আজ মনসা দেবীর পূজা: মৌলভীবাজারের গ্রামাঞ্চল ও চা বাগানে ভক্তদের সমাগম
- আপডেট সময় : ০২:৪১:১২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৬
- / 70
বাংলা পঞ্জিকা অনুযায়ী আজ পহেলা ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ এবং ইংরেজি ১৮ আগস্ট ২০২৬, মঙ্গলবার। এ উপলক্ষে মৌলভীবাজারের গ্রামাঞ্চল ও চা বাগান এলাকায় ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও শ্রদ্ধার সঙ্গে পালিত হচ্ছে দেবী মনসার পূজা।
লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, সাপের কামড় থেকে রক্ষা পাওয়ার আশায় যুগ যুগ ধরে বাঙালি সমাজে দেবী মনসার আরাধনা চলে আসছে। এদিন অনেক পরিবারে মাটির সরায় দুধ-কলা নিবেদন করে দেবীর পূজা করা হয়। বিশেষ করে নারীরা সারাদিন উপবাস পালন করে পূজা শেষে শাগু, দুধ, কলাসহ বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে পূজা সম্পন্ন করার পর উপবাস ভঙ্গ করেন।
সমাজে মনসা পূজার প্রচলনের পেছনে রয়েছে প্রাচীন এক কিংবদন্তি কাহিনি। মনসামঙ্গল কাব্যধারার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হলেন দেবী মনসা। এই কাহিনির সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রাচীন ভারতের চম্পক নগরের ধনী ও প্রভাবশালী বণিক চাঁদ সদাগরের নাম। কবি বিপ্রদাস পিপলাই রচিত মনসামঙ্গল কাব্যে উল্লেখ রয়েছে, চাঁদ সদাগরের বাণিজ্যতরী সপ্তগ্রাম ও গঙ্গা-যমুনা-সরস্বতী নদীর মিলনস্থল ত্রিবেণী হয়ে সমুদ্রপথে যাত্রা করত।
কিংবদন্তি অনুযায়ী, চাঁদ সদাগর ছিলেন শিবের একনিষ্ঠ ভক্ত। দেবী মনসা তাঁর পূজা গ্রহণ করতে চাইলে চাঁদ তা প্রত্যাখ্যান করেন। মনসা বিভিন্নভাবে তাঁকে পূজা করতে বাধ্য করার চেষ্টা করলেও চাঁদ শিবপ্রদত্ত ‘মহাজ্ঞান’ মন্ত্রের মাধ্যমে তা প্রতিহত করেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে দেবী মনসা সর্পাঘাতে চাঁদ সদাগরের ছয় পুত্রের প্রাণহানি ঘটান।
পুত্রশোকে ভেঙে পড়লেও চাঁদ সদাগর পরবর্তীতে আবার বাণিজ্যে ফিরে যান। চম্পক নগরে ফিরে এসে তিনি নতুনভাবে জীবন শুরু করেন। এরপর তাঁর ঘরে জন্ম নেয় পুত্র লক্ষিন্দর। অন্যদিকে সয়াবেনের ঘরে জন্ম নেয় কন্যা বেহুলা। বড় হয়ে দুজনের বিবাহ স্থির হয়।
তবে বিবাহের সময় কোষ্ঠী মিলিয়ে জানা যায়, বাসর রাতেই সর্পাঘাতে লক্ষিন্দরের মৃত্যুর সম্ভাবনা রয়েছে। এ আশঙ্কায় চাঁদ সদাগর লোহার বাসরঘর নির্মাণ করেন। কিন্তু দেবী মনসার ইচ্ছায় একটি সাপ সেই বাসরঘরে প্রবেশ করে লক্ষিন্দরের প্রাণনাশ করে।
তৎকালীন প্রথা অনুযায়ী, সর্পদংশনে মৃত ব্যক্তিকে দাহ না করে কলার ভেলায় ভাসিয়ে দেওয়া হতো। বেহুলা তাঁর মৃত স্বামী লক্ষিন্দরের দেহ নিয়ে কলার ভেলায় যাত্রা শুরু করেন। দীর্ঘ ছয় মাস ধরে তিনি নদীপথে ভাসতে থাকেন এবং স্বামীর জীবন ফিরে পাওয়ার আশায় দেবী মনসার কাছে প্রার্থনা করতে থাকেন।
কিংবদন্তি অনুযায়ী, একপর্যায়ে বেহুলা মনসার সহচরী নেতার মাধ্যমে দেবীর কাছে পৌঁছান। মনসা তাঁকে শর্ত দেন, যদি তিনি তাঁর শ্বশুর চাঁদ সদাগরকে দিয়ে দেবীর পূজা করাতে পারেন, তবে লক্ষিন্দরের প্রাণ ফিরিয়ে দেওয়া হবে। বেহুলা সেই শর্ত গ্রহণ করেন এবং তাঁর অটুট বিশ্বাস ও ভালোবাসার কারণে লক্ষিন্দর পুনরায় জীবন ফিরে পান।
পরবর্তীতে বেহুলা চাঁদ সদাগরকে সব ঘটনা জানান। চাঁদ সদাগর শেষ পর্যন্ত মনসার পূজা করতে সম্মত হন। তবে দেবীর প্রতি অভিমান থেকে তিনি বাম হাতে মুখ ফিরিয়ে পূজা করেন। তাতেই দেবী মনসা সন্তুষ্ট হন এবং চাঁদ সদাগরের পরিবারে সুখ-শান্তি ফিরে আসে। মনসা তাঁর ছয় পুত্রকেও জীবন ফিরিয়ে দেন।
চাঁদ সদাগরের মতো একজন প্রভাবশালী বণিকের মাধ্যমে মনসা পূজার প্রচার বৃহত্তর সমাজে ছড়িয়ে পড়ে। সেই ঐতিহ্য ধরে আজও বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষ করে মৌলভীবাজারের গ্রামাঞ্চল ও চা বাগানগুলোতে ভক্তি ও শ্রদ্ধার সঙ্গে দেবী মনসার পূজা পালিত হচ্ছে। পূজাকে ঘিরে নারী-পুরুষসহ সকলের মধ্যে বিরাজ করছে উৎসবের আমেজ।


























