০৬:০৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম ::
Logo গ্রীনহিল স্টেট কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে যোগ দিলেন মো. নিয়াজ উদ্দীন Logo হারিয়ে যায়নি চিঠি, বদলেছে শুধু রূপ : মাটির ফলক থেকে ডিজিটাল ইনবক্স Logo দুর্গম এলাকায় ডিজিটাল নজরদারি বাড়াবে বিজিবি, তৈরি হবে নিজস্ব ড্রোন সক্ষমতা- সিলেটে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী Logo অ্যান্টিবায়োটিক সংকট: ওষুধহীন অন্ধকার যুগের পথে মানবসভ্যতা Logo এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের প্রথম নারী সার্ফার ফাতিমা Logo প্যারিসে টেক্সওয়ার্ল্ড অ্যাপারেল সোর্সিং মেলা ২০২৬ শুরু, উদ্বোধন হলো বাংলাদেশ প্যাভিলিয়ন Logo গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে দুর্বার গতিতে ছুটে চলেছে বিএনপি Logo সিলেটে মানবাধিকারকর্মী মিনহাজ সামাদ চৌধুরী নিখোঁজ Logo বড়লেখায় বিজিবির অভিযানে ইয়াবাসহ দুই মাদক কারবারি আটক Logo কোর্স ফর রোভার মেট সম্পন্ন করলেন সিলেট মুক্ত রোভার স্কাউট গ্রুপের ৮ সদস্য

প্রতি বছর ১ সেপ্টেম্বর বিশ্ব চিঠি দিবস (World Letter Writing Day) হিসেবে বিশ্বব্যাপী পালিত হয়। ডিজিটাল যুগের দ্রুতগতির মেসেজ বা ইমেইলের ভিড়ে কাগজের পাতায় হাতে লেখা চিঠির ঐতিহ্য ও আবেগপূর্ণ অনুভূতিকে স্মরণ করিয়ে দিতেই এই বিশেষ দিনটি উদযাপন করা হয়। বিশ্ব চিঠি দিবস নিয়ে লিখেছেন- শেখ ফয়সাল আহমদ

হারিয়ে যায়নি চিঠি, বদলেছে শুধু রূপ : মাটির ফলক থেকে ডিজিটাল ইনবক্স

শেখ ফয়সাল আহমদ
  • আপডেট সময় : ১০:০৪:৪৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / 103
যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের সর্বশেষ খবর জানতে ভিজিট করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

কখনো একটি চিঠির জন্য কেঁদেছে মানুষ। কখনো একটি চিঠিই ফিরিয়ে দিয়েছে বেঁচে থাকার আশা। আবার কখনো একটি ছোট্ট খামের ভাঁজে লুকিয়ে থেকেছে একটি যুদ্ধের ইতিহাস, একটি পরিবারের অপেক্ষা কিংবা দুটি মানুষের গভীর ভালোবাসার গল্প।

পুরোনো কাঠের আলমারির নিচের তাকে পড়ে থাকা একটি হলদেটে খাম খুললেই আজও যেন ভেসে আসে অতীতের কোনো এক দিনের নিঃশ্বাস। বিবর্ণ হয়ে যাওয়া কাগজে হয়তো কয়েকটি শব্দও আর স্পষ্ট নেই, কালির দাগও মুছে গেছে সময়ের সঙ্গে। তবু সেই অক্ষরগুলো আজও বহন করে একজন মানুষের কণ্ঠস্বর, একটি সম্পর্কের উষ্ণতা, একটি সময়ের স্পন্দন।

চিঠি কখনো শুধুই কাগজে লেখা কিছু শব্দ ছিল না। এটি ছিল অপেক্ষার শেষ মুহূর্ত, দূরত্ব পেরিয়ে আসা এক টুকরো হৃদস্পন্দন। ডাকপিয়নের হাতে ধরা একটি খাম কখনো হয়ে উঠত পরিবারের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ আবার কখনো একটি চিঠির কয়েকটি লাইনই ছিল যুদ্ধক্ষেত্রে থাকা সন্তানের বেঁচে থাকার প্রমাণ।

আজকের পৃথিবীতে একটি বার্তা পৌঁছাতে সময় লাগে মাত্র কয়েক সেকেন্ড। একটি মেসেজ, একটি ভিডিও কল কিংবা একটি ই-মেইল মুহূর্তেই দূরত্ব মুছে দেয়। কিন্তু এই দ্রুততার যুগের আগে ছিল অন্য এক পৃথিবী- যেখানে একটি চিঠির জন্য মানুষ অপেক্ষা করত দিনের পর দিন, মাসের পর মাস।

দূর থেকে ভেসে আসা ডাকপিয়নের সাইকেলের ঘণ্টা কিংবা রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে ছুটে চলা রানারের ঝুনঝুনি শুনে কত মানুষের বুক ধক করে উঠত- ‘হয়তো আজ আমার খবর এসেছে।’

কারণ একটি চিঠি মানে শুধু সংবাদ নয়।
একটি চিঠি মানে- কেউ আপনাকে মনে রেখেছে।

হাজার বছরের পথ পেরিয়ে মাটির ফলক থেকে প্যাপিরাস, ডাকটিকিট থেকে ডাকপিয়ন, আর আজকের ডিজিটাল ইনবক্স পর্যন্ত চিঠির এই যাত্রা আসলে মানবসভ্যতার অনুভূতি সংরক্ষণের ইতিহাস। এটি প্রযুক্তির বিবর্তনের গল্প যেমন, তেমনি মানুষের ভালোবাসা, অপেক্ষা আর সম্পর্ক ধরে রাখার অদম্য আকাঙ্ক্ষার গল্প।

চিঠির গল্প আসলে মানবসভ্যতার লিখিত ইতিহাসের গল্প। প্রায় চার হাজার বছর আগে প্রাচীন মেসোপটেমিয়ায় মানুষ প্রথম মাটির ফলকে নিজের কথা লিখে রাখে…

প্রায় চার হাজার বছর আগে প্রাচীন মেসোপটেমিয়ায় মানুষ প্রথম মাটির ফলকে নিজের কথা লিখে রাখে। ভেজা মাটির ওপর কিউনিফর্ম বা কীলকাকৃতি লিপিতে খোদাই করা সেই বার্তাগুলো ছিল সভ্যতার প্রথম লিখিত যোগাযোগের নিদর্শন।

সেই সময়েও মানুষ বুঝেছিল, ব্যক্তিগত কথারও নিরাপত্তা প্রয়োজন। তাই মূল মাটির ফলকের ওপর আরেকটি পাতলা মাটির আবরণ দিয়ে তৈরি করা হতো এক ধরনের প্রাচীন খাম। প্রেরক ও প্রাপকের পরিচয় এবং রাজকীয় সিলমোহর থাকত তার গায়ে। প্রাপক বার্তা পড়ার জন্য সেই মাটির আবরণ ভেঙে ফেলতেন- যেন আজকের দিনের পাসওয়ার্ড সুরক্ষিত কোনো বার্তা খোলার মতো।

প্রাচীন মিশরের ‘আমর্না লেটার্স’ জানায়, কূটনীতি ও রাজ্য পরিচালনায় চিঠির ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। পরে প্যাপিরাসের আবিষ্কার চিঠিকে করে তোলে আরও হালকা, সহজ ও বহনযোগ্য।

চিঠি লেখা হয়ে গেলেও তার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা ছিল পৌঁছে দেওয়া। হাজার হাজার বছর আগে একটি বার্তা নিয়ে পথ চলা মানে ছিল বিপদের সঙ্গে লড়াই করা।

পারস্যের আকেমেনীয় সাম্রাজ্য খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ-পঞ্চম শতাব্দীতে ‘আঙ্গারেয়ন’ নামে একটি উন্নত বার্তা পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলে। নির্দিষ্ট দূরত্ব পরপর ঘোড়া ও বার্তাবাহক প্রস্তুত থাকত, যাতে এক বাহকের কাছ থেকে অন্য বাহকের হাতে দ্রুত পৌঁছে যেত রাজকীয় বার্তা।

রোমান সাম্রাজ্যের সময় ‘কুরসুস পাবলিকুস’ রাষ্ট্রীয় যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও সংগঠিত করে। কিন্তু প্রযুক্তির আগের সেই পৃথিবীতে প্রতিটি চিঠির পেছনে ছিল মানুষের শ্রম, সাহস এবং দীর্ঘ পথের গল্প।

ভারতীয় উপমহাদেশে চিঠি ও বার্তা আদান-প্রদানের ঐতিহ্যও বহু পুরোনো। রাজা-বাদশাহদের সময়ে দ্রুতগামী দূত, প্রশিক্ষিত কবুতর এবং বিশেষ বার্তাবাহকের মাধ্যমে খবর পৌঁছানো হতো।

দিল্লি সালতানাতের শাসকরা সংগঠিত বার্তা ব্যবস্থার সূচনা করেন। পরে শের শাহ সুরি গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডের সঙ্গে সঙ্গে স্থাপন করেন ডাক চৌকি, যা উপমহাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।

তবে এই ইতিহাসের সবচেয়ে আবেগঘন চরিত্র নিঃসন্দেহে ‘ডাক হরকরা’ বা রানার।

হাতে বল্লম, পায়ে ক্লান্তি, কাঁধে চিঠির বোঝা আর মাথায় ঝুনঝুনি- এই ছিল তাদের পরিচয়। রাতের অন্ধকারে জঙ্গল পেরিয়ে, নদী পার হয়ে, পাহাড়ি পথ অতিক্রম করে তারা ছুটে চলতেন মানুষের খবর পৌঁছে দিতে।

তাদের কাছে একটি চিঠি ছিল শুধু কাগজ নয় বরং এটি ছিল কারও অপেক্ষার অবসান, কারও চোখের জলের উত্তর, কারও জীবনের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত সংবাদ।

সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘রানার’ কবিতার সেই ছুটে চলা মানুষ কিংবা তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ডাকহরকরা’ গল্পের চরিত্রগুলো আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয়- যোগাযোগের ইতিহাসে কিছু মানুষ নিঃশব্দ নায়ক হয়ে থাকেন।

বাংলাদেশের মানুষের জীবনেও চিঠির রয়েছে গভীর আবেগের স্থান। বিশেষ করে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে চিঠি হয়ে উঠেছিল যুদ্ধরত মানুষ ও পরিবারের মধ্যে একমাত্র সেতুবন্ধন।

রণাঙ্গনে থাকা মুক্তিযোদ্ধারা কখনো তামাকের কাগজে, কখনো ছেঁড়া খাতার পাতায়, কখনো সাধারণ কাগজে লিখতেন পরিবারের কাছে কয়েকটি লাইন-

‘মা, আমি ভালো আছি। দেশ স্বাধীন করে ফিরব।’

এই কয়েকটি শব্দের মধ্যেই ছিল একটি মায়ের অশ্রু, একটি পরিবারের অপেক্ষা এবং একটি জাতির স্বাধীনতার স্বপ্ন।

স্বাধীনতার পরও প্রবাসী স্বজনদের পাঠানো চিঠি ছিল বহু পরিবারের সবচেয়ে বড় আনন্দ। নীল খামের ভেতর আসা বিদেশের চিঠিতে থাকত দূরদেশের গল্প, ভালোবাসা, কষ্ট আর স্বপ্ন পূরণের সংগ্রাম।

চিঠি শুধু বাস্তব জীবনের অংশ নয়, এটি সাহিত্যেরও এক অনন্য উপাদান। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ছিন্নপত্র’, ‘ভানুসিংহের পত্রাবলী’, কাজী নজরুল ইসলামের চিঠিপত্র কিংবা বাংলা সাহিত্যের অসংখ্য রচনায় চিঠি হয়ে উঠেছে অনুভূতি প্রকাশের এক শক্তিশালী মাধ্যম।

একটি চিঠি লেখারও ছিল নিজস্ব এক শিল্প। সুন্দর কাগজ নির্বাচন, কলমের আঁচড়ে মনের কথা সাজানো, ভুল হলে নতুন করে লেখা, খামে ভরে ডাকবাক্সে ফেলা-তারপর শুরু হতো অপেক্ষার দিন।

সেই অপেক্ষার মধ্যেও ছিল ভালোবাসা।

প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে সহজ করেছে, দ্রুত করেছে। এখন একটি বার্তা পাঠাতে সময় লাগে কয়েক সেকেন্ড। কিন্তু দ্রুততার এই যুগেও চিঠির আবেদন হারিয়ে যায়নি।

কারণ একটি হাতে লেখা চিঠি শুধু তথ্য বহন করে না, বহন করে একজন মানুষের সময়, যত্ন এবং অনুভূতি।

কেউ যখন আপনার জন্য কলম হাতে নেন, কাগজ বেছে নেন, শব্দ খুঁজে নেন- তখন তিনি শুধু একটি বার্তা পাঠান না, তিনি তাঁর জীবনের কিছু মুহূর্ত আপনার নামে উৎসর্গ করেন।

ডিজিটাল বার্তা হয়তো সহজে হারিয়ে যায় হাজারো কথার ভিড়ে। কিন্তু একটি পুরোনো চিঠি বছরের পর বছর ধরে বেঁচে থাকে। বাবা-মায়ের হাতের লেখা, প্রিয়জনের শুভেচ্ছা কিংবা বহু বছর আগের কোনো অভিমানভরা চিঠি- এসব হয়ে ওঠে জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান স্মৃতি।

ডিজিটাল যুগে চিঠির আনুষ্ঠানিক ব্যবহার কমে গেলেও এর আবেগ এখনো অমলিন। সেই অনুভূতিকে স্মরণ করিয়ে দিতে ২০১৪ সালে অস্ট্রেলিয়ার রিচার্ড সিম্পকিন ১ সেপ্টেম্বর ‘বিশ্ব চিঠি দিবস’ পালনের উদ্যোগ নেন।

এই দিনটি শুধু একটি যোগাযোগ মাধ্যমকে স্মরণ করার দিন নয়; এটি মনে করিয়ে দেয়-মানুষের অনুভূতিরও একটি ধীর, গভীর এবং স্পর্শযোগ্য ভাষা আছে।

ডিজিটাল বার্তার গতি হয়তো আলোর মতো, কিন্তু একটি চিঠির জীবন হতে পারে শতাব্দীর।

হয়তো আজও কোনো আলমারির ভাঁজে, পুরোনো ডায়েরির পাতায় কিংবা মানিব্যাগের ছোট্ট পকেটে লুকিয়ে আছে একটি চিঠি। সেখানে হয়তো লেখা আছে- কেউ কাউকে খুব ভালোবাসত, কেউ কারও জন্য অপেক্ষা করত, কেউ ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।

সেই চিঠিগুলো আসলে কাগজ নয়। সেগুলো মানুষের হৃদয়ের সংরক্ষিত ইতিহাস। তাই চিঠি বেঁচে থাকুক। বেঁচে থাকুক অপেক্ষা, ভালোবাসা আর আন্তরিকতার সেই পুরোনো ভাষা।

চিঠি লিখুন। কারণ কিছু অনুভূতি পাঠানোর জন্য নয়-চিরদিন রেখে দেওয়ার জন্য।

• শেখ ফয়সাল আহমদ, ফাউন্ডার, বুকিয়ানস

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

প্রতি বছর ১ সেপ্টেম্বর বিশ্ব চিঠি দিবস (World Letter Writing Day) হিসেবে বিশ্বব্যাপী পালিত হয়। ডিজিটাল যুগের দ্রুতগতির মেসেজ বা ইমেইলের ভিড়ে কাগজের পাতায় হাতে লেখা চিঠির ঐতিহ্য ও আবেগপূর্ণ অনুভূতিকে স্মরণ করিয়ে দিতেই এই বিশেষ দিনটি উদযাপন করা হয়। বিশ্ব চিঠি দিবস নিয়ে লিখেছেন- শেখ ফয়সাল আহমদ

হারিয়ে যায়নি চিঠি, বদলেছে শুধু রূপ : মাটির ফলক থেকে ডিজিটাল ইনবক্স

আপডেট সময় : ১০:০৪:৪৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

কখনো একটি চিঠির জন্য কেঁদেছে মানুষ। কখনো একটি চিঠিই ফিরিয়ে দিয়েছে বেঁচে থাকার আশা। আবার কখনো একটি ছোট্ট খামের ভাঁজে লুকিয়ে থেকেছে একটি যুদ্ধের ইতিহাস, একটি পরিবারের অপেক্ষা কিংবা দুটি মানুষের গভীর ভালোবাসার গল্প।

পুরোনো কাঠের আলমারির নিচের তাকে পড়ে থাকা একটি হলদেটে খাম খুললেই আজও যেন ভেসে আসে অতীতের কোনো এক দিনের নিঃশ্বাস। বিবর্ণ হয়ে যাওয়া কাগজে হয়তো কয়েকটি শব্দও আর স্পষ্ট নেই, কালির দাগও মুছে গেছে সময়ের সঙ্গে। তবু সেই অক্ষরগুলো আজও বহন করে একজন মানুষের কণ্ঠস্বর, একটি সম্পর্কের উষ্ণতা, একটি সময়ের স্পন্দন।

চিঠি কখনো শুধুই কাগজে লেখা কিছু শব্দ ছিল না। এটি ছিল অপেক্ষার শেষ মুহূর্ত, দূরত্ব পেরিয়ে আসা এক টুকরো হৃদস্পন্দন। ডাকপিয়নের হাতে ধরা একটি খাম কখনো হয়ে উঠত পরিবারের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ আবার কখনো একটি চিঠির কয়েকটি লাইনই ছিল যুদ্ধক্ষেত্রে থাকা সন্তানের বেঁচে থাকার প্রমাণ।

আজকের পৃথিবীতে একটি বার্তা পৌঁছাতে সময় লাগে মাত্র কয়েক সেকেন্ড। একটি মেসেজ, একটি ভিডিও কল কিংবা একটি ই-মেইল মুহূর্তেই দূরত্ব মুছে দেয়। কিন্তু এই দ্রুততার যুগের আগে ছিল অন্য এক পৃথিবী- যেখানে একটি চিঠির জন্য মানুষ অপেক্ষা করত দিনের পর দিন, মাসের পর মাস।

দূর থেকে ভেসে আসা ডাকপিয়নের সাইকেলের ঘণ্টা কিংবা রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে ছুটে চলা রানারের ঝুনঝুনি শুনে কত মানুষের বুক ধক করে উঠত- ‘হয়তো আজ আমার খবর এসেছে।’

কারণ একটি চিঠি মানে শুধু সংবাদ নয়।
একটি চিঠি মানে- কেউ আপনাকে মনে রেখেছে।

হাজার বছরের পথ পেরিয়ে মাটির ফলক থেকে প্যাপিরাস, ডাকটিকিট থেকে ডাকপিয়ন, আর আজকের ডিজিটাল ইনবক্স পর্যন্ত চিঠির এই যাত্রা আসলে মানবসভ্যতার অনুভূতি সংরক্ষণের ইতিহাস। এটি প্রযুক্তির বিবর্তনের গল্প যেমন, তেমনি মানুষের ভালোবাসা, অপেক্ষা আর সম্পর্ক ধরে রাখার অদম্য আকাঙ্ক্ষার গল্প।

চিঠির গল্প আসলে মানবসভ্যতার লিখিত ইতিহাসের গল্প। প্রায় চার হাজার বছর আগে প্রাচীন মেসোপটেমিয়ায় মানুষ প্রথম মাটির ফলকে নিজের কথা লিখে রাখে…

প্রায় চার হাজার বছর আগে প্রাচীন মেসোপটেমিয়ায় মানুষ প্রথম মাটির ফলকে নিজের কথা লিখে রাখে। ভেজা মাটির ওপর কিউনিফর্ম বা কীলকাকৃতি লিপিতে খোদাই করা সেই বার্তাগুলো ছিল সভ্যতার প্রথম লিখিত যোগাযোগের নিদর্শন।

সেই সময়েও মানুষ বুঝেছিল, ব্যক্তিগত কথারও নিরাপত্তা প্রয়োজন। তাই মূল মাটির ফলকের ওপর আরেকটি পাতলা মাটির আবরণ দিয়ে তৈরি করা হতো এক ধরনের প্রাচীন খাম। প্রেরক ও প্রাপকের পরিচয় এবং রাজকীয় সিলমোহর থাকত তার গায়ে। প্রাপক বার্তা পড়ার জন্য সেই মাটির আবরণ ভেঙে ফেলতেন- যেন আজকের দিনের পাসওয়ার্ড সুরক্ষিত কোনো বার্তা খোলার মতো।

প্রাচীন মিশরের ‘আমর্না লেটার্স’ জানায়, কূটনীতি ও রাজ্য পরিচালনায় চিঠির ভূমিকা কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। পরে প্যাপিরাসের আবিষ্কার চিঠিকে করে তোলে আরও হালকা, সহজ ও বহনযোগ্য।

চিঠি লেখা হয়ে গেলেও তার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা ছিল পৌঁছে দেওয়া। হাজার হাজার বছর আগে একটি বার্তা নিয়ে পথ চলা মানে ছিল বিপদের সঙ্গে লড়াই করা।

পারস্যের আকেমেনীয় সাম্রাজ্য খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ-পঞ্চম শতাব্দীতে ‘আঙ্গারেয়ন’ নামে একটি উন্নত বার্তা পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলে। নির্দিষ্ট দূরত্ব পরপর ঘোড়া ও বার্তাবাহক প্রস্তুত থাকত, যাতে এক বাহকের কাছ থেকে অন্য বাহকের হাতে দ্রুত পৌঁছে যেত রাজকীয় বার্তা।

রোমান সাম্রাজ্যের সময় ‘কুরসুস পাবলিকুস’ রাষ্ট্রীয় যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আরও সংগঠিত করে। কিন্তু প্রযুক্তির আগের সেই পৃথিবীতে প্রতিটি চিঠির পেছনে ছিল মানুষের শ্রম, সাহস এবং দীর্ঘ পথের গল্প।

ভারতীয় উপমহাদেশে চিঠি ও বার্তা আদান-প্রদানের ঐতিহ্যও বহু পুরোনো। রাজা-বাদশাহদের সময়ে দ্রুতগামী দূত, প্রশিক্ষিত কবুতর এবং বিশেষ বার্তাবাহকের মাধ্যমে খবর পৌঁছানো হতো।

দিল্লি সালতানাতের শাসকরা সংগঠিত বার্তা ব্যবস্থার সূচনা করেন। পরে শের শাহ সুরি গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডের সঙ্গে সঙ্গে স্থাপন করেন ডাক চৌকি, যা উপমহাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।

তবে এই ইতিহাসের সবচেয়ে আবেগঘন চরিত্র নিঃসন্দেহে ‘ডাক হরকরা’ বা রানার।

হাতে বল্লম, পায়ে ক্লান্তি, কাঁধে চিঠির বোঝা আর মাথায় ঝুনঝুনি- এই ছিল তাদের পরিচয়। রাতের অন্ধকারে জঙ্গল পেরিয়ে, নদী পার হয়ে, পাহাড়ি পথ অতিক্রম করে তারা ছুটে চলতেন মানুষের খবর পৌঁছে দিতে।

তাদের কাছে একটি চিঠি ছিল শুধু কাগজ নয় বরং এটি ছিল কারও অপেক্ষার অবসান, কারও চোখের জলের উত্তর, কারও জীবনের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত সংবাদ।

সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘রানার’ কবিতার সেই ছুটে চলা মানুষ কিংবা তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘ডাকহরকরা’ গল্পের চরিত্রগুলো আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয়- যোগাযোগের ইতিহাসে কিছু মানুষ নিঃশব্দ নায়ক হয়ে থাকেন।

বাংলাদেশের মানুষের জীবনেও চিঠির রয়েছে গভীর আবেগের স্থান। বিশেষ করে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে চিঠি হয়ে উঠেছিল যুদ্ধরত মানুষ ও পরিবারের মধ্যে একমাত্র সেতুবন্ধন।

রণাঙ্গনে থাকা মুক্তিযোদ্ধারা কখনো তামাকের কাগজে, কখনো ছেঁড়া খাতার পাতায়, কখনো সাধারণ কাগজে লিখতেন পরিবারের কাছে কয়েকটি লাইন-

‘মা, আমি ভালো আছি। দেশ স্বাধীন করে ফিরব।’

এই কয়েকটি শব্দের মধ্যেই ছিল একটি মায়ের অশ্রু, একটি পরিবারের অপেক্ষা এবং একটি জাতির স্বাধীনতার স্বপ্ন।

স্বাধীনতার পরও প্রবাসী স্বজনদের পাঠানো চিঠি ছিল বহু পরিবারের সবচেয়ে বড় আনন্দ। নীল খামের ভেতর আসা বিদেশের চিঠিতে থাকত দূরদেশের গল্প, ভালোবাসা, কষ্ট আর স্বপ্ন পূরণের সংগ্রাম।

চিঠি শুধু বাস্তব জীবনের অংশ নয়, এটি সাহিত্যেরও এক অনন্য উপাদান। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘ছিন্নপত্র’, ‘ভানুসিংহের পত্রাবলী’, কাজী নজরুল ইসলামের চিঠিপত্র কিংবা বাংলা সাহিত্যের অসংখ্য রচনায় চিঠি হয়ে উঠেছে অনুভূতি প্রকাশের এক শক্তিশালী মাধ্যম।

একটি চিঠি লেখারও ছিল নিজস্ব এক শিল্প। সুন্দর কাগজ নির্বাচন, কলমের আঁচড়ে মনের কথা সাজানো, ভুল হলে নতুন করে লেখা, খামে ভরে ডাকবাক্সে ফেলা-তারপর শুরু হতো অপেক্ষার দিন।

সেই অপেক্ষার মধ্যেও ছিল ভালোবাসা।

প্রযুক্তি আমাদের জীবনকে সহজ করেছে, দ্রুত করেছে। এখন একটি বার্তা পাঠাতে সময় লাগে কয়েক সেকেন্ড। কিন্তু দ্রুততার এই যুগেও চিঠির আবেদন হারিয়ে যায়নি।

কারণ একটি হাতে লেখা চিঠি শুধু তথ্য বহন করে না, বহন করে একজন মানুষের সময়, যত্ন এবং অনুভূতি।

কেউ যখন আপনার জন্য কলম হাতে নেন, কাগজ বেছে নেন, শব্দ খুঁজে নেন- তখন তিনি শুধু একটি বার্তা পাঠান না, তিনি তাঁর জীবনের কিছু মুহূর্ত আপনার নামে উৎসর্গ করেন।

ডিজিটাল বার্তা হয়তো সহজে হারিয়ে যায় হাজারো কথার ভিড়ে। কিন্তু একটি পুরোনো চিঠি বছরের পর বছর ধরে বেঁচে থাকে। বাবা-মায়ের হাতের লেখা, প্রিয়জনের শুভেচ্ছা কিংবা বহু বছর আগের কোনো অভিমানভরা চিঠি- এসব হয়ে ওঠে জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান স্মৃতি।

ডিজিটাল যুগে চিঠির আনুষ্ঠানিক ব্যবহার কমে গেলেও এর আবেগ এখনো অমলিন। সেই অনুভূতিকে স্মরণ করিয়ে দিতে ২০১৪ সালে অস্ট্রেলিয়ার রিচার্ড সিম্পকিন ১ সেপ্টেম্বর ‘বিশ্ব চিঠি দিবস’ পালনের উদ্যোগ নেন।

এই দিনটি শুধু একটি যোগাযোগ মাধ্যমকে স্মরণ করার দিন নয়; এটি মনে করিয়ে দেয়-মানুষের অনুভূতিরও একটি ধীর, গভীর এবং স্পর্শযোগ্য ভাষা আছে।

ডিজিটাল বার্তার গতি হয়তো আলোর মতো, কিন্তু একটি চিঠির জীবন হতে পারে শতাব্দীর।

হয়তো আজও কোনো আলমারির ভাঁজে, পুরোনো ডায়েরির পাতায় কিংবা মানিব্যাগের ছোট্ট পকেটে লুকিয়ে আছে একটি চিঠি। সেখানে হয়তো লেখা আছে- কেউ কাউকে খুব ভালোবাসত, কেউ কারও জন্য অপেক্ষা করত, কেউ ফিরে আসার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।

সেই চিঠিগুলো আসলে কাগজ নয়। সেগুলো মানুষের হৃদয়ের সংরক্ষিত ইতিহাস। তাই চিঠি বেঁচে থাকুক। বেঁচে থাকুক অপেক্ষা, ভালোবাসা আর আন্তরিকতার সেই পুরোনো ভাষা।

চিঠি লিখুন। কারণ কিছু অনুভূতি পাঠানোর জন্য নয়-চিরদিন রেখে দেওয়ার জন্য।

• শেখ ফয়সাল আহমদ, ফাউন্ডার, বুকিয়ানস