হুমায়ূন আহমেদের ১৪তম মৃত্যুবার্ষিকী
সৃষ্টি আর স্মৃতিতে আজও অমর বাংলা সাহিত্যের নন্দিত কথাশিল্পী
- আপডেট সময় : ১০:২০:৪৩ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬
- / 44
বাংলা সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার ও চলচ্চিত্র নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদের ১৪তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ, ১৯ জুলাই। ২০১২ সালের এই দিনে যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। সময়ের ব্যবধানে তার শারীরিক অনুপস্থিতি আরও গভীরভাবে অনুভূত হলেও সাহিত্য, নাটক ও চলচ্চিত্রে রেখে যাওয়া অসামান্য সৃষ্টিকর্মের মধ্য দিয়ে তিনি আজও বেঁচে আছেন কোটি পাঠক-দর্শকের হৃদয়ে।
১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার কুতুবপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন হুমায়ূন আহমেদ। শৈশবে তার ডাকনাম ছিল ‘কাজল’। জন্মের সময় তার নাম রাখা হয়েছিল শামসুর রহমান। পরবর্তীতে পরিবারের সিদ্ধান্তে তার নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় হুমায়ূন আহমেদ।
সাহিত্যচর্চার অনুকূল পরিবেশ তিনি পেয়েছিলেন পরিবার থেকেই। তার বাবা শহীদ ফয়জুর রহমান আহমেদ ছিলেন একজন পুলিশ কর্মকর্তা। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পিরোজপুরে দায়িত্ব পালনকালে তিনি শহীদ হন। সাহিত্যচর্চার প্রতিও তার আগ্রহ ছিল; তার লেখা ‘দ্বীপ নেভা যার ঘরে’ গ্রন্থটি বিশেষভাবে পরিচিত। মা আয়েশা ফয়েজও ‘জীবন যে রকম’ শিরোনামে আত্মজীবনী রচনা করেছেন। পরিবারের অন্য দুই সদস্য- মুহম্মদ জাফর ইকবাল ও আহসান হাবীব- বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির অঙ্গনে সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব।
শিক্ষাজীবন শেষে দীর্ঘদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে অধ্যাপনা করেন হুমায়ূন আহমেদ। পরে সাহিত্য ও চলচ্চিত্র নির্মাণে পূর্ণ সময় দেওয়ার লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরি ছেড়ে দেন।
১৯৭২ সালে প্রকাশিত তার প্রথম উপন্যাস ‘নন্দিত নরকে’ বাংলা সাহিত্যাঙ্গনে নতুন এক প্রতিভার আবির্ভাব ঘটায়। এরপর ‘শঙ্খনীল কারাগার’, ‘মধ্যাহ্ন’, ‘জোছনা ও জননীর গল্প’, ‘দেয়াল’, ‘মাতাল হাওয়া’, ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’, ‘কবি’, ‘লীলাবতী’ এবং *‘গৌরীপুর জংশন’*সহ অসংখ্য জনপ্রিয় উপন্যাস রচনা করে তিনি বাংলা সাহিতিকে সমৃদ্ধ করেন।
শুধু সাহিত্যেই নয়, নাটক ও চলচ্চিত্রেও তিনি নির্মাণ করেছেন নিজস্ব এক স্বতন্ত্র ধারা। ‘এইসব দিনরাত্রি’ ধারাবাহিক নাটকের মাধ্যমে তিনি টেলিভিশন দর্শকের ঘরে ঘরে পৌঁছে যান। চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবে ‘আগুনের পরশমণি’, ‘শ্যামল ছায়া’, ‘দুই দুয়ারী’, ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ এবং ‘ঘেঁটুপুত্র কমলা’ নির্মাণ করে দেশ-বিদেশে প্রশংসা অর্জন করেন।
হুমায়ূন আহমেদের সৃষ্ট ‘হিমু’, ‘মিসির আলী’ ও ‘শুভ্র’ চরিত্র বাংলা সাহিত্যের কালজয়ী সংযোজন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। প্রজন্মের পর প্রজন্ম নতুন পাঠক এসব চরিত্রে খুঁজে পান জীবন, রহস্য, দর্শন ও মানবিকতার অনন্য প্রকাশ।
সাহিত্য, নাটক ও চলচ্চিত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদক, জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, বাচসাস পুরস্কারসহ অসংখ্য সম্মাননায় ভূষিত হন।
দিবসটি উপলক্ষে নুহাশপল্লীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে স্মরণসভা, দোয়া মাহফিল, পাঠচক্র, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও বিশেষ আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তার অগণিত পাঠক, শুভানুধ্যায়ী ও ভক্তরা প্রিয় লেখককে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছেন।
বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাসে হুমায়ূন আহমেদ শুধু একজন লেখকের নাম নয়; তিনি এক অনন্য সাহিত্য-প্রতিষ্ঠান। তার সৃষ্ট চরিত্র, ভাষার সহজাত সৌন্দর্য এবং মানবজীবনের গভীরতম অনুভূতিকে সহজ ভাষায় প্রকাশ করার অনন্য ক্ষমতা তাকে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে।

























