রোগীর অ্যাম্বুলেন্সের চালক সিভিল সার্জনের গাড়িতে, ৯ মাস ধরে সংকটে জুড়ীর জরুরি সেবা
- আপডেট সময় : ০৪:০৭:৫৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬
- / 51
মুমূর্ষু রোগীর জীবন বাঁচাতে যে অ্যাম্বুলেন্স ছুটে যাওয়ার কথা হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে, সেই অ্যাম্বুলেন্সের চালক এখন ব্যস্ত সিভিল সার্জনের সরকারি গাড়ি চালাতে। ফলে প্রায় নয় মাস ধরে চালক সংকটে পড়ে আছে মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একমাত্র সরকারি অ্যাম্বুলেন্স। জরুরি মুহূর্তে রোগী স্থানান্তরের ক্ষেত্রে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন রোগীর স্বজনরা। বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত টাকা খরচ করে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স কিংবা বিকল্প যানবাহনের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
এমন অভিযোগ উঠেছে মৌলভীবাজারের সিভিল সার্জন ডা. মো. মামুনুর রহমানের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি স্বাস্থ্যসেবার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি যানবাহনের চালককে নিজের সরকারি গাড়ি চালানোর কাজে ব্যবহার করছেন তিনি। শুধু অ্যাম্বুলেন্স চালক ব্যবহারের অভিযোগই নয়, তার বিরুদ্ধে বদলি বাণিজ্য, সরকারি টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক অনিয়ম ও অসদাচরণসহ একাধিক গুরুতর অভিযোগ তুলেছে ‘স্বাস্থ্য সচেতন নাগরিক ফোরাম’।
সংগঠনটির দাবি, এসব অভিযোগের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং জেলা প্রশাসকের কার্যালয়সহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে জুড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সরকারি অ্যাম্বুলেন্স চালককে সিভিল সার্জনের গাড়ি চালানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়। এরপর থেকেই চালক সংকটে পড়ে উপজেলার একমাত্র সরকারি অ্যাম্বুলেন্সটি।

স্বাস্থ্য বিভাগের নিয়ম অনুযায়ী, উপজেলা পর্যায়ের সরকারি অ্যাম্বুলেন্স সংকটাপন্ন রোগীদের দ্রুত উন্নত চিকিৎসার জন্য জেলা সদর কিংবা বিশেষায়িত হাসপাতালে স্থানান্তরের কাজে ব্যবহারের কথা। কিন্তু চালকের অভাবে জুড়ীর এই গুরুত্বপূর্ণ সেবাটি কার্যত বাধাগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি অ্যাম্বুলেন্স থাকা সত্ত্বেও সেটি সময়মতো না পাওয়ায় দরিদ্র রোগীদেরও বাধ্য হয়ে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করতে হচ্ছে। এতে চিকিৎসার পাশাপাশি বাড়তি পরিবহন খরচের বোঝা চাপছে সাধারণ মানুষের ওপর।
জুড়ীর বাসিন্দা কালাম নামে এক রোগীর স্বজন বলেন, “সরকারি অ্যাম্বুলেন্স থাকলেও চালক না থাকায় আমরা সেটির সুবিধা পাচ্ছি না। জরুরি রোগী নিয়ে বেসরকারি অ্যাম্বুলেন্স নিতে হচ্ছে। এতে বাড়তি টাকা খরচ হচ্ছে, যা দরিদ্র পরিবারের জন্য অনেক কষ্টকর।”
অ্যাম্বুলেন্স চালককে সিভিল সার্জনের গাড়িতে ব্যবহারের বিষয়ে জানতে চাইলে ডা. মো. মামুনুর রহমান বলেন, “জুড়ীতে অ্যাম্বুলেন্সের সার্ভিস কম, প্রয়োজনও কম। তাই পছন্দ করে নিয়ে আসছি। সিভিল সার্জনের গাড়ি তো বন্ধ থাকতে পারে না। আমি না চললে সব উপজেলা বন্ধ হয়ে যাবে, সব উপজেলার সার্ভিস বন্ধ হয়ে যাবে।”
তবে তার এ বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা। তাদের প্রশ্ন, একজন কর্মকর্তার সরকারি গাড়ির সুবিধা নিশ্চিত করা কি মুমূর্ষু রোগীর জরুরি চিকিৎসা পরিবহনের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ?
জুড়ী প্রেসক্লাবের সাংগঠনিক সম্পাদক মনিরুল ইসলাম বলেন, “একজন কর্মকর্তার গাড়ি চালানোর জন্য যদি রোগী বহনের অ্যাম্বুলেন্সের চালক সরিয়ে নেওয়া হয়, তাহলে জরুরি সময়ে রোগীদের সেবা দেবে কে? মানুষের জীবন রক্ষার বিষয়টি সবার আগে গুরুত্ব পাওয়া উচিত।”
এদিকে ‘স্বাস্থ্য সচেতন নাগরিক ফোরাম’র অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, জেলার বিভিন্ন সরকারি টেন্ডার একটি নির্দিষ্ট সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। সুবিধাভোগী ও নামসর্বস্ব ঠিকাদারের মাধ্যমে আর্থিক অনিয়ম, আউটসোর্সিং জনবল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ঘুষ গ্রহণ এবং কর্মীদের বেতন থেকে অর্থ কর্তনের অভিযোগও রয়েছে।
সংগঠনটির অভিযোগে আরও দাবি করা হয়েছে, সিভিল সার্জন কার্যালয়ের একটি কক্ষ ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারের পাশাপাশি সেখানে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়ে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে। সরকারি বিভিন্ন কর্মসূচিতেও দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার অভিযোগ তোলা হয়েছে তার বিরুদ্ধে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্বাস্থ্য বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, “টাকা ছাড়া কোনো কাজ হয় না। টাকা দিলে কাজ হয়, না দিলে বিভিন্নভাবে হয়রানির শিকার হতে হয়।”
শ্রীমঙ্গলের সাংবাদিক মো. এহসানুল হক বলেন, “কোনো অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি ‘দেখছি’, ‘দেখবো’, ‘ব্যবস্থা নেবো’-এ ধরনের কথা বলে বিষয়গুলো এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।”
অভিযোগগুলোর বিষয়ে জানতে চাইলে সিভিল সার্জন ডা. মো. মামুনুর রহমান বলেন, “কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে তো আমি খারাপ হিসেবে বিবেচিত হবো।” নিজের আচরণ সম্পর্কে তিনি দাবি করেন, “মৌলভীবাজারে এ যাবত যত সিভিল সার্জন এসেছেন, তাদের মধ্যে সবচেয়ে ভদ্র ও রুচিশীল কর্মকর্তা আমি।”
তবে অভিযোগের অন্যান্য বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি অসুস্থতার কথা বলে দ্রুত কার্যালয় ত্যাগ করেন।
এ বিষয়ে সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. মাহবুবুল আলম বলেন, “সিভিল সার্জনের কথাগুলো একদম অপেশাদারিত্ব। একজন সিভিল সার্জনের কাছ থেকে এ ধরনের বক্তব্য কাম্য নয়। জনগণের সেবা সবার আগে, আগে জনগণ পরে কর্মচারী। বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

























