০৬:০৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম ::
Logo গ্রীনহিল স্টেট কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে যোগ দিলেন মো. নিয়াজ উদ্দীন Logo হারিয়ে যায়নি চিঠি, বদলেছে শুধু রূপ : মাটির ফলক থেকে ডিজিটাল ইনবক্স Logo দুর্গম এলাকায় ডিজিটাল নজরদারি বাড়াবে বিজিবি, তৈরি হবে নিজস্ব ড্রোন সক্ষমতা- সিলেটে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী Logo অ্যান্টিবায়োটিক সংকট: ওষুধহীন অন্ধকার যুগের পথে মানবসভ্যতা Logo এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের প্রথম নারী সার্ফার ফাতিমা Logo প্যারিসে টেক্সওয়ার্ল্ড অ্যাপারেল সোর্সিং মেলা ২০২৬ শুরু, উদ্বোধন হলো বাংলাদেশ প্যাভিলিয়ন Logo গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে দুর্বার গতিতে ছুটে চলেছে বিএনপি Logo সিলেটে মানবাধিকারকর্মী মিনহাজ সামাদ চৌধুরী নিখোঁজ Logo বড়লেখায় বিজিবির অভিযানে ইয়াবাসহ দুই মাদক কারবারি আটক Logo কোর্স ফর রোভার মেট সম্পন্ন করলেন সিলেট মুক্ত রোভার স্কাউট গ্রুপের ৮ সদস্য

অ্যান্টিবায়োটিক সংকট: ওষুধহীন অন্ধকার যুগের পথে মানবসভ্যতা

শেখ ফয়সাল আহমদ
  • আপডেট সময় : ০৭:১৪:২৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / 60
যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের সর্বশেষ খবর জানতে ভিজিট করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

পরবর্তী বৈশ্বিক স্বাস্থ্য বিপর্যয় হয়তো কোনো নতুন ভাইরাসের কারণে নয়, বরং এমন এক শত্রুর কারণে আসতে পারে, যাকে খালি চোখে দেখা যায় না। সেই নীরব শত্রু হলো অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া। ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয়ে ওঠা এই অণুজীব মানবজাতিকে এমন এক ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যেখানে একসময়ের সাধারণ সংক্রমণও হয়ে উঠতে পারে প্রাণঘাতী।

২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (CDC) এমন এক ঘটনার মুখোমুখি হয়েছিল, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানে গভীর উদ্বেগ তৈরি করে। হাড়ের চিকিৎসার পর এক নারী গুরুতর সংক্রমণে আক্রান্ত হন। পরীক্ষায় দেখা যায়, তাঁর রক্তে ছড়িয়ে পড়া Klebsiella pneumoniae ব্যাকটেরিয়া যুক্তরাষ্ট্রে অনুমোদিত বহু অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধেই প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করেছে। এমনকি শেষ ভরসার ওষুধ কোলিস্টিনও কার্যকর হয়নি। চিকিৎসকদের হাতে থাকা অস্ত্র ফুরিয়ে গেলে শেষ পর্যন্ত অণুজীবের কাছে হার মানতে হয়।

এ ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া ‘নীরব মহামারী’র একটি প্রতিচ্ছবি। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এই সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

দ্য ল্যানসেটে প্রকাশিত বৈশ্বিক গবেষণা অনুযায়ী, প্রতিবছর বিশ্বে ১২ লাখের বেশি মানুষ সরাসরি অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (AMR)-এর কারণে মারা যাচ্ছে। বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েক দশকে এই মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সকে বিশ্বের অন্যতম প্রধান স্বাস্থ্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা কমে যাওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো এর অপব্যবহার। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ গ্রহণ, নির্ধারিত কোর্স সম্পূর্ণ না করা এবং ভাইরাসজনিত রোগে অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার ব্যাকটেরিয়াকে ধীরে ধীরে প্রতিরোধী করে তুলছে।

বাংলাদেশেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। আইনগত বিধিনিষেধ থাকা সত্ত্বেও অনেক ক্ষেত্রে প্রেসক্রিপশন ছাড়াই অ্যান্টিবায়োটিক কেনাবেচার অভিযোগ রয়েছে। সাধারণ সর্দি-জ্বর বা ভাইরাসজনিত সংক্রমণেও অনেক মানুষ অ্যাজিথ্রোমাইসিন, সিপ্রোফ্লোক্সাসিনসহ শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করেন। এতে রোগী তাৎক্ষণিকভাবে কিছুটা স্বস্তি পেলেও দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পুরো সমাজ।

শুধু মানুষের চিকিৎসা নয়, কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাতেও অ্যান্টিবায়োটিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। পোল্ট্রি, মৎস্য ও গবাদিপশু খাতে অপরিকল্পিত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার পরিবেশ ও খাদ্যশৃঙ্খলে প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার বিস্তার ঘটাতে পারে। এসব ব্যাকটেরিয়া মানুষের শরীরেও প্রবেশ করে চিকিৎসাকে কঠিন করে তুলছে।

চিকিৎসকদের আশঙ্কা, অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা আরও কমে গেলে আধুনিক চিকিৎসার অনেক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র ঝুঁকির মুখে পড়বে। সিজারিয়ান অপারেশন, অঙ্গ প্রতিস্থাপন, ক্যান্সারের চিকিৎসা কিংবা বড় ধরনের অস্ত্রোপচারের পর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। এমনকি ছোটখাটো আঘাত বা সাধারণ ইনফেকশনও তখন বড় বিপদের কারণ হয়ে উঠতে পারে।

এই সংকটের পেছনে মানুষের আচরণগত কারণও গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত সুস্থ হওয়ার আকাঙ্ক্ষা, চিকিৎসকের ওপর অতিরিক্ত প্রত্যাশা এবং রোগের প্রকৃতি না বুঝে ওষুধ গ্রহণের প্রবণতা পরিস্থিতিকে জটিল করছে। অনেক সময় রোগী নিজেই অ্যান্টিবায়োটিক দাবি করেন, আবার কখনো চিকিৎসকরাও রোগীর চাপ বা অনিশ্চয়তার কারণে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ওষুধ ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

তবে এই সংকট মোকাবিলার পথ এখনও খোলা রয়েছে। প্রথমত, অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে কঠোর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে। চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়া বিক্রি বন্ধ করার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। ভাইরাসজনিত রোগে অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে না- এই মৌলিক বিষয়টি সবাইকে বুঝতে হবে।

দ্বিতীয়ত, দ্রুত রোগ নির্ণয় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। আধুনিক ডায়াগনস্টিক পদ্ধতি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি সংক্রমণের প্রকৃতি দ্রুত শনাক্ত করতে পারলে অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার কমানো সম্ভব হবে। পাশাপাশি ফেজ থেরাপির মতো বিকল্প চিকিৎসা পদ্ধতি এবং নতুন অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কারে গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

তৃতীয়ত, ‘ওয়ান হেলথ’ নীতি বাস্তবায়ন জরুরি। মানুষের স্বাস্থ্য, প্রাণিসম্পদ ও পরিবেশ- এই তিনটি বিষয়কে আলাদা করে দেখলে চলবে না। কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাতে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ওপর নজরদারি বাড়াতে হবে এবং শিল্পবর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

সাধারণ নাগরিকরাও এই লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ না করা, ওষুধের নির্ধারিত কোর্স সম্পন্ন করা, নিয়মিত হাত ধোয়া, টিকা গ্রহণ এবং নিরাপদ খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা- এসব ছোট ছোট পদক্ষেপই বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞানের সমস্যা নয়; এটি মানবসভ্যতার ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি বড় পরীক্ষা। আমরা যদি আজ সচেতন না হই, তাহলে আগামী প্রজন্ম এমন এক পৃথিবীর মুখোমুখি হতে পারে, যেখানে একসময়ের সাধারণ রোগের চিকিৎসাও কঠিন হয়ে পড়বে।

ব্যাকটেরিয়া প্রতিনিয়ত নিজেদের পরিবর্তন করছে। এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পালা মানুষের- আমরা কি অযথা অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করে ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলব, নাকি দায়িত্বশীল আচরণের মাধ্যমে আধুনিক চিকিৎসার এই গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রকে রক্ষা করব?

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

অ্যান্টিবায়োটিক সংকট: ওষুধহীন অন্ধকার যুগের পথে মানবসভ্যতা

আপডেট সময় : ০৭:১৪:২৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পরবর্তী বৈশ্বিক স্বাস্থ্য বিপর্যয় হয়তো কোনো নতুন ভাইরাসের কারণে নয়, বরং এমন এক শত্রুর কারণে আসতে পারে, যাকে খালি চোখে দেখা যায় না। সেই নীরব শত্রু হলো অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া। ধীরে ধীরে শক্তিশালী হয়ে ওঠা এই অণুজীব মানবজাতিকে এমন এক ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যেখানে একসময়ের সাধারণ সংক্রমণও হয়ে উঠতে পারে প্রাণঘাতী।

২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (CDC) এমন এক ঘটনার মুখোমুখি হয়েছিল, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানে গভীর উদ্বেগ তৈরি করে। হাড়ের চিকিৎসার পর এক নারী গুরুতর সংক্রমণে আক্রান্ত হন। পরীক্ষায় দেখা যায়, তাঁর রক্তে ছড়িয়ে পড়া Klebsiella pneumoniae ব্যাকটেরিয়া যুক্তরাষ্ট্রে অনুমোদিত বহু অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধেই প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করেছে। এমনকি শেষ ভরসার ওষুধ কোলিস্টিনও কার্যকর হয়নি। চিকিৎসকদের হাতে থাকা অস্ত্র ফুরিয়ে গেলে শেষ পর্যন্ত অণুজীবের কাছে হার মানতে হয়।

এ ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া ‘নীরব মহামারী’র একটি প্রতিচ্ছবি। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এই সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

দ্য ল্যানসেটে প্রকাশিত বৈশ্বিক গবেষণা অনুযায়ী, প্রতিবছর বিশ্বে ১২ লাখের বেশি মানুষ সরাসরি অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (AMR)-এর কারণে মারা যাচ্ছে। বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আগামী কয়েক দশকে এই মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সকে বিশ্বের অন্যতম প্রধান স্বাস্থ্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা কমে যাওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো এর অপব্যবহার। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ গ্রহণ, নির্ধারিত কোর্স সম্পূর্ণ না করা এবং ভাইরাসজনিত রোগে অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার ব্যাকটেরিয়াকে ধীরে ধীরে প্রতিরোধী করে তুলছে।

বাংলাদেশেও পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। আইনগত বিধিনিষেধ থাকা সত্ত্বেও অনেক ক্ষেত্রে প্রেসক্রিপশন ছাড়াই অ্যান্টিবায়োটিক কেনাবেচার অভিযোগ রয়েছে। সাধারণ সর্দি-জ্বর বা ভাইরাসজনিত সংক্রমণেও অনেক মানুষ অ্যাজিথ্রোমাইসিন, সিপ্রোফ্লোক্সাসিনসহ শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করেন। এতে রোগী তাৎক্ষণিকভাবে কিছুটা স্বস্তি পেলেও দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পুরো সমাজ।

শুধু মানুষের চিকিৎসা নয়, কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাতেও অ্যান্টিবায়োটিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার সংকটকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। পোল্ট্রি, মৎস্য ও গবাদিপশু খাতে অপরিকল্পিত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার পরিবেশ ও খাদ্যশৃঙ্খলে প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার বিস্তার ঘটাতে পারে। এসব ব্যাকটেরিয়া মানুষের শরীরেও প্রবেশ করে চিকিৎসাকে কঠিন করে তুলছে।

চিকিৎসকদের আশঙ্কা, অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা আরও কমে গেলে আধুনিক চিকিৎসার অনেক গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র ঝুঁকির মুখে পড়বে। সিজারিয়ান অপারেশন, অঙ্গ প্রতিস্থাপন, ক্যান্সারের চিকিৎসা কিংবা বড় ধরনের অস্ত্রোপচারের পর সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। এমনকি ছোটখাটো আঘাত বা সাধারণ ইনফেকশনও তখন বড় বিপদের কারণ হয়ে উঠতে পারে।

এই সংকটের পেছনে মানুষের আচরণগত কারণও গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত সুস্থ হওয়ার আকাঙ্ক্ষা, চিকিৎসকের ওপর অতিরিক্ত প্রত্যাশা এবং রোগের প্রকৃতি না বুঝে ওষুধ গ্রহণের প্রবণতা পরিস্থিতিকে জটিল করছে। অনেক সময় রোগী নিজেই অ্যান্টিবায়োটিক দাবি করেন, আবার কখনো চিকিৎসকরাও রোগীর চাপ বা অনিশ্চয়তার কারণে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি ওষুধ ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

তবে এই সংকট মোকাবিলার পথ এখনও খোলা রয়েছে। প্রথমত, অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে কঠোর নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে হবে। চিকিৎসকের প্রেসক্রিপশন ছাড়া বিক্রি বন্ধ করার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে। ভাইরাসজনিত রোগে অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে না- এই মৌলিক বিষয়টি সবাইকে বুঝতে হবে।

দ্বিতীয়ত, দ্রুত রোগ নির্ণয় প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। আধুনিক ডায়াগনস্টিক পদ্ধতি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি সংক্রমণের প্রকৃতি দ্রুত শনাক্ত করতে পারলে অপ্রয়োজনীয় অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার কমানো সম্ভব হবে। পাশাপাশি ফেজ থেরাপির মতো বিকল্প চিকিৎসা পদ্ধতি এবং নতুন অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কারে গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

তৃতীয়ত, ‘ওয়ান হেলথ’ নীতি বাস্তবায়ন জরুরি। মানুষের স্বাস্থ্য, প্রাণিসম্পদ ও পরিবেশ- এই তিনটি বিষয়কে আলাদা করে দেখলে চলবে না। কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাতে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ওপর নজরদারি বাড়াতে হবে এবং শিল্পবর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

সাধারণ নাগরিকরাও এই লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ না করা, ওষুধের নির্ধারিত কোর্স সম্পন্ন করা, নিয়মিত হাত ধোয়া, টিকা গ্রহণ এবং নিরাপদ খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা- এসব ছোট ছোট পদক্ষেপই বড় পরিবর্তন আনতে পারে।

অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্স শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞানের সমস্যা নয়; এটি মানবসভ্যতার ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি বড় পরীক্ষা। আমরা যদি আজ সচেতন না হই, তাহলে আগামী প্রজন্ম এমন এক পৃথিবীর মুখোমুখি হতে পারে, যেখানে একসময়ের সাধারণ রোগের চিকিৎসাও কঠিন হয়ে পড়বে।

ব্যাকটেরিয়া প্রতিনিয়ত নিজেদের পরিবর্তন করছে। এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পালা মানুষের- আমরা কি অযথা অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করে ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলব, নাকি দায়িত্বশীল আচরণের মাধ্যমে আধুনিক চিকিৎসার এই গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রকে রক্ষা করব?