১০:১৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

জলবায়ু সম্মেলনের কাগুজে প্রতিশ্রুতি আর বাস্তব পৃথিবীর আর্তনাদ

আবুল কাসেম, কো-অর্ডিনেটর, হাকালুকি ক‍্যাম্প
  • আপডেট সময় : ০৪:১৫:১৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬
  • / 45
যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের সর্বশেষ খবর জানতে ভিজিট করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

পৃথিবী আজ এক নীরব বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কোথাও ভয়াবহ দাবানল, কোথাও দীর্ঘ খরা, কোথাও অস্বাভাবিক বন্যা, আবার কোথাও তীব্র তাপপ্রবাহ মানুষের স্বাভাবিক জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলছে। জলবায়ু পরিবর্তন আর ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয়; এটি এখন বাস্তবতা। অথচ এই সংকট মোকাবিলায় গত কয়েক দশকে বিশ্বজুড়ে অসংখ্য আন্তর্জাতিক সম্মেলন, চুক্তি ও প্রতিশ্রুতি হলেও বাস্তব অগ্রগতি এখনও খুব সীমিত।

প্রতি বছর ৫ জুন পালিত বিশ্ব পরিবেশ দিবস তাই কেবল আনুষ্ঠানিক কোনো দিবস নয়; এটি মানবসভ্যতার অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্ন। ১৯৭২ সালে সুইডেনের স্টকহোমে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ মানব পরিবেশ সম্মেলনের মাধ্যমে বিশ্ব পরিবেশ দিবসের যাত্রা শুরু হয়। এরপর ১৯৭৩ সালে “অনলি ওয়ান আর্থ” স্লোগানে প্রথমবার দিবসটি পালিত হয়। সেই সময় পৃথিবীকে রক্ষার যে আহ্বান জানানো হয়েছিল, অর্ধশতাব্দী পর আজ তা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।

২০২৬ সালের বিশ্ব পরিবেশ দিবসের প্রতিপাদ্য- “জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় সমাধান এবং স্থিতিস্থাপকতা”। এবারের বৈশ্বিক স্লোগান “নাও ফর ক্লাইমেট” যেন বিশ্ববাসীকে মনে করিয়ে দিচ্ছে- সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে, এখনই কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন শুধু পরিবেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, কৃষি, জীববৈচিত্র্য এবং মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সরাসরি আঘাত হানছে।

বিগত বছরগুলোতে কপ সম্মেলনসহ নানা আন্তর্জাতিক ফোরামে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। উন্নত দেশগুলো কার্বন নিঃসরণ কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য জলবায়ু তহবিল গঠনের আশ্বাসও এসেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, পৃথিবীর তাপমাত্রা এখনও বাড়ছে। শিল্পোন্নত দেশগুলোর বড় একটি অংশ এখনও জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। কয়লা, তেল ও গ্যাসনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আসার রাজনৈতিক সাহস অনেক রাষ্ট্রই দেখাতে পারছে না। ফলে সম্মেলনের আলোচনাগুলো অনেক সময় কাগুজে প্রতিশ্রুতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়।

জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বাড়ছে, কৃষি উৎপাদন কমছে, বিশুদ্ধ পানির সংকট তৈরি হচ্ছে। পাহাড়ি অঞ্চলে ভূমিধস বাড়ছে, বনভূমি উজাড় হওয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে অসংখ্য প্রাণীর আবাসস্থল। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে জলবায়ু উদ্বাস্তু মানুষের সংখ্যাও আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। অথচ এই ক্ষতির জন্য দায়ী নয় সাধারণ মানুষ; দায়ী অপরিকল্পিত উন্নয়ন, অতিরিক্ত শিল্পায়ন এবং প্রকৃতির প্রতি মানুষের নির্মম আচরণ।

এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য এখন আর শুধু বক্তৃতা বা প্রতীকী কর্মসূচি যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক, দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পদক্ষেপ। প্রথমত, কার্বন নিঃসরণ কমাতে কার্যকর নীতি গ্রহণ করতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই। সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির প্রসার ঘটাতে হবে রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে।

দ্বিতীয়ত, বন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে হবে। পৃথিবীর বনভূমি কেবল অক্সিজেনের উৎস নয়; এটি জলবায়ুর প্রাকৃতিক নিয়ন্ত্রক। নির্বিচারে বন উজাড় বন্ধ না হলে জলবায়ু সংকট আরও ভয়াবহ হবে। নদী, পাহাড়, জলাভূমি ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল সংরক্ষণে কঠোর আইন বাস্তবায়ন জরুরি। একই সঙ্গে নগরায়ণের নামে প্রকৃতি ধ্বংসের প্রবণতা থেকেও বেরিয়ে আসতে হবে।

তৃতীয়ত, পরিবেশ শিক্ষা ও জনসচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াই কেবল সরকারের দায়িত্ব নয়; প্রতিটি মানুষের অংশগ্রহণ ছাড়া এ সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, পানি ও বিদ্যুৎ অপচয় রোধ, গণপরিবহন ব্যবহার, বৃক্ষরোপণ এবং পরিবেশবান্ধব জীবনযাপন এসব ছোট ছোট উদ্যোগও বড় পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করতে পারে।

পরিবেশ রক্ষায় হাওরের ভূমিকা অপরিসীম। হাওর হচ্ছে প্রকৃতির এক বিশাল জলাধার, যা পরিবেশ রক্ষায় প্রাকৃতিক ঢালের মতো কাজ করে। হাওর অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি ধারণ করে বন্যার চাপ কমাতে সহায়তা করে। ফলে নিচু অঞ্চলগুলোতে আকস্মিক জলাবদ্ধতা ও ভয়াবহ বন্যার ঝুঁকি অনেকাংশে হ্রাস পায়। একই সঙ্গে হাওর ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ঠিক রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রাকৃতিকভাবে পানি সংরক্ষণের এই ব্যবস্থা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায়ও সহায়ক। শীত মৌসুমে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে হাজার হাজার পরিযায়ী পাখি হাওরে এসে আশ্রয় নেয়। ফলে হাওর শুধু স্থানীয় পরিবেশ নয়, বৈশ্বিক জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

পরিবেশবিদদের মতে, হাওর প্রাকৃতিক কার্বন শোষণেও ভূমিকা রাখে। জলাভূমির উদ্ভিদ ও মাটি বায়ুমণ্ডলের কার্বন ধারণ করে জলবায়ুর ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করে। এছাড়া হাওরের সবুজ পরিবেশ তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতি কমাতেও ভূমিকা রাখে।

অথচ দেশে দেশে আজ নানা কারণে হাওরের পরিবেশ হুমকির মুখে। অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ, নদী ভরাট, অবৈধ দখল, দূষণ, অতিরিক্ত বালু উত্তোলন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে হাওরের স্বাভাবিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে জীববৈচিত্র্য কমে যাচ্ছে, মাছের উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। তাই পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে হাওর সংরক্ষণ এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জলবায়ু ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। যেসব দেশ ও জনগোষ্ঠী সবচেয়ে কম দূষণ করেছে, তারাই আজ সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার। তাই উন্নত দেশগুলোর উচিত ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং অভিযোজন সহায়তা নিশ্চিত করা। অন্যথায় বৈশ্বিক জলবায়ু উদ্যোগ কখনও সফল হবে না।

বিশ্ব পরিবেশ দিবস আমাদের আবারও স্মরণ করিয়ে দেয় পৃথিবী মানুষের সম্পত্তি নয়; মানুষ পৃথিবীর একটি অংশ মাত্র। প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান ছাড়া টেকসই ভবিষ্যৎ সম্ভব নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে আগামী প্রজন্মের জন্য রেখে যেতে হবে এক উষ্ণ, বিপর্যস্ত ও অনিরাপদ পৃথিবী।

এখনও সময় আছে কিন্তু সেই সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। পৃথিবীকে রক্ষার প্রশ্নে আর ভণ্ডামি, কূটনৈতিক অভিনয় কিংবা কাগুজে প্রতিশ্রুতির সুযোগ নেই। জলবায়ু সম্মেলনের বিলাসবহুল মঞ্চে দাঁড়িয়ে পরিবেশ রক্ষার ভাষণ দিয়ে, আবার একই সঙ্গে প্রকৃতি ধ্বংসের নীতি চালিয়ে গেলে এই পৃথিবী একদিন মানুষের জন্যই বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠবে। তখন কোনো সম্মেলন, কোনো স্লোগান কিংবা কোনো রাজনৈতিক বক্তৃতা মানবসভ্যতাকে রক্ষা করতে পারবে না।

প্রকৃতি আজ স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিচ্ছে- মানুষ যদি এখনই না বদলায়, তাহলে প্রকৃতি তার নিজস্ব নিয়মেই প্রতিশোধ নেবে। দাবানল, ঘূর্ণিঝড়, খরা, বন্যা কিংবা তাপপ্রবাহ তখন আর বিচ্ছিন্ন দুর্যোগ হবে না; হয়ে উঠবে মানবসভ্যতার দৈনন্দিন বাস্তবতা।

তাই এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় আমরা কি মুনাফার লোভে পৃথিবীকে ধ্বংস হতে দেখব, নাকি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যেতে সত্যিকারের সাহসী পদক্ষেপ নেব? কারণ ইতিহাস একদিন নির্মমভাবে হিসাব নেবে পৃথিবী যখন বিপন্ন ছিল, তখন আমরা কী করেছি।

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

জলবায়ু সম্মেলনের কাগুজে প্রতিশ্রুতি আর বাস্তব পৃথিবীর আর্তনাদ

আপডেট সময় : ০৪:১৫:১৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৫ জুন ২০২৬

পৃথিবী আজ এক নীরব বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। কোথাও ভয়াবহ দাবানল, কোথাও দীর্ঘ খরা, কোথাও অস্বাভাবিক বন্যা, আবার কোথাও তীব্র তাপপ্রবাহ মানুষের স্বাভাবিক জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলছে। জলবায়ু পরিবর্তন আর ভবিষ্যতের কোনো আশঙ্কা নয়; এটি এখন বাস্তবতা। অথচ এই সংকট মোকাবিলায় গত কয়েক দশকে বিশ্বজুড়ে অসংখ্য আন্তর্জাতিক সম্মেলন, চুক্তি ও প্রতিশ্রুতি হলেও বাস্তব অগ্রগতি এখনও খুব সীমিত।

প্রতি বছর ৫ জুন পালিত বিশ্ব পরিবেশ দিবস তাই কেবল আনুষ্ঠানিক কোনো দিবস নয়; এটি মানবসভ্যতার অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্ন। ১৯৭২ সালে সুইডেনের স্টকহোমে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘ মানব পরিবেশ সম্মেলনের মাধ্যমে বিশ্ব পরিবেশ দিবসের যাত্রা শুরু হয়। এরপর ১৯৭৩ সালে “অনলি ওয়ান আর্থ” স্লোগানে প্রথমবার দিবসটি পালিত হয়। সেই সময় পৃথিবীকে রক্ষার যে আহ্বান জানানো হয়েছিল, অর্ধশতাব্দী পর আজ তা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।

২০২৬ সালের বিশ্ব পরিবেশ দিবসের প্রতিপাদ্য- “জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় সমাধান এবং স্থিতিস্থাপকতা”। এবারের বৈশ্বিক স্লোগান “নাও ফর ক্লাইমেট” যেন বিশ্ববাসীকে মনে করিয়ে দিচ্ছে- সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে, এখনই কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন শুধু পরিবেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, কৃষি, জীববৈচিত্র্য এবং মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সরাসরি আঘাত হানছে।

বিগত বছরগুলোতে কপ সম্মেলনসহ নানা আন্তর্জাতিক ফোরামে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। উন্নত দেশগুলো কার্বন নিঃসরণ কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য জলবায়ু তহবিল গঠনের আশ্বাসও এসেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, পৃথিবীর তাপমাত্রা এখনও বাড়ছে। শিল্পোন্নত দেশগুলোর বড় একটি অংশ এখনও জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল। কয়লা, তেল ও গ্যাসনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে আসার রাজনৈতিক সাহস অনেক রাষ্ট্রই দেখাতে পারছে না। ফলে সম্মেলনের আলোচনাগুলো অনেক সময় কাগুজে প্রতিশ্রুতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়।

জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বাড়ছে, কৃষি উৎপাদন কমছে, বিশুদ্ধ পানির সংকট তৈরি হচ্ছে। পাহাড়ি অঞ্চলে ভূমিধস বাড়ছে, বনভূমি উজাড় হওয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে অসংখ্য প্রাণীর আবাসস্থল। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে জলবায়ু উদ্বাস্তু মানুষের সংখ্যাও আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। অথচ এই ক্ষতির জন্য দায়ী নয় সাধারণ মানুষ; দায়ী অপরিকল্পিত উন্নয়ন, অতিরিক্ত শিল্পায়ন এবং প্রকৃতির প্রতি মানুষের নির্মম আচরণ।

এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য এখন আর শুধু বক্তৃতা বা প্রতীকী কর্মসূচি যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক, দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পদক্ষেপ। প্রথমত, কার্বন নিঃসরণ কমাতে কার্যকর নীতি গ্রহণ করতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই। সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির প্রসার ঘটাতে হবে রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে।

দ্বিতীয়ত, বন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে হবে। পৃথিবীর বনভূমি কেবল অক্সিজেনের উৎস নয়; এটি জলবায়ুর প্রাকৃতিক নিয়ন্ত্রক। নির্বিচারে বন উজাড় বন্ধ না হলে জলবায়ু সংকট আরও ভয়াবহ হবে। নদী, পাহাড়, জলাভূমি ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল সংরক্ষণে কঠোর আইন বাস্তবায়ন জরুরি। একই সঙ্গে নগরায়ণের নামে প্রকৃতি ধ্বংসের প্রবণতা থেকেও বেরিয়ে আসতে হবে।

তৃতীয়ত, পরিবেশ শিক্ষা ও জনসচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াই কেবল সরকারের দায়িত্ব নয়; প্রতিটি মানুষের অংশগ্রহণ ছাড়া এ সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো, পানি ও বিদ্যুৎ অপচয় রোধ, গণপরিবহন ব্যবহার, বৃক্ষরোপণ এবং পরিবেশবান্ধব জীবনযাপন এসব ছোট ছোট উদ্যোগও বড় পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি করতে পারে।

পরিবেশ রক্ষায় হাওরের ভূমিকা অপরিসীম। হাওর হচ্ছে প্রকৃতির এক বিশাল জলাধার, যা পরিবেশ রক্ষায় প্রাকৃতিক ঢালের মতো কাজ করে। হাওর অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি ধারণ করে বন্যার চাপ কমাতে সহায়তা করে। ফলে নিচু অঞ্চলগুলোতে আকস্মিক জলাবদ্ধতা ও ভয়াবহ বন্যার ঝুঁকি অনেকাংশে হ্রাস পায়। একই সঙ্গে হাওর ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ঠিক রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রাকৃতিকভাবে পানি সংরক্ষণের এই ব্যবস্থা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায়ও সহায়ক। শীত মৌসুমে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে হাজার হাজার পরিযায়ী পাখি হাওরে এসে আশ্রয় নেয়। ফলে হাওর শুধু স্থানীয় পরিবেশ নয়, বৈশ্বিক জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

পরিবেশবিদদের মতে, হাওর প্রাকৃতিক কার্বন শোষণেও ভূমিকা রাখে। জলাভূমির উদ্ভিদ ও মাটি বায়ুমণ্ডলের কার্বন ধারণ করে জলবায়ুর ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করে। এছাড়া হাওরের সবুজ পরিবেশ তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতি কমাতেও ভূমিকা রাখে।

অথচ দেশে দেশে আজ নানা কারণে হাওরের পরিবেশ হুমকির মুখে। অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ, নদী ভরাট, অবৈধ দখল, দূষণ, অতিরিক্ত বালু উত্তোলন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে হাওরের স্বাভাবিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে জীববৈচিত্র্য কমে যাচ্ছে, মাছের উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। তাই পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে হাওর সংরক্ষণ এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জলবায়ু ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। যেসব দেশ ও জনগোষ্ঠী সবচেয়ে কম দূষণ করেছে, তারাই আজ সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার। তাই উন্নত দেশগুলোর উচিত ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য অর্থায়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং অভিযোজন সহায়তা নিশ্চিত করা। অন্যথায় বৈশ্বিক জলবায়ু উদ্যোগ কখনও সফল হবে না।

বিশ্ব পরিবেশ দিবস আমাদের আবারও স্মরণ করিয়ে দেয় পৃথিবী মানুষের সম্পত্তি নয়; মানুষ পৃথিবীর একটি অংশ মাত্র। প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান ছাড়া টেকসই ভবিষ্যৎ সম্ভব নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে আগামী প্রজন্মের জন্য রেখে যেতে হবে এক উষ্ণ, বিপর্যস্ত ও অনিরাপদ পৃথিবী।

এখনও সময় আছে কিন্তু সেই সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। পৃথিবীকে রক্ষার প্রশ্নে আর ভণ্ডামি, কূটনৈতিক অভিনয় কিংবা কাগুজে প্রতিশ্রুতির সুযোগ নেই। জলবায়ু সম্মেলনের বিলাসবহুল মঞ্চে দাঁড়িয়ে পরিবেশ রক্ষার ভাষণ দিয়ে, আবার একই সঙ্গে প্রকৃতি ধ্বংসের নীতি চালিয়ে গেলে এই পৃথিবী একদিন মানুষের জন্যই বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠবে। তখন কোনো সম্মেলন, কোনো স্লোগান কিংবা কোনো রাজনৈতিক বক্তৃতা মানবসভ্যতাকে রক্ষা করতে পারবে না।

প্রকৃতি আজ স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিচ্ছে- মানুষ যদি এখনই না বদলায়, তাহলে প্রকৃতি তার নিজস্ব নিয়মেই প্রতিশোধ নেবে। দাবানল, ঘূর্ণিঝড়, খরা, বন্যা কিংবা তাপপ্রবাহ তখন আর বিচ্ছিন্ন দুর্যোগ হবে না; হয়ে উঠবে মানবসভ্যতার দৈনন্দিন বাস্তবতা।

তাই এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় আমরা কি মুনাফার লোভে পৃথিবীকে ধ্বংস হতে দেখব, নাকি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী রেখে যেতে সত্যিকারের সাহসী পদক্ষেপ নেব? কারণ ইতিহাস একদিন নির্মমভাবে হিসাব নেবে পৃথিবী যখন বিপন্ন ছিল, তখন আমরা কী করেছি।