সাবেক স্পিকার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর ২৫তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ
- আপডেট সময় : ১১:৪৯:০৪ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১০ জুলাই ২০২৬
- / 66
জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার, বরেণ্য কূটনীতিক, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাবেক সভাপতি হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর ২৫তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ, ১০ জুলাই। ২০০১ সালের এই দিনে রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি ৭২ বছর বয়সে মারা যান। পরে তার মরদেহ সিলেটে আনা হলে হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারসংলগ্ন কবরস্থানে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়।
মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে পরিবারের সদস্য, বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং শুভানুধ্যায়ীরা তার কবরে শ্রদ্ধা নিবেদন, কোরআনখানি, মিলাদ ও দোয়া মাহফিলসহ বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করেছেন।
হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী ১৯২৮ সালের ১১ নভেম্বর সিলেট শহরের দরগা গেইট এলাকার ঐতিহ্যবাহী ‘রশিদ মঞ্জিল’-এ জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা আব্দুর রশিদ চৌধুরী ছিলেন অবিভক্ত ভারতের কেন্দ্রীয় আইনসভা (Central Legislative Assembly)-এর সদস্য এবং মাতা সিরাজুনন্নেসা চৌধুরী ছিলেন পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য। রাজনৈতিক ও শিক্ষিত পারিবারিক পরিবেশেই তার বেড়ে ওঠা।
শিক্ষাজীবনে তিনি সিলেট সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা ও তৎকালীন আসামে মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। পরে ভারতের আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৪৭ সালে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। উচ্চশিক্ষার অংশ হিসেবে যুক্তরাজ্যের ইনার টেম্পলের সদস্যপদ লাভ করেন এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, আইন ও কূটনীতি বিষয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।
১৯৫৩ সালে পাকিস্তান পররাষ্ট্র বিভাগে যোগদানের মাধ্যমে তার কূটনৈতিক জীবনের সূচনা হয়। কর্মজীবনে তিনি মস্কো, বেইজিং, আঙ্কারা, জাকার্তা ও নয়াদিল্লিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মিশনে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানের প্রতি আনুগত্য ত্যাগ করে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেন। নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ মিশনের প্রধান হিসেবে আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। ১৯৭১ সালের ৫ ডিসেম্বর ভারতের সংসদে দেওয়া তার ঐতিহাসিক বক্তব্য মুক্তিযুদ্ধের কূটনৈতিক ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয়।
স্বাধীনতার পর তিনি পশ্চিম জার্মানিতে বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে সুইজারল্যান্ড, অস্ট্রিয়া এবং ভ্যাটিকানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ছিলেন। এছাড়া তিনি পররাষ্ট্রসচিব ও পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন এবং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সুসংহত করতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন।
১৯৮৬ সালে (১৯৮৫ সালের অধিবেশনের জন্য নির্বাচিত) তিনি জাতিসংঘের ৪১তম সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এই পদে অধিষ্ঠিত হওয়া প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে তিনি বিশ্ব কূটনীতিতে দেশের মর্যাদা নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান। নিরস্ত্রীকরণ, আন্তর্জাতিক শান্তি, উন্নয়ন ও বহুপাক্ষিক সহযোগিতার পক্ষে তার দৃঢ় অবস্থান আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসিত হয়।
কূটনৈতিক জীবন শেষে তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন। সিলেট-১ (সদর–কোম্পানীগঞ্জ) আসন থেকে তিনবার জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালের ১৪ জুলাই সর্বসম্মতিক্রমে জাতীয় সংসদের স্পিকার নির্বাচিত হন এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। সংসদীয় গণতন্ত্রের চর্চা ও কার্যক্রমকে শক্তিশালী করতে তার ভূমিকা রাজনৈতিক মহলে ব্যাপকভাবে স্বীকৃত।
বাংলা, ইংরেজি, উর্দু, ফরাসি ও ইতালীয় ভাষায় সাবলীল হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী আরবি, জার্মান, স্প্যানিশ, পর্তুগিজ ও ইন্দোনেশীয় ভাষাতেও দক্ষ ছিলেন। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অঙ্গনে তার ভাষাজ্ঞান ও ব্যক্তিত্ব তাকে বিশেষ মর্যাদা এনে দেয়।
মহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ সরকার ২০১৮ সালে তাকে মরণোত্তর স্বাধীনতা পদকে ভূষিত করে। দেশের কূটনৈতিক ইতিহাসে তিনি আজও একজন প্রজ্ঞাবান রাষ্ট্রনায়ক, দক্ষ সংসদীয় নেতা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অন্যতম উজ্জ্বল মুখ হিসেবে স্মরণীয়।
























