প্রবাসে সম্প্রীতি, ঐক্য ও শেকড়ের বন্ধন অটুট রাখার প্রত্যয়
নিউইয়র্কে বড়লেখা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সমিতির বার্ষিক বনভোজন অনুষ্ঠিত
- আপডেট সময় : ১০:৫১:৩২ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬
- / 48
যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বড়লেখাবাসীর অন্যতম সামাজিক সংগঠন বড়লেখা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সমিতি ইউএসএ ইনক-এর উদ্যোগে বার্ষিক বনভোজন-২০২৬ উৎসবমুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত ২৬ জুলাই (রবিবার) নিউইয়র্ক সিটির মনোরম অ্যাস্টোরিয়া পার্কে আয়োজিত দিনব্যাপী এ মিলনমেলায় অংশ নেন শতাধিক প্রবাসী বড়লেখাবাসী ও তাদের পরিবার-পরিজন। প্রবাসের কর্মব্যস্ত জীবনের একঘেয়েমি ভুলে একদিনের এই আয়োজন পরিণত হয় আনন্দ, সম্প্রীতি, পারিবারিক বন্ধন এবং শেকড়ের টানে এক প্রাণবন্ত মিলনোৎসবে।
সকাল থেকেই শিশু-কিশোর, তরুণ, প্রবীণসহ বিভিন্ন বয়সী প্রবাসীরা পরিবার-পরিজন নিয়ে বনভোজনস্থলে সমবেত হন। দীর্ঘদিন পর পরিচিত মুখগুলোর সঙ্গে কুশল বিনিময়, আড্ডা, স্মৃতিচারণ এবং নতুন প্রজন্মের পরিচয়পর্বে প্রাণ ফিরে পায় পুরো আয়োজন। পার্কজুড়ে ছিল উৎসবের আমেজ, হাসি-আনন্দ আর মিলনমেলার উচ্ছ্বাস।
দিনব্যাপী আয়োজনে ছিল শিশু, নারী ও পুরুষদের জন্য পৃথক খেলাধুলা ও বিনোদনমূলক নানা প্রতিযোগিতা। দৌড়, বল নিক্ষেপ, মিউজিক্যাল চেয়ারসহ বিভিন্ন ইভেন্টে অংশ নিয়ে শিশু-কিশোরদের উচ্ছ্বাস আর অভিভাবকদের উৎসাহ অনুষ্ঠানকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। খেলাধুলায় বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করা হয়, যা অংশগ্রহণকারীদের আনন্দকে আরও বাড়িয়ে দেয়।

বনভোজনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল দেশীয় ঐতিহ্যের স্বাদে সমৃদ্ধ মধ্যাহ্নভোজ। নানা ধরনের সুস্বাদু বাঙালি খাবার পরিবেশন করা হয় অতিথিদের জন্য। একসঙ্গে বসে মধ্যাহ্নভোজ গ্রহণের মধ্য দিয়ে প্রবাসের মাটিতে যেন ফিরে আসে দেশের পারিবারিক উৎসবের আবহ। খাবারের টেবিল ঘিরে প্রাণখোলা আলাপ, হাস্যরস আর আন্তরিকতায় দিনটি হয়ে ওঠে আরও স্মরণীয়।
বনভোজন উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন সমিতির সভাপতি মো. আব্দুল জব্বার। অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে আলোচনায় অংশ নেন জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশন অব নিউইয়র্ক-এর সাধারণ সম্পাদক মইনুল ইসলাম, মৌলভীবাজার ডিস্ট্রিক্ট অ্যাসোসিয়েশন-এর সভাপতি ফজলুর রহমান, সাবেক ছাত্রনেতা অ্যাডভোকেট সিরাজুল ইসলাম, নাসির উদ্দীন, সমিতির সাবেক সভাপতি আব্দুল খালিক, সায়ের আহমদ, সমিতির উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম, তখন আলী, সিরাজ উদ্দিন, পংকি মিয়া, ময়েজ উদ্দিন, ফয়েজ আহমদ, সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. আজাদ হোসেন, এম শাহিনুল ইসলাম, সুহেল উদ্দিন।
আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, ভৌগোলিক দূরত্ব মানুষকে জন্মভূমি থেকে দূরে রাখলেও হৃদয়ের টান কখনো কমে না। প্রবাসে বসবাসরত নতুন প্রজন্মের কাছে বড়লেখার ইতিহাস, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও সামাজিক মূল্যবোধ তুলে ধরতে এ ধরনের আয়োজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে এটি প্রবাসী সমাজে পারস্পরিক সহযোগিতা, সম্প্রীতি, ভ্রাতৃত্ববোধ ও সামাজিক বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করে।
বক্তারা আরও বলেন, বড়লেখা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সমিতি ইউএসএ ইনক দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসী বড়লেখাবাসীর সুখ-দুঃখে পাশে থেকে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মানবিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছে। সংগঠনটি শুধু প্রবাসীদের পারস্পরিক যোগাযোগের সেতুবন্ধনই নয়, বরং মাতৃভূমির সঙ্গে আবেগের সম্পর্ক অটুট রাখার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ভবিষ্যতেও ঐক্য, সহযোগিতা, মানবিক মূল্যবোধ ও সামাজিক দায়বদ্ধতাকে সামনে রেখে সংগঠনের কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন বক্তারা।

পুরো আয়োজন নিয়ে সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. আজাদ হোসেন বলেন, “প্রবাসে হাজারো ব্যস্ততার মাঝেও আমরা যেন আমাদের শেকড়, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়কে ভুলে না যাই সেই লক্ষ্য নিয়েই বড়লেখা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সমিতি ইউএসএ ইনক-এই মিলনমেলার আয়োজন করেছে। বার্ষিক বনভোজন আমাদের কাছে শুধু একটি আনন্দ আয়োজন নয় বরং এটি প্রবাসে বসবাসরত বড়লেখাবাসীর হৃদয়ের মিলন, পারস্পরিক ভালোবাসা, সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধকে আরও সুদৃঢ় করার এক অনন্য উপলক্ষ।
আজকের এই প্রাণবন্ত আয়োজন প্রমাণ করেছে, ভৌগোলিক দূরত্ব যতই হোক না কেন, বড়লেখার মানুষ এখনো একে অপরের সুখ-দুঃখের সাথী। শিশু-কিশোরদের হাসি, প্রবীণদের আন্তরিক সৌহার্দ্য, খেলাধুলার উচ্ছ্বাস, একসঙ্গে মধ্যাহ্নভোজ এবং সাংস্কৃতিক পরিবেশনা-সব মিলিয়ে যেন প্রবাসের মাটিতে এক টুকরো বড়লেখার আবহ তৈরি হয়েছে।
এ আয়োজন সফল করতে যাঁরা পরিকল্পনা, শ্রম ও সময় দিয়েছেন, পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন এবং পরিবার-পরিজন নিয়ে উপস্থিত থেকে অনুষ্ঠানকে প্রাণবন্ত করে তুলেছেন, তাঁদের প্রত্যেকের প্রতি সমিতির পক্ষ থেকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই। আমরা বিশ্বাস করি, এ ধরনের আয়োজন শুধু প্রবাসীদের মধ্যে সম্পর্ককে গভীর করে না, নতুন প্রজন্মের মাঝেও নিজেদের শেকড়, ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতি ভালোবাসা জাগিয়ে তোলে। ভবিষ্যতেও বৃহত্তর ঐক্য, মানবিক মূল্যবোধ ও সামাজিক দায়বদ্ধতাকে ধারণ করে আরও ব্যাপক পরিসরে এমন মিলনমেলার আয়োজন অব্যাহত থাকবে।”

আলোচনা সভা শেষে অনুষ্ঠিত হয় বহুল প্রতীক্ষিত র্যাফেল ড্র। পরে প্রবাসী শিল্পী ও সংগঠনের সদস্যদের অংশগ্রহণে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশিত হয়। দেশাত্মবোধক গান, লোকসংগীত ও জনপ্রিয় বাংলা গানের পরিবেশনায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো বনভোজন প্রাঙ্গণ। শিশু-কিশোর থেকে প্রবীণ-সব বয়সী অংশগ্রহণকারীদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি সাংস্কৃতিক আয়োজনকে আরও বর্ণিল করে তোলে।
দিনব্যাপী খেলাধুলা, সুস্বাদু মধ্যাহ্নভোজ, প্রাণবন্ত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, পারিবারিক মিলন এবং আন্তরিক সৌহার্দ্যের আবহে সফলভাবে সম্পন্ন হয় বড়লেখা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সমিতি ইউএসএ ইনক-এর বার্ষিক বনভোজন-২০২৬। অংশগ্রহণকারী প্রবাসীরা বলেন, এমন আয়োজন শুধু বিনোদনের নয়, বরং প্রবাসে বেড়ে ওঠা নতুন প্রজন্মকে নিজেদের শেকড়, সংস্কৃতি ও পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত রাখার একটি কার্যকর মাধ্যম। তারা ভবিষ্যতেও আরও বৃহৎ পরিসরে এ ধরনের মিলনমেলার আয়োজন নিয়মিত অব্যাহত রাখার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।





















