ঢেউ জয়ের গল্প
এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের প্রথম নারী সার্ফার ফাতিমা
- আপডেট সময় : ০৬:৪৯:০৫ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
- / 37
কক্সবাজারের লাবণী পয়েন্টে প্রতিদিন সমুদ্রের বিশাল ঢেউয়ের সঙ্গে লড়াই করেন একদল তরুণ-তরুণী। ছয় বছর আগে সেই ঢেউয়ের কাছেই এসেছিলেন ফাতিমা আক্তার। তবে তখন সার্ফিং শব্দটির সঙ্গেও পরিচিত ছিলেন না তিনি। বান্ধবীদের নিয়মিত সার্ফিং করতে দেখে তৈরি হয়েছিল কৌতূহল। সেই কৌতূহল থেকেই একদিন লুকিয়ে তাঁদের সঙ্গে চলে যান সমুদ্রে। আর সেই দিনের ছোট্ট সাহসী সিদ্ধান্তই ধীরে ধীরে বদলে দিয়েছে তাঁর জীবন।
আজ সেই ফাতিমাই বাংলাদেশের হয়ে এশিয়ান গেমসে সার্ফিংয়ে অংশ নিতে যাচ্ছেন। মাল্টি ইভেন্টের এই আসরে বাংলাদেশের প্রথম নারী সার্ফার হিসেবে অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েছেন কক্সবাজারের ১৬ বছর বয়সী এই তরুণী। তাঁর স্বপ্ন এখন দেশের পতাকা উড়িয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজের সক্ষমতা প্রমাণ করা।
ফাতিমার সার্ফিংয়ের শুরুটা অবশ্য ছিল ভয় আর অশ্রু দিয়ে। ক্লাস থ্রিতে পড়ার সময় প্রথমবার পানিতে নেমে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন তিনি। তখন সাঁতারও জানতেন না। পানিতে পড়ে সার্ফিং বোর্ডটি মাথার ওপর চলে এলে ভয়ে কেঁদে ফেলেন। কিন্তু বান্ধবীদের উৎসাহ তাঁকে আবারও পানিতে নামতে সাহস জোগায়।
ফাতিমা বলেন, ‘সার্ফিং সম্পর্কে তখন আমার কোনো ধারণাই ছিল না। কৌতূহল থেকেই বান্ধবীদের সঙ্গে প্রথমবার যাই। পানিতে নামার পর খুব ভয় পেয়েছিলাম। পরে ওদের উৎসাহেই আবার চেষ্টা করি।’
সার্ফিংয়ের পাশাপাশি ক্লাব থেকেই তাঁকে শেখানো হয় সাঁতার। ধীরে ধীরে কেটে যায় পানির ভয়। একসময় নিজেই বোর্ডে দাঁড়িয়ে ঢেউয়ের সঙ্গে পাল্লা দিতে শুরু করেন ফাতিমা। ভালো মানের একটি সার্ফিং বোর্ড পাওয়ার পর তাঁর আত্মবিশ্বাস আরও বেড়ে যায়। এরপর মাঝসমুদ্রে গিয়ে অনুশীলনও শুরু করেন নিয়মিত।
তবে সমুদ্রের ঢেউ জয় করলেও সামাজিক বাধা পেরোনো সহজ ছিল না। অনেকের নেতিবাচক মন্তব্যে একসময় তাঁর মা-ও মেয়েকে সার্ফিংয়ে যেতে দিতে চাইতেন না। এর সঙ্গে ছিল পারিবারিক আর্থিক সংকট। ছোটবেলাতেই বাবাকে হারিয়েছেন ফাতিমা। মা বাসাবাড়িতে কাজ করে সংসার চালান। তিন বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে সবার ছোট তিনি। সীমিত আয়ের সংসারে খেলাধুলার খরচ চালানো ছিল কঠিন।
একপর্যায়ে সার্ফিং ছেড়ে দেওয়ার কথাও ভেবেছিলেন ফাতিমা। সেই কঠিন সময়ে পাশে দাঁড়ান তাঁর কোচ রাশেদ আলম। তাঁর সহযোগিতায় আবারও নিয়মিত অনুশীলনে ফেরেন এই তরুণী।
ফাতিমা বলেন, ‘সংসারে আর্থিক চাপ ছিল। খেলাধুলার খরচ চালানোও কঠিন হয়ে পড়েছিল। একসময় সার্ফিং ছেড়ে দেওয়ার কথা ভাবছিলাম। তখন রাশেদ ভাই পাশে দাঁড়ান। তিনি আমার পড়াশোনা, অনুশীলনের খরচ এবং ক্লাবে যাতায়াতেও সহায়তা করেছেন।’
বাংলাদেশে সার্ফিংয়ের বড় চ্যালেঞ্জ প্রশিক্ষণের সীমাবদ্ধতা। উপকূলে সব সময় অনুকূল ঢেউ পাওয়া যায় না। ফলে নিয়মিত অনুশীলনের সুযোগও সীমিত। ফাতিমার মতে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সার্ফাররা যেখানে ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশে গিয়ে দীর্ঘ সময় প্রশিক্ষণ নেন, সেখানে বাংলাদেশের সার্ফারদের সুযোগ অনেক কম।
তিনি বলেন, ‘আমরা যদি অন্য দেশে গিয়ে নিয়মিত অনুশীলনের সুযোগ পেতাম, তাহলে আরও ভালো করতে পারতাম। এখানে কয়েক দিন ভালো ঢেউ পাওয়া গেলেও এরপর অনেক দিন অপেক্ষা করতে হয়।’
তবে প্রতিকূলতা থামাতে পারেনি ফাতিমাকে। সময়ের সঙ্গে বদলেছে তাঁর স্বপ্নের পরিধিও। এখন তাঁর লক্ষ্য শুধু নিজের সাফল্য নয়, দেশের আরও মেয়েদের সার্ফিংয়ে আগ্রহী করে তোলা।
ফাতিমা বলেন, ‘যখন সার্ফিং নিয়ে বড় স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছি, তখন আর এসব বাধা মনে রাখিনি। আমি চাই, বাংলাদেশে অন্য খেলাগুলোর মতো সার্ফিংকেও গুরুত্ব দেওয়া হোক এবং আরও অনেক মেয়ে এই খেলায় এগিয়ে আসুক।’
এবার সেই স্বপ্ন পূরণের পথে নতুন অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে ফাতিমার। জাপানে এশিয়ান গেমসের মঞ্চে বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে সার্ফিং করবেন তিনি। তাঁর এই যাত্রা শুধু ব্যক্তিগত অর্জন নয়, কক্সবাজারের উপকূলীয় এলাকার অসংখ্য মেয়ের জন্যও হতে পারে নতুন অনুপ্রেরণার গল্প।
ফাতিমার বিশ্বাস, তিনি এগিয়ে যেতে পারলে সমুদ্রের ঢেউ জয় করতে আরও অনেক মেয়েই সাহসী হয়ে উঠবে।















