একই স্থানে প্রায় ২০০ প্রজাপতি প্রজাতির বিস্ময়যাত্রা
মাধবকুণ্ড জলপ্রপাত : রঙিন ডানাদের স্বর্গরাজ্য
- আপডেট সময় : ০৫:৩৫:৩৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২৬ নভেম্বর ২০২৫
- / 201
বৈজ্ঞানিকভাবে প্রজাপতি একটি পোকা হলেও সাধারণ মানুষের কাছে তারা যেন কোনোভাবেই বিরক্তিকর বা ক্ষতিকর প্রাণী নয়। কারণ প্রজাপতির রঙিন ডানা আর নানান নকশার সমাহার তাদের উড়াউড়িকে রঙিন নৃত্যের মতো করে তোলে। তারা সম্পূর্ণ নিরীহ কামড়ায় না, দংশন করে না, রোগ ছড়ায় না। বরং প্রকৃতিকে সুন্দর করে এবং মানুষের মনে এনে দেয় প্রশান্তি। পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্রেও প্রজাপতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা খাদ্যজালের অংশ, উদ্ভিদের পরাগায়নে সহায়তা করে এবং পরিবেশগত পরিবর্তনের সূচক হিসেবেও কাজ করে। আবহাওয়া, তাপমাত্রা বা আর্দ্রতার সামান্য পরিবর্তনও তাদের আচরণ, সংখ্যা ও বৈচিত্র্যে দ্রুত প্রভাব ফেলে।
![]()
প্রজাপতিতে সমৃদ্ধ এলাকায় মাধবকুণ্ড ইকোপার্ক একটি অনন্য নাম। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মনোয়ার হোসেনের ২০২৩ সালের গবেষণা অনুযায়ী দেশে মোট ৪২১টি প্রজাপতি প্রজাতি রয়েছে। এর মধ্যে মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার মাধবকুণ্ড ইকোপার্কে আশ্চর্যজনকভাবে প্রায় ২০০ প্রজাতির প্রজাপতির দেখা মেলে যা বাংলাদেশের মোট প্রজাতির প্রায় ৫০ শতাংশ। ২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে প্রজাপতির ছবি সংগ্রহের লক্ষ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে এখন পর্যন্ত আমি ২৭০ প্রজাতির প্রজাপতির ছবি তুলেছি, যার মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রজাতি দেখেছি মাধবকুণ্ডেই। প্রায় প্রতিবারই এখানে ৮০–১০০ প্রজাতির প্রজাপতি চোখে পড়ে। এখন পর্যন্ত আমার ব্যক্তিগত নথিতে রয়েছে মাধবকুণ্ড থেকে দেখা ১৬০ প্রজাতি, আর অন্যান্যদের নথিভুক্ত প্রজাতি যুক্ত করলে সংখ্যা প্রায় ২০০।

প্রতিবছরই মাধবকুণ্ড থেকে নতুন নতুন প্রজাতির প্রজাপতির সন্ধান মেলে। দেশের জন্য নতুন দুইটি প্রজাতি খুঁজে পাওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছে—২০২৩ সালের ডিসেম্বরে Pithauria marsena (Banded Straw Ace) এবং ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে Celaenorrhinus nigricans (Small Banded Flat)। এই আবিষ্কারগুলো দেশের প্রজাপতি তালিকায় নতুন সংযোজন এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

মাধবকুণ্ডে প্রজাপতির এত বৈচিত্র্যের পেছনে প্রধান দুটি কারণ হলো—উদ্ভিদের বৈচিত্র্যতা এবং মিঠাপানির ছড়া। প্রজাপতির জীবনচক্র (ডিম, লার্ভা, পিউপা, পূর্ণাঙ্গ প্রজাপতি) নির্ভর করে হোস্ট উদ্ভিদের উপর। বেশিরভাগ প্রজাপতি নির্দিষ্ট উদ্ভিদে ডিম দেয় এবং শুঁয়োপোকা সেই পাতাই খেয়ে বেঁচে থাকে। হোস্ট উদ্ভিদ না থাকলে তাদের জীবনচক্র সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ে। উদ্ভিদবিজ্ঞানী খন্দকার কামরুল ইসলামের ২০২২ সালের জরিপে দেখা যায়, মাধবকুণ্ডে রয়েছে প্রায় ২১৭ প্রজাতির গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভিদ যা প্রজাপতির জন্য স্বর্গসম পরিবেশ তৈরি করে।

এর পাশাপাশি প্রজাপতির ‘Puddling’ বা কাদা চোষণের আচরণও এখানে তাদের আকর্ষণ করে। মাধবকুণ্ড ঝর্ণার পানি বালি-পাথরের ছড়া বেয়ে নেমে অসংখ্য আর্দ্র স্থান তৈরি করে। প্রজাপতিরা এসব ভেজা জায়গা থেকে পানি ও খনিজ লবণ শোষণ করে যা তাদের শক্তি, প্রজনন এবং দেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তাই মাধবকুণ্ডের উদ্ভিদবৈচিত্র্য ও মিঠাপানির প্রবাহ প্রজাপতির জন্য আদর্শ আবাসস্থল।

কিন্তু দুঃখজনকভাবে, পর্যটকদের আকর্ষণ বাড়াতে অবকাঠামো নির্মাণ ও অযত্নের কারণে মাধবকুণ্ডের প্রাকৃতিক আবাসস্থল দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ২০২৩ সালের তুলনায় বর্তমানে পরিস্থিতি আরও খারাপ বলে মনে হয়। উদ্ভিদ ধ্বংস, আর্দ্র স্থান কমে যাওয়া এবং অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণের ফলে প্রজাপতির সংখ্যাও দৃশ্যমানভাবে হ্রাস পাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে অনেক প্রজাতির হোস্ট উদ্ভিদ বিলুপ্ত হবে, খাদ্যজাল দুর্বল হবে, পাখি ও অন্যান্য কীটপতঙ্গও ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং পরিবেশের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হবে।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনের উচিত সংবেদনশীল এলাকায় অবকাঠামো নির্মাণ সীমিত রাখা, পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থা গ্রহণ, জীববৈচিত্র্য মনিটরিং চালু করা, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পুনরুদ্ধার করা এবং স্থানীয়দের সচেতনতা বৃদ্ধি করা। অন্যথায় মাধবকুণ্ডের এই রঙিন ডানাদের স্বর্গরাজ্য একদিন হারিয়ে যাবে যা হবে দেশের জীববৈচিত্র্যের জন্য নিঃসন্দেহে এক বড় ক্ষতি।
ষাটমাকন্ঠ/এএইচআর























