবে। ইতিমধ্যে বরমচাল, ভূকশিমইল, ব্রাহ্মণবাজার, রাউৎগাঁও, ভাটেরা ও পৃথিমপাশা ইউনিয়নে বিতরণ কার্যক্রম সম্পন্ন হয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মুহাম্মদ জসিম উদ্দিন বলেন, চলতি বছরের বন্যায় অনেক কৃষক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন। তাদের পুনর্বাসনে তালিকা প্রস্তুত করা হয়। কিন্তু বরাদ্দ কম পাওয়ায় কিছু প্রকৃত কৃষক তালিকা থেকে বাদ পড়েছেন এটা সত্য। তবে অনিয়মের বিষয়ে ইউএনও মহোদয় বরাবরে অভিযোগ দিলে ব্যবস্থা নেয়া যাবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সানজিদা আক্তার বলেন, চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ অনেক কম পাওয়া গেছে। যাচাই-বাছাই কমিটির স্বাক্ষরিত তালিকা পাওয়ার পর ইউনিয়ন পর্যায়ে ওই কমিটির লোকদের উপস্থিতিতে সহায়তা বিতরণ করা হয়েছে। অনিয়মের বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখেছি। এটা নিয়ে কৃষি অফিসার ও উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কমকর্তার সাথে আলোচনা করা হয়েছে। কেউ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়েও তালিকাভুক্ত হয়ে থাকলে অভিযোগের ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
এদিকে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের তালিকা তৈরিতে কোনো অনিয়ম সহ্য করা হবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন মৌলভীবাজার-২ কুলাউড়া আসনের এমপি শওকতুল ইসলাম শকু। তিনি ইউনিয়ন বিএনপির নেতৃবৃন্দদের কঠোর হুঁশিয়ারী দিয়ে বলেন, ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকদের প্রণোদনা বিতরণে অনেক অভিযোগ শোনা যাচ্ছে। কোন রকমের অনিয়ম বরদাস্ত করা হবে না। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে জনগণের ভোটে নির্বাচিত এই গণতান্ত্রিক সরকার সব সময় থাকবে।























