১২:২৭ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৪ অগাস্ট ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম ::
Logo কৃতি শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা দিল সিলেটের বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ Logo মুরারিচাঁদ কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের অংশগ্রহণে চড়ুইভাতি Logo ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত Logo তৃণমূলে নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়াতে দলগুলোর নীতিতে পরিবর্তনের আহ্বান Logo বড়লেখায় মহিষকাণ্ডে যুবলীগ ও বিএনপি নেতাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে মামলা Logo বড়লেখায় শিক্ষার্থীদের নিয়ে অভিভাবক সমাবেশ Logo কুলাউড়ায় সাংবাদিকদের সঙ্গে স্বদেশমেইল সম্পাদক নজরুল ইসলাম খানের মতবিনিময় Logo জাতীয়তাবাদী পরিবারের উদ্যোগে দাসের বাজারে দুই শতাধিক এসএসসি উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীকে সংবর্ধনা Logo শ্রীমঙ্গলে প্রবাসীর বাসায় আগুন, পুড়ে ছাই দুই ঘর Logo প্রযুক্তি শিক্ষায় নতুন দিগন্ত, রাজধানীর বসিলায় হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়

প্লাস্টিকের ভেতর বিদ্যুৎ: শিরাকাওয়ার এক যুগান্তকারী আবিষ্কারের গল্প

শেখ ফয়সাল আহমদ
  • আপডেট সময় : ১০:০০:০৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২১ অগাস্ট ২০২৬
  • / 59
যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের সর্বশেষ খবর জানতে ভিজিট করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

বিজ্ঞানের ইতিহাসে সব বড় আবিষ্কার যে সুপরিকল্পিত গবেষণার পথ ধরেই এসেছে, তা নয়। কখনো কখনো ল্যাবরেটরির একটি ছোট্ট ভুলও খুলে দিয়েছে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার। তবে সেই ভুলের মধ্যে লুকিয়ে থাকা অজানা সত্যকে চিনে নেওয়ার জন্য প্রয়োজন বিজ্ঞানীর কৌতূহলী চোখ। এমনই এক ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ২০০০ সালে রসায়নে নোবেলজয়ী জাপানি বিজ্ঞানী হিদেকি শিরাকাওয়ার (Hideki Shirakawa) নাম।

আজকের ফ্লেক্সিবল ডিসপ্লে, অর্গানিক লাইট-এমিটিং ডায়োড (OLED), নমনীয় সৌরকোষ কিংবা নানা ধরনের পলিমারভিত্তিক ইলেকট্রনিক প্রযুক্তির পেছনে রয়েছে ‘পরিবাহী পলিমার’ বা কনডাক্টিং পলিমার নিয়ে যুগান্তকারী গবেষণা। একসময় প্লাস্টিককে কেবল বিদ্যুতের অপরিবাহী পদার্থ হিসেবেই ভাবা হতো। সেই ধারণা বদলে দিয়ে হিদেকি শিরাকাওয়া এবং তাঁর দুই সহ-গবেষক অ্যালান জি. ম্যাকডিয়ারমিড ও অ্যালান জে. হিগার দেখান, বিশেষ প্রক্রিয়ায় পলিমারও অত্যন্ত উচ্চমাত্রায় বিদ্যুৎ পরিবহন করতে পারে।

শৈশবের পাতায় লেখা ভবিষ্যৎ

শিরাকাওয়ার শৈশবের বড় একটি সময় কেটেছে জাপানের পাহাড় ও নদীবেষ্টিত ছোট শহর তাকায়ামায়। চারপাশের প্রকৃতি তাঁকে ছোটবেলা থেকেই আকৃষ্ট করত। প্রজাপতি, পোকামাকড় ও নানা ধরনের উদ্ভিদ সংগ্রহের মধ্য দিয়ে তাঁর মনে জন্ম নেয় প্রকৃতিকে জানার গভীর কৌতূহল। পাশাপাশি রেডিও তৈরি ও বিজ্ঞানের নানা বিষয় নিয়েও ছিল তাঁর প্রবল আগ্রহ।

জুনিয়র হাইস্কুলে পড়ার সময় একটি স্মৃতিগ্রন্থে নিজের ভবিষ্যৎ স্বপ্নের কথা লিখেছিলেন শিরাকাওয়া। সেখানে জানিয়েছিলেন, বড় হয়ে তিনি বিজ্ঞানী হতে চান এবং সাধারণ মানুষের কাজে লাগে- এমন প্লাস্টিক নিয়ে গবেষণা করতে চান।

কে জানত, কিশোর বয়সে লেখা সেই কয়েকটি লাইন একদিন সত্যি হয়ে উঠবে!

দীর্ঘ প্রায় ৪৫ বছর পর, ২০০০ সালে নোবেল পুরস্কারের জন্য তাঁর নাম ঘোষণার পরদিন জাপানের জাতীয় সংবাদপত্রগুলোতে প্রকাশিত হয় তাঁর সেই পুরোনো লেখার ছবি। শৈশবের স্বপ্ন আর জীবনের অর্জনের এমন আশ্চর্য মিল দেখে শিরাকাওয়া নিজেও বিস্মিত হয়েছিলেন।

ল্যাবের একটি ভুল, বদলে গেল গবেষণার পথ

টোকিও ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে পড়াশোনা শেষে ১৯৬৬ সালে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন শিরাকাওয়া। গবেষণার শুরুর দিকে তিনি জাইগলার-নাটা ক্যাটালিস্ট ব্যবহার করে পলিমার সংশ্লেষণ নিয়ে কাজ করছিলেন।

সে সময় পলিঅ্যাসিটিলিন সাধারণত কালো গুঁড়ো বা পাউডার আকারে পাওয়া যেত। কিন্তু ১৯৬৭ সালের শরতে ল্যাবরেটরিতে ঘটল এক অপ্রত্যাশিত ঘটনা।

একজন অতিথি গবেষক নির্দেশনা বুঝতে ভুল করে প্রয়োজনের তুলনায় প্রায় এক হাজার গুণ বেশি ঘনমাত্রার অনুঘটক ব্যবহার করে ফেলেন। ফলে বিক্রিয়াটি অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে ঘটে। সবাইকে অবাক করে দিয়ে কালো পাউডারের বদলে পাত্রের তরলের ওপর তৈরি হলো চকচকে রূপালি রঙের পাতলা পলিঅ্যাসিটিলিন ফিল্ম।

সাধারণ চোখে এটি ছিল একটি ব্যর্থ পরীক্ষা। কিন্তু শিরাকাওয়ার কাছে সেটিই হয়ে উঠল নতুন প্রশ্নের শুরু- পাউডারের বদলে এমন ফিল্ম তৈরি হলো কেন?

ভুলটিকে উপেক্ষা না করে তিনি সেটি নিয়ে বিস্তারিত পরীক্ষা শুরু করেন। পরে ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপে দেখা যায়, চকচকে ফিল্মটি আসলে অসংখ্য অতিক্ষুদ্র ফাইবারের সমষ্টি। পলিঅ্যাসিটিলিনকে নতুনভাবে বোঝার ক্ষেত্রে এই পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

রূপালি ফিল্ম থেকে বিদ্যুৎ পরিবাহী প্লাস্টিক

শিরাকাওয়ার তৈরি সেই রূপালি পলিঅ্যাসিটিলিন ফিল্ম পরে নজর কাড়ে মার্কিন রসায়নবিদ অ্যালান জি. ম্যাকডিয়ারমিডের। তিনি শিরাকাওয়াকে যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর গবেষণাগারে কাজ করার আমন্ত্রণ জানান।

সেখানেই শুরু হয় গবেষণার আরেক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

১৯৭৬ সালের ২৩ নভেম্বর গবেষক সি. কে. চিয়াং, অ্যালান জে. হিগার, অ্যালান ম্যাকডিয়ারমিড ও শিরাকাওয়ার গবেষণায় পলিঅ্যাসিটিলিনের বৈদ্যুতিক ধর্ম নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফল পাওয়া যায়। পলিঅ্যাসিটিলিনকে রাসায়নিকভাবে ‘ডোপিং’ করার পর দেখা যায়, এর বৈদ্যুতিক পরিবাহিতা নাটকীয়ভাবে বেড়ে গেছে।

এই আবিষ্কার বদলে দেয় পলিমার সম্পর্কে দীর্ঘদিনের ধারণা। যে প্লাস্টিককে এতদিন বিদ্যুতের অপরিবাহী হিসেবে দেখা হতো, বিশেষ রাসায়নিক পরিবর্তনের মাধ্যমে সেটিকেই অত্যন্ত পরিবাহী করে তোলা সম্ভব-এই উপলব্ধি খুলে দেয় কনডাক্টিং পলিমার গবেষণার নতুন দিগন্ত।

পলিমার ইলেকট্রনিক্সের নতুন যুগ

যুক্তরাষ্ট্রে গবেষণা শেষে জাপানে ফিরে শিরাকাওয়া ইউনিভার্সিটি অব সুকুবায় অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। সেখানে তিনি তরল ক্রিস্টাল ব্যবহার করে বিশেষ ধরনের হেলিক্যাল ও অরিয়েন্টেড পলিঅ্যাসিটিলিন ফিল্ম তৈরির গবেষণা করেন।

পরিবাহী পলিমার নিয়ে শিরাকাওয়া, ম্যাকডিয়ারমিড ও হিগারের কাজ পরবর্তী সময়ে পলিমার ইলেকট্রনিক্সের বিশাল গবেষণাক্ষেত্র তৈরিতে ভূমিকা রাখে। হালকা, নমনীয় ও সহজে প্রক্রিয়াজাতযোগ্য ইলেকট্রনিক উপাদান তৈরির সম্ভাবনা বিজ্ঞানীদের সামনে নতুনভাবে উন্মুক্ত হয়।

এই যুগান্তকারী অবদানের স্বীকৃতি আসে ২০০০ সালে। “পরিবাহী পলিমার আবিষ্কার ও উন্নয়নের জন্য” হিদেকি শিরাকাওয়া, অ্যালান জি. ম্যাকডিয়ারমিড এবং অ্যালান জে. হিগার যৌথভাবে রসায়নে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। একই সময়ে জাপানেও শিরাকাওয়া রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্মানে ভূষিত হন।

একটি ভুলের ভেতর লুকিয়ে থাকা সম্ভাবনা

২০০০ সালের মার্চে অধ্যাপনা থেকে অবসর নিলেও হিদেকি শিরাকাওয়ার গবেষণাজীবনের গল্প আজও তরুণ বিজ্ঞানীদের অনুপ্রাণিত করে।

তাঁর গল্প মনে করিয়ে দেয়, গবেষণাগারে প্রত্যাশিত ফল না পাওয়া মানেই সব সময় ব্যর্থতা নয়। কখনো একটি অস্বাভাবিক ফল, একটি ভুল হিসাব কিংবা একটি অনাকাঙ্ক্ষিত বিক্রিয়াই হতে পারে বড় আবিষ্কারের প্রথম সংকেত। প্রয়োজন শুধু সেই অস্বাভাবিকতার দিকে প্রশ্ন নিয়ে তাকানোর সাহস।

শৈশবের স্মৃতিগ্রন্থে সাধারণ মানুষের কাজে লাগবে এমন প্লাস্টিক নিয়ে গবেষণার স্বপ্ন দেখেছিলেন যে কিশোর, কয়েক দশক পর তিনিই প্লাস্টিকের বৈদ্যুতিক সম্ভাবনা উন্মোচনের জন্য দাঁড়ালেন নোবেলের মঞ্চে।

হিদেকি শিরাকাওয়ার জীবন তাই শুধু একটি বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের ইতিহাস নয়; এটি কৌতূহল, অধ্যবসায় এবং ভুলের মধ্যেও নতুন সম্ভাবনা খুঁজে পাওয়ার এক অনন্য গল্প।

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

প্লাস্টিকের ভেতর বিদ্যুৎ: শিরাকাওয়ার এক যুগান্তকারী আবিষ্কারের গল্প

আপডেট সময় : ১০:০০:০৬ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২১ অগাস্ট ২০২৬

বিজ্ঞানের ইতিহাসে সব বড় আবিষ্কার যে সুপরিকল্পিত গবেষণার পথ ধরেই এসেছে, তা নয়। কখনো কখনো ল্যাবরেটরির একটি ছোট্ট ভুলও খুলে দিয়েছে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার। তবে সেই ভুলের মধ্যে লুকিয়ে থাকা অজানা সত্যকে চিনে নেওয়ার জন্য প্রয়োজন বিজ্ঞানীর কৌতূহলী চোখ। এমনই এক ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ২০০০ সালে রসায়নে নোবেলজয়ী জাপানি বিজ্ঞানী হিদেকি শিরাকাওয়ার (Hideki Shirakawa) নাম।

আজকের ফ্লেক্সিবল ডিসপ্লে, অর্গানিক লাইট-এমিটিং ডায়োড (OLED), নমনীয় সৌরকোষ কিংবা নানা ধরনের পলিমারভিত্তিক ইলেকট্রনিক প্রযুক্তির পেছনে রয়েছে ‘পরিবাহী পলিমার’ বা কনডাক্টিং পলিমার নিয়ে যুগান্তকারী গবেষণা। একসময় প্লাস্টিককে কেবল বিদ্যুতের অপরিবাহী পদার্থ হিসেবেই ভাবা হতো। সেই ধারণা বদলে দিয়ে হিদেকি শিরাকাওয়া এবং তাঁর দুই সহ-গবেষক অ্যালান জি. ম্যাকডিয়ারমিড ও অ্যালান জে. হিগার দেখান, বিশেষ প্রক্রিয়ায় পলিমারও অত্যন্ত উচ্চমাত্রায় বিদ্যুৎ পরিবহন করতে পারে।

শৈশবের পাতায় লেখা ভবিষ্যৎ

শিরাকাওয়ার শৈশবের বড় একটি সময় কেটেছে জাপানের পাহাড় ও নদীবেষ্টিত ছোট শহর তাকায়ামায়। চারপাশের প্রকৃতি তাঁকে ছোটবেলা থেকেই আকৃষ্ট করত। প্রজাপতি, পোকামাকড় ও নানা ধরনের উদ্ভিদ সংগ্রহের মধ্য দিয়ে তাঁর মনে জন্ম নেয় প্রকৃতিকে জানার গভীর কৌতূহল। পাশাপাশি রেডিও তৈরি ও বিজ্ঞানের নানা বিষয় নিয়েও ছিল তাঁর প্রবল আগ্রহ।

জুনিয়র হাইস্কুলে পড়ার সময় একটি স্মৃতিগ্রন্থে নিজের ভবিষ্যৎ স্বপ্নের কথা লিখেছিলেন শিরাকাওয়া। সেখানে জানিয়েছিলেন, বড় হয়ে তিনি বিজ্ঞানী হতে চান এবং সাধারণ মানুষের কাজে লাগে- এমন প্লাস্টিক নিয়ে গবেষণা করতে চান।

কে জানত, কিশোর বয়সে লেখা সেই কয়েকটি লাইন একদিন সত্যি হয়ে উঠবে!

দীর্ঘ প্রায় ৪৫ বছর পর, ২০০০ সালে নোবেল পুরস্কারের জন্য তাঁর নাম ঘোষণার পরদিন জাপানের জাতীয় সংবাদপত্রগুলোতে প্রকাশিত হয় তাঁর সেই পুরোনো লেখার ছবি। শৈশবের স্বপ্ন আর জীবনের অর্জনের এমন আশ্চর্য মিল দেখে শিরাকাওয়া নিজেও বিস্মিত হয়েছিলেন।

ল্যাবের একটি ভুল, বদলে গেল গবেষণার পথ

টোকিও ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে পড়াশোনা শেষে ১৯৬৬ সালে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন শিরাকাওয়া। গবেষণার শুরুর দিকে তিনি জাইগলার-নাটা ক্যাটালিস্ট ব্যবহার করে পলিমার সংশ্লেষণ নিয়ে কাজ করছিলেন।

সে সময় পলিঅ্যাসিটিলিন সাধারণত কালো গুঁড়ো বা পাউডার আকারে পাওয়া যেত। কিন্তু ১৯৬৭ সালের শরতে ল্যাবরেটরিতে ঘটল এক অপ্রত্যাশিত ঘটনা।

একজন অতিথি গবেষক নির্দেশনা বুঝতে ভুল করে প্রয়োজনের তুলনায় প্রায় এক হাজার গুণ বেশি ঘনমাত্রার অনুঘটক ব্যবহার করে ফেলেন। ফলে বিক্রিয়াটি অস্বাভাবিক দ্রুতগতিতে ঘটে। সবাইকে অবাক করে দিয়ে কালো পাউডারের বদলে পাত্রের তরলের ওপর তৈরি হলো চকচকে রূপালি রঙের পাতলা পলিঅ্যাসিটিলিন ফিল্ম।

সাধারণ চোখে এটি ছিল একটি ব্যর্থ পরীক্ষা। কিন্তু শিরাকাওয়ার কাছে সেটিই হয়ে উঠল নতুন প্রশ্নের শুরু- পাউডারের বদলে এমন ফিল্ম তৈরি হলো কেন?

ভুলটিকে উপেক্ষা না করে তিনি সেটি নিয়ে বিস্তারিত পরীক্ষা শুরু করেন। পরে ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপে দেখা যায়, চকচকে ফিল্মটি আসলে অসংখ্য অতিক্ষুদ্র ফাইবারের সমষ্টি। পলিঅ্যাসিটিলিনকে নতুনভাবে বোঝার ক্ষেত্রে এই পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

রূপালি ফিল্ম থেকে বিদ্যুৎ পরিবাহী প্লাস্টিক

শিরাকাওয়ার তৈরি সেই রূপালি পলিঅ্যাসিটিলিন ফিল্ম পরে নজর কাড়ে মার্কিন রসায়নবিদ অ্যালান জি. ম্যাকডিয়ারমিডের। তিনি শিরাকাওয়াকে যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভেনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর গবেষণাগারে কাজ করার আমন্ত্রণ জানান।

সেখানেই শুরু হয় গবেষণার আরেক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।

১৯৭৬ সালের ২৩ নভেম্বর গবেষক সি. কে. চিয়াং, অ্যালান জে. হিগার, অ্যালান ম্যাকডিয়ারমিড ও শিরাকাওয়ার গবেষণায় পলিঅ্যাসিটিলিনের বৈদ্যুতিক ধর্ম নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফল পাওয়া যায়। পলিঅ্যাসিটিলিনকে রাসায়নিকভাবে ‘ডোপিং’ করার পর দেখা যায়, এর বৈদ্যুতিক পরিবাহিতা নাটকীয়ভাবে বেড়ে গেছে।

এই আবিষ্কার বদলে দেয় পলিমার সম্পর্কে দীর্ঘদিনের ধারণা। যে প্লাস্টিককে এতদিন বিদ্যুতের অপরিবাহী হিসেবে দেখা হতো, বিশেষ রাসায়নিক পরিবর্তনের মাধ্যমে সেটিকেই অত্যন্ত পরিবাহী করে তোলা সম্ভব-এই উপলব্ধি খুলে দেয় কনডাক্টিং পলিমার গবেষণার নতুন দিগন্ত।

পলিমার ইলেকট্রনিক্সের নতুন যুগ

যুক্তরাষ্ট্রে গবেষণা শেষে জাপানে ফিরে শিরাকাওয়া ইউনিভার্সিটি অব সুকুবায় অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। সেখানে তিনি তরল ক্রিস্টাল ব্যবহার করে বিশেষ ধরনের হেলিক্যাল ও অরিয়েন্টেড পলিঅ্যাসিটিলিন ফিল্ম তৈরির গবেষণা করেন।

পরিবাহী পলিমার নিয়ে শিরাকাওয়া, ম্যাকডিয়ারমিড ও হিগারের কাজ পরবর্তী সময়ে পলিমার ইলেকট্রনিক্সের বিশাল গবেষণাক্ষেত্র তৈরিতে ভূমিকা রাখে। হালকা, নমনীয় ও সহজে প্রক্রিয়াজাতযোগ্য ইলেকট্রনিক উপাদান তৈরির সম্ভাবনা বিজ্ঞানীদের সামনে নতুনভাবে উন্মুক্ত হয়।

এই যুগান্তকারী অবদানের স্বীকৃতি আসে ২০০০ সালে। “পরিবাহী পলিমার আবিষ্কার ও উন্নয়নের জন্য” হিদেকি শিরাকাওয়া, অ্যালান জি. ম্যাকডিয়ারমিড এবং অ্যালান জে. হিগার যৌথভাবে রসায়নে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। একই সময়ে জাপানেও শিরাকাওয়া রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্মানে ভূষিত হন।

একটি ভুলের ভেতর লুকিয়ে থাকা সম্ভাবনা

২০০০ সালের মার্চে অধ্যাপনা থেকে অবসর নিলেও হিদেকি শিরাকাওয়ার গবেষণাজীবনের গল্প আজও তরুণ বিজ্ঞানীদের অনুপ্রাণিত করে।

তাঁর গল্প মনে করিয়ে দেয়, গবেষণাগারে প্রত্যাশিত ফল না পাওয়া মানেই সব সময় ব্যর্থতা নয়। কখনো একটি অস্বাভাবিক ফল, একটি ভুল হিসাব কিংবা একটি অনাকাঙ্ক্ষিত বিক্রিয়াই হতে পারে বড় আবিষ্কারের প্রথম সংকেত। প্রয়োজন শুধু সেই অস্বাভাবিকতার দিকে প্রশ্ন নিয়ে তাকানোর সাহস।

শৈশবের স্মৃতিগ্রন্থে সাধারণ মানুষের কাজে লাগবে এমন প্লাস্টিক নিয়ে গবেষণার স্বপ্ন দেখেছিলেন যে কিশোর, কয়েক দশক পর তিনিই প্লাস্টিকের বৈদ্যুতিক সম্ভাবনা উন্মোচনের জন্য দাঁড়ালেন নোবেলের মঞ্চে।

হিদেকি শিরাকাওয়ার জীবন তাই শুধু একটি বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের ইতিহাস নয়; এটি কৌতূহল, অধ্যবসায় এবং ভুলের মধ্যেও নতুন সম্ভাবনা খুঁজে পাওয়ার এক অনন্য গল্প।