ডোরা দেখে নেই ভয়, মেছো বিড়াল বাঘ নয়! আই সুজুকি
- আপডেট সময় : ০১:১৯:৪৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২০ জানুয়ারী ২০২৬
- / 54
মৌলভীবাজারের হাকালুকি হাওরবেষ্টিত বড়লেখা উপজেলার খুটাউড়া এলাকায় “ডোরা দেখে নেই ভয়, মেছো বিড়াল বাঘ নয়” এই স্লোগানকে সামনে রেখে একটি জনসচেতনতা মূলক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সোমবার (১৯ জানুয়ারি) বিকালে খোটাউরা এলাকায় অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় সভাপতিত্ব করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. এম. এ. আজিজ। সঞ্চালনায় ছিলেন, আমিনুর রহমান শান্ত।
সভায় বড়লেখা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) নাইমা নাদিয়া বলেন, “বড়লেখা হাওরবেষ্টিত হওয়ায় এখানে এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান আয়োজন অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। মেছো বিড়াল যেন কেউ হত্যা বা নিধন না করে, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। অন্যথায় বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ অনুযায়ী আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। মহান আল্লাহ তাআলা প্রতিটি প্রাণী মানুষের উপকারের জন্য সৃষ্টি করেছেন। সুতরাং মানুষের কল্যাণের স্বার্থেই এসব প্রাণীকে রক্ষা করা আমাদের অত্যন্ত জরুরি।”
জাপানের রিৎসুমেইকান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আই সুজুকি বলেন, ডোরা দেখে নেই ভয়, মেছো বিড়াল বাঘ নয়! সুতরাং তাঁকে ভয় পাওয়া কিছু নেই। আজকে আপনাদের সামনে উপস্থিত হতে পেরে আমি অত্যন্ত আনন্দিত। এই প্রকল্পের সঙ্গে যারা আন্তরিক ও পরিশ্রমের সঙ্গে কাজ করেছেন, তাদের সকলের প্রতি আমি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। মেছো বিড়াল সংরক্ষণে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। অনেক সময় মানুষ মেছো বিড়ালকে বাঘ ভেবে ভুল ধারণা তৈরি করে, কিন্তু এটি মানুষের জন্য ক্ষতিকর নয়। এ বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করা জরুরি।”
তিনি আরও জানান, নিজ উদ্যোগে নির্মিত একটি ভিডিও ডকুমেন্টারিতে মেছো বিড়ালের গুরুত্ব এবং মানুষের জন্য ক্ষতিকর নয় তা তথ্যভিত্তিকভাবে দেখানো হয়েছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. এম. এ. আজিজ বলেন, “মেছো বিড়াল পৃথিবীর মাত্র চার-পাঁচটি দেশে পাওয়া যায় ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল ও থাইল্যান্ড। অন্যান্য দেশের তুলনায় ভালো অবস্থানে মেছো বিড়াল রয়েছে বাংলাদেশে। এতো ছোট একটি দেশ এবং বিপুল জনসংখ্যার মাঝেও এই প্রাণীটি টিকে থাকা সম্ভব হয়েছে সাধারণ মানুষের সহযোগিতা ছাড়া নয়। বাংলাদেশের প্রায় আটটি বিড়াল জাতীয় বন্যপ্রাণী রয়েছে, তবে মানুষের চাপ ও অন্যান্য কারণে এদের অনেকের অবস্থান এখন ভালো নয়। মেছো বিড়াল সংরক্ষণে আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। একে রক্ষা করলে শুধু একটি প্রজাতিই নয়, পুরো প্রাকৃতিক ভারসাম্যও রক্ষিত হবে।”
বিভাগীয় বন কর্মকর্তা বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চল (সিলেট) মোঃ আবুল কালাম বলেন, “একটি মেছো বিড়াল তার জীবদ্দশায় প্রায় ৫০ লাখ টাকার ফসল রক্ষা করে। হাকালুকি হাওর এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম হাওর, যেখানে মেছো বিড়ালের প্রাকৃতিক আবাসস্থল ছড়িয়ে–ছিটিয়ে রয়েছে। দুঃখজনক হলেও সত্য, অনেক সময় মানুষ মেছো বিড়ালকে আটক করে এবং বন বিভাগের ওপর চাপ সৃষ্টি করে সেটিকে উদ্ধার করার জন্য। অথচ যেখান থেকে মেছো বিড়ালটি আটক করা হয়, সেটিই তার মূল আবাসস্থল। সচেতনতা থাকলে মানুষকে বুঝিয়ে সেই স্থানে ছেড়ে দেওয়া সম্ভব, যা আমাদের কাজ অনেক সহজ করে এবং মেছো বিড়ালও নিরাপদে টিকে থাকে।”

বন সংরক্ষক, বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চল, বন অধিদপ্তর (ঢাকা) মোঃ সানাউল্যা পাটওয়ারী বলেন, “হাকালুকি হাওরে মেছো বিড়ালসহ নানান প্রজাতির বন্যপ্রাণীর বসবাস রয়েছে। এখানে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পাখির কলনিও রয়েছে, যেগুলো টিকিয়ে রাখা অত্যন্ত জরুরি। ইকোসিস্টেমের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে পাখি ও অন্যান্য বন্যপ্রাণী মেছো বিড়ালের সঙ্গে পারস্পরিকভাবে সম্পর্কযুক্ত। মেছো বিড়াল নীরবে কৃষকের ফসল রক্ষা করে এবং রোগাক্রান্ত মাছ খেয়ে হাওরের পানিকে দূষণ থেকে বাঁচায়। ফলে মেছো বিড়ালসহ বন্যপ্রাণী না থাকলে হাওরের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হবে এবং মাছ উৎপাদনেও ব্যাঘাত ঘটবে।”
প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বন সংরক্ষক, বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চল বন অধিদপ্তর (ঢাকা) মো. ছানাউল্যা পাটুওয়ারী। বিশেষ অতিথি ছিলেন বড়লেখা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) নাইমা নাদিয়া। এছাড়া বনপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ সিলেটের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. আবুল কালাম এবং জাপানের রিৎসুমেইকান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. আই সুজুকি। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন জায়গা থেকে আগত পরিবেশকর্মী, শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।
সভা শেষে সকলেই মেছো বিড়ালের সংরক্ষণে সচেতন হওয়ার এবং হাকালুকি হাওরের পরিবেশ রক্ষায় সম্মিলিতভাবে কাজ করার শপথ নেন।
ষাটমাকন্ঠ/ খোর্শেদ/ টি ই আর



















