‘বাজেট’ শব্দটি কীভাবে এল, আয়-ব্যয়ের হিসাবের বাইরেও যা জানা জরুরি
- আপডেট সময় : ০৭:২২:২৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৯ জুন ২০২৬
- / 29
‘বাজেট’ শব্দটি এসেছে ফরাসি শব্দ ‘বুজেট’ থেকে, যার অর্থ ছিল ছোট চামড়ার থলি বা অর্থ রাখার ব্যাগ। মধ্যযুগে এই শব্দ ফরাসি থেকে ইংরেজি ভাষায় প্রবেশ করে। পরবর্তীতে ব্রিটেনে অর্থমন্ত্রী যখন সংসদে রাজকোষের আয়-ব্যয়ের পরিকল্পনা উপস্থাপন করতেন, তখন তিনি সেই নথিপত্র একটি চামড়ার ব্যাগে বহন করতেন। সংসদে এসে তিনি ব্যাগটি খুলে আর্থিক পরিকল্পনা প্রকাশ করতেন। এ থেকেই ‘ওপেনিং দা বাজেট’ বা ‘বাজেট উন্মোচন’ কথাটির জন্ম।
ধীরে ধীরে ব্যাগের পরিবর্তে ব্যাগে থাকা আর্থিক পরিকল্পনাকেই বাজেট বলা শুরু হয়। সেই ব্যাগ খুলে আর্থিক পরিকল্পনা উপস্থাপনের প্রথা থেকেই ধীরে ধীরে ‘বাজেট’ শব্দটি রাষ্ট্রের আয়-ব্যয়ের পরিকল্পনা অর্থে ব্যবহৃত হতে শুরু করে।
বর্তমানে বাজেট বলতে বোঝায় একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য আয় ও ব্যয়ের পরিকল্পনা। রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে প্রতি বছর সরকার যে হিসাব করে—আগামী অর্থবছরে কত টাকা আয় করবে এবং সেই অর্থ কোন কোন খাতে ব্যয় করবে—সেই পরিকল্পনাকেই জাতীয় বাজেট বলা হয়। সহজভাবে বললে, একটি দেশের অর্থনৈতিক রোডম্যাপ হলো বাজেট। সাধারণত সরকার আগে সম্ভাব্য ব্যয়ের হিসাব নির্ধারণ করে, এরপর সেই ব্যয় মেটাতে আয়ের উৎসগুলো চিহ্নিত করে।
সরকার আয় করে কীভাবে
সরকারের আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস হলো কর বা ট্যাক্স। আমরা যখন বাজার থেকে কোনো পণ্য কিনি, রেস্টুরেন্টে খাই, মোবাইল ফোনে রিচার্জ করি কিংবা বিভিন্ন সেবা গ্রহণ করি, তখন যে অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ করি তার একটি অংশ সরকারের কোষাগারে জমা হয়। এই করের অন্যতম প্রধান ধরন হলো ভ্যাট বা মূল্য সংযোজন কর।
এ ছাড়া নির্দিষ্ট সীমার বেশি আয় করলে ব্যক্তিকে আয়কর দিতে হয়। ভ্যাট, আয়কর এবং অন্যান্য কর থেকে যে অর্থ সংগ্রহ করা হয়, সেটিকে বলা হয় রাজস্ব আয়।
তবে সরকারের আয় শুধু করের ওপর নির্ভরশীল নয়। আমদানি ও রপ্তানি পণ্যের ওপর আরোপিত শুল্ক, বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের মুনাফা, ফি ও চার্জ, বিদেশি অনুদান এবং দেশি-বিদেশি ঋণ থেকেও সরকার অর্থ সংগ্রহ করে।
সরকার খরচ করে কোথায়
সরকারের ব্যয় সাধারণত দুই ধরনের।
প্রথমত, নিয়মিত বা পরিচালন ব্যয়। এর মধ্যে রয়েছে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, অফিস পরিচালনার খরচ, বিদ্যুৎ-পানি বিল, প্রশাসনিক ব্যয় ইত্যাদি।
দ্বিতীয়ত, উন্নয়ন ব্যয়। দেশের অবকাঠামো ও জনসেবার মান উন্নয়নের জন্য যে অর্থ ব্যয় করা হয়, তা এই খাতের অন্তর্ভুক্ত। যেমন—সড়ক, সেতু, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিদ্যুৎকেন্দ্র বা অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্প নির্মাণ। এসব উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য যে বার্ষিক পরিকল্পনা নেওয়া হয়, সেটিকে বলা হয় বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপি।
ঘাটতি বাজেট কী
সব সময় সরকারের আয় ও ব্যয় সমান হয় না। অনেক ক্ষেত্রে ব্যয়ের পরিমাণ আয়ের চেয়ে বেশি হয়। তখন তাকে বলা হয় ঘাটতি বাজেট।
এই ঘাটতি পূরণ করতে সরকার দেশীয় ব্যাংক, সঞ্চয়পত্র বা বিদেশি উন্নয়ন সংস্থা ও বিভিন্ন দেশের কাছ থেকে ঋণ গ্রহণ করে। অনেক সময় বিদেশি অনুদানও এ ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
বাজেট আলোচনায় বহুল ব্যবহৃত কিছু শব্দ
ভর্তুকি
কোনো পণ্য বা সেবার প্রকৃত মূল্যের একটি অংশ সরকার নিজে বহন করলে তাকে ভর্তুকি বলা হয়। এর ফলে জনগণ কম দামে সেই পণ্য বা সেবা কিনতে পারে। উদাহরণ হিসেবে কৃষকদের জন্য সারের দাম কম রাখা হয়, কারণ এর একটি অংশ সরকার পরিশোধ করে।
ঘাটতি
আয় ও ব্যয়ের মধ্যে যে পার্থক্য তৈরি হয়, তাকে ঘাটতি বলা হয়। যখন ব্যয়ের পরিমাণ আয়ের চেয়ে বেশি হয়, তখন ঘাটতি সৃষ্টি হয়।
উন্নয়ন বাজেট
দেশের অবকাঠামো, জনসেবা ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য যে অর্থ বরাদ্দ করা হয়, তাকে উন্নয়ন বাজেট বলা হয়। রাস্তা, সেতু, বিদ্যুৎ প্রকল্প, হাসপাতাল বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণ সাধারণত এই বাজেটের আওতায় পড়ে।
রাজস্ব বাজেট
সরকারের দৈনন্দিন প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য যে ব্যয় নির্ধারণ করা হয়, সেটিই রাজস্ব বাজেট। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন, অফিস পরিচালনা ব্যয় এবং অন্যান্য নিয়মিত খরচ এই বাজেটের অংশ।
সামাজিক নিরাপত্তা খাত
সমাজের ঝুঁকিপূর্ণ ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য সরকারের সহায়তামূলক কর্মসূচিগুলো এই খাতের অন্তর্ভুক্ত। যেমন—বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, মুক্তিযোদ্ধা ভাতা এবং বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি।
মূল্যস্ফীতি
যখন একই পরিমাণ টাকা দিয়ে আগের তুলনায় কম পণ্য বা সেবা কেনা যায়, তখন তাকে মূল্যস্ফীতি বলা হয়। অর্থাৎ পণ্যের দাম বেড়ে গেলে টাকার ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। বাজারে পণ্যের সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্য নষ্ট হলে কিংবা অর্থ সরবরাহ অতিরিক্ত বেড়ে গেলে মুদ্রাস্ফীতি দেখা দিতে পারে। বাজেটের প্রভাব নিয়ে আলোচনায় এই বিষয়টি প্রায়ই গুরুত্ব পায়।
অপর্যাপ্ত বরাদ্দ
কোনো খাতে প্রয়োজনের তুলনায় খুব কম অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হলে তাকে অপর্যাপ্ত বরাদ্দ বলা হয়। এতে সংশ্লিষ্ট খাতের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
উৎস কর
আয় বা লেনদেনের সময় সরাসরি কেটে রাখা করকে উৎস কর বলা হয়। উদাহরণ হিসেবে অনেক প্রতিষ্ঠানে কর্মচারীদের বেতন দেওয়ার আগেই নির্ধারিত কর কেটে রাখা হয়।
আবগারি শুল্ক
দেশের অভ্যন্তরে উৎপাদিত বা নির্দিষ্ট কিছু পণ্য ও সেবার ওপর আরোপিত করকে আবগারি শুল্ক বলা হয়। এটি সরকারের রাজস্ব আয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস।

























