০৭:০১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম ::
Logo গ্রীনহিল স্টেট কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে যোগ দিলেন মো. নিয়াজ উদ্দীন Logo হারিয়ে যায়নি চিঠি, বদলেছে শুধু রূপ : মাটির ফলক থেকে ডিজিটাল ইনবক্স Logo দুর্গম এলাকায় ডিজিটাল নজরদারি বাড়াবে বিজিবি, তৈরি হবে নিজস্ব ড্রোন সক্ষমতা- সিলেটে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী Logo অ্যান্টিবায়োটিক সংকট: ওষুধহীন অন্ধকার যুগের পথে মানবসভ্যতা Logo এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের প্রথম নারী সার্ফার ফাতিমা Logo প্যারিসে টেক্সওয়ার্ল্ড অ্যাপারেল সোর্সিং মেলা ২০২৬ শুরু, উদ্বোধন হলো বাংলাদেশ প্যাভিলিয়ন Logo গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে দুর্বার গতিতে ছুটে চলেছে বিএনপি Logo সিলেটে মানবাধিকারকর্মী মিনহাজ সামাদ চৌধুরী নিখোঁজ Logo বড়লেখায় বিজিবির অভিযানে ইয়াবাসহ দুই মাদক কারবারি আটক Logo কোর্স ফর রোভার মেট সম্পন্ন করলেন সিলেট মুক্ত রোভার স্কাউট গ্রুপের ৮ সদস্য

গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে দুর্বার গতিতে ছুটে চলেছে বিএনপি

অধ্যাপক ড. মোর্শেদ হাসান খান
  • আপডেট সময় : ০৫:৫১:২৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • / 35
যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের সর্বশেষ খবর জানতে ভিজিট করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় গণমুখী রাজনৈতিক শক্তি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপি এখন রাষ্ট্রক্ষমতায়। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে একটি অবাধ, নিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর নির্বাচনে ভূমিধস বিজয়ের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে দলটি। যদিও বিএনপির বর্তমান নেতৃত্ব একে ক্ষমতা না বলে বরং বলছেন দায়িত্ব। অর্থাৎ দেশের জনগণের শান্তি-নিরাপত্তা, সুখ-সমৃদ্ধি ও সুশাসন নিশ্চিত করার পবিত্র দায়িত্ব এখন বিএনপি সরকারের ওপর। যেই দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত, ভঙ্গুর ও দুর্নীতিগ্রস্ত দেশকে টেনে তোলার দুঃসাহসিক দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে যিনি রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছিলেন। এরপর রাষ্ট্র গঠনে তাঁর নিরন্তর ছুটে চলা, নিরলস শ্রম আর নিঃসীম স্বপ্ন তাঁকে অমরত্ব দান করে। পৃথিবীর ইতিহাসে যার স্থান হয় ক্ষণজন্মা অথচ ভিশনারী লিডার হিসেবে।

পঁচাত্তরের পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর সৃষ্টি হয় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি। রাজধানীর রমনা রেস্তোরাঁয় সেদিন এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ঘোষণাপত্র পাঠ ছাড়াও প্রায় দুই ঘণ্টা সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন। প্রতিষ্ঠাকালে দলের অন্যতম সৌন্দর্য ছিল ডানপন্থী, বামপন্থী, মধ্যপন্থী সবার অংশগ্রহণ। সেদিন তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছিলেন, বাস্তবিকপক্ষে জাতীয় প্রয়োজনের জন্যই নতুন দল করা হচ্ছে, এই দল জাতিকে দৃঢ় করবে এবং দেশ ও দেশের মানুষকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।

প্রেসিডেন্ট জিয়া সে সময় বলেন, ১৯৭১ সালে আমরা স্বাধীনতা এনেছি। অনেকে তখন মনে করেছেন, এই স্বাধীনতার প্রয়োজন নেই। কিন্তু স্বাধীনতার মাধ্যমেই অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন করা সম্ভব। বাংলাদেশের যে বিপুল জাতীয় সম্পদ রয়েছে, তার সদ্ব্যবহার করলে অল্প সময়ের মধ্যে দেশকে উন্নতির পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যাবে। এই বিশ্বাস নিয়েই আমরা স্বাধীনতাযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম। আমি দেখেছি, হাজার হাজার নর-নারী দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন দিয়েছেন। তাঁদের ভুললে চলবে না, প্রশ্ন করতে হবে কেন তাঁরা প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলেন। তাঁদের আস্থা ছিল, দেশ স্বাধীন হলে তাঁরা শান্তিতে বসবাস করতে পারবেন। তাঁদের সে স্বপ্ন বাস্তবায়ন করাই নতুন দলের অঙ্গীকার।
প্রেসিডেন্ট জিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, জাতীয়তাবাদী দলের প্রধান লক্ষ্য ছিল স্বাধীনতার অঙ্গীকার, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে জাতীয় ঐক্য এবং জনগণের মধ্যে স্বনির্ভরতার চেতনা সৃষ্টি। ১৯ দফা কর্মসূচি ছিল দলের মূল আদর্শ। রাষ্ট্রনীতির চারটি মৌলিক আদর্শ তথা গণতন্ত্র, সর্বশক্তিমান আল্লাহর উপর অবিচল আস্থা ও বিশ্বাস, জাতীয়তাবাদ এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায়বিচার অর্থে সমাজতন্ত্র, এই ছিল দলীয় কর্মসূচির মর্মবাণী।

এ বিষয়ে বিশিষ্ট রাজনীতি গবেষক ও লেখক মহিউদ্দিন আহমদ তাঁর ‘সময়-অসময়’ গ্রন্থের ফ্ল্যাপের অংশেই কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা লিখেছেন। তাঁর মতে, ‘বিএনপির জন্ম সেনাছাউনিতে, একজন সেনা নায়কের হাতে, যখন তিনি ছিলেন ক্ষমতার কেন্দ্রে। এ ধরনের রাজনৈতিক দল ক্ষমতার বৃত্ত থেকে ছিটকে পড়লে সাধারণত হারিয়ে যায়। বিএনপি এদিক থেকে ব্যতিক্রম। দলটি শুধু টিকেই যায়নি, ভোটের রাজনীতিতে বিকল্প শক্তি হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। দেশে গণতন্ত্র আছে কিনা, বিএনপিতেও গণতন্ত্রের চর্চা হয় কিনা, তা নিয়ে চায়ের পেয়ালায় ঝড় তোলা যায়। কিন্তু দলটি দেশের জনগোষ্ঠীর বড় একটা অংশের প্রতিনিধিত্ব করে, এটা অস্বীকার করার জো নেই।’

১৯ দফা ছিল শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ঘোষণা করা রাষ্ট্রের মুক্তির দিকনির্দেশনাবলী। এক কথায় বলা যেতে পারে, সমসাময়িক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্র গঠনে মনোযোগ ফিরিয়ে আনেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এই ১৯ দফা প্রণয়নের মাধ্যমে। তিনি তাঁর রাজনৈতিক দর্শনে যেমন শাসনতন্ত্রের মূলনীতি—গণতন্ত্রের পথ দেখিয়েছেন, ঠিক তেমনি সমাজতন্ত্রের ভালো যে দিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের কথা, সেটিও বলেছেন। তিনি সমাজব্যবস্থার সকল উত্তম দিকের সমন্বয়ে একটা স্বাধীন, অখণ্ড ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের স্বপ্নের বাস্তবিক প্রয়োগ দেখিয়েছিলেন। এই ১৯ দফায় রাষ্ট্রকে তিনি যেমন সমসাময়িক মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে প্রাধান্য দিয়েছেন, ঠিক তেমনই ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে সকলকে নিয়ে জাতীয় ঐক্যের পথ শিখিয়েছেন। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তাঁর ওই তত্ত্বে আত্মনির্ভরশীল জাতি গঠনের জন্য নিরক্ষরতামুক্ত শিক্ষিত জাতির কথা বলেছেন। একটি দেশের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের আত্মসম্মান ও আত্মমর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার যাবতীয় উপকরণ ছিল তাঁর সেই ১৯ দফায়।

বাংলাদেশকে একটি আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যখন অক্লান্ত পরিশ্রম করছেন, বিশ্বে দ্রুত অগ্রসরমান দেশ হিসেবে যখন বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই দেশি-বিদেশি চক্রান্তের অংশ হিসেবে মাত্র ৪৫ বছর বয়সে ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সেনাবাহিনীর কিছু বিপথগামী সদস্যের নির্মম বুলেটে প্রাণ হারান বাংলাদেশের ইতিহাসের ক্ষণজন্মা এই রাষ্ট্রনায়ক।

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর ১৯৮২ সালে দেশ ও গণতন্ত্রের অপরিহার্য প্রয়োজনে দলের হাল ধরেন তাঁরই সহধর্মিণী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। সাধারণ গৃহবধূ থেকে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দলের প্রধান এবং বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন তিনি। সে সময় বিএনপি অভ্যন্তরীণ ও জাতীয় সংকট মোকাবিলায় অনেকটা বেসামাল ছিল। তবে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া তাঁর আপসহীন নেতৃত্ব এবং সীমাহীন ধৈর্য ও প্রজ্ঞা দিয়ে দলটিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যান প্রবহমান নদীর মতো। সামরিক শাসক এরশাদবিরোধী আন্দোলনে তিনি পরিচিতি লাভ করেন ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে।

এ বিষয়ে গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ তাঁর ‘সময়-অসময়’ বইয়ের বিষয়ে বিবিসি বাংলাকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ক্ষমতার বলয়ের ভেতরে থেকে বিএনপি তৈরি করলেও পরবর্তীতে বেগম খালেদা জিয়া রাজনৈতিক দল হিসেবে সেটি এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “সেভাবে এটি রাজনৈতিক দল ছিল না, যেভাবে রাজনৈতিক দল তৈরি হয় আমাদের দেশে। বিএনপির রাজনৈতিক দল হিসেবে গড়ে ওঠা এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময়, খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে। আজকে আমরা যে বিএনপি দেখি, যদিও সেটার আইকন জিয়াউর রহমান, কিন্তু দলটাকে এ পর্যায়ে এনেছেন খালেদা জিয়া।”

প্রতিষ্ঠার পর নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে গিয়েছে বিএনপি। দেশীয় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ যেমন দলটিকে নিঃশেষ করতে চেয়েছে, তেমনি বিদেশি শক্তিও কখনো কখনো দলটির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছে। মধ্যপন্থার উদারনৈতিক এই দলটি অতি অল্প সময়ে দেশের মানুষের অকুণ্ঠ সমর্থন লাভ করায় বারবারই চক্রান্তের শিকার হয়েছে। যদিও সকল ষড়যন্ত্র-চক্রান্তের জাল ছিন্ন করেই দুর্বার গতিতে বিএনপি এগিয়ে চলেছে।
বিশেষ করে কুখ্যাত ওয়ান-ইলেভেন সরকার দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব, সাবেক তিনবারের সফল প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও তাঁর পুত্র তারেক রহমানকে মাইনাস করার অপচেষ্টা করে। আদালতকে ব্যবহার করে ফ্যাসিবাদী দল আওয়ামী লীগও বারবার বিএনপিকে ধ্বংসের পাঁয়তারা করেছে। তারা ভেবেছিল, জেল-জুলুম আর নির্যাতন করে বিএনপিকে এদেশের রাজনীতি থেকে মুছে ফেলবে। কিন্তু সেটি হয়নি। বরং ঘাত-প্রতিঘাতে দলটি হয়েছে আরও জনপ্রিয়, আরও সুসংগঠিত। দুর্দিনে-দুঃসময়ে দলটির লাখ লাখ নেতাকর্মীই বরং বিএনপিকে আগলে রেখেছে। নিজেরা জেল-জুলুম, হামলা-মামলা আর রাজনৈতিক সংঘাত সয়ে রাজপথে টিকিয়ে রেখেছে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হাতে গড়া বিএনপিকে।

চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে বিএনপির অবদান অপরিসীম। হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে লাগাতার সংগ্রামরত দলটির লাখ লাখ নেতাকর্মী মধ্য জুলাই থেকে রাজপথে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হন। দেশনায়ক তারেক রহমানের নির্দেশে সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিলেমিশে একটি ফ্যাসিস্ট রেজিমের পতন ঘটাতে বিএনপির নেতাকর্মীদের যে ত্যাগ, তা এ দেশের মুক্তিকামী মানুষ আজীবন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। দলটির শত শত নেতাকর্মীর আত্মাহুতি আর ত্যাগ চব্বিশের গণবিপ্লবকে করেছে মহিমান্বিত।

প্রতিষ্ঠার প্রায় ৫ দশকে এ দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র-ভোটাধিকারসহ উন্নয়নের কথা বলে গণমানুষের মুখপাত্র হিসেবে বিএনপি নিজেকে প্রমাণ করেছে। দেশের ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের প্রতিটি কানায় কানায় এই দলটির কর্মী-সমর্থকে পরিপূর্ণ। ছাব্বিশের নির্বাচনে দলটির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা যেন দলটি প্রতিষ্ঠার সময় প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। দেশের প্রয়োজন এবং মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের যে মহান ব্রত নিয়ে বিএনপির যাত্রা শুরু হয়েছিল, আজ তারই পবিত্র উত্তরাধিকার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্ব যেন সেই পথেরই পথিক। রাষ্ট্র সংস্কারে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রণীত ৩১ দফা বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে বিএনপি সরকার।

ফ্যাসিবাদমুক্ত দেশে রাষ্ট্র ও জনগণের ভাগ্যোন্নয়নে বিএনপি যদি এগুলো বাস্তবায়নে সফল হয়, তাহলে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে বহুদূর। ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই দিনে দলটির জন্য থাকল অফুরন্ত শুভকামনা।

• অধ্যাপক ড. মোর্শেদ হাসান খান, অধ্যাপক, মার্কেটিং বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে দুর্বার গতিতে ছুটে চলেছে বিএনপি

আপডেট সময় : ০৫:৫১:২৯ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় গণমুখী রাজনৈতিক শক্তি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল—বিএনপি এখন রাষ্ট্রক্ষমতায়। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে একটি অবাধ, নিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর নির্বাচনে ভূমিধস বিজয়ের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় এসেছে দলটি। যদিও বিএনপির বর্তমান নেতৃত্ব একে ক্ষমতা না বলে বরং বলছেন দায়িত্ব। অর্থাৎ দেশের জনগণের শান্তি-নিরাপত্তা, সুখ-সমৃদ্ধি ও সুশাসন নিশ্চিত করার পবিত্র দায়িত্ব এখন বিএনপি সরকারের ওপর। যেই দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত, ভঙ্গুর ও দুর্নীতিগ্রস্ত দেশকে টেনে তোলার দুঃসাহসিক দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে যিনি রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছিলেন। এরপর রাষ্ট্র গঠনে তাঁর নিরন্তর ছুটে চলা, নিরলস শ্রম আর নিঃসীম স্বপ্ন তাঁকে অমরত্ব দান করে। পৃথিবীর ইতিহাসে যার স্থান হয় ক্ষণজন্মা অথচ ভিশনারী লিডার হিসেবে।

পঁচাত্তরের পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর সৃষ্টি হয় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি। রাজধানীর রমনা রেস্তোরাঁয় সেদিন এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ঘোষণাপত্র পাঠ ছাড়াও প্রায় দুই ঘণ্টা সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন। প্রতিষ্ঠাকালে দলের অন্যতম সৌন্দর্য ছিল ডানপন্থী, বামপন্থী, মধ্যপন্থী সবার অংশগ্রহণ। সেদিন তিনি দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছিলেন, বাস্তবিকপক্ষে জাতীয় প্রয়োজনের জন্যই নতুন দল করা হচ্ছে, এই দল জাতিকে দৃঢ় করবে এবং দেশ ও দেশের মানুষকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।

প্রেসিডেন্ট জিয়া সে সময় বলেন, ১৯৭১ সালে আমরা স্বাধীনতা এনেছি। অনেকে তখন মনে করেছেন, এই স্বাধীনতার প্রয়োজন নেই। কিন্তু স্বাধীনতার মাধ্যমেই অর্থনৈতিক মুক্তি অর্জন করা সম্ভব। বাংলাদেশের যে বিপুল জাতীয় সম্পদ রয়েছে, তার সদ্ব্যবহার করলে অল্প সময়ের মধ্যে দেশকে উন্নতির পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যাবে। এই বিশ্বাস নিয়েই আমরা স্বাধীনতাযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম। আমি দেখেছি, হাজার হাজার নর-নারী দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন দিয়েছেন। তাঁদের ভুললে চলবে না, প্রশ্ন করতে হবে কেন তাঁরা প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলেন। তাঁদের আস্থা ছিল, দেশ স্বাধীন হলে তাঁরা শান্তিতে বসবাস করতে পারবেন। তাঁদের সে স্বপ্ন বাস্তবায়ন করাই নতুন দলের অঙ্গীকার।
প্রেসিডেন্ট জিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, জাতীয়তাবাদী দলের প্রধান লক্ষ্য ছিল স্বাধীনতার অঙ্গীকার, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা, বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে জাতীয় ঐক্য এবং জনগণের মধ্যে স্বনির্ভরতার চেতনা সৃষ্টি। ১৯ দফা কর্মসূচি ছিল দলের মূল আদর্শ। রাষ্ট্রনীতির চারটি মৌলিক আদর্শ তথা গণতন্ত্র, সর্বশক্তিমান আল্লাহর উপর অবিচল আস্থা ও বিশ্বাস, জাতীয়তাবাদ এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক ন্যায়বিচার অর্থে সমাজতন্ত্র, এই ছিল দলীয় কর্মসূচির মর্মবাণী।

এ বিষয়ে বিশিষ্ট রাজনীতি গবেষক ও লেখক মহিউদ্দিন আহমদ তাঁর ‘সময়-অসময়’ গ্রন্থের ফ্ল্যাপের অংশেই কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা লিখেছেন। তাঁর মতে, ‘বিএনপির জন্ম সেনাছাউনিতে, একজন সেনা নায়কের হাতে, যখন তিনি ছিলেন ক্ষমতার কেন্দ্রে। এ ধরনের রাজনৈতিক দল ক্ষমতার বৃত্ত থেকে ছিটকে পড়লে সাধারণত হারিয়ে যায়। বিএনপি এদিক থেকে ব্যতিক্রম। দলটি শুধু টিকেই যায়নি, ভোটের রাজনীতিতে বিকল্প শক্তি হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। দেশে গণতন্ত্র আছে কিনা, বিএনপিতেও গণতন্ত্রের চর্চা হয় কিনা, তা নিয়ে চায়ের পেয়ালায় ঝড় তোলা যায়। কিন্তু দলটি দেশের জনগোষ্ঠীর বড় একটা অংশের প্রতিনিধিত্ব করে, এটা অস্বীকার করার জো নেই।’

১৯ দফা ছিল শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ঘোষণা করা রাষ্ট্রের মুক্তির দিকনির্দেশনাবলী। এক কথায় বলা যেতে পারে, সমসাময়িক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্র গঠনে মনোযোগ ফিরিয়ে আনেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এই ১৯ দফা প্রণয়নের মাধ্যমে। তিনি তাঁর রাজনৈতিক দর্শনে যেমন শাসনতন্ত্রের মূলনীতি—গণতন্ত্রের পথ দেখিয়েছেন, ঠিক তেমনি সমাজতন্ত্রের ভালো যে দিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের কথা, সেটিও বলেছেন। তিনি সমাজব্যবস্থার সকল উত্তম দিকের সমন্বয়ে একটা স্বাধীন, অখণ্ড ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের স্বপ্নের বাস্তবিক প্রয়োগ দেখিয়েছিলেন। এই ১৯ দফায় রাষ্ট্রকে তিনি যেমন সমসাময়িক মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে প্রাধান্য দিয়েছেন, ঠিক তেমনই ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে সকলকে নিয়ে জাতীয় ঐক্যের পথ শিখিয়েছেন। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান তাঁর ওই তত্ত্বে আত্মনির্ভরশীল জাতি গঠনের জন্য নিরক্ষরতামুক্ত শিক্ষিত জাতির কথা বলেছেন। একটি দেশের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের আত্মসম্মান ও আত্মমর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার যাবতীয় উপকরণ ছিল তাঁর সেই ১৯ দফায়।

বাংলাদেশকে একটি আধুনিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান যখন অক্লান্ত পরিশ্রম করছেন, বিশ্বে দ্রুত অগ্রসরমান দেশ হিসেবে যখন বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই দেশি-বিদেশি চক্রান্তের অংশ হিসেবে মাত্র ৪৫ বছর বয়সে ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সেনাবাহিনীর কিছু বিপথগামী সদস্যের নির্মম বুলেটে প্রাণ হারান বাংলাদেশের ইতিহাসের ক্ষণজন্মা এই রাষ্ট্রনায়ক।

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদাতের পর ১৯৮২ সালে দেশ ও গণতন্ত্রের অপরিহার্য প্রয়োজনে দলের হাল ধরেন তাঁরই সহধর্মিণী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। সাধারণ গৃহবধূ থেকে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দলের প্রধান এবং বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন তিনি। সে সময় বিএনপি অভ্যন্তরীণ ও জাতীয় সংকট মোকাবিলায় অনেকটা বেসামাল ছিল। তবে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া তাঁর আপসহীন নেতৃত্ব এবং সীমাহীন ধৈর্য ও প্রজ্ঞা দিয়ে দলটিকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যান প্রবহমান নদীর মতো। সামরিক শাসক এরশাদবিরোধী আন্দোলনে তিনি পরিচিতি লাভ করেন ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে।

এ বিষয়ে গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ তাঁর ‘সময়-অসময়’ বইয়ের বিষয়ে বিবিসি বাংলাকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ক্ষমতার বলয়ের ভেতরে থেকে বিএনপি তৈরি করলেও পরবর্তীতে বেগম খালেদা জিয়া রাজনৈতিক দল হিসেবে সেটি এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “সেভাবে এটি রাজনৈতিক দল ছিল না, যেভাবে রাজনৈতিক দল তৈরি হয় আমাদের দেশে। বিএনপির রাজনৈতিক দল হিসেবে গড়ে ওঠা এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময়, খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে। আজকে আমরা যে বিএনপি দেখি, যদিও সেটার আইকন জিয়াউর রহমান, কিন্তু দলটাকে এ পর্যায়ে এনেছেন খালেদা জিয়া।”

প্রতিষ্ঠার পর নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে গিয়েছে বিএনপি। দেশীয় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ যেমন দলটিকে নিঃশেষ করতে চেয়েছে, তেমনি বিদেশি শক্তিও কখনো কখনো দলটির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছে। মধ্যপন্থার উদারনৈতিক এই দলটি অতি অল্প সময়ে দেশের মানুষের অকুণ্ঠ সমর্থন লাভ করায় বারবারই চক্রান্তের শিকার হয়েছে। যদিও সকল ষড়যন্ত্র-চক্রান্তের জাল ছিন্ন করেই দুর্বার গতিতে বিএনপি এগিয়ে চলেছে।
বিশেষ করে কুখ্যাত ওয়ান-ইলেভেন সরকার দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব, সাবেক তিনবারের সফল প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও তাঁর পুত্র তারেক রহমানকে মাইনাস করার অপচেষ্টা করে। আদালতকে ব্যবহার করে ফ্যাসিবাদী দল আওয়ামী লীগও বারবার বিএনপিকে ধ্বংসের পাঁয়তারা করেছে। তারা ভেবেছিল, জেল-জুলুম আর নির্যাতন করে বিএনপিকে এদেশের রাজনীতি থেকে মুছে ফেলবে। কিন্তু সেটি হয়নি। বরং ঘাত-প্রতিঘাতে দলটি হয়েছে আরও জনপ্রিয়, আরও সুসংগঠিত। দুর্দিনে-দুঃসময়ে দলটির লাখ লাখ নেতাকর্মীই বরং বিএনপিকে আগলে রেখেছে। নিজেরা জেল-জুলুম, হামলা-মামলা আর রাজনৈতিক সংঘাত সয়ে রাজপথে টিকিয়ে রেখেছে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হাতে গড়া বিএনপিকে।

চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে বিএনপির অবদান অপরিসীম। হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে লাগাতার সংগ্রামরত দলটির লাখ লাখ নেতাকর্মী মধ্য জুলাই থেকে রাজপথে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হন। দেশনায়ক তারেক রহমানের নির্দেশে সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিলেমিশে একটি ফ্যাসিস্ট রেজিমের পতন ঘটাতে বিএনপির নেতাকর্মীদের যে ত্যাগ, তা এ দেশের মুক্তিকামী মানুষ আজীবন শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে। দলটির শত শত নেতাকর্মীর আত্মাহুতি আর ত্যাগ চব্বিশের গণবিপ্লবকে করেছে মহিমান্বিত।

প্রতিষ্ঠার প্রায় ৫ দশকে এ দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র-ভোটাধিকারসহ উন্নয়নের কথা বলে গণমানুষের মুখপাত্র হিসেবে বিএনপি নিজেকে প্রমাণ করেছে। দেশের ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের প্রতিটি কানায় কানায় এই দলটির কর্মী-সমর্থকে পরিপূর্ণ। ছাব্বিশের নির্বাচনে দলটির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা যেন দলটি প্রতিষ্ঠার সময় প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। দেশের প্রয়োজন এবং মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের যে মহান ব্রত নিয়ে বিএনপির যাত্রা শুরু হয়েছিল, আজ তারই পবিত্র উত্তরাধিকার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্ব যেন সেই পথেরই পথিক। রাষ্ট্র সংস্কারে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রণীত ৩১ দফা বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে বিএনপি সরকার।

ফ্যাসিবাদমুক্ত দেশে রাষ্ট্র ও জনগণের ভাগ্যোন্নয়নে বিএনপি যদি এগুলো বাস্তবায়নে সফল হয়, তাহলে বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে বহুদূর। ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই দিনে দলটির জন্য থাকল অফুরন্ত শুভকামনা।

• অধ্যাপক ড. মোর্শেদ হাসান খান, অধ্যাপক, মার্কেটিং বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।