চিত্রকলা, পাপেট ও টেলিভিশন জগতের উজ্জ্বল নক্ষত্রের বিদায়ে সংস্কৃতি অঙ্গনে শোক
বরেণ্য শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার আর নেই
- আপডেট সময় : ১০:০৩:০৪ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬
- / 20
বাংলাদেশের শিল্প ও সংস্কৃতির অন্যতম অগ্রদূত, একুশে পদকপ্রাপ্ত বরেণ্য চিত্রশিল্পী, পাপেট নির্মাতা ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মুস্তাফা মনোয়ার আর নেই। সোমবার (২৯ জুন) সকাল সাড়ে ৮টায় রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯০ বছর।
শিল্পীর ব্যক্তিগত সহকারী রুবেল মিয়া তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, গত ১৪ জুন থেকে হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন মুস্তাফা মনোয়ার। দীর্ঘদিন ধরে নিউমোনিয়া, প্রোস্টেট ক্যানসারসহ বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি।
পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, হাসপাতাল থেকে তাঁর মরদেহ ধানমন্ডির তাকওয়া মসজিদে নেওয়া হবে। এরপর ধানমন্ডি ১ নম্বরে তাঁর বাসভবনে রাখা হবে। জানাজা ও দাফনের সময়সূচি পরে জানানো হবে।
১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর যশোরের শ্রীপুরে জন্মগ্রহণ করেন মুস্তাফা মনোয়ার। তাঁর বাবা ছিলেন কবি গোলাম মোস্তফা এবং মা জমিলা খাতুন। ছয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার ছোট। মাত্র পাঁচ বছর বয়সে মাকে হারালেও পারিবারিক সাংস্কৃতিক পরিবেশ তাঁর শিল্পবোধ ও বাংলা সংস্কৃতির প্রতি গভীর অনুরাগ গড়ে তোলে।
স্কুলজীবনেই বাবার ক্যামেরা হাতে নিয়ে ফটোগ্রাফির মাধ্যমে শিল্পচর্চা শুরু করেন তিনি। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় নারায়ণগঞ্জ হাইস্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্র থাকা অবস্থায় আন্দোলনের পক্ষে কার্টুন আঁকার দায়ে প্রায় এক মাস কারাভোগ করতে হয়েছিল তাঁকে।
ম্যাট্রিকের পর কলকাতার স্কটিশ চার্চ কলেজে বিজ্ঞানে ভর্তি হলেও পরে চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৯৫৯ সালে ফাইন আর্টসে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম স্থান অর্জনের পর শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের আহ্বানে ১৯৬০ সালে ঢাকায় এসে পূর্ব পাকিস্তান চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন।
জলরঙে তাঁর অসাধারণ দক্ষতা তাঁকে দ্রুত স্বীকৃতি এনে দেয়। কিংবদন্তি চলচ্চিত্র নির্মাতা সত্যজিৎ রায় একবার মন্তব্য করেছিলেন, “মুস্তাফা মনোয়ারের আঁকা ছবি খুব অল্পতেই অনেক কথা বলতে পারে।”
১৯৬৫ সালে চারুকলার শিক্ষকতা ছেড়ে পাকিস্তান টেলিভিশনের ঢাকা কেন্দ্রে যোগ দেন তিনি। তাঁর বিশ্বাস ছিল, টেলিভিশন হতে পারে বাংলা সংস্কৃতি বিকাশের শক্তিশালী মাধ্যম। মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে ১৯৭১ সালের ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবসে পাকিস্তানের পতাকা প্রদর্শন এড়াতে অনুষ্ঠানসূচি মধ্যরাত পর্যন্ত দীর্ঘায়িত করার পরিকল্পনায়ও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। একই সময়ে তাঁর পরিচালনায় প্রচারিত হয় ফজল-এ-খোদার লেখা ও আজাদ রহমানের সুরে বিখ্যাত গণসংগীত- ‘সংগ্রাম সংগ্রাম সংগ্রাম, চলবে দিনরাত অবিরাম’।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে কলকাতায় ওয়াহিদুল হক ও সন্জীদা খাতুনের নেতৃত্বে গঠিত সাংস্কৃতিক দলে যুক্ত হয়ে দেশাত্মবোধক গান পরিবেশন করেন তিনি। পাশাপাশি শরণার্থী শিবিরে শিশুদের মুখে হাসি ফোটাতে আয়োজন করেন পাপেট শো।
বাংলাদেশে পাপেট শিল্পকে জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে মুস্তাফা মনোয়ারের অবদান অনন্য। এ কারণেই তিনি পরিচিতি পান ‘বাংলাদেশের পাপেটম্যান’ হিসেবে। তাঁর সৃষ্ট পাপেট চরিত্র ‘পারুল’ থেকেই ইউনিসেফের অনুপ্রেরণায় পরে সৃষ্টি হয় বহুল জনপ্রিয় শিশু চরিত্র ‘মীনা’। বাংলাদেশ টেলিভিশনে তাঁর নির্মিত ‘আজব দেশে’ অনুষ্ঠানের ‘বাঘা’ ও ‘মেনি’ চরিত্রও দর্শকদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে।
শিশু-কিশোরদের প্রতিভা বিকাশের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘নতুন কুঁড়ি’-এর স্রষ্টাও ছিলেন তিনি। এছাড়া ‘মনের কথা’সহ একাধিক প্রশংসিত অনুষ্ঠান নির্মাণ করেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রক্তকরবী’ এবং মুনীর চৌধুরীর অনূদিত ‘মুখরা রমণী বশীকরণ’ নাটকের তাঁর টেলিভিশন প্রযোজনা যুক্তরাজ্যের গ্রানাডা টেলিভিশনের ‘ওয়ার্ল্ড হিস্ট্রি অব টিভি ড্রামা’-এর জন্য মনোনীত হয়েছিল।
শিল্পচর্চার পাশাপাশি তিনি বাংলাদেশ টেলিভিশনের উপমহাপরিচালক ও জেনারেল ম্যানেজার, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক, জাতীয় গণমাধ্যম ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, জনবিভাগ উন্নয়ন কেন্দ্রের চেয়ারম্যান এবং এডুকেশনাল পাপেট ডেভেলপমেন্ট সেন্টারের প্রকল্প পরিচালকসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
দ্বিতীয় সাফ গেমসের মাস্কট ‘মিশুক’-এর নকশা এবং ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের পেছনের লাল সূর্যের প্রতিরূপও তাঁর সৃজনশীলতার অনন্য নিদর্শন।
শিল্প ও সংস্কৃতিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০৪ সালে তিনি একুশে পদকে ভূষিত হন। এছাড়া চিত্রকলা, টেলিভিশন নাটক, পাপেট নির্মাণ ও শিশু সংস্কৃতিতে বিশেষ অবদানের জন্য দেশ-বিদেশে অসংখ্য সম্মাননা ও পুরস্কার লাভ করেন।
মুস্তাফা মনোয়ারের মৃত্যুতে দেশের শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতি অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বহুমাত্রিক সৃষ্টিশীলতা, দেশপ্রেম এবং শিল্পভাবনায় তিনি চিরকাল বেঁচে থাকবেন। তাঁর সৃষ্টি, দর্শন ও কর্ম আগামী প্রজন্মের শিল্পী-সংস্কৃতিকর্মীদের জন্য অনুপ্রেরণার অবিনাশী উৎস হয়ে থাকবে।





















