কমলগঞ্জে দুই দিনব্যাপী বিষু উৎসবের আজ শেষদিন
সংস্কৃতির মিলনমেলায় মুখর নটমণ্ডপ প্রাঙ্গণ
- আপডেট সময় : ০৮:২৩:৩৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৮ এপ্রিল ২০২৬
- / 10
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার ঘোড়ামারা এলাকায় অবস্থিত মণিপুরি থিয়েটারের নটমণ্ডপ প্রাঙ্গণে বর্ণাঢ্য আয়োজনে শুরু হয়েছে মণিপুরি সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান ঐতিহ্যবাহী উৎসব ‘বিষু’। চৈত্র সংক্রান্তি ও বাংলা নববর্ষকে কেন্দ্র করে আয়োজিত এই দুই দিনব্যাপী উৎসব ১৭ এপ্রিল থেকে শুরু হয়ে আজ ১৮ এপ্রিল পর্যন্ত চলবে। মণিপুরি থিয়েটারের উদ্যোগে আয়োজিত এ উৎসবে শতাধিক শিল্পীর অংশগ্রহণে নাটক, পালাগান, সংগীত, নৃত্য ও লোকজ খেলাধুলার সমাহার ঘটেছে।
উৎসবের প্রথম দিনের অনুষ্ঠান শুরু হয় মণিপুরি থিয়েটারের কিশোরীদের দলীয় কোরাস পরিবেশনার মাধ্যমে। ষড়ঋতুর বর্ণনা ও সুরেলা গানে সাজানো এই পরিবেশনা উপস্থিত দর্শকদের মুগ্ধ করে। কোরাসটির রচনা ও সুরারোপ করেন শুভাশিস সিনহা এবং পরিচালনা করেন শর্মিলা সিনহা।
পুরো অনুষ্ঠানটি মণিপুরি ও বাংলা ভাষায় সঞ্চালনা করেন কিরণ সিংহ ও পুস্পাঞ্জলি সিনহা। এরপর মণিপুরি ভাষায় দলীয় বৈশাখী গান এবং ‘এসো হে বৈশাখ’ শিরোনামের পরিবেশনা মঞ্চস্থ হয়, যা নববর্ষের আমেজকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে।
স্বাগত বক্তব্যে মণিপুরি থিয়েটারের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি শুভাশিস সিনহা বলেন, বিষু উৎসব কেবল একটি উৎসব নয়, এটি মণিপুরি জনগোষ্ঠীর জীবনধারা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রতিচ্ছবি। তিনি এই আয়োজনকে মণিপুরি ও বাঙালি সংস্কৃতির সেতুবন্ধন হিসেবে উল্লেখ করেন।
সাংস্কৃতিক পর্বে সংগীত পরিবেশন করেন সুনীতি সিনহা, দীপ্তি সিনহা, ধীরকান্ত সিংহ, অশ্বিনী সিংহ, অনিতা সিনহা ও বিজন সিংহ। তবলায় সঙ্গত দেন বিধান চন্দ্র সিংহ ও নবকুমার সিংহ এবং মৃদঙ্গে ছিলেন রোহিত সিংহ।
এছাড়া ভানুবিল গ্রামের শিশু-কিশোরদের পরিবেশনায় ঐতিহ্যবাহী হোলি নৃত্য দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তরুণ শিল্পীদের নৃত্য পরিবেশনায় অংশ নেন বিজয়া, শ্রেয়া, সপ্তর্ষি, ঋষিকা, অগ্নি, শাশ্বতী, মৌমিতা ও অমৃতাসহ আরও অনেকে। কবিতা আবৃত্তি করেন মিশু, আরাধ্য ও আফসানা।
অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে বিজয়া, মৌমিতা, শ্রুতি ও রোমিতের পরিবেশনায় একটি কৌতুক নাটিকা মঞ্চস্থ হয়, যা দর্শকদের মাঝে হাস্যরসের সৃষ্টি করে।
দিনের শেষ পর্বে মণিপুরি থিয়েটারের পরিবেশনায় মঞ্চস্থ হয় নাটক ‘খেন্তাম’। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘কর্মফল’ গল্প অবলম্বনে নাট্যরূপ দেন শুভাশিস সিনহা। নাটকে অভিনয় করেন জ্যোতি, স্মৃতি, বিধান, সমরজিত, দ্বৈপায়ন, লক্ষণ, নির্জন, চয়ন, হরিনারায়ণ, শাশ্বতী ও আয়ুষসহ আরও অনেকে। নাটকের লাইট ডিজাইন করেন মো. শাহজাহান মিয়া এবং অলংকরণ ও মঞ্চসজ্জায় ছিলেন সজলকান্তি সিংহ, সহযোগিতায় সৌরভ ও অবন্তিকা। সার্বিক ব্যবস্থাপনায় ছিলেন সুব্রত সিংহ ও আপন সিংহসহ সংশ্লিষ্টরা।

নাটক পরিবেশনার মধ্য দিয়ে প্রথম দিনের অনুষ্ঠান শেষ হয়।
উৎসবের দ্বিতীয় ও শেষ দিনের প্রধান আকর্ষণ হিসেবে আজ সন্ধ্যা ৬টায় ময়মনসিংহ গীতিকার আলোকে সায়িক সিদ্দিকীর নির্দেশনায় আহির বাংলার পরিবেশনায় পালানাট্য ‘জয়তুন বিবির পালা’ মঞ্চস্থ হবে।

বিষু উৎসব উপলক্ষে মণিপুরি সম্প্রদায়ের ঘরে ঘরে চলছে উৎসবের আমেজ। ঘরবাড়ি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা, নিরামিষ নানা পদ রান্না এবং আত্মীয়-স্বজনদের মাঝে খাবার বিনিময়ের মাধ্যমে উদযাপিত হচ্ছে এই উৎসব। পাশাপাশি ‘নিকন খেলা’সহ বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী আয়োজন উৎসবকে করে তুলেছে আরও প্রাণবন্ত।
সব মিলিয়ে, কমলগঞ্জের এই বিষু উৎসব পরিণত হয়েছে মণিপুরি ও বাঙালি লোকজ সংস্কৃতির এক অনন্য মিলনমেলায়, যা স্থানীয় সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে নতুন প্রাণচাঞ্চল্যে ভরিয়ে তুলেছে।























