পাখির অভয়ারণ্য হবিগঞ্জের রেমা-কালেঙ্গা
- আপডেট সময় : ০৮:৩৪:১২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৬ মার্চ ২০২৫
- / 155
অরণ্য সবুজের ভিড়ে হারাতে অনেকেই চায়। সঙ্গে যদি হয় পাতার শব্দ আর পাখির কিচিরমিচির, তাহলে তো আকর্ষণ আরো বেড়ে যায়। এমনই এক পর্যটন স্থান হবিগঞ্জের রেমা-কালেঙ্গা। পাখির কিচিরমিচিরের সঙ্গে কখনো কখনো চোখে পড়ে দুর্লভ প্রজাতির কোনো গাছ বা অদ্ভুত কোনো বন্য প্রাণী।
আবার হাঁটতে হাঁটতে কখনো চোখে আটকাতে পারে কোনো এক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী শিশুর স্তম্ভিত চাহনি। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের এই অভয়ারণ্য সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক আজকের প্রতিবেদনে। সঙ্গে কিভাবে যাবেন, কত খরচ হতে পারে, তা জানুন বিস্তারিত।
রেমা-কালেঙ্গার অবস্থান
দেশের পূর্বাঞ্চলের বিভাগ সিলেটের হবিগঞ্জ জেলার চুনারুঘাট উপজেলায় অবস্থিত এই অভয়ারণ্য।
সুন্দরবনের পরেই এই শুকনো ও চিরহরিৎ বনটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম প্রাকৃতিক বনভূমি। একই সঙ্গে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বন্য প্রাণী অভয়ারণ্য হিসেবেও স্বীকৃত এই অঞ্চলটি। অভয়ারণ্যটির আয়তন ১ হাজার ৭৯৫ দশমিক ৫৪ হেক্টর। হবিগঞ্জ বন বিভাগের কালেঙ্গা রেঞ্জের রেমা, কালেঙ্গা, ও ছনবাড়ী- এই তিনটি বিট পড়েছে অভয়ারণ্যের মধ্যে।
কিভাবে যাবেন
ঢাকা বা দেশের যেকোনো স্থান থেকে প্রথমে পৌঁছাতে হবে হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জে। তবে শ্রীমঙ্গল হয়ে গেলে একসঙ্গে দুই অঞ্চলের পর্যটন স্থানগুলো ভ্রমণ করা যাবে। ঢাকা থেকে বাস ও ট্রেন, উভয় বাহনেই যাওয়া যায় এই স্থানে। শায়েস্তাগঞ্জ বা শ্রীমঙ্গল, দুই জায়গা থেকেই সরাসরি কালেঙ্গা যাওয়ার অটোরিকশা বা জিপ গাড়ি পাওয়া যায়। শ্রীমঙ্গল থেকে জিপে করে কালেঙ্গা যেতে খরচ পড়বে ২ থেকে ৩ হাজার টাকা।
রেমা-কালেঙ্গায় আর কী দেখবেন
বনে প্রবেশ করতেই স্বাগত জানাবে মনোরম একটি লেক। পাশেই সুউচ্চ ওয়াচ টাওয়ার, যেখান থেকে পুরো বনভূমি একনজরে দেখে নেওয়া যায়। এই অভয়ারণ্যে ৬৩৮ প্রজাতির উদ্ভিদ, ৩৭ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ৭ প্রজাতির উভচর প্রাণী, ১৮ প্রজাতির সরীসৃপ ও ১৬৭ প্রজাতির পাখি রয়েছে। পাখিপ্রেমীদের জন্য এই অভয়ারণ্য সর্বোত্তম জায়গা। তবে একসঙ্গে অনেক পাখির দেখা পাওয়ার জন্য খুব ভোরে বনের ভেতর ঢুকতে হবে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে পাহাড়ি ময়না, ভিমরাজ, কাও ধনেশ, ফোটা কান্টি সাতভারলা, শালিক, শ্যামা, শামুক খাওরি, টুনটুনিসহ আরো দুর্লভ প্রজাতির পাখি।
এখানকার প্রধান আকর্ষণের মধ্যে রয়েছে শকুন দর্শন। বনভূমিটি শকুনের নিরাপদ অভয়ারণ্য হিসেবে জাতীয়ভাবে স্বীকৃত। এই বনে ৩ প্রজাতির বানরের দেখা মেলে। এগুলো হলো- লাল বানর, নিশাচর লজ্জাবতী বানর এবং উল্টোলেজি বানর। এ বনে কাঠবিড়ালি আছে ৫ প্রজাতির, যেগুলোর মধ্যে বিরল প্রজাতির মালয়ান বড় কাঠবিড়ালি শুধু এখানেই পাওয়া যায়। সাপের মধ্যে দেখা যায় দুধরাজ, কোবরা, দাঁড়াশ ও লাউডগা।
এই বন্য প্রাণী অভয়ারণ্যে ট্রেকিংয়ের জন্য রয়েছে ৩টি ট্রেইল। একটি আধঘণ্টার, একটি ১ ঘণ্টার এবং একটি ৩ ঘণ্টার পথ। এই পথে দেখা হয়ে যাবে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের সঙ্গে। এখানে মোট ৪টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বসবাস। তারা হলো ত্রিপুরা, সাঁওতাল, উড়ং ও তেলুগু।
কখন যাবেন
এই বনভূমিতে বৃষ্টির মৌসুম বাদে বছরের যেকোনো সময়েই ঘুরতে যাওয়া যায়। বর্ষায় ৩টি ট্রেইলের ২টিই চলাচলের একদম অযোগ্য হয়ে পড়ে। গরমে পাহাড়ি জংলা পথে অল্প হাটতেই ক্লান্তি চলে আসবে। তাই এই অভয়ারণ্য ভ্রমণের সেরা সময় হচ্ছে পুরোটা শীত এবং বসন্তের শুরু তথা ফাল্গুন মাস। ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির যেকোনো দিন এখানে ঘুরে আসা যেতে পারে।
থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা
এখানে বন বিভাগের বাংলো রয়েছে। তবে এখানে থাকতে সিলেট বন কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিতে হবে। এ ছাড়া কয়েকটি বেসরকারি রিসোর্টও আছে। এগুলোতে ৭০০ থেকে ১ হাজার টাকায় থাকা যেতে পারে। প্রতি বেলা খাবারের জন্য খরচ হতে পারে মাথাপিছু ২০০ টাকা।
ভ্রমণকালীন কিছু সতর্কতা
- অভয়ারণ্য ভ্রমণে দিক নির্দেশনা ও থাকা-খাওয়া বন্দোবস্তের জন্য সঙ্গে অবশ্যই গাইড নেওয়া আবশ্যক।
- ট্রেকিংয়ের সময় সঙ্গে হালকা শুকনা খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও স্যালাইন রাখা জরুরি।
- জংলি জোঁক থেকে বাঁচতে পায়ে বড় মোজা পরা যেতে পারে কিংবা সঙ্গে লবণ রাখা ভালো।
- বনের জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশ রক্ষার্থে যেখানে সেখানে পলিথিন, খাবারের উচ্ছিষ্ট, প্যাকেট ও পানির বোতল ফেলা থেকে বিরত থাকতে হবে।


























