ক্ষোভে ফুঁসছেন সাধারণ জনগণ
সুজানগর ইউনিয়ন পরিষদে নাগরিক সেবায় চরম ভোগান্তি
- আপডেট সময় : ০১:৩৬:৫৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬
- / 173
মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার ৯ নং সুজানগর ইউনিয়ন পরিষদে প্রয়োজনীয় নাগরিক সেবা পেতে দীর্ঘদিন ধরে চরম ভোগান্তির অভিযোগ উঠেছে। জন্মনিবন্ধন সংশোধন, নাগরিক সনদ, বিভিন্ন প্রত্যয়নপত্র ও অন্যান্য প্রশাসনিক সেবা নিতে গিয়ে প্রতিদিনই হয়রানির শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। সেবাপ্রার্থীদের অভিযোগ, দিনের পর দিন ইউনিয়ন পরিষদে ঘুরেও কাঙ্ক্ষিত সেবা না পেয়ে তারা সময়, অর্থ ও শ্রম-তিন দিক থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, ইউনিয়ন পরিষদে গেলেই প্রায়শই ‘সার্ভার ডাউন’ থাকার কথা বলে আবেদন গ্রহণ বা নিষ্পত্তি বিলম্বিত করা হয়। আবার আবেদন জমা দেওয়ার পরও সপ্তাহের পর সপ্তাহ কোনো অগ্রগতি দেখা যায় না। অনেক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা সচিবের অনুপস্থিতির অজুহাতে সেবাগ্রহীতাদের বারবার ফিরে যেতে বাধ্য করা হচ্ছে। ফলে পাসপোর্ট আবেদন, জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য সংশোধন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি, চাকরির আবেদন এবং বিদেশগমনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম অনিশ্চয়তায় পড়ছে।
সম্প্রতি এক ভুক্তভোগী জন্মনিবন্ধনের ডিজিটাল কপি সংগ্রহ করতে গিয়ে দেখতে পান, তাঁর এনালগ নিবন্ধনে নাম ও ঠিকানা সঠিক থাকলেও ডিজিটাল ডাটাবেজে ঠিকানা ভুল এবং নামের শেষ অংশে ‘হোসেন’-এর পরিবর্তে ‘আহমেদ’ যুক্ত হয়েছে। ভুলটি সংশোধনের জন্য তিনি একাধিকবার ইউনিয়ন পরিষদে গেলেও কখনো সার্ভার সমস্যার কথা, আবার কখনো দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার অনুপস্থিতির কারণ দেখিয়ে তাঁকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
তিনি জানান, বিদেশ-সংক্রান্ত জরুরি প্রক্রিয়ার জন্য সংশোধিত জন্মনিবন্ধন অত্যাবশ্যক হলেও দীর্ঘসূত্রতা ও প্রশাসনিক জটিলতায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করতে না পারায় তাঁর বিদেশযাত্রা এখন অনিশ্চয়তার মুখে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ইউনিয়ন পরিষদের সচিবের দায়িত্বে থাকা মিহির কান্তি দাসকে নিয়মিত অফিসে পাওয়া যায় না। গুরুত্বপূর্ণ নথিতে স্বাক্ষরের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। আবার চেয়ারম্যানের অনুপস্থিতির কারণেও অনেক সাধারণ প্রশাসনিক কাজ দিনের পর দিন ঝুলে থাকে। এতে ইউনিয়ন পরিষদের সেবা কার্যক্রম নিয়ে জনমনে হতাশা বাড়ছে। পাশাপাশি কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগও করেছেন একাধিক সেবাপ্রার্থী।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, ইউনিয়ন পরিষদ হচ্ছে সরকারের সবচেয়ে নিকটবর্তী সেবাকেন্দ্র। কিন্তু সেই প্রতিষ্ঠানেই যদি সাধারণ মানুষ হয়রানির শিকার হন, তবে স্থানীয় সরকারের প্রতি জনগণের আস্থা ক্ষুণ্ন হওয়াই স্বাভাবিক। নাগরিকদের অভিযোগ, একটি সাধারণ সনদ বা জন্মনিবন্ধন সংশোধনের জন্য বারবার ইউনিয়ন পরিষদে যেতে হচ্ছে, অথচ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সেবা পাওয়ার কোনো নিশ্চয়তা নেই। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন দরিদ্র, প্রান্তিক ও গ্রামের সহজ-সরল মানুষ।
এ বিষয়ে ৯ নম্বর সুজানগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বদরুল ইসলাম এবং সচিবের দায়িত্বে থাকা মিহির কান্তি দাসের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁদের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয়দের দাবি, ইউনিয়ন পরিষদের সার্বিক সেবা কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় সরকার বিভাগের পক্ষ থেকে দ্রুত তদন্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে জন্মনিবন্ধনসহ অন্যান্য নাগরিক সেবা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নিশ্চিত করতে কার্যকর নজরদারি, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়মিত উপস্থিতি এবং সেবাপ্রার্থীদের প্রতি পেশাদার ও মানবিক আচরণ নিশ্চিত করার জোর দাবি জানিয়েছেন তারা।
বিশ্লেষকদের মতে, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার মূল শক্তি হলো জনগণের দোরগোড়ায় দ্রুত ও কার্যকর সেবা পৌঁছে দেওয়া। কিন্তু সেবাপ্রাপ্তি যদি বারবার বিলম্ব, অনিয়ম ও প্রশাসনিক অদক্ষতার কারণে বাধাগ্রস্ত হয়, তবে এর প্রভাব শুধু একজন নাগরিকের ব্যক্তিগত দুর্ভোগেই সীমাবদ্ধ থাকে না বরং সরকারি সেবা ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ও বিশ্বাসও প্রশ্নের মুখে পড়ে। তাই অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি সেবা ব্যবস্থাকে আধুনিক, জবাবদিহিমূলক ও নাগরিকবান্ধব করে তোলাই এখন সময়ের দাবি।






















