প্যারিসে টেক্সওয়ার্ল্ড অ্যাপারেল সোর্সিং মেলা ২০২৬ শুরু, উদ্বোধন হলো বাংলাদেশ প্যাভিলিয়ন
- আপডেট সময় : ০৬:২২:২৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / 36
ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে শুরু হয়েছে আন্তর্জাতিক টেক্সটাইল ও তৈরি পোশাকশিল্পের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্য মেলা ‘টেক্সওয়ার্ল্ড অ্যাপারেল সোর্সিং প্যারিস ২০২৬’। সোমবার (৩১ আগস্ট) প্যারিস-লে বুর্জে প্রদর্শনী কেন্দ্রে তিন দিনব্যাপী এ মেলার উদ্বোধন হয়। একই দিন বিকেলে মেলার হল-৩-এর বি-৩৩০ নম্বর বুথে উদ্বোধন করা হয় বাংলাদেশের জাতীয় প্যাভিলিয়ন।
বাংলাদেশ প্যাভিলিয়নের উদ্বোধন করেন ফ্রান্সে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এবং ইউনেস্কোতে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি খন্দকার এম. তালহা। অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) ভাইস চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ হাসান আরিফ।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ও বাংলাদেশ প্যাভিলিয়নের পরিচালক মোহাম্মদ রেহান উদ্দিন। এছাড়া প্যারিসে বাংলাদেশ দূতাবাসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন ডিফেন্স অ্যাটাশে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ খায়রুজ্জামান মোল্লা (এনডিসি, পিএসসি), কাউন্সিলর মাহফুজা সুলতানা, দূতালয় প্রধান মো. ওয়ালিদ বিন কাশেম, প্রথম সচিব শেখ মারেফত তারেকুল ইসলাম, মিনিস্টার (কমার্শিয়াল) মিজানুর রহমান এবং দ্বিতীয় সচিব কে. এফ. এম. শারহাদ শাকিলসহ অন্যান্য কর্মকর্তারা।
মেসে ফ্রাঙ্কফুর্ট আয়োজিত এবারের মেলা ৩১ আগস্ট থেকে ২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, টেক্সওয়ার্ল্ড অ্যাপারেল সোর্সিং প্যারিসের ৫৯তম সংস্করণে প্রায় ৩৫টি দেশের ১ হাজার ৩০০-এর বেশি নির্মাতা ও সরবরাহকারী অংশ নিচ্ছেন। প্যারিসের পার্ক দেজ এক্সপোজিসিয়োঁ দ্য প্যারিস-লে বুর্জের ২, ৩ ও ৪ নম্বর হলে এ আয়োজন অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
বিশ্ব ফ্যাশন ও টেক্সটাইল শিল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সোর্সিং প্ল্যাটফর্ম হিসেবে পরিচিত এ মেলায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের টেক্সটাইল প্রস্তুতকারক, পোশাক উৎপাদক, ফ্যাশন ব্র্যান্ড, আমদানিকারক, ক্রেতা, ডিজাইনার ও শিল্পসংশ্লিষ্ট পেশাজীবীরা অংশ নিচ্ছেন। টেক্সওয়ার্ল্ড প্যারিস, অ্যাপারেল সোর্সিং প্যারিসের পাশাপাশি টেকসই ও প্রযুক্তিনির্ভর ফ্যাশনের নতুন সমাধান নিয়ে অ্যাভানটেক্স প্যারিসও অংশগ্রহণ করছে।
মেলায় তুলা, ডেনিম, নিট ফেব্রিক, লিনেন, হেম্প, সিল্ক, এমব্রয়ডারি, লেস, জ্যাকোয়ার্ড, শার্টিং, স্পোর্টসওয়্যার ও কার্যকরী কাপড়সহ বিভিন্ন ধরনের টেক্সটাইল পণ্য প্রদর্শন করা হচ্ছে। অন্যদিকে অ্যাপারেল সোর্সিং প্যারিস অংশে নারীদের পোশাক, পুরুষদের পোশাক, শিশুদের পোশাক, নিটওয়্যার, ক্যাজুয়াল ও স্পোর্টসওয়্যার এবং বিভিন্ন ফ্যাশন অ্যাকসেসরিজের উৎপাদন সক্ষমতা তুলে ধরছেন অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো।
পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক বাজার বাস্তবতায় এবারের মেলায় সরবরাহব্যবস্থার বৈচিত্র্য, পরিবেশবান্ধব উৎপাদন, দ্রুত সরবরাহ এবং টেকসই ব্যবসায়িক ব্যবস্থার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক ক্রেতারা এখন শুধু উৎপাদন সক্ষমতা নয়, বরং মান, কমপ্লায়েন্স, পরিবেশগত দায়বদ্ধতা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার স্বচ্ছতাকেও গুরুত্ব দিচ্ছেন।
এবারের মেলায় চীন, ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তানসহ বিশ্বের প্রধান পোশাক উৎপাদনকারী দেশগুলোর পাশাপাশি আর্মেনিয়া, কিরগিজস্তান, উজবেকিস্তান ও বুলগেরিয়ার মতো উদীয়মান দেশও অংশ নিচ্ছে। এতে বৈশ্বিক পোশাক শিল্পে বহুমুখী সোর্সিংয়ের প্রবণতা আরও স্পষ্ট হয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য এবারের প্যারিস মেলা বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) উদ্যোগে দেশের ১২টি প্রতিষ্ঠান মেলায় অংশ নিচ্ছে। এর বাইরে ব্যক্তিগত উদ্যোগে আরও পাঁচটি প্রতিষ্ঠান অংশগ্রহণ করছে বলে জানিয়েছেন প্যারিসে বাংলাদেশ দূতাবাসের মিনিস্টার (কমার্শিয়াল) মিজানুর রহমান।
মেলায় অংশ নেওয়া বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো ইউরোপীয় ক্রেতাদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ, নতুন ব্যবসায়িক সম্পর্ক তৈরি এবং উচ্চমূল্যের ও বৈচিত্র্যময় পোশাকপণ্য উৎপাদনে বাংলাদেশের সক্ষমতা তুলে ধরার সুযোগ পাচ্ছে। অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে বেঙ্গল গ্লোরি লিমিটেড অ্যাপারেল সোর্সিং প্যারিসের ২০২৬ সংস্করণের প্রদর্শক হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প দীর্ঘদিন ধরে বৈশ্বিক বাজারে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান ধরে রেখেছে। দেশের রপ্তানি আয়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শিল্পায়নে এ খাতের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে বর্তমান আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ায় পণ্যের মান উন্নয়ন, উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদন, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং টেকসই উৎপাদন ব্যবস্থার দিকে শিল্প উদ্যোক্তাদের নজর বাড়ছে।

ফ্রান্স বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইউরোপীয় বাজার। বিশেষ করে প্যারিস বিশ্ব ফ্যাশনশিল্পের একটি প্রধান কেন্দ্র হওয়ায় সেখানে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক মেলায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণ নতুন বাজার সম্প্রসারণ ও ব্যবসায়িক যোগাযোগ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
মেলার অন্যতম আকর্ষণ হিসেবে রয়েছে টেকসই ফ্যাশন, স্মার্ট ম্যাটেরিয়াল, সার্কুলার উৎপাদন ব্যবস্থা, অটোমেশন এবং নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার। অ্যাভানটেক্স প্যারিস অংশে ফ্যাশন ও টেক্সটাইল খাতে উদ্ভাবনী প্রযুক্তি, গবেষণা ও উন্নয়ন এবং ভবিষ্যৎ উৎপাদন পদ্ধতি তুলে ধরা হচ্ছে।
এছাড়া এবারের আয়োজনে চামড়া ও জুয়েলারি পণ্যের জন্য বিশেষ প্যাভিলিয়ন রাখা হয়েছে। পাশাপাশি ছোট ও মাঝারি ব্র্যান্ডের জন্য ছোট পরিমাণে পণ্য সরবরাহ করতে সক্ষম প্রতিষ্ঠানগুলোকে তুলে ধরতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, টেক্সওয়ার্ল্ড অ্যাপারেল সোর্সিং প্যারিসে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ দেশের পোশাকশিল্পের সক্ষমতা, পণ্যের বৈচিত্র্য এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে সহায়তা করবে। একই সঙ্গে নতুন ক্রেতা, ব্যবসায়িক অংশীদার এবং ইউরোপীয় বাজারে রপ্তানি সম্প্রসারণের নতুন সুযোগ তৈরি হবে।
সব মিলিয়ে প্যারিসের এ মেলা বৈশ্বিক পোশাক ও টেক্সটাইল শিল্পের পরিবর্তিত প্রবণতার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিফলন। বাংলাদেশের জন্য এটি শুধু নতুন ক্রেতা খোঁজার সুযোগ নয়; বরং দেশের উৎপাদন সক্ষমতা, গুণগত মান, টেকসই উদ্যোগ এবং আধুনিক পোশাকপণ্যের পরিচিতি বিশ্ববাজারে তুলে ধরার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম।















