০৩:৩৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬

আদিবাসীদের জন্য ‘দায় ও দরদ’ নেই

জোবাইদা নাসরীন
  • আপডেট সময় : ০৬:০৪:০৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১ অক্টোবর ২০২৫
  • / 124
যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের সর্বশেষ খবর জানতে ভিজিট করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

কয়েকদিন ধরেই প্রতিবাদ, বিক্ষোভে উত্তাল ছিল পার্বত্য এলাকা খাগড়াছড়ি। সেখানে এক স্কুলছাত্রী দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে। প্রতিবাদ হিসেবে খাগড়াছড়িতে সড়ক অবরোধ চলছিল। সেই অবরোধের মধ্যেই গুইমারা বাজারে বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। এক পর্যায়ে গুলিতে প্রাণ যায় তিন পাহাড়ি যুবকের। আহত হয়েছেন সেনা ও পুলিশ সদস্য। একটি ধর্ষণের ঘটনার বিচার চাইতে গিয়ে প্রাণ গেল তিনজনের। ধর্ষণকারীদের শাস্তির বিপরীতে শাস্তি হলো প্রতিবাদকারীদের।

যে কোনো পরিস্থিতিতেই রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সঙ্গে সংঘাতে কোনো নাগরিকের প্রাণ গেলে জনগণ রাষ্ট্রের কাছে এর ব্যাখ্যা দাবি করে। এ ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
এ ঘটনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে গতানুগতিক গভীর দুঃখ প্রকাশ করার পর এই বলে আশ্বস্ত করা হয়েছে- এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শিগগির তদন্তপূর্বক আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কোনো অপরাধীকেই ছাড় দেওয়া হবে না। ততক্ষণ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধৈর্য ধারণপূর্বক শান্ত থাকার জন্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হয়েছে। কিন্তু খাগড়াছড়িতেই এর আগে যত ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোর একটারও বিচার হয়নি। তাই ভুক্তভোগী ও তাদের স্বজনদের কাছে এ ধরনের বিবৃতির মূল্য তেমন নেই।

চট্টগ্রামের দায়িত্বপাপ্ত উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমা প্রায় একই কথা বলেছেন। তিনি পাহাড় ও সমতলের বাংলাদেশের সব নাগরিকের প্রতি ‘পরাজিত ও ফ্যাসিবাদী শক্তির সব ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে ঐক্যবদ্ধ’ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি উভয় পক্ষের কথা গুরুত্ব দিয়ে শোনার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু সরকারের সদস্য হয়ে উপদেষ্টা সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে কি দায় এড়াতে পারেন?

বাম দলগুলো ঘটনার প্রতিবাদে মিছিল করেছে। কর্মসূচি দিয়েছে। দৃশ্যত বড় দল বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামী কোনো রকম প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেনি। সম্ভবত বিভিন্ন মহলের ‘খুশি-বেজার’ তরিকা বিবেচনা করতে করতেই সময় অনেকখানি এগিয়েছে। কিংবা হয়তো তাদের রাজনীতিতে আদিবাসীরা গুরুত্বপূর্ণ নয়।

বিএনপি এবং জামায়াত চুপ থাকলেও এনসিপি নেতা হান্নান মাসউদ চুপ থাকেননি। তিনি নোয়াখালীর হাতিয়াতে অনুষ্ঠিত ‘ঐক্য ও সংহতির সমাবেশ’-এ বলেন, ‘শেষ ট্রাম্পকার্ড খেলছে ভারত, একটি ভুয়া ধর্ষণের ঘটনার মাধ্যমে পাহাড়ি ও বাঙালিদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে অঞ্চলটিকে অস্থিতিশীল করে তোলার চেষ্টা চলছে।’ (ইত্তেফাক, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫)

হান্নান মাসউদের এই বক্তব্য তাঁর নিজের জন্য কতটা লাভজনক হয়েছে, জানি না। তবে এনসিপিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। যদিও দল হিসেবে এনসিপি কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি; দলটি হারিয়েছে তার কেন্দ্রীয় যুগ্ম মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) ও তরুণ আদিবাসী নেতা অলিক মৃকে। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা এবং নিজ দলের নেতার বক্তব্য শুনে ক্ষুব্ধ হয়ে অলিক মৃ এনসিপি ত্যাগ করেছেন।

সামাজিক মাধ্যমে হান্নান মাসউদের বক্তব্যের বিরুদ্ধে সমালোচনার ঝড় তৈরি হলে তিনি এ বক্তব্য প্রত্যাহার করে বলেন ‘এই অনাকাঙ্ক্ষিত শব্দটি ব্যবহার করায় আমি বিব্রত ও দুঃখিত। আশা করি, আমার শুভাকাঙ্ক্ষী, সমর্থক ও সমালোচকরা এটাকে আমার মুহূর্তের ভুল হিসেবেই বিবেচনা করবেন।’

 

গত বছরের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সেপ্টেম্বরের ১৭ তারিখে খাগড়াছড়িতে বাঙালি-আদিবাসী সংঘর্ষ হয়। সেই সময়ও গুলিতে তিনজন নিহত, শতাধিক আহত হন। সেই সংঘর্ষ পরদিন রাঙামাটিতে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে আঞ্চলিক পরিষদের অফিস ভাঙচুর এবং একজন আদিবাসী নিহত হন। সেই সময়ও গুলির অভিযোগ উঠেছিল নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে।

এই এক বছরে পার্বত্য এলাকায় বিশেষ করে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে বড় দুটো সহিংসতায় মোট সাতজনের প্রাণহানি, অনেকে আহত হওয়াসহ ঘরবাড়ি ও বাজারের দোকানপাটে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলে ২৫ সেপ্টেম্বর তাদের প্রকাশিত সংবাদে খাগড়াছড়ির মহিলা কল্যাণ সমিতির তথ্যকে উল্লেখ করে জানিয়েছে, গত এক বছরে পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়িতে ধর্ষণের শিকার হয়েছে সাতজন আদিবাসী নারী এবং এই এক বছরে ধর্ষণের চেষ্টা হয়েছে তিনটি। সেখানে দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনাই বেশি ঘটছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান কাপেং ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে পার্বত্য চট্টগ্রামে ২৯৯ জন আদিবাসী নারী ধর্ষণ ও অপহরণের শিকার হয়েছেন। এই হিসাবের ভিত্তি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সংবাদ। তার মানে, এ সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। কারণ সব ঘটনা, বিশেষত দুর্গম অঞ্চলে সংঘটিত ঘটনাবলি সংবাদমাধ্যমে আসে না।

প্রশ্ন হতে পারে, এই এক বছরকে কেন আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখব? কারণ অন্তর্বর্তী সরকার একটি অভ্যুত্থান থেকে জন্ম নেওয়া। যারা এই আন্দোলনের মালিকানা দাবি করছেন, তারা আমাদের দায় এবং দরদের গল্প শুনিয়েছেন; প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন- বহুত্ববাদকে রাষ্ট্রীয় মূলনীতি বানাবেন, তা অনুসরণ করবেন। কিন্তু এখন স্পষ্ট হচ্ছে, যে দায় এবং দরদের রাজনীতির কথা বলা হয়েছে, সেটিতে আদিবাসীরা নেই। বহুত্ববাদ যে শুধু কথার ফুলঝুরি ছিল, তা পাঠ্যবই থেকে আদিবাসী-সংশ্লিষ্ট গ্রাফিতি বাদ দিয়েই তারা দেখিয়ে দিয়েছেন।

আদিবাসীদের প্রতি দায় ও দরদ নেই বলেই গণঅভ্যুত্থানের পক্ষ রাজনৈতিক দল, এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাও আদিবাসীদের ধর্ষণ, গুলি করে হত্যার ঘটনার পরও সেখানে ভারত এবং ফ্যাসিস্ট শব্দ জুড়ে দিয়ে দায়মুক্তির চাল চালতে চায়। পরিস্থিতি হলো, ‘তদন্ত হবে’ কিন্তু রিপোর্ট বের হবে না। সে প্রসঙ্গ আবার নিহতদের পরিবারকে অর্থ সাহায্য দিয়ে ‘ভুল বোঝাবুঝি’র ঢাকনা দিয়ে ঢেকে দেওয়া যায়। তাদের দায় ও দরদের মতাদর্শে আদিবাসী ও প্রান্তিক মানুষেরা নেই, কিন্তু আছে অন্য কেউ- সেটা দাগহীনভাবেই স্পষ্ট।

  • জোবাইদা নাসরীন: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
    zobaidanasreen@gmail.com

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

আদিবাসীদের জন্য ‘দায় ও দরদ’ নেই

আপডেট সময় : ০৬:০৪:০৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১ অক্টোবর ২০২৫

কয়েকদিন ধরেই প্রতিবাদ, বিক্ষোভে উত্তাল ছিল পার্বত্য এলাকা খাগড়াছড়ি। সেখানে এক স্কুলছাত্রী দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছে। প্রতিবাদ হিসেবে খাগড়াছড়িতে সড়ক অবরোধ চলছিল। সেই অবরোধের মধ্যেই গুইমারা বাজারে বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। এক পর্যায়ে গুলিতে প্রাণ যায় তিন পাহাড়ি যুবকের। আহত হয়েছেন সেনা ও পুলিশ সদস্য। একটি ধর্ষণের ঘটনার বিচার চাইতে গিয়ে প্রাণ গেল তিনজনের। ধর্ষণকারীদের শাস্তির বিপরীতে শাস্তি হলো প্রতিবাদকারীদের।

যে কোনো পরিস্থিতিতেই রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সঙ্গে সংঘাতে কোনো নাগরিকের প্রাণ গেলে জনগণ রাষ্ট্রের কাছে এর ব্যাখ্যা দাবি করে। এ ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
এ ঘটনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে গতানুগতিক গভীর দুঃখ প্রকাশ করার পর এই বলে আশ্বস্ত করা হয়েছে- এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শিগগির তদন্তপূর্বক আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কোনো অপরাধীকেই ছাড় দেওয়া হবে না। ততক্ষণ পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধৈর্য ধারণপূর্বক শান্ত থাকার জন্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হয়েছে। কিন্তু খাগড়াছড়িতেই এর আগে যত ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে, সেগুলোর একটারও বিচার হয়নি। তাই ভুক্তভোগী ও তাদের স্বজনদের কাছে এ ধরনের বিবৃতির মূল্য তেমন নেই।

চট্টগ্রামের দায়িত্বপাপ্ত উপদেষ্টা সুপ্রদীপ চাকমা প্রায় একই কথা বলেছেন। তিনি পাহাড় ও সমতলের বাংলাদেশের সব নাগরিকের প্রতি ‘পরাজিত ও ফ্যাসিবাদী শক্তির সব ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করে ঐক্যবদ্ধ’ থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি উভয় পক্ষের কথা গুরুত্ব দিয়ে শোনার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু সরকারের সদস্য হয়ে উপদেষ্টা সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে কি দায় এড়াতে পারেন?

বাম দলগুলো ঘটনার প্রতিবাদে মিছিল করেছে। কর্মসূচি দিয়েছে। দৃশ্যত বড় দল বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামী কোনো রকম প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেনি। সম্ভবত বিভিন্ন মহলের ‘খুশি-বেজার’ তরিকা বিবেচনা করতে করতেই সময় অনেকখানি এগিয়েছে। কিংবা হয়তো তাদের রাজনীতিতে আদিবাসীরা গুরুত্বপূর্ণ নয়।

বিএনপি এবং জামায়াত চুপ থাকলেও এনসিপি নেতা হান্নান মাসউদ চুপ থাকেননি। তিনি নোয়াখালীর হাতিয়াতে অনুষ্ঠিত ‘ঐক্য ও সংহতির সমাবেশ’-এ বলেন, ‘শেষ ট্রাম্পকার্ড খেলছে ভারত, একটি ভুয়া ধর্ষণের ঘটনার মাধ্যমে পাহাড়ি ও বাঙালিদের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে অঞ্চলটিকে অস্থিতিশীল করে তোলার চেষ্টা চলছে।’ (ইত্তেফাক, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫)

হান্নান মাসউদের এই বক্তব্য তাঁর নিজের জন্য কতটা লাভজনক হয়েছে, জানি না। তবে এনসিপিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। যদিও দল হিসেবে এনসিপি কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি; দলটি হারিয়েছে তার কেন্দ্রীয় যুগ্ম মুখ্য সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) ও তরুণ আদিবাসী নেতা অলিক মৃকে। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা এবং নিজ দলের নেতার বক্তব্য শুনে ক্ষুব্ধ হয়ে অলিক মৃ এনসিপি ত্যাগ করেছেন।

সামাজিক মাধ্যমে হান্নান মাসউদের বক্তব্যের বিরুদ্ধে সমালোচনার ঝড় তৈরি হলে তিনি এ বক্তব্য প্রত্যাহার করে বলেন ‘এই অনাকাঙ্ক্ষিত শব্দটি ব্যবহার করায় আমি বিব্রত ও দুঃখিত। আশা করি, আমার শুভাকাঙ্ক্ষী, সমর্থক ও সমালোচকরা এটাকে আমার মুহূর্তের ভুল হিসেবেই বিবেচনা করবেন।’

 

গত বছরের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সেপ্টেম্বরের ১৭ তারিখে খাগড়াছড়িতে বাঙালি-আদিবাসী সংঘর্ষ হয়। সেই সময়ও গুলিতে তিনজন নিহত, শতাধিক আহত হন। সেই সংঘর্ষ পরদিন রাঙামাটিতে ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে আঞ্চলিক পরিষদের অফিস ভাঙচুর এবং একজন আদিবাসী নিহত হন। সেই সময়ও গুলির অভিযোগ উঠেছিল নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে।

এই এক বছরে পার্বত্য এলাকায় বিশেষ করে খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটিতে বড় দুটো সহিংসতায় মোট সাতজনের প্রাণহানি, অনেকে আহত হওয়াসহ ঘরবাড়ি ও বাজারের দোকানপাটে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলে ২৫ সেপ্টেম্বর তাদের প্রকাশিত সংবাদে খাগড়াছড়ির মহিলা কল্যাণ সমিতির তথ্যকে উল্লেখ করে জানিয়েছে, গত এক বছরে পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়িতে ধর্ষণের শিকার হয়েছে সাতজন আদিবাসী নারী এবং এই এক বছরে ধর্ষণের চেষ্টা হয়েছে তিনটি। সেখানে দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনাই বেশি ঘটছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান কাপেং ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে পার্বত্য চট্টগ্রামে ২৯৯ জন আদিবাসী নারী ধর্ষণ ও অপহরণের শিকার হয়েছেন। এই হিসাবের ভিত্তি বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সংবাদ। তার মানে, এ সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। কারণ সব ঘটনা, বিশেষত দুর্গম অঞ্চলে সংঘটিত ঘটনাবলি সংবাদমাধ্যমে আসে না।

প্রশ্ন হতে পারে, এই এক বছরকে কেন আমরা গুরুত্বের সঙ্গে দেখব? কারণ অন্তর্বর্তী সরকার একটি অভ্যুত্থান থেকে জন্ম নেওয়া। যারা এই আন্দোলনের মালিকানা দাবি করছেন, তারা আমাদের দায় এবং দরদের গল্প শুনিয়েছেন; প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন- বহুত্ববাদকে রাষ্ট্রীয় মূলনীতি বানাবেন, তা অনুসরণ করবেন। কিন্তু এখন স্পষ্ট হচ্ছে, যে দায় এবং দরদের রাজনীতির কথা বলা হয়েছে, সেটিতে আদিবাসীরা নেই। বহুত্ববাদ যে শুধু কথার ফুলঝুরি ছিল, তা পাঠ্যবই থেকে আদিবাসী-সংশ্লিষ্ট গ্রাফিতি বাদ দিয়েই তারা দেখিয়ে দিয়েছেন।

আদিবাসীদের প্রতি দায় ও দরদ নেই বলেই গণঅভ্যুত্থানের পক্ষ রাজনৈতিক দল, এমনকি অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাও আদিবাসীদের ধর্ষণ, গুলি করে হত্যার ঘটনার পরও সেখানে ভারত এবং ফ্যাসিস্ট শব্দ জুড়ে দিয়ে দায়মুক্তির চাল চালতে চায়। পরিস্থিতি হলো, ‘তদন্ত হবে’ কিন্তু রিপোর্ট বের হবে না। সে প্রসঙ্গ আবার নিহতদের পরিবারকে অর্থ সাহায্য দিয়ে ‘ভুল বোঝাবুঝি’র ঢাকনা দিয়ে ঢেকে দেওয়া যায়। তাদের দায় ও দরদের মতাদর্শে আদিবাসী ও প্রান্তিক মানুষেরা নেই, কিন্তু আছে অন্য কেউ- সেটা দাগহীনভাবেই স্পষ্ট।

  • জোবাইদা নাসরীন: শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
    zobaidanasreen@gmail.com