বিষু উৎসব ২০২৬
সুর-নৃত্য-নাট্যে মণিপুরি থিয়েটারের বর্ণিল বিষু উৎসবের সমাপ্তি
- আপডেট সময় : ১০:৩৭:১৪ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬
- / 10
কমলগঞ্জের সাংস্কৃতিক আঙিনায় আবারও প্রাণের স্পন্দন জাগিয়ে পর্দা নামল মণিপুরি থিয়েটার আয়োজিত দুই দিনব্যাপী বিষু উৎসব ২০২৬-এর। নৃত্যু, সুর, তাল আর ঐতিহ্যের অপূর্ব মেলবন্ধনে উৎসবের শেষ দিনটি হয়ে উঠেছিল এক গভীর আবেগে মোড়া স্মরণীয় আয়োজন যেখানে সংস্কৃতি ও শেকড়ের টানে মানুষ একসূত্রে গাঁথা পড়ে।
সমাপনী দিনের সূচনা হয় সুরের মূর্ছনায়। শিল্পী শর্মিলা সিনহার আবেগময় কণ্ঠ যেন ছুঁয়ে যায় দর্শকের হৃদয়ের গভীরতম প্রান্ত। তার সঙ্গে অঞ্জনার সুরেলা সহযোগিতা এবং মৃদঙ্গে রোহিত সিংহের তাল মিলিয়ে তৈরি হয় এক মোহনীয় পরিবেশ, যা মুহূর্তেই নটমণ্ডপ প্রাঙ্গণকে ডুবিয়ে দেয় সুরের অনাবিল আবেশে।
এরপর মঞ্চে আসেন মহিলা নটপালা’র শিল্পীরা। তাদের প্রাণবন্ত উপস্থাপনা, সাবলীল অভিনয় আর ঐতিহ্যবাহী পরিবেশনা দর্শকদের নিয়ে যায় মণিপুরি সংস্কৃতির গভীরে। পরিচালক বিধান সিংহের দক্ষ পরিচালনায় প্রতিটি দৃশ্য হয়ে ওঠে জীবন্ত, ছন্দময় ও হৃদয়স্পর্শী।
বিষু উৎসব মঞ্চের আলোয় নতুন মাত্রা যোগ করে জ্যোতি সিনহা ও স্বর্ণালী সিনহার মণিপুরি নৃত্য। তাদের প্রতিটি মুদ্রা, ভঙ্গিমা আর আবেগময় প্রকাশ যেন ইতিহাস, সংস্কৃতি আর সৌন্দর্যের এক জীবন্ত কাব্য হয়ে ওঠে। দর্শক মুগ্ধতায় ডুবে থেকে অনুভব করেন ঐতিহ্যের শুদ্ধ সৌন্দর্য।
উৎসবের এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে মঞ্চে উঠে আসে জীবনের বাস্তব গল্প। চা-শ্রমিকদের পরিবেশিত নাট্যাংশ ‘দণ্ডনাট’ তুলে ধরে তাদের সংগ্রাম, বঞ্চনা আর স্বপ্নের কথা। সরল উপস্থাপনায় লুকিয়ে থাকা গভীর সত্য দর্শকদের ভাবিয়ে তোলে, ছুঁয়ে যায় হৃদয়ের গহীন আবেগকে।
সবশেষে আবেগের চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে সায়িক সিদ্দিকীর পরিচালনায় তার দল ‘আহির বাংলা’র পরিবেশিত পালানাট্য ‘জয়তুন বিবির পালা’-য়। শক্তিশালী কাহিনি, প্রাণবন্ত সংলাপ আর সাবলীল অভিনয়ে দর্শক হয়ে ওঠেন অভিভূত। দীর্ঘ করতালিতে মুখরিত হয় পুরো উৎসব প্রাঙ্গণ, যেন এই পরিবেশনাই উৎসবকে এনে দেয় পূর্ণতা।

সমাপনী পর্বে তৈরি হয় এক আবেগঘন মুহূর্ত। মণিপুরি থিয়েটারের প্রতিষ্ঠাতা শুভাশিস সিনহা বলেন, বিষু শুধু একটি উৎসব নয় এটি আমাদের অস্তিত্ব, আমাদের শেকড়, আমাদের ঐতিহ্যের প্রতিচ্ছবি। এই উৎসবের মাধ্যমে আমরা শুধু আনন্দ ভাগাভাগি করি না, বরং আমাদের সংস্কৃতিকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার এক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও পালন করি। এই দুই দিনে মঞ্চে যে সুর, নৃত্য ও নাট্যের অপূর্ব সমাহার আমরা দেখেছি, তা আমাদের সংস্কৃতির প্রাণশক্তিরই এক জীবন্ত প্রমাণ।
তিনি আরও বলেন, আমি গভীরভাবে কৃতজ্ঞ আমাদের সকল শিল্পীর প্রতি, যারা তাদের নিষ্ঠা, সাধনা ও ভালোবাসা দিয়ে এই মঞ্চকে আলোকিত করেছেন। কৃতজ্ঞ আমাদের আয়োজক দল, স্বেচ্ছাসেবক এবং পৃষ্ঠপোষকদের প্রতি, যাদের ত্যাগ, অক্লান্ত পরিশ্রম ছাড়া এ আয়োজন সম্ভব হতো না। মণিপুরি থিয়েটার আগামী দিনগুলোতেও এই সাংস্কৃতিক ধারাকে আরও বিস্তৃত করবে, নতুন নতুন সৃষ্টির মাধ্যমে আমাদের ঐতিহ্যকে আরও সমৃদ্ধ করবে।
শেষদিনে অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারীদের হাতে উত্তরীয় পরিয়ে সম্মাননা ক্রেস্ট তুলে দেওয়া হয়।

শেষ মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে এক নীরব আবেগ। একদিকে বিদায়ের বিষণ্ণতা আর অন্যদিকে নতুন শুরুর প্রত্যাশা। শিল্পী, দর্শক ও আয়োজকদের চোখেমুখে ছিল তৃপ্তির হাসি। বিষু উৎসবকে কেন্দ্র করে পুরো কমলগঞ্জে তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। সংস্কৃতি সংরক্ষণ, ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা এই আয়োজন সকল সম্প্রদায়ের মিলনমেলায় পরিণত হয়।
























