পরিবহন সংকটে উত্তাল মৌলভীবাজার, আলোচনার টেবিলে দুই জেলার শীর্ষ নেতা
- আপডেট সময় : ০৭:১০:২২ অপরাহ্ন, রবিবার, ৯ নভেম্বর ২০২৫
- / 153
হবিগঞ্জ মোটর মালিক সমিতির এক নেতার মৌলভীবাজার জেলাকে বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করার হুমকির প্রতিবাদে ফুঁসে উঠেছে মৌলভীবাজারবাসী। গত ৭ নভেম্বর থেকে চলমান এই উত্তেজনা রোববার (৯ নভেম্বর) গণঅবস্থান কর্মসূচির মধ্য দিয়ে আরও তীব্র রূপ নেয়।
দুপুরে মৌলভীবাজার শহরের ঢাকা বাসস্ট্যান্ডে অনুষ্ঠিত এ গণঅবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নেন জেলা বাস-মিনিবাস মালিক সমিতি, পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়ন, অটোরিকশা চালক সমিতি, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এবং সর্বস্তরের মানুষ। কর্মসূচিতে বক্তব্য দেন জেলা পরিবহন শ্রমিক নেতা রফিকুল ইসলাম রসিক, জেলা অটোরিকশা সমিতির সাধারণ সম্পাদক আজিজুল হক সেলিম, কুলাউড়া বাস মালিক সমিতির সভাপতি আব্দুর রহিম আনছার, মৌলভীবাজার জেলা বাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রব, জেলা মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের সভাপতি তোফায়েল আহমেদ তোয়েল ও সাধারণ সম্পাদক মো. আনোয়ার মিয়াসহ অনেকে।
গত ১ নভেম্বর মৌলভীবাজারে শ্রীমঙ্গল–মৌলভীবাজার–সিলেট রুটে বিরতিহীন বাস সার্ভিসের উদ্বোধন করেন সাবেক এমপি এম নাসের রহমান। ওইদিন হবিগঞ্জ–সিলেট রুটে এক সড়ক দুর্ঘটনায় তিনজন মারা যান। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে নাসের রহমান বলেন, হবিগঞ্জ রুটে দীর্ঘদিন ধরে ফিটনেসবিহীন পুরোনো গাড়ি চলাচলের কারণে দুর্ঘটনা বাড়ছে। তাই এসব গাড়ি এ রুটে না চালানোর আহ্বান জানাই।
তার এই মন্তব্যের জেরে হবিগঞ্জ মোটর মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবু মঈন চৌধুরী সোহেল সংবাদ সম্মেলনে মৌলভীবাজারকে “বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ার” হুমকি দেন। এই বক্তব্য ছড়িয়ে পড়লে ক্ষোভে ফেটে পড়ে মৌলভীবাজারের পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলো। রোববার সকাল ১১টায় শহরের বেরিরপার এলাকায় সড়ক অবরোধ ও গণঅবস্থান কর্মসূচি পালন করা হয়, যা পরে দুই জেলার নেতাদের আলোচনায় বসার আশ্বাসে স্থগিত করা হয়।

পরিস্থিতি সামাল দিতে হবিগঞ্জ পৌরসভার সাবেক মেয়র ও বিএনপির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আলহাজ্ব জি কে গউছ যোগাযোগ করেন মৌলভীবাজার পৌরসভার সাবেক মেয়র ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ফয়জুল করিম ময়ূন এবং জেলা বাস-মিনিবাস মালিক সমিতির সভাপতি ও জেলা বিএনপির সদস্য সচিব আব্দুর রহিম রিপনের সঙ্গে।
অবস্থান কর্মসূচিতে ফয়জুল করিম ময়ূন বলেন, আইন অনুযায়ী হবিগঞ্জের গাড়ি মৌলভীবাজারে যাবে, মৌলভীবাজারের গাড়ি হবিগঞ্জে যাবে—এটাই নিয়ম। কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। উত্তেজনা নয়, আলোচনার মাধ্যমেই সব সমস্যার সমাধান হবে। তিনি আরও বলেন, মৌলভীবাজারবাসী ধৈর্য ধরুন, আমরা আলোচনায় সফলতার পথে এগিয়ে আছি। আজ সন্ধ্যায় জি কে গউছ আমাদের সঙ্গে আলোচনায় বসবেন।
জেলা বাস-মিনিবাস মালিক সমিতির সভাপতি আব্দুর রহিম রিপন বলেন, আজকের অবস্থান চলাকালে জি কে গউছ জানিয়েছেন—বিষয়টি যেন আর না বাড়ে। আমরা কটূক্তির জবাবে শান্তির বার্তা দিতে চাই। তিনি আরও বলেন, “মৌলভীবাজারবাসী ঐতিহ্যগতভাবে সম্প্রীতির মানুষ। কেউ আমাদের প্রতি কাদা ছুঁড়লে আমরা জবাবে বলি—আপনি কি হাতে ব্যথা পেয়েছেন? এটাই আমাদের সংস্কৃতি ও ধৈর্য। আমরা হানাহানিমুক্ত, শান্তিপ্রিয় মানুষ। কেউ কাউকে বিচ্ছিন্ন করবে না, কেউ কাউকে আন্ডারমাইনও করবে না।
রিপন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানিমূলক পোস্ট নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, দেশে-বিদেশে অনেকে সাইবার যুদ্ধ শুরু করেছেন, কিন্তু এটি মৌলভীবাজারের সংস্কৃতি নয়। আমরা সম্প্রীতির মানুষ—শান্তির বার্তাই দিতে চাই।
গণঅবস্থান কর্মসূচিতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, শিক্ষার্থী, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। বক্তারা বলেন, “মৌলভীবাজারের মর্যাদাহানি কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না। জেলার সম্মান ও ঐতিহ্য রক্ষায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।” তারা আরও বলেন, “মৌলভীবাজার একটি ঐতিহ্যবাহী ও সংস্কৃতিমণ্ডিত জেলা। এর মর্যাদা ও সুনাম রক্ষায় যেকোনো অপচেষ্টার বিরুদ্ধে আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলব।
বক্তারা একসঙ্গে ঘোষণা দেন, মৌলভীবাজারকে হুমকি দেওয়া মানে বাংলাদেশের ঐক্যে আঘাত। এমন উসকানি আর সহ্য করা হবে না।


























