সুনাই নদীতে উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হলো ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ
- আপডেট সময় : ০৮:৫০:২৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৮ অগাস্ট ২০২৬
- / 28
নৌকাবাইচকে ঘিরে সুনাই নদীর দুই তীরে নামে উৎসুক মানুষের ঢল। নানা আলোচনা, জল্পনা-কল্পনা ও অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়ে সিলেটের বিয়ানীবাজারে উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে ঐতিহ্যবাহী নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা। শুক্রবার (২৮ আগস্ট) বিকেলে উপজেলার লাউতা ইউনিয়নের সুনাই নদীতে এ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। বৈঠার ছন্দ, মাঝিদের হাঁকডাক ও দর্শকদের উচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
প্রতিযোগিতা শেষে সন্ধ্যায় বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করেন সিলেট-৬ (বিয়ানীবাজার-গোলাপগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট এমরান আহমদ চৌধুরী।
জানা যায়, লাউতা ইউনিয়নের লাউতা-বাহাদুরপুর যুবসমাজের উদ্যোগে প্রতি বছরের ধারাবাহিকতায় এবারও বার্ষিক নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। তবে আয়োজনের আগে একটি মহল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এর বিরোধিতা করে প্রতিবাদ জানালে বিষয়টি নিয়ে এলাকায় আলোচনা শুরু হয়। পরে গত ২২ আগস্ট স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের উদ্যোগে দুই পক্ষকে নিয়ে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বিষয়টির সমাধান হলে নির্ধারিত সময়ে নৌকাবাইচ আয়োজনের পথ সুগম হয়।
শুক্রবার জুমার নামাজের পর থেকেই নৌকাবাইচ দেখতে সুনাই নদীর দুই পাড়ে মানুষের সমাগম বাড়তে থাকে। বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিযোগী দলগুলো নৌকা নিয়ে নদীতে এসে উপস্থিত হয়। বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয় প্রতিযোগিতা। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নদীর তীর, সড়ক ও আশপাশের এলাকায় দর্শনার্থীদের ভিড় আরও বাড়তে থাকে।
এবারের প্রতিযোগিতায় কালিজুরির ‘পাগলা নৌকা’, শরীফগঞ্জের ‘হাকালুকি বাঘ নৌকা’ এবং সুজানগরের ‘স্বাধীন বাংলা নৌকা’ অংশ নেয়। বিভিন্ন ধাপ শেষে ফাইনালে ওঠে ‘হাকালুকি বাঘ’ ও ‘পাগলা’ নৌকা। তবে ফাইনালে দুই নৌকা একই সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় না নেমে পৃথকভাবে দৌড় শেষ করায় কাঙ্ক্ষিত প্রতিযোগিতার আমেজ কিছুটা ব্যাহত হয়। এ কারণে ফলাফল নিয়েও তৈরি হয় অনিশ্চয়তা। আয়োজকদের পক্ষ থেকেও এ ঘটনায় অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়। তবে দীর্ঘ জটিলতার পর নৌকাবাইচ অনুষ্ঠিত হওয়ায় দর্শকদের উৎসাহ-উচ্ছ্বাসে কোনো কমতি দেখা যায়নি।
দর্শনার্থীরা জানান, নৌকাবাইচ প্রতিযোগিতা আমাদের গ্রামীণ জনপদের মানুষের আনন্দ-বিনোদনের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী মাধ্যম। প্রতিবছরের এই আয়োজন দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসেন। সারি সারি নৌকা, মাঝিদের বৈঠার ছন্দ, বাদ্যযন্ত্রের সুর এবং দর্শকদের উল্লাসে নদীর দুই পাড় পরিণত হয় উৎসবের মিলনমেলায়।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট এমরান আহমদ চৌধুরী বলেন, “নৌকাবাইচ আবহমান বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। এ ধরনের আয়োজন প্রান্তিক জনপদের মানুষের বিনোদনের অন্যতম মাধ্যম। নৌকাবাইচ কোনো ধর্মবিরোধী বিষয় নয়। আমরা চাই প্রতিবছর সুনাই নদীতে এ আয়োজন অব্যাহত থাকুক। আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে হবে।”
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিয়ানীবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) উম্মে হাবিবা মজুমদার, বিয়ানীবাজার থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আবু জাফর মো. মাহফুজুল করিম, লাউতা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন, মোল্লাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম এ মান্নান, বড়লেখার সুজানগর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান নছিব আলী, লাউতা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান গৌছ উদ্দিন, উপজেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট আহমদ রেজা, ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক গিয়াস উদ্দিন, আতাউর রহমান, পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নজমুল হোসেনসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
আয়োজকরা জানান, “সুনাই নদীর নৌকাবাইচ দেখতে মানুষের ঢল প্রমাণ করে এটি বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অংশ। এই প্রাচীন আয়োজনকে কোনোভাবেই হারিয়ে যেতে দেওয়া যাবে না। সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে নৌকাবাইচের ঐতিহ্য ধরে রাখতে হবে।”

























