মব সাইকোলজি এবং মনসামঙ্গল
- আপডেট সময় : ০৯:০৩:০৯ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৮ অগাস্ট ২০২৫
- / 349
আধুনিকতার এই যুগে রকমারি বিনোদন বৈচিত্র্যের মাঝেও ‘মনসামঙ্গল’ বা ‘পদ্মাপুরাণ’ বা ‘পদ্মপুরাণ’ এর আবেদন এখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি বাংলার পল্লীঅঞ্চল থেকে! আজ গ্রামের বাড়িতে মনসার পূজা হচ্ছে। এত চমৎকারভাবে সুর করে ‘পদ্মপুরাণ’ পাঠ করা হচ্ছে! দেখে কেবল মনে হচ্ছে- “আহা রে, কত সামর্থ এই কবিতার, কত যে শক্তি একেকজন কবির” ।
আমার অঞ্চলে যে পুরাণ পাঠ হচ্ছে, তা রচনা হয়েছে মধ্যযুগে। লেখক হচ্ছেন কবি দ্বিজবংশীদাস, অন্য নাম বংশীবদন ভট্টাচার্য। তিনি আবার বাংলার আদি নারী কবি চন্দ্রাবতীর পিতা। সর্পদেবী মনসা আর চাঁদ সওদাগর-কে নিয়ে লেখা হয়েছে এই উপাখ্যান। মৃত লখিন্দরকে বাঁচানোর জন্য বেহুলার অসাধারণ আত্মত্যাগ এই উপখ্যানেরই অংশ।
বর্ষাকালে সাপের উপদ্রব বেড়ে যায়। তাছাড়া তখন জলবদ্ধতাও দেখা দেয় মাঠেঘাটে । শ্রাবণমাসে পদ্মপুরাণ কাব্যগ্রন্থটি আসরে বসে সুর করে পাঠ করা হয়। এর নাম রয়ানী গান। অতঃপর শ্রাবণের নাগপঞ্চমী তিথিতে মনসার পূজা করা হয়। এটাই এখানে প্রচলিত রীতি।
“মনসামঙ্গল” ধারার কাব্যে অনেকজন কবি রয়েছেন। সিলেট অঞ্চলের একজন কবিও মনসামঙ্গল রচনা করেছেন। তাঁর নাম ষষ্ঠীবর দত্ত। আমার কাছে আনুমানিক ১২০-১৩০ বছরের পুরনো একটা হাতে লেখা পদ্মাপুরাণ আছে। খাগড়ার কলম এবং কোনো এক গাছের কষ ব্যবহার করে পুরাণটির অনুলিখন করেছেন আমার দাদাশ্বশুরের বাবা । কাব্যগ্রন্থটির মূল লেখক ষষ্ঠীবর দত্ত। ধারণা করছি, ষষ্ঠীবরের পদ্মাপুরাণটি মুদ্রিত হওয়ার আগেই পাণ্ডুলিপি থেকে কিংবা যেকোনো অজানা উৎস থেকে তিনি এটির অনুলিখন করেছিলেন। অতিচমৎকার হরফে প্রায় দেড়শত বছর আগে লিখা বইটি কাঠের তক্তা দিয়ে মলাটবদ্ধ করা হয়েছে।
ষষ্ঠীবরের পাশাপাশি সে সময়ে বিপ্রদাস , গঙ্গাদাস সেন, দ্বিজ বংশীদাস, জগজ্জীবন ঘোষাল , জীবন মৈত্র প্রভৃতি আরো অনেক কবিই দেবী মনসার গান রচনা করেছেন । তাঁদেরমধ্যে উল্লেখ্য হলেন কবি বিজয়গুপ্ত। স্পষ্টতোই দেবতার চেয়ে মানবতাকে বড় করে উপস্থান করে তিনি রচনা করেছিলেন ‘পদ্মাপুরাণ’। তবে বিজয়গুপ্তের আগ হতেই মনসা মাহাত্ম্য প্রচলিত ছিল গ্রামীন জনপদে। বিজয়গুপ্তের কথাতেই পাওয়া যায় তার প্রমান। তিনি মনসার উক্তিতেই বললেন-
“মূর্খে রচিল গীত না জানে মাহাত্ম্য।
প্রথমে রচিল গীত কানা হরি দত্ত।।”
অর্থাৎ “কানা হরি দত্ত” নামের অন্য একজন কবিই মনসামঙ্গল কাব্যের আদি কবি।
তখনকার প্রজাবৎসল রাজাদের পৃষ্টপোষকতায় যে সাহিত্যের জন্ম হয়েছিলো তা এত এত বছর পরেও নিভৃতপল্লীর সহজ সরল মানুষের গভীর বিশ্বাসকে নাড়িয়ে দিয়ে যাচ্ছে। এটাই কবিতার সত্যিকারের মাহাত্ম্য, এখানেই একজন কবির অমরত্ব। সেই সাথে স্মরণীয় হয়ে আছেন তখনকার রাজাও। বিজয়গুপ্তের একটা স্তবক থেকে বিষয়টা চমৎকার অনুধাবিত হয়। কবি লিখলেন-
“ঋতু শূন্য বেদ শশী পরিমিত শক,
সুলতান হোসেন শাহ্ নৃপতি তিলক”।
লাইনটি বিশ্লেষণ করলে দাঁড়ায় – ঋতুর ৬, শূন্য ০, বেদ হতে ৪ ( চতুর্বেদ) , শশী মানে এক চন্দ্র ১। এর মানে হলো ১৪০৬ শকাব্দ অর্থ্যাৎ ১৪৮৪ খ্রিষ্টাব্দ এবং ‘হোসেন শাহ্ নৃপতি তিলক” মানে হলো- জালালউদ্দিন হোসেন শাহের শাসনামল, সুলতানের প্রজাবাৎসল্য, শান্তিতে প্রজাদের বসবাসের পরিচয়।

বর্তমান সময়ের একজন গবেষক- কায়সার হক মনসামঙ্গলগুলোর একটি সমন্বিত সংস্করণ ইংরেজি ভাষায় প্রকাশ করেছেন। ২০১৫ সালে তাঁর রচিত “দ্য ট্রায়াম্ফ অব দ্য স্নেক গডেস” নামের সে বইটি প্রকাশ করেছে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস। তবে পদ্যে নয়, তিনি গদ্যে লিখেছেন বইটি। সবগুলো মনসামঙ্গল কাব্য চষে সেগুলোর মধ্য থেকে একটি সুতো নিয়ে তিনি এই গ্রন্থে নতুন একটি গল্প বুনেছেন এবং এর মধ্যদিয়ে তিনি কয়েকশ বছর পূর্বের আখ্যানকে নতুন করে দেখানোর একটা প্রয়াস করেছেন।
মনসামঙ্গলের কোন ধর্মীয়গ্রন্থের চেয়েও বড় এক পরিচয় হলো এটি মহাকাব্য। শওকত ওসমানের আদমজী পুরষ্কার প্রাপ্ত ‘ক্রীতদাসের হাসি’ বইটার শুরুতে যেমন কৌশলে কিছু লাইন লেখা হয়েছে যেন পাকিস্তান সরকার বইটি ব্যান করে না দেয়, সেরকম মনসামঙ্গলেও মব-সাইকোলজি ব্যবহৃত হয়েছে এবং সর্বোপরি দেবী মনসার চেয়ে মর্তের মানুষ চাঁদ সদাগর এর গুণকীর্তন বেশি করা হয়েছে।
তবুও একথা সত্য যে, মনসা দেবীর প্রভাবের মত, কালের পরিক্রমায় সেই রয়ানী গানও একটু একটু করে হারিয়ে যাচ্ছে।


























