০৭:৫৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৫ মে ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম ::

নিশির নিষ্ঠুরতার বিপরীতে শিশু সামিনের মমত্ববোধ

প্রাণির বন্ধু ছোট্ট সামিন

ষাটমাকন্ঠ প্রতিবেদক
  • আপডেট সময় : ১১:২৩:১৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৫ ডিসেম্বর ২০২৫
  • / 259

মাত্র দশ বছরের সাইহান সামিন- যে নিজের ছোট্ট হৃদয়ে ধারণ করেছে অসীম মমতা, দুর্দমনীয় দায়িত্ববোধ আর প্রাণের প্রতি গভীর ভালোবাসা।

যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের সর্বশেষ খবর জানতে ভিজিট করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

পাবনার নিশি নামে এক নারীর হাতে আটটি নিরীহ কুকুরছানার নির্মম মৃত্যু- যেখানে নিষ্ঠুরতার চূড়ান্তরূপ আমরা দেখি, ঠিক সেই সময়ই জানা যায় সিলেট শহরে মানবিকতার এক কোমল গল্প। মাত্র দশ বছরের সাইহান সামিন- যে নিজের ছোট্ট হৃদয়ে ধারণ করেছে অসীম মমতা, দুর্দমনীয় দায়িত্ববোধ আর প্রাণের প্রতি গভীর ভালোবাসা।

সিলেট শহরের খাসদবির সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী সামিন; বয়সে ছোট হলেও অনুভূতিতে অনেক বড়। স্কুল থেকে ফিরে ব্যাগ নামাতেও ভুলে যায় সে, দ্রুত ছুটে যায় তার প্রিয় প্রাণিসঙ্গীদের কাছে। কারো পানি কম, কেউ অসুস্থ, কেউ ক্ষুধার্ত-সবকিছুই দেখে সে নিজের হাতে। খেলাধুলা, পড়াশোনা আর প্রাণি পরিচর্যা-এই তিন বিষয় তার প্রতিদিনের জীবনের ছন্দ।

শিক্ষক, সহপাঠী সবাই তাকে চেনে-একজন ব্যতিক্রমী প্রাণিপ্রেমী হিসেবে; যে ভালোবাসাকে কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করে।

ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী সামিন; বয়সে ছোট হলেও অনুভূতিতে অনেক বড়।

একটি বাড়ি, যেখানে প্রাণিরা পায় নিরাপদ আশ্রয়

সামিনদের আম্বরখানা বড়বাজার এলাকার গোয়াইটুলায় বাড়ির প্রবেশমুখে সতর্কবাণী- “কুকুর হইতে সাবধান।” কিন্তু ভেতরে পা রাখলেই যেন খুলে যায় আরেক রূপকথার দরজা-কোথাও খুশিতে লেজ নাড়ানো, কোথাও দুষ্টামি, কোথাও আবার মায়াভরা চোখে তাকানো অসংখ্য প্রাণ।

টারজান, কাল্লু, চিংকু, লাল্লি, বল্টু-একেকটির আলাদা নাম, আলাদা গল্প! এরা সামিনের কাছে কুকুর নয়-পরিবারের সদস্য।

বছর কয়েক আগে রাস্তায় পড়ে থাকা তিনটি অসহায় বাচ্চা কুকুর-লালু, কালু ও ডনকে দেখেই সামিনের এ যাত্রা শুরু। প্রতিদিন খাবার দেওয়া, কোলে নেওয়া, গায়ে হাত বুলিয়ে আদর করা-এভাবে একসময় বাড়তে থাকে সংখ্যাটি। কেউ অসুস্থ, কেউ আহত, কেউ পরিত্যক্ত-সবাইকে আশ্রয় দিয়েছে এই ছোট্ট প্রাণদরদি শিশু। আজ তার দায়িত্বে রয়েছে প্রায় অর্ধশতাধিক কুকুর।

সামিনের কণ্ঠে নিখাদ ভালোবাসা

প্রাণির প্রতি ভালোলাগার গল্প বলতে বলতে সামিন বলে, “ওরা কথা বলতে পারে না, তাই কষ্ট পেলে আমার মন ভেঙে যায়। কেউ কেউ মারে, ভয় পায়… কিন্তু ওরা আমার কাছে পরিবার।”
তার চোখে মুখে ফুটে ওঠে নিষ্পাপ অনুভূতি-অন্যের ব্যথাকে নিজের মনে ধারণ করার অপরিসীম ক্ষমতা।

পরিবারের উৎসাহ-মানবিকতার ভিত্তি

পরিবারের সকলেই উৎসাহ দেন এমন কাজে। সামিনের বাবা সাদিকুর রহমান সাকী বলেন, “ছোট থেকেই ও প্রাণিদের ভালোবাসে। প্রথমে ভেবেছিলাম, এতগুলো প্রাণি সামলানো কি সম্ভব? পরে দেখলাম-আদর, যত্ন, দায়িত্ব সবকিছুই সে নিজ হাতে করে। আমরা কেবল পাশে থাকি।”

মা সুবর্ণা হামিদ জানান, “শিশুরা যেখানে খেলনা নিয়ে ব্যস্ত থাকে, আমাদের সামিন ব্যস্ত থাকে অচেনা প্রাণিদের হাসি ফিরিয়ে আনতে। অনেকে বলে কুকুর রাখলে সমস্যা হয়, অথচ আমরা দেখি-এই প্রাণীরাই ঘরকে আনন্দে ভরিয়ে রাখে।”

প্রাণিপ্রেমের পাশাপাশি সামিন নিয়মিত অংশ নেয় বিভিন্ন প্রাণিসম্পদ মেলায়। ‘সামিন পেটস কেয়ার’ নামের উদ্যোগ নিয়ে সে জেলা পর্যায়ে পেয়েছে সেরা প্রদর্শক পুরস্কারও।

সিলেটের সামিন নামের এক শিশু প্রতিনিয়ত কুকুরছানার জীবনকে তার ছোট্ট দুই হাতে বাঁচায়।

একদিকে অন্ধকার, অন্যদিকে শিশুর হাতে আলো

যেখানে নিশি নামের এক নারীর নির্মম নিষ্ঠুরতায় হারিয়ে যায় ৮টি নিরীহ কুকুরছানার প্রাণ, সেখানে সিলেটের সামিন নামের এক শিশু প্রতিনিয়ত কুকুরছানার জীবনকে তার ছোট্ট দুই হাতে বাঁচায়।
সে মনে করিয়ে দেয়- “প্রাণেরও তো মূল্য আছে। তারা আমাদের মতোই ব্যথা পায়।”

সামিনের বাড়িটি কেবল কুকুরের আশ্রয়স্থল নয়- মানবতারও আশ্রয়। তাকে দেখলে যে কেউ অনুধাবন করবেন, হৃদয়ের বড়ত্ব বয়স দিয়ে মাপা যায় না।

অমানবিকতার অন্ধকারে সামিনের মতো শিশুরা যেন আশার আলোকিত প্রদীপ-যারা শেখায়, ভালোবাসাই সত্যিকারের শক্তি।

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

নিশির নিষ্ঠুরতার বিপরীতে শিশু সামিনের মমত্ববোধ

প্রাণির বন্ধু ছোট্ট সামিন

আপডেট সময় : ১১:২৩:১৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ৫ ডিসেম্বর ২০২৫

পাবনার নিশি নামে এক নারীর হাতে আটটি নিরীহ কুকুরছানার নির্মম মৃত্যু- যেখানে নিষ্ঠুরতার চূড়ান্তরূপ আমরা দেখি, ঠিক সেই সময়ই জানা যায় সিলেট শহরে মানবিকতার এক কোমল গল্প। মাত্র দশ বছরের সাইহান সামিন- যে নিজের ছোট্ট হৃদয়ে ধারণ করেছে অসীম মমতা, দুর্দমনীয় দায়িত্ববোধ আর প্রাণের প্রতি গভীর ভালোবাসা।

সিলেট শহরের খাসদবির সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী সামিন; বয়সে ছোট হলেও অনুভূতিতে অনেক বড়। স্কুল থেকে ফিরে ব্যাগ নামাতেও ভুলে যায় সে, দ্রুত ছুটে যায় তার প্রিয় প্রাণিসঙ্গীদের কাছে। কারো পানি কম, কেউ অসুস্থ, কেউ ক্ষুধার্ত-সবকিছুই দেখে সে নিজের হাতে। খেলাধুলা, পড়াশোনা আর প্রাণি পরিচর্যা-এই তিন বিষয় তার প্রতিদিনের জীবনের ছন্দ।

শিক্ষক, সহপাঠী সবাই তাকে চেনে-একজন ব্যতিক্রমী প্রাণিপ্রেমী হিসেবে; যে ভালোবাসাকে কাজের মাধ্যমে প্রমাণ করে।

ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী সামিন; বয়সে ছোট হলেও অনুভূতিতে অনেক বড়।

একটি বাড়ি, যেখানে প্রাণিরা পায় নিরাপদ আশ্রয়

সামিনদের আম্বরখানা বড়বাজার এলাকার গোয়াইটুলায় বাড়ির প্রবেশমুখে সতর্কবাণী- “কুকুর হইতে সাবধান।” কিন্তু ভেতরে পা রাখলেই যেন খুলে যায় আরেক রূপকথার দরজা-কোথাও খুশিতে লেজ নাড়ানো, কোথাও দুষ্টামি, কোথাও আবার মায়াভরা চোখে তাকানো অসংখ্য প্রাণ।

টারজান, কাল্লু, চিংকু, লাল্লি, বল্টু-একেকটির আলাদা নাম, আলাদা গল্প! এরা সামিনের কাছে কুকুর নয়-পরিবারের সদস্য।

বছর কয়েক আগে রাস্তায় পড়ে থাকা তিনটি অসহায় বাচ্চা কুকুর-লালু, কালু ও ডনকে দেখেই সামিনের এ যাত্রা শুরু। প্রতিদিন খাবার দেওয়া, কোলে নেওয়া, গায়ে হাত বুলিয়ে আদর করা-এভাবে একসময় বাড়তে থাকে সংখ্যাটি। কেউ অসুস্থ, কেউ আহত, কেউ পরিত্যক্ত-সবাইকে আশ্রয় দিয়েছে এই ছোট্ট প্রাণদরদি শিশু। আজ তার দায়িত্বে রয়েছে প্রায় অর্ধশতাধিক কুকুর।

সামিনের কণ্ঠে নিখাদ ভালোবাসা

প্রাণির প্রতি ভালোলাগার গল্প বলতে বলতে সামিন বলে, “ওরা কথা বলতে পারে না, তাই কষ্ট পেলে আমার মন ভেঙে যায়। কেউ কেউ মারে, ভয় পায়… কিন্তু ওরা আমার কাছে পরিবার।”
তার চোখে মুখে ফুটে ওঠে নিষ্পাপ অনুভূতি-অন্যের ব্যথাকে নিজের মনে ধারণ করার অপরিসীম ক্ষমতা।

পরিবারের উৎসাহ-মানবিকতার ভিত্তি

পরিবারের সকলেই উৎসাহ দেন এমন কাজে। সামিনের বাবা সাদিকুর রহমান সাকী বলেন, “ছোট থেকেই ও প্রাণিদের ভালোবাসে। প্রথমে ভেবেছিলাম, এতগুলো প্রাণি সামলানো কি সম্ভব? পরে দেখলাম-আদর, যত্ন, দায়িত্ব সবকিছুই সে নিজ হাতে করে। আমরা কেবল পাশে থাকি।”

মা সুবর্ণা হামিদ জানান, “শিশুরা যেখানে খেলনা নিয়ে ব্যস্ত থাকে, আমাদের সামিন ব্যস্ত থাকে অচেনা প্রাণিদের হাসি ফিরিয়ে আনতে। অনেকে বলে কুকুর রাখলে সমস্যা হয়, অথচ আমরা দেখি-এই প্রাণীরাই ঘরকে আনন্দে ভরিয়ে রাখে।”

প্রাণিপ্রেমের পাশাপাশি সামিন নিয়মিত অংশ নেয় বিভিন্ন প্রাণিসম্পদ মেলায়। ‘সামিন পেটস কেয়ার’ নামের উদ্যোগ নিয়ে সে জেলা পর্যায়ে পেয়েছে সেরা প্রদর্শক পুরস্কারও।

সিলেটের সামিন নামের এক শিশু প্রতিনিয়ত কুকুরছানার জীবনকে তার ছোট্ট দুই হাতে বাঁচায়।

একদিকে অন্ধকার, অন্যদিকে শিশুর হাতে আলো

যেখানে নিশি নামের এক নারীর নির্মম নিষ্ঠুরতায় হারিয়ে যায় ৮টি নিরীহ কুকুরছানার প্রাণ, সেখানে সিলেটের সামিন নামের এক শিশু প্রতিনিয়ত কুকুরছানার জীবনকে তার ছোট্ট দুই হাতে বাঁচায়।
সে মনে করিয়ে দেয়- “প্রাণেরও তো মূল্য আছে। তারা আমাদের মতোই ব্যথা পায়।”

সামিনের বাড়িটি কেবল কুকুরের আশ্রয়স্থল নয়- মানবতারও আশ্রয়। তাকে দেখলে যে কেউ অনুধাবন করবেন, হৃদয়ের বড়ত্ব বয়স দিয়ে মাপা যায় না।

অমানবিকতার অন্ধকারে সামিনের মতো শিশুরা যেন আশার আলোকিত প্রদীপ-যারা শেখায়, ভালোবাসাই সত্যিকারের শক্তি।