১১:১৮ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

স্মৃতিতে হারিয়ে যাচ্ছে শীতের সেই গ্রামবাংলা

বিলুপ্তির পথে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী ‘চুঙ্গাপোড়া পিঠা’

আবিদ হোসাইন, পূর্ব জুড়ী প্রতিনিধি :
  • আপডেট সময় : ১১:৩৯:৫৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬
  • / 226

জুড়ী শহরের ভবানীগঞ্জ বাজারে চুঙ্গাপিঠার প্রধান উপকরণ ঢলু বাঁশ বিক্রি করছেন বিক্রেতারা। ছবি : আবিদ হোসাইন, ষাটমাকন্ঠ ।

যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের সর্বশেষ খবর জানতে ভিজিট করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

সিলেট ও মৌলভীবাজার অঞ্চলের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী খাবার চুঙ্গাপোড়া পিঠা আজ বিলুপ্তির পথে। একসময় শীতের আমেজ শুরু হলেই সোনালি আমন ধান ঘরে তোলার পর সিলেট অঞ্চলের গ্রামে গ্রামে শুরু হতো চুঙ্গাপোড়া পিঠা তৈরির উৎসব। শীতের রাতে খড়কুটো জ্বালিয়ে উঠোনে দলবেঁধে পিঠা বানানোর সেই চিরচেনা দৃশ্য এখন আর চোখে পড়ে না।

কালের পরিক্রমায় সিলেট ও মৌলভীবাজার অঞ্চলের মানুষের এই অনন্য ঐতিহ্য অনেকটাই স্মৃতির পাতায় বন্দি হয়ে পড়েছে। চুঙ্গাপোড়া পিঠা তৈরির প্রধান উপকরণ চলু (ঢলু) বাঁশ ও বিন্নি ধানের চাল (বিরইন চাল) এই দুইয়েরই উৎপাদন ও সরবরাহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। একসময় প্রায় সব কৃষকই অন্যান্য ধানের পাশাপাশি বিন্নি ধান চাষ করলেও এখন অনেকেই তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।

জুড়ী শহরের ভবানীগঞ্জ বাজারে চুঙ্গাপিঠার প্রধান উপকরণ ঢলু বাঁশ বিক্রি করছেন বিক্রেতারা। ছবি : আবিদ হোসাইন, ষাটমাকন্ঠ ।
জুড়ী শহরের ভবানীগঞ্জ বাজারে চুঙ্গাপিঠার প্রধান উপকরণ ঢলু বাঁশ বিক্রি করছেন বিক্রেতারা। ছবি : আবিদ হোসাইন, ষাটমাকন্ঠ ।

চুঙ্গাপোড়া পিঠার আরেকটি অপরিহার্য উপকরণ চলু বাঁশ একসময় মৌলভীবাজারের জুড়ী ও বড়লেখা উপজেলার পাথরিয়া পাহাড়, রাজনগর, কুলাউড়ার গাজীপুরের পাহাড় এবং জুড়ী উপজেলার চুঙ্গাবাড়ি এলাকায় প্রচুর পাওয়া যেত। এই বাঁশের কারণেই কিছু কিছু এলাকা বেশ প্রসিদ্ধ ছিল। বর্তমানে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বন উজাড় ও পরিবেশের ভারসাম্যহীনতার কারণে বনাঞ্চল থেকে ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে ঢলু বাঁশ।

জুড়ী উপজেলার পাহাড়ঘেঁষা কয়েকটি এলাকায় বসবাসরত স্থানীয়রা এখনও শীত মৌসুমে ভবানীগঞ্জ ও কামিনীগঞ্জ বাজারে সীমিত পরিসরে ঢলু বাঁশ বিক্রি করেন। তবে আগের মতো সহজে বাজারে এ বাঁশ পাওয়া যায় না। স্থানীয়দের ভাষ্য, ঢলু বাঁশ ছাড়া চুঙ্গাপোড়া পিঠা তৈরি প্রায় অসম্ভব। কারণ এই বাঁশে থাকা প্রাকৃতিক তৈলাক্ত রাসায়নিক উপাদান আগুনে বাঁশকে সহজে পুড়ে যেতে দেয় না। ফলে আগুনে দেওয়ার পর বাঁশ না পুড়ে ভেতরের পিঠা ধীরে ধীরে সেদ্ধ হয়।

জুড়ীর প্রবীণ বাসিন্দা মুজিবুর রহমান ও ডা. স্বপন তালুকদার বলেন, চুঙ্গাপোড়া পিঠা তৈরি করতে ধৈর্য ও যত্ন প্রয়োজন। চুঙ্গার ভেতরে লুকিয়ে থাকে এক অনন্য, মনোমুগ্ধকর স্বাদ। তারা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, যথাযথ উদ্যোগ ও সংরক্ষণ না হলে সিলেট অঞ্চলের এই ঐতিহ্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে কেবল ইতিহাস হয়েই থেকে যাবে।

জুড়ী উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক মো. তাজুল ইসলাম বলেন, জুড়ী উপজেলা পাহাড়বেষ্টিত হওয়ায় একসময় এখানে প্রচুর ঢলু বাঁশ পাওয়া যেত। শীত এলেই ঘরে ঘরে নানান স্বাদের চুঙ্গাপোড়া পিঠা বানানো হতো। আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে নিমন্ত্রণ পেতাম সে আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।

ষাটমাকন্ঠ/রুমেল

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

স্মৃতিতে হারিয়ে যাচ্ছে শীতের সেই গ্রামবাংলা

বিলুপ্তির পথে সিলেটের ঐতিহ্যবাহী ‘চুঙ্গাপোড়া পিঠা’

আপডেট সময় : ১১:৩৯:৫৬ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬

সিলেট ও মৌলভীবাজার অঞ্চলের প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী খাবার চুঙ্গাপোড়া পিঠা আজ বিলুপ্তির পথে। একসময় শীতের আমেজ শুরু হলেই সোনালি আমন ধান ঘরে তোলার পর সিলেট অঞ্চলের গ্রামে গ্রামে শুরু হতো চুঙ্গাপোড়া পিঠা তৈরির উৎসব। শীতের রাতে খড়কুটো জ্বালিয়ে উঠোনে দলবেঁধে পিঠা বানানোর সেই চিরচেনা দৃশ্য এখন আর চোখে পড়ে না।

কালের পরিক্রমায় সিলেট ও মৌলভীবাজার অঞ্চলের মানুষের এই অনন্য ঐতিহ্য অনেকটাই স্মৃতির পাতায় বন্দি হয়ে পড়েছে। চুঙ্গাপোড়া পিঠা তৈরির প্রধান উপকরণ চলু (ঢলু) বাঁশ ও বিন্নি ধানের চাল (বিরইন চাল) এই দুইয়েরই উৎপাদন ও সরবরাহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। একসময় প্রায় সব কৃষকই অন্যান্য ধানের পাশাপাশি বিন্নি ধান চাষ করলেও এখন অনেকেই তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।

জুড়ী শহরের ভবানীগঞ্জ বাজারে চুঙ্গাপিঠার প্রধান উপকরণ ঢলু বাঁশ বিক্রি করছেন বিক্রেতারা। ছবি : আবিদ হোসাইন, ষাটমাকন্ঠ ।
জুড়ী শহরের ভবানীগঞ্জ বাজারে চুঙ্গাপিঠার প্রধান উপকরণ ঢলু বাঁশ বিক্রি করছেন বিক্রেতারা। ছবি : আবিদ হোসাইন, ষাটমাকন্ঠ ।

চুঙ্গাপোড়া পিঠার আরেকটি অপরিহার্য উপকরণ চলু বাঁশ একসময় মৌলভীবাজারের জুড়ী ও বড়লেখা উপজেলার পাথরিয়া পাহাড়, রাজনগর, কুলাউড়ার গাজীপুরের পাহাড় এবং জুড়ী উপজেলার চুঙ্গাবাড়ি এলাকায় প্রচুর পাওয়া যেত। এই বাঁশের কারণেই কিছু কিছু এলাকা বেশ প্রসিদ্ধ ছিল। বর্তমানে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বন উজাড় ও পরিবেশের ভারসাম্যহীনতার কারণে বনাঞ্চল থেকে ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে ঢলু বাঁশ।

জুড়ী উপজেলার পাহাড়ঘেঁষা কয়েকটি এলাকায় বসবাসরত স্থানীয়রা এখনও শীত মৌসুমে ভবানীগঞ্জ ও কামিনীগঞ্জ বাজারে সীমিত পরিসরে ঢলু বাঁশ বিক্রি করেন। তবে আগের মতো সহজে বাজারে এ বাঁশ পাওয়া যায় না। স্থানীয়দের ভাষ্য, ঢলু বাঁশ ছাড়া চুঙ্গাপোড়া পিঠা তৈরি প্রায় অসম্ভব। কারণ এই বাঁশে থাকা প্রাকৃতিক তৈলাক্ত রাসায়নিক উপাদান আগুনে বাঁশকে সহজে পুড়ে যেতে দেয় না। ফলে আগুনে দেওয়ার পর বাঁশ না পুড়ে ভেতরের পিঠা ধীরে ধীরে সেদ্ধ হয়।

জুড়ীর প্রবীণ বাসিন্দা মুজিবুর রহমান ও ডা. স্বপন তালুকদার বলেন, চুঙ্গাপোড়া পিঠা তৈরি করতে ধৈর্য ও যত্ন প্রয়োজন। চুঙ্গার ভেতরে লুকিয়ে থাকে এক অনন্য, মনোমুগ্ধকর স্বাদ। তারা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, যথাযথ উদ্যোগ ও সংরক্ষণ না হলে সিলেট অঞ্চলের এই ঐতিহ্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে কেবল ইতিহাস হয়েই থেকে যাবে।

জুড়ী উচ্চ বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক মো. তাজুল ইসলাম বলেন, জুড়ী উপজেলা পাহাড়বেষ্টিত হওয়ায় একসময় এখানে প্রচুর ঢলু বাঁশ পাওয়া যেত। শীত এলেই ঘরে ঘরে নানান স্বাদের চুঙ্গাপোড়া পিঠা বানানো হতো। আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে নিমন্ত্রণ পেতাম সে আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।

ষাটমাকন্ঠ/রুমেল