ঝর্ণার জলে কার ছায়া গো!
মাধবকুণ্ড ঝর্ণার জলে বিরল ঝর্ণাপাখি
- আপডেট সময় : ০৫:৫৯:৫৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫
- / 182
নামে যার সঙ্গে ঝর্ণা জড়িয়ে, তার সঙ্গে ঝর্ণার সম্পর্ক যে নিবিড় হবে এটাই স্বাভাবিক। বাস্তবেও ঠিক তাই। অপার্থিব সৌন্দর্যের এই পাখিটির বাহারি বাংলা নামের তালিকাও বেশ সমৃদ্ধ নীলাম্বর জলখঞ্জরী, নীল পানগির্দি, ঝর্ণাপাখি, নীল কপালি গির্দি, নীলচে লালগির্দি ইত্যাদি।
ইংরেজিতে এর নাম Plumbeous Water Redstart এবং দাঁতভাঙা বৈজ্ঞানিক নাম Phoenicurus fuliginosus।
ডিসেম্বরের শুরুর দিকের কথা। মৌলভীবাজারের মাধবকুণ্ড ঝর্ণায় এই পাখির আগমন ঘটেছে খবরটি পেয়েই মনটা অস্থির হয়ে উঠল। ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কয়েকজন আলোকচিত্রী এর ছবি পোস্ট করে যেন সেই অস্থিরতার আগুনে ঘি ঢেলে দিলেন। ভাবছিলাম, কী করা যায় ঠিক তখনই কাকতালীয়ভাবে সিলেট থেকে অতি প্রিয় আলোকচিত্রী শামীম খান ভাইয়ের ফোন।
কল রিসিভ করতেই তিনি বললেন, “চলে আসো। মাসুমসহ কয়েকজন ঢাকা থেকে আসছে। ওদের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ করো। সাদিক, রাকিব আর আতিকসহ আমরা আগেভাগেই উপস্থিত থাকব।”
কালক্ষেপণ না করে আলোকচিত্রী মাসুম ভাইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। পরদিন রাতের বাসে মাসুম ভাই, মিজবাহ ভাই, শাহিন ভাই, রনি ভাই, রিদোয়ান ভাই আর আমি সবাই মিলে রওনা দিলাম কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে।
ভোরে পৌঁছে দেখি, শামীম ভাই ও তাঁর সঙ্গীসাথীরা ইতোমধ্যেই ছবি তোলা শুরু করে দিয়েছেন। ফলে ‘মহাশয়কে’ খুঁজে পেতে বিশেষ বেগ পেতে হলো না। দীর্ঘ সময় নিয়ে মন-প্রাণ ভরে ছবি তুললাম। মাঝেমধ্যে ক্যামেরার শাটার চাপা থামিয়ে, চর্মচক্ষু দিয়েও তার সৌন্দর্য উপভোগ করতে ভুলিনি।

আকারে অত্যন্ত ছোট এই পাখিটির পুরুষটির গড় ওজন প্রায় ২২ গ্রাম এবং স্ত্রী পাখিটির প্রায় ১৮ গ্রাম। এত হালকা শরীরে কী পাহাড়সম সৌন্দর্যই না এরা বয়ে বেড়ায় ভাবলেই বিস্ময় জাগে।
শীতকালে পাহাড়ি নদীর ধারে এরা অস্থায়ী নীড় বানায়। শীত বিদায় নিতেই চলে যায় গ্রীষ্মের গন্তব্যে। সেখানে পৌঁছেই সংসার গড়ায় মনোযোগী হয়। মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত এদের প্রজননকাল। স্ত্রী নীল পানগির্দি সাধারণত তিন বা চারটি হালকা গোলাপি-ধূসর কিংবা হালকা হলদে রঙের ডিম পাড়ে। ডিমে তা দেওয়ার দায়িত্ব সে একাই পালন করে, তবে ছানা লালন-পালনে পুরুষ পাখিটিও সমানভাবে অংশ নেয়।
বাংলাদেশ ছাড়াও আফগানিস্তান, ভুটান, চীন, ভারত, লাওস, মায়ানমার, নেপাল, পাকিস্তান, তাইওয়ান, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামে এদের দেখা মেলে।
সবশেষে সেখান থেকে বিদায় নিয়ে সাগরনালে নীলপরির সন্ধানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হলো যা প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তির ভিন্ন এক গল্প। অন্য সময়ের জন্য তোলা থাক।
ক্যামেরা ব্যাগে নেওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে পাখিটি পানি আর মাটির সীমানা স্থলে এমনভাবে এসে বসল, দৃশ্যটা যেন এক ইলিউশন। মনে হলো, একটি পাখি হুট করে দুটো পাখি হয়ে গেছে। মনে মনে “ঝর্ণার জলে কার ছায়া গো” বলতে বলতেই সেদিনের মতো ঝর্ণাপাখির শেষ ছবিটিতে ক্লিক করলাম।





















