চায়ের কাপে ভোটের হিসাব
- আপডেট সময় : ০১:৫৩:৩৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৬
- / 63
মৌলভীবাজার জেলায় রাজনীতির নাড়ির টান বোঝা যায় না সভা-মঞ্চের স্লোগানে কিংবা স্ক্রিনের ঝলমলে লাইভে। এখানে ভোটের আসল হাওয়া ধরা পড়ে এক কাপ চায়ের ভেতর। ভোরবেলার লাল চা যখন কাপে ঢালা হয়, তখন তার ধোঁয়ার সঙ্গে মিশে যায় হিসাব-নিকাশ কে এগোচ্ছে, কে পিছোচ্ছে, আর শেষ মুহূর্তে কী হতে পারে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে মৌলভীবাজারের প্রতিটি চায়ের দোকান যেন নীরবে রূপ নিচ্ছে জনমতের পরীক্ষাগারে।

বড়লেখা উপজেলার দক্ষিণভাগ এলাকার একটি টিনের চালের দোকানে সকাল আটটা বাজতেই জমে ওঠে লোক। কেউ বেঞ্চে বসে চা নেড়ে নেয়, কেউ বিড়ির আগুন ধরায়। কথাবার্তা ঘুরেফিরে এসে আটকে যায় এক প্রশ্নে ‘এইবারের খেলায় আসল চালটা দেবে কে?’
চা বিক্রেতা বলাই মিয়া হাসতে হাসতে বলেন, এখন দিনে যত কাপ চা বিক্রি করি, তার চেয়েও বেশি বিক্রি হয় ভোটের গল্প। কেউ বলে ধানের শীষ, কেউ বলে জামায়াত আবার কেউ ফিসফিস করে বলে, শেষ মুহূর্তে বড় চমক আসবেই। ভোট তো শুধু আজকের হিসাব না ভাই, মানুষের স্মৃতি অনেক দূর পর্যন্ত যায় পুরোনো কথা সহজে ভোলে না।
গ্রামাঞ্চলে এই আলোচনা আরও জমাট বাঁধে। জুড়ী উপজেলার এক গ্রামের চায়ের দোকানে বিকেল নামলেই জড়ো হন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, মাঠে-ঘাটে ঘুরে বেড়ানো কৃষক আর বিদেশফেরত তরুণরা। ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপে চুমুকের ফাঁকে চলে মাঠের প্রচারণার হিসাব আর তার সঙ্গেই ঢুকে পড়ে ফেসবুক, ইউটিউব আর অনলাইনের অঙ্ক–কষাকষি। গ্রামীণ আড্ডার এই চায়ের দোকানটাই যেন হয়ে ওঠে ছোটখাটো এক ‘রাজনৈতিক সংসদ’।

ভোটার মাওলানা ছাব্বির আহমদ ও এমরান আহমদ বললেন, আমরা মাইকিং শুনতে যাই না। মোবাইলে দেখি কে কী বলছে, কার ভিডিও কতটা ঘুরছে। তারপর চায়ের দোকানে বসে সবাই মিলে বিচার-বিশ্লেষণ করি।চায়ের কাপে চুমুকের ফাঁকে চলে তুলনামূলক গণনা কে কত উন্নয়ন করেছে, কে কখন কোন দলে ছিল, কে কয়বার অবস্থান পাল্টেছে। কেউ হেসে হেসে বললেন, ভোটের আগে যদি চায়ের দোকানে পাস না করো, ব্যালট বাক্সেও কঠিন হবে! চায়ের দোকান এখন যেন গ্রামীণ ভোটের ছোটখাটো সেনানিবাস এখানেই গড়ে ওঠে সমীক্ষা, বিশ্লেষণ আর রাজনৈতিক হাসি-ঠাট্টা।
এক কোণে বসে থাকা সত্তরের কাছাকাছি বয়সী একজন ধীরে ধীরে বললেন, এখন পর্যন্ত আলাপ-আলোচনায় মানুষ বিএনপির প্রার্থীকে একটু এগিয়ে রাখছে। মাঠে যেমন দেখা যাচ্ছে, অনলাইনে তেমনই। অনেকের মনে হচ্ছে এইবার হয়তো তাকে একটা সুযোগ দেওয়া যাইতে পারে।

এই কথা শুনে পাশে বসা আরেকজন হেসে বললেন, জামায়াতও পিছিয়ে নেই, তারা ওরা নিজস্ব ছন্দে এগোচ্ছে, দেখব কে শেষ হাসি হাসে।
মৌলভীবাজার-১ আসনের এক বাজারের দোকানে আলোচনার ফোকাস ছিল প্রার্থীদের থিম সং। এক তরুণ মোবাইলে প্রচারণার গান জোরে চালালেই চারপাশে হাসির হাহাকার ছড়িয়ে পড়ে। এক বৃদ্ধ ঠাট্টা করে প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন, গান ভালো হলে কি ভোটও বাড়ে? পাশ থেকে কেউ হেসে বলল, ভোটের হিসাব না জানা গেলেও, গান মাথায় ধরে থাকে ঠিকই।
এই আড্ডায় শুধু দলীয় আবেগ নয়, জীবনের বাস্তব চ্যালেঞ্জও ঢুকে পড়েছে। গ্যাস নেই, বিদ্যুৎ অনিয়মিত, কাজের সুযোগ কম এই সব সমস্যাকেই ভোটাররা আজকের ভোটের সঙ্গে মেলাচ্ছেন, হিসাব করছেন এবং তুলনা করছেন, কে কতটা জীবনযাত্রা সহজ করতে পারবে।
মৌলভীবাজার-১ আসনের এক ভোটার বললেন, ফেসবুকে সবাই নেতা হয়ে যায়, কিন্তু চায়ের দোকানে বসলে আসল ছবি দেখা যায় কার উপর ভরসা রাখা যায়, আর কার উপর রাখা যায় না।
এই জায়গাটাই চায়ের দোকানের আসল শক্তি। এখানে কেউ নেতা নয়, সবাই বিচারক। কে কাকে ভোট দেবে তা মুখে না বললেও কথার ফাঁকে, হাসি-ঠাট্টার ভেতরেই ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে ওঠে মনোভাব। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই চায়ের দোকানগুলো পরিণত হচ্ছে জনমতের জীবন্ত আয়নায় যেখানে ধোঁয়া ওঠা কাপে প্রতিফলিত হয় মানুষের ভরসা আর দ্বিধা।
স্ক্রিনে ভেসে ওঠে ডিজিটাল প্রচারণা, রাস্তাজুড়ে ভেসে আসে মাইকের ডাক। আর চায়ের দোকানে শোনা যায় ভোটের সবচেয়ে খাঁটি গল্প-মানুষের মুখে মুখে। সন্ধ্যা গড়িয়ে গেলে আড্ডা ভাঙে; কেউ ফেরে কাজে, কেউ পা বাড়ায় মসজিদের দিকে। বেঞ্চগুলো ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে যায়, টেবিলে পড়ে থাকে আধখাওয়া বিস্কুট আর ঠান্ডা হয়ে যাওয়া চায়ের কাপ।
ব্যালট বাক্সে শেষ রায় কী হবে, তা এখনো অনিশ্চিত। তবে মৌলভীবাজারের চায়ের দোকানগুলোতে যে হিসাব কষা চলছে, সেখানে ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি নীরবে জায়গা করে নিচ্ছে অতীতের স্মৃতি, অভিজ্ঞতা আর না-বলা হিসাবগুলোও।
ষাটমাকন্ঠ/এএইচআর




















