বড়লেখার ‘অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণ নাগরিক সংঘ’ মানবতার নীরব বাতিঘর
সমাজ বদলের স্বপ্নে একদল আলোকিত মানুষ
- আপডেট সময় : ০৩:৪৬:১৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬
- / 163
অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণ নাগরিক সংঘের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আব্দুস সাত্তার (বামে) সংগঠনের কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে আলাপ করছেন প্রতিবেদক আফজাল হোসেন রুমেলের সঙ্গে। ছবি: ষাটমাকন্ঠ
জীবনের একটি সময় আসে, যখন মানুষ কর্মব্যস্ততার দীর্ঘ অধ্যায় পেরিয়ে ধীরে ধীরে অবসরের নীরবতায় প্রবেশ করেন। অনেকেই তখন নিজেকে গুটিয়ে নেন পরিবার আর ব্যক্তিগত পরিসরে। কিন্তু কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের কাছে অবসর মানে থেমে যাওয়া নয়; বরং সমাজকে ফিরিয়ে দেওয়ার নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা। বড়লেখার ‘অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণ নাগরিক সংঘ’ ঠিক তেমনই এক আলোকিত উদ্যোগ, যেখানে জীবনের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রূপ নিয়েছে মানবসেবার অঙ্গীকারে, আর অবসরের দিনগুলো পরিণত হয়েছে সমাজ বদলের এক নিরবচ্ছিন্ন অভিযাত্রায়।
এই সংগঠনের জন্ম কোনো আনুষ্ঠানিক পরিকল্পনা সভায় নয় বরং জন্ম হয়েছিল এক সাধারণ জুমার বিকেলে। নামাজ শেষে মসজিদ থেকে বেরিয়ে আসা দুই প্রবীণ মানুষের কথোপকথনে উঠে এসেছিল সমাজের নানা বাস্তবতা- অর্থাভাবে চিকিৎসা না পাওয়া রোগী, ঝরে পড়া শিক্ষার্থী, অসহায় মানুষের দীর্ঘশ্বাস এবং ক্রমশ ক্ষয় হতে থাকা মানবিক মূল্যবোধের কথা। সেই আলোচনা শেষ হয়েছিল একটি অঙ্গীকারে- সমাজের জন্য কিছু করতে হবে, যতটুকু সামর্থ্য আছে, তা নিয়েই।
ছোট্ট সেই ভাবনা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে আরও কয়েকজন সমমনা মানুষের কাছে। একসময় তাঁদের সঙ্গে যুক্ত হন আরও সাতজন প্রবীণ, যাঁদের প্রত্যেকেই কর্মজীবনে নিজ নিজ ক্ষেত্রে সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছেন। অবশেষে ২০২০ সালের ১ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে ‘অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণ নাগরিক সংঘ’। নয়জন মানুষের সেই ক্ষুদ্র উদ্যোগ আজ বড়লেখায় মানবিকতার এক নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
সংগঠনের সভাপতি তালিবুল ইসলাম (৮৬) বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী। কর্মজীবনে বিদ্যুতের আলো পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করা এই মানুষটি আজ আলো ছড়িয়ে দিচ্ছেন মানুষের জীবনে। সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে থাকা সাবেক জনসংযোগ কর্মকর্তা মোহাম্মদ আব্দুস সাত্তার (৭৫) তাঁর দীর্ঘ পেশাগত অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাচ্ছেন মানুষের কল্যাণে।
তাঁদের সঙ্গে রয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক বাবু কৃপাময় পাল ও গোলাম মুহিব চৌধুরী, স্বাস্থ্য পরিদর্শক মদরিস আলী, ফার্মাসিস্ট আজির উদ্দিন ও আব্দুল খালিক, ব্যবসায়ী মিসবা উদ্দিন এবং প্রয়াত প্রতিষ্ঠাতা সদস্য আইনুল ইসলাম। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রশাসন ও সামাজিক নেতৃত্বের নানা অভিজ্ঞতা যেন এক সুতোয় গেঁথেছে এই মানুষগুলোকে। তাঁদের সম্মিলিত প্রজ্ঞাই সংগঠনটির সবচেয়ে বড় শক্তি।

সংগঠনটির কর্মকাণ্ডের দিকে তাকালে বোঝা যায়, এটি কেবল একটি সামাজিক সংগঠন নয়; বরং মানুষের সংকটে পাশে দাঁড়ানোর এক নীরব আন্দোলন। প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ পর্যন্ত ৩২ জন ক্যান্সার রোগীর চিকিৎসায় আর্থিক সহায়তা দিয়েছে তারা। কিডনি প্রতিস্থাপনের মতো ব্যয়বহুল চিকিৎসা, ফুসফুসের জটিল রোগে আক্রান্ত অসহায় মানুষ কিংবা পারিবারিক সহিংসতায় অগ্নিদগ্ধ নারীর চিকিৎসাতেও সংগঠনটি সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছে।
তবে সংগঠনটির সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ মানুষের ভবিষ্যৎ গড়ায়। তাদের বিশ্বাস শিক্ষায় বিনিয়োগ মানেই সমাজের আগামীকে আলোকিত করা। সেই লক্ষ্য থেকেই উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের ১০ জন অসচ্ছল শিক্ষার্থীর শিক্ষার সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিয়েছে সংগঠনটি। তিনটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিতরণ করা হয়েছে ৩০টি স্কুল ড্রেস। মেধাবী শিক্ষার্থীদের উৎসাহ দিতে দেওয়া হয়েছে আর্থিক প্রণোদনা। শিক্ষার্থীদের যুক্তিবোধ ও নেতৃত্ব বিকাশে আয়োজন করা হয়েছে বিতর্ক প্রতিযোগিতা, যেখানে অংশগ্রহণকারী তার্কিকদেরও দেওয়া হয়েছে সম্মাননা ও আর্থিক সহায়তা।

মানবিকতার স্পর্শ সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয় সংকটের মুহূর্তে। শীতার্ত মানুষের কাঁধে উষ্ণতা হয়ে জড়িয়ে গেছে সংগঠনের দেওয়া ৪০০টি কম্বল। বসবাসের অনুপযোগী পাঁচটি ঘর সংস্কার করে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে নিরাপদ আশ্রয়। আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে যেসব পরিবারের মেয়েদের বিয়ে অনিশ্চয়তায় ছিল, এমন পাঁচটি পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছে তারা। প্রতিবন্ধী দুইজনকে দেওয়া হয়েছে হুইলচেয়ার, আর এক মেধাবী প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন সচল রাখতে দেওয়া হয়েছে বিশেষ আর্থিক সহায়তা।
মেধা ও কৃতিত্বের স্বীকৃতি দিতেও কার্পণ্য করেনি সংগঠনটি। বড়লেখার কৃতী বিসিএস কর্মকর্তাদের সংবর্ধনা, ইউনেস্কোর সঙ্গে যুক্ত একজন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বকে সম্মাননা এবং এলাকার গুণীজনদের স্বীকৃতি দেওয়ার মধ্য দিয়ে তারা নতুন প্রজন্মের সামনে ইতিবাচক উদাহরণ তুলে ধরেছে।
মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধের পাশাপাশি অতীতের প্রতি শ্রদ্ধাবোধও সংগঠনটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। সাবেক সংসদ সদস্য এবাদুর রহমানের মৃত্যুতে দোয়া মাহফিল, প্রয়াত প্রতিষ্ঠাতা সদস্য আইনুল ইসলামের স্মরণসভা এসব আয়োজন প্রমাণ করে, মানুষের অবদানকে তারা শুধু স্মরণই করে না, উত্তর প্রজন্মের কাছেও তা পৌঁছে দিতে চায়।
প্রতিষ্ঠার পর থেকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানবিক সহায়তামূলক কর্মকাণ্ডে প্রায় ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা ব্যয় করেছে সংগঠনটি। এই অর্থের পরিমাণের চেয়ে বড় বিষয় হলো এর পেছনে থাকা দায়বদ্ধতা। সদস্যদের ব্যক্তিগত উদ্যোগ, সহযোগিতা এবং মানুষের প্রতি আন্তরিক ভালোবাসাই এই কর্মকাণ্ডের মূল শক্তি।
সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আব্দুস সাত্তার ষাটমাকন্ঠকে বলেছেন, আমরা বিশ্বাস করি, একটি সুন্দর সমাজ গড়তে হলে পিছিয়ে পড়া মানুষের পাশে দাঁড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই। শিক্ষা, চিকিৎসা ও মানবিক সহায়তার মাধ্যমে আমরা সেই দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করছি। ভবিষ্যতে আরও বেশি সমাজসেবী মানুষকে সঙ্গে নিয়ে আমাদের কার্যক্রম বিস্তৃত করতে চাই। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ ও সামাজিক দায়িত্ববোধ জাগ্রত করাও আমাদের অন্যতম লক্ষ্য।
বড়লেখার সচেতন মহলের মতে, অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণ নাগরিক সংঘ দেখিয়ে দিয়েছে সমাজ পরিবর্তনের জন্য সব সময় বড় অর্থ কিংবা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন আন্তরিকতা, দায়বদ্ধতা এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসা। বয়স মানুষের শরীরকে ক্লান্ত করতে পারে, কিন্তু স্বপ্নকে নয়। সেই স্বপ্নই আজ বড়লেখার একদল প্রবীণ মানুষকে পরিণত করেছে মানবতার আলোকবর্তিকায়।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সমাজ বদলায়, মানুষ বদলায়, প্রজন্ম বদলায়। কিন্তু কিছু মানুষ তাঁদের কাজের মধ্য দিয়ে সময়কে অতিক্রম করে যান। বড়লেখার এই প্রবীণ মানুষগুলোও হয়তো একদিন থাকবেন না, কিন্তু তাঁদের হাতে রোপণ করা মানবতার এই চারাগাছ একদিন মহীরুহ হয়ে আরও অসংখ্য মানুষের জীবনে ছায়া দেবে। আর সেখানেই নিহিত থাকবে তাঁদের প্রকৃত সার্থকতা।
লিখেছেন: আফজাল হোসেন রুমেল ও এমরান আহমদ



















