০১:৪৬ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম ::
Logo বড়লেখায় ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত বিদ্যুৎ লাইন মেরামতে দেরি হওয়ায় লাইনম্যানকে হুমকি ও অপপ্রচার Logo ভাওয়াল শালবন হত্যার বিচার চাই Logo সিলেটের ৮ চা-কন্যার সাফল্য Logo ৭ বীরশ্রেষ্ঠের নামে জাতীয় সংসদের গ্যালারির নামকরণ Logo কানাডাস্থ জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশন অব টরন্টো’র নির্বাচনে চমক দেখাতে চায় এবাদ-মঈনুল-বাবলু পরিষদ Logo কুলাউড়ায় হাওরে মৎস্য রক্ষায় বালাইনাশকের ক্ষতি নিয়ে প্রশিক্ষণ Logo কুলাউড়ায় জাতীয় পুষ্টি সপ্তাহের উদ্বোধন Logo দুই ছাত্রীকে ধর্ষণের চেষ্টাকালে আটক যুবককে ঘরবাড়িতে হামলা চালিয়ে ছিনিয়ে নিল স্বজনরা Logo বড়লেখায় ছিদ্দেক আলী উচ্চ বিদ্যালয়ের শতবর্ষ পূর্তি উপলক্ষে প্রস্তুতি সভা Logo কাগজে কলমে লাইনম্যান হলেও সে যেন অলিখিত জুনিয়র ইঞ্জিনিয়ার, নেপথ্যে কারা…

প্রাণ ও প্রকৃতি

ভাওয়াল শালবন হত্যার বিচার চাই

পাভেল পার্থ
  • আপডেট সময় : ১২:৫১:৪৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬
  • / 7
যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের সর্বশেষ খবর জানতে ভিজিট করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

কাঠামোগত পরিবেশ-গণহত্যার প্রশ্নহীন উদাহরণ ভাওয়াল শালবন। বাঘ, হরিণ, বুনো শূকর আর বনময়ূরের জন্য বিখ্যাত এই প্রাচীন বনটিকে নির্মমভাবে খুন করা হয়েছে। ব্রিটিশ উপনিবেশকালে ফ্রাংক বি সিমসন শাসক হয়ে পূর্ববঙ্গে এসে বিভিন্ন বনাঞ্চলে বন্যপ্রাণী শিকারের নেশায় ঘুরেছেন। তাঁর নির্মম শিকারের অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা ১৮৮৬ সালে প্রকাশিত বই ‘লেটার্স অন স্পোর্টস ইন ইস্টার্ন বেঙ্গল’-এ পাওয়া যায় ভাওয়াল বনে শিকারের জন্য গেম রিজার্ভের বহু স্থানের কথা।

ভাওয়াল শালবনকে একসময় বলা হতো ময়ূরবন। গাজীপুরের শ্রীপুরের যাত্রাদলের মঞ্চ কাঁপানো নায়ক দিগেন্দ্র চন্দ্র বর্মণ রাথুরা এককালে এই শালবনে চিতাবাঘ, বুনো শূকর, শজারু, হরিণ, খরগোশ, অজগর, ময়ূরসহ নানান জাতের পাখি দেখেছেন। কালিয়াকৈরের রামচন্দ্রপুর গ্রামের বেলায়েত হোসেন ১৯৫৫ সালে বুড়িপাবরচালা থেকে গোলাপি-লাল ময়ূরের ডিম খুঁজে পেয়েছিলেন। পরে মুরগির তায়ে ফুটিয়ে সেই ময়ূর বড় করেছেন। তাঁর মতে, দেশ স্বাধীনের পর আর শালবনে ময়ূর দেখা যায়নি। যদিও ১৯৮৫ সালে ভাওয়াল বনে শেষ ময়ূর-দর্শনের কথা শোনা যায়। কালিয়াকৈরের মৌচাক ইউনিয়নে হরিণহাটি গ্রামের নাম হরিণের জন্য হলেও এখন এটি কারখানা বোঝাই শ্রমিকবস্তি।

হরিণ ও ময়ূরের পাশাপাশি একসময় শালবন বাঘশূন্যও হয়ে পড়ে। ১৯৪০ সালে ভাওয়াল শালবনে বাঘের সর্বশেষ বিচরণের কাহিনি জানা যায়। শ্রীপুরের তেলিহাটি ইউনিয়নের শুকলাল মুচি নাকি রাথুরা বনে পাওয়া বাঘের বাচ্চা এনে ঘরে পালতেন। বাঘের স্মৃতি বহন করছেও ভাওয়াল শালবনে টিকে থাকা বাঘের বাজার, বাঘেরচালা, বাঘেরবাইদ, বাঘাডোবা এলাকার নামগুলো। এত দ্রুত কোনো প্রাচীন বন নিশ্চিহ্ন হওয়ার উদাহরণ কম। কেবল সামরিকায়ন বা শিল্পায়ন নয়, ভাওয়াল শালবন দখল-দূষণে একের পর এক উন্নয়ন জবরদস্তি হাজির হয়েছে।

সম্প্রতি ভাওয়াল সংরক্ষিত বনে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের বর্জ্যের ভাগাড় বা সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (সিটিএস) নির্মাণ নিয়ে তর্ক উঠেছে। দৈনিক সমকালে ‘সংরক্ষিত বনধ্বংস: মুখোমুখি দুই সংস্থা’ শিরোনামের সরেজমিন প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এই কার্যক্রম বন্ধে সিটি করপোরেশনকে চিঠি দিয়েছে। কিন্তু বন বিভাগ ও সিটি করপোরেশন মুখোমুখি অবস্থানে থাকায় সমাধান হচ্ছে না। বন বিভাগ ও সিটি করপোরেশন নানাবিধ কারণে মুখোমুখি হতে পারে, কিন্তু এক প্রাচীন মুমূর্ষু বনের জীবন নিয়ে কেন তারা ছিনিমিনি খেলবে। এমন প্রাচীন বাস্তুতন্ত্র কেবল গাজীপুর বা বাংলাদেশের নয়, জলবায়ু-দুর্গত দুনিয়ায় পৃথিবীর সকলের সামষ্টিক শক্তি।
যত দ্রুত সম্ভব পরিবেশ ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রীকে ভাওয়াল শালবন বিষয়ে তৎপর হতে হবে। নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সকল পক্ষকে নিয়ে ‘সবার আগে বনের নিরাপত্তা’ নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিবেদন থেকে আরও জানা যায়, সিটি করপোরেশন ২০০ জন মানুষ নিয়ে গিয়ে বনের সীমানা প্রাচীর ভেঙে সংরক্ষিত বনে গভীর নলকূপ স্থাপন ও আগুনও জ্বালিয়েছে। বন আইন ও বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনে এসব দণ্ডনীয় অপরাধ।

ভাওয়াল গড়ে পাল, পান্ডু ও সেন রাজবংশের বিস্তার ছিল। মোগল আমলে ভাওয়াল রাজারা এখানে প্রাসাদ ও দুর্গ গড়ে তোলেন। ভাওয়াল রাজা রমেন্দ্র নারায়ণ রায়ের রহস্যময় মৃত্যুর পর আলোচিত ‘ভাওয়াল সন্ন্যাসী’ আখ্যান তৈরি হয়। ১৯৭৩ সালে প্রাচীন এই শালবনকে ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করা হয়। ১৯৮২ সালে বন বিভাগ এখানে একটি ‘ইকো-ট্যুরিজম’ প্রকল্প চালু করে। অথচ এই বনের প্রাণবৈচিত্র্য ও বাস্তুতন্ত্র সুরক্ষায় কোনো কার্যকর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ তৈরি হয়নি। একটি প্রজাপতি পার্ক তৈরি হলেও সেটি এখন বন্ধ। বরং এই বনের রাথুরা অংশে ২০১০ সালে গড়ে তোলা হয়েছে বিতর্কিত সাফারি পার্ক।

মধুপুর ও ভাওয়াল গড়ের ভূমির বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো স্থানীয়ভাবে এখানে উঁচু ভূমিকে চালা ও নিচু ভূমিকে বাইদ বলে। বাইদ জমিগুলোই বনের আশপাশের জনগণের জীবিকা নির্বাহের অন্যতম সূত্র। এককালে শালবনের ভেতর এসব বাইদ জমিনে বিন্নি, কাইকা, চিনিগুঁড়া, কালিজিরা, কুমলি আর উঁচু চালা জমিতে কাতিশাইল, বিরণ, ভাদুরিয়ার মতো নানারকম ধান চাষ করত স্থানীয় বর্মণ, কোচ, মান্দাই জনগোষ্ঠী। কিন্তু এসব ধান বহু আগেই হারিয়েছে। শালবন ছিল স্থানীয় বর্মণ, ক্ষত্রিয়, ওরাওঁ, মান্দাই ও দরিদ্র বাঙালি জনগণের খাদ্য, ওষুধ ও জ্বালানির এক ঐতিহাসিক উৎসস্থল। কিন্তু এ বনের এমন ঐতিহ্য এবং বৈচিত্র্য এখন আর নেই। শালবন জবরদখল করে গড়ের ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য ও শ্রেণি পরিবর্তন করা হচ্ছে। একেবারে চিহ্ন মুছে ফেলার আগে এই ঐতিহাসিক বন সুরক্ষায় রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত ও তৎপরতা জরুরি।

নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনের সাড়াজাগানো নাটক বনপাংশুলে ভাওয়াল শালবনের ক্ষয়িষ্ণু জীবনের মান্দাই সংস্কৃতির আহাজারি দেখি। বনের মতোই বনের জীবন উন্নয়ন বাহাদুরিতে কেমন বিবর্ণ, পাংশু আর জীর্ণ হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের জন্ম, ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং অর্থনীতিতে ভাওয়াল শালবনের পরিবেশগত অবদান কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। একইসঙ্গে এই প্রশ্নও সামনে আসে, শতসহস্র বর্জ্যের স্তূপ নিয়ে সিটি করপোরেশন যাবে কোথায়? অবশ্যই এর জন্য আমাদের টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা দরকার। তাই বলে একটি বিক্ষত বনকে আমরা ময়লার ডাম্পিং জোন বানাতে পারি না।
গাজীপুরবাসীকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় যুক্ত করতে হবে, একইসঙ্গে ভাওয়াল শালবনের চারধারের গ্রামবাসীকেও বন সংরক্ষণের অংশীদার করতে হবে। কোনোভাবেই বর্জ্য ভাগাড়ের জন্য প্রাকৃতিক বন, জলাভূমি, নদী, কৃষিজমি বা কোনো নাজুক বাস্তুতন্ত্রকে টার্গেট করা যাবে না। এ ক্ষেত্রে সরকারি সকল দপ্তর ও কর্তৃপক্ষকে তাদের আওতায় থাকা জমির মূল্যায়ন করতে হবে। দরকার হলেও সরকার জমি কিনবে। একটি বনের প্রাণের ওপর দিয়ে গড়ে তোলা বর্জ্য ভাগাড় ধারাবাহিকভাবে যে পরিবেশগত-দূষণ ঘটাবে তার চাপ আমরা সামাল দিতে পারব না। জলবায়ু-দুর্গত যুদ্ধবিপন্ন এই দুনিয়ায় বেঁচে থাকার জন্য আমাদের বহু জলা, জমিন ও জঙ্গল দরকার। বিক্ষত দগদগে হলেও ভাওয়াল শালবনটি আমাদের দরকার।

পাভেল পার্থ: লেখক ও গবেষক। ইমেইল:
animistbangla@gmail.com

নিউজটি শেয়ার করুন

প্রাণ ও প্রকৃতি

ভাওয়াল শালবন হত্যার বিচার চাই

আপডেট সময় : ১২:৫১:৪৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬

কাঠামোগত পরিবেশ-গণহত্যার প্রশ্নহীন উদাহরণ ভাওয়াল শালবন। বাঘ, হরিণ, বুনো শূকর আর বনময়ূরের জন্য বিখ্যাত এই প্রাচীন বনটিকে নির্মমভাবে খুন করা হয়েছে। ব্রিটিশ উপনিবেশকালে ফ্রাংক বি সিমসন শাসক হয়ে পূর্ববঙ্গে এসে বিভিন্ন বনাঞ্চলে বন্যপ্রাণী শিকারের নেশায় ঘুরেছেন। তাঁর নির্মম শিকারের অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা ১৮৮৬ সালে প্রকাশিত বই ‘লেটার্স অন স্পোর্টস ইন ইস্টার্ন বেঙ্গল’-এ পাওয়া যায় ভাওয়াল বনে শিকারের জন্য গেম রিজার্ভের বহু স্থানের কথা।

ভাওয়াল শালবনকে একসময় বলা হতো ময়ূরবন। গাজীপুরের শ্রীপুরের যাত্রাদলের মঞ্চ কাঁপানো নায়ক দিগেন্দ্র চন্দ্র বর্মণ রাথুরা এককালে এই শালবনে চিতাবাঘ, বুনো শূকর, শজারু, হরিণ, খরগোশ, অজগর, ময়ূরসহ নানান জাতের পাখি দেখেছেন। কালিয়াকৈরের রামচন্দ্রপুর গ্রামের বেলায়েত হোসেন ১৯৫৫ সালে বুড়িপাবরচালা থেকে গোলাপি-লাল ময়ূরের ডিম খুঁজে পেয়েছিলেন। পরে মুরগির তায়ে ফুটিয়ে সেই ময়ূর বড় করেছেন। তাঁর মতে, দেশ স্বাধীনের পর আর শালবনে ময়ূর দেখা যায়নি। যদিও ১৯৮৫ সালে ভাওয়াল বনে শেষ ময়ূর-দর্শনের কথা শোনা যায়। কালিয়াকৈরের মৌচাক ইউনিয়নে হরিণহাটি গ্রামের নাম হরিণের জন্য হলেও এখন এটি কারখানা বোঝাই শ্রমিকবস্তি।

হরিণ ও ময়ূরের পাশাপাশি একসময় শালবন বাঘশূন্যও হয়ে পড়ে। ১৯৪০ সালে ভাওয়াল শালবনে বাঘের সর্বশেষ বিচরণের কাহিনি জানা যায়। শ্রীপুরের তেলিহাটি ইউনিয়নের শুকলাল মুচি নাকি রাথুরা বনে পাওয়া বাঘের বাচ্চা এনে ঘরে পালতেন। বাঘের স্মৃতি বহন করছেও ভাওয়াল শালবনে টিকে থাকা বাঘের বাজার, বাঘেরচালা, বাঘেরবাইদ, বাঘাডোবা এলাকার নামগুলো। এত দ্রুত কোনো প্রাচীন বন নিশ্চিহ্ন হওয়ার উদাহরণ কম। কেবল সামরিকায়ন বা শিল্পায়ন নয়, ভাওয়াল শালবন দখল-দূষণে একের পর এক উন্নয়ন জবরদস্তি হাজির হয়েছে।

সম্প্রতি ভাওয়াল সংরক্ষিত বনে গাজীপুর সিটি করপোরেশনের বর্জ্যের ভাগাড় বা সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (সিটিএস) নির্মাণ নিয়ে তর্ক উঠেছে। দৈনিক সমকালে ‘সংরক্ষিত বনধ্বংস: মুখোমুখি দুই সংস্থা’ শিরোনামের সরেজমিন প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এই কার্যক্রম বন্ধে সিটি করপোরেশনকে চিঠি দিয়েছে। কিন্তু বন বিভাগ ও সিটি করপোরেশন মুখোমুখি অবস্থানে থাকায় সমাধান হচ্ছে না। বন বিভাগ ও সিটি করপোরেশন নানাবিধ কারণে মুখোমুখি হতে পারে, কিন্তু এক প্রাচীন মুমূর্ষু বনের জীবন নিয়ে কেন তারা ছিনিমিনি খেলবে। এমন প্রাচীন বাস্তুতন্ত্র কেবল গাজীপুর বা বাংলাদেশের নয়, জলবায়ু-দুর্গত দুনিয়ায় পৃথিবীর সকলের সামষ্টিক শক্তি।
যত দ্রুত সম্ভব পরিবেশ ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রীকে ভাওয়াল শালবন বিষয়ে তৎপর হতে হবে। নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সকল পক্ষকে নিয়ে ‘সবার আগে বনের নিরাপত্তা’ নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিবেদন থেকে আরও জানা যায়, সিটি করপোরেশন ২০০ জন মানুষ নিয়ে গিয়ে বনের সীমানা প্রাচীর ভেঙে সংরক্ষিত বনে গভীর নলকূপ স্থাপন ও আগুনও জ্বালিয়েছে। বন আইন ও বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইনে এসব দণ্ডনীয় অপরাধ।

ভাওয়াল গড়ে পাল, পান্ডু ও সেন রাজবংশের বিস্তার ছিল। মোগল আমলে ভাওয়াল রাজারা এখানে প্রাসাদ ও দুর্গ গড়ে তোলেন। ভাওয়াল রাজা রমেন্দ্র নারায়ণ রায়ের রহস্যময় মৃত্যুর পর আলোচিত ‘ভাওয়াল সন্ন্যাসী’ আখ্যান তৈরি হয়। ১৯৭৩ সালে প্রাচীন এই শালবনকে ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করা হয়। ১৯৮২ সালে বন বিভাগ এখানে একটি ‘ইকো-ট্যুরিজম’ প্রকল্প চালু করে। অথচ এই বনের প্রাণবৈচিত্র্য ও বাস্তুতন্ত্র সুরক্ষায় কোনো কার্যকর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ তৈরি হয়নি। একটি প্রজাপতি পার্ক তৈরি হলেও সেটি এখন বন্ধ। বরং এই বনের রাথুরা অংশে ২০১০ সালে গড়ে তোলা হয়েছে বিতর্কিত সাফারি পার্ক।

মধুপুর ও ভাওয়াল গড়ের ভূমির বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো স্থানীয়ভাবে এখানে উঁচু ভূমিকে চালা ও নিচু ভূমিকে বাইদ বলে। বাইদ জমিগুলোই বনের আশপাশের জনগণের জীবিকা নির্বাহের অন্যতম সূত্র। এককালে শালবনের ভেতর এসব বাইদ জমিনে বিন্নি, কাইকা, চিনিগুঁড়া, কালিজিরা, কুমলি আর উঁচু চালা জমিতে কাতিশাইল, বিরণ, ভাদুরিয়ার মতো নানারকম ধান চাষ করত স্থানীয় বর্মণ, কোচ, মান্দাই জনগোষ্ঠী। কিন্তু এসব ধান বহু আগেই হারিয়েছে। শালবন ছিল স্থানীয় বর্মণ, ক্ষত্রিয়, ওরাওঁ, মান্দাই ও দরিদ্র বাঙালি জনগণের খাদ্য, ওষুধ ও জ্বালানির এক ঐতিহাসিক উৎসস্থল। কিন্তু এ বনের এমন ঐতিহ্য এবং বৈচিত্র্য এখন আর নেই। শালবন জবরদখল করে গড়ের ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য ও শ্রেণি পরিবর্তন করা হচ্ছে। একেবারে চিহ্ন মুছে ফেলার আগে এই ঐতিহাসিক বন সুরক্ষায় রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত ও তৎপরতা জরুরি।

নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনের সাড়াজাগানো নাটক বনপাংশুলে ভাওয়াল শালবনের ক্ষয়িষ্ণু জীবনের মান্দাই সংস্কৃতির আহাজারি দেখি। বনের মতোই বনের জীবন উন্নয়ন বাহাদুরিতে কেমন বিবর্ণ, পাংশু আর জীর্ণ হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের জন্ম, ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং অর্থনীতিতে ভাওয়াল শালবনের পরিবেশগত অবদান কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। একইসঙ্গে এই প্রশ্নও সামনে আসে, শতসহস্র বর্জ্যের স্তূপ নিয়ে সিটি করপোরেশন যাবে কোথায়? অবশ্যই এর জন্য আমাদের টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা দরকার। তাই বলে একটি বিক্ষত বনকে আমরা ময়লার ডাম্পিং জোন বানাতে পারি না।
গাজীপুরবাসীকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় যুক্ত করতে হবে, একইসঙ্গে ভাওয়াল শালবনের চারধারের গ্রামবাসীকেও বন সংরক্ষণের অংশীদার করতে হবে। কোনোভাবেই বর্জ্য ভাগাড়ের জন্য প্রাকৃতিক বন, জলাভূমি, নদী, কৃষিজমি বা কোনো নাজুক বাস্তুতন্ত্রকে টার্গেট করা যাবে না। এ ক্ষেত্রে সরকারি সকল দপ্তর ও কর্তৃপক্ষকে তাদের আওতায় থাকা জমির মূল্যায়ন করতে হবে। দরকার হলেও সরকার জমি কিনবে। একটি বনের প্রাণের ওপর দিয়ে গড়ে তোলা বর্জ্য ভাগাড় ধারাবাহিকভাবে যে পরিবেশগত-দূষণ ঘটাবে তার চাপ আমরা সামাল দিতে পারব না। জলবায়ু-দুর্গত যুদ্ধবিপন্ন এই দুনিয়ায় বেঁচে থাকার জন্য আমাদের বহু জলা, জমিন ও জঙ্গল দরকার। বিক্ষত দগদগে হলেও ভাওয়াল শালবনটি আমাদের দরকার।

পাভেল পার্থ: লেখক ও গবেষক। ইমেইল:
animistbangla@gmail.com