০৩:১৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম ::
Logo চলন্ত ট্রেনে যাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ Logo গ্রীনহিল স্টেট কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে যোগ দিলেন মো. নিয়াজ উদ্দীন Logo হারিয়ে যায়নি চিঠি, বদলেছে শুধু রূপ : মাটির ফলক থেকে ডিজিটাল ইনবক্স Logo দুর্গম এলাকায় ডিজিটাল নজরদারি বাড়াবে বিজিবি, তৈরি হবে নিজস্ব ড্রোন সক্ষমতা- সিলেটে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী Logo অ্যান্টিবায়োটিক সংকট: ওষুধহীন অন্ধকার যুগের পথে মানবসভ্যতা Logo এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের প্রথম নারী সার্ফার ফাতিমা Logo প্যারিসে টেক্সওয়ার্ল্ড অ্যাপারেল সোর্সিং মেলা ২০২৬ শুরু, উদ্বোধন হলো বাংলাদেশ প্যাভিলিয়ন Logo গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে দুর্বার গতিতে ছুটে চলেছে বিএনপি Logo সিলেটে মানবাধিকারকর্মী মিনহাজ সামাদ চৌধুরী নিখোঁজ Logo বড়লেখায় বিজিবির অভিযানে ইয়াবাসহ দুই মাদক কারবারি আটক

মানুষ কেন দুঃখ পায়?

শ্রেয়ান ঘোষ
  • আপডেট সময় : ০৯:০২:৩১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬
  • / 446
যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের সর্বশেষ খবর জানতে ভিজিট করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

সৃষ্টির শুরু থেকে মানুষ আজও ঘুরে বেড়াচ্ছে এক প্রশ্নের উত্তরের সন্ধানে-মানুষ কেন দুঃখ পায়?

তথাগত গৌতম বুদ্ধ যখন বোধি বা জ্ঞান লাভ করেন, তখন তিনি চারটি আর্যসত্য উপলব্ধি করেন। এর প্রথমটি হলো-‘সর্বং দুঃখম্’; অর্থাৎ সংসারের সবকিছুই দুঃখময়। তাঁর এই উপলব্ধ জ্ঞান মানবসভ্যতার বিকাশ, চিন্তা, চেতনা ও জীবনদর্শনে গভীর প্রভাব ফেলেছে।

আজকের আধুনিক যুগে মানুষের ব্যস্ততা বেড়েছে, কাজের চাপ বেড়েছে। আমাদের সময় হয় না প্রতিবেশীর খোঁজ নেওয়ার, সময় হয় না ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সঙ্গে একটু কথা বলার। এত ব্যস্ততা ও সময়ের সংকটের মধ্যেও যে বিষয়টি বদলায়নি, তা হলো মানুষের চিরন্তন দুঃখবোধ। এই দুঃখ শুধু শারীরিক নয়, মানসিকও।

প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে মানুষকে দুঃখ ও দুর্দশা থেকে মুক্তির পথ দেখাতে কপিলাবস্তুর রাজা শুদ্ধোধন ও রানি মায়াদেবীর পুত্র সিদ্ধার্থ গৌতম মাত্র ২৯ বছর বয়সে গৃহত্যাগ করেছিলেন। তিনি অনুসন্ধান করতে থাকেন মানুষের এই সীমাহীন মানসিক যন্ত্রণার কারণ। তাঁর সেই অনুসন্ধানের কেন্দ্রীয় উপলব্ধি ছিল—সুখ, আনন্দ কিংবা প্রমোদ মানবজীবনে স্থায়ী নয়। আমরা সুখ পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় অনেক সময় নিজেরাই দুঃখের কারণ তৈরি করি। অথচ ভুলে যাই, এই পৃথিবীতে কোনো কিছুই স্থায়ী নয়; এমনকি কোনো কিছুই চিরদিনের জন্য আমাদের নয়।

বর্তমান ভোগবাদী অর্থনীতির যুগে চাহিদা পূরণের পাশাপাশি প্রতিনিয়ত নতুন চাহিদা তৈরি হচ্ছে। বিজ্ঞাপনের রঙিন আলো আমাদের মনকে আরও বেশি আকাঙ্ক্ষায় উদ্বুদ্ধ করছে। কিছু পণ্য এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা এখন কেবল প্রয়োজন মেটানোর উপকরণ নয়; বরং সামাজিক অবস্থান ও ব্যক্তিগত সাফল্য প্রদর্শনের সূক্ষ্ম মাধ্যম। কিন্তু বাস্তব জীবনে এসবের কতটুকু সত্যিই প্রয়োজন?

অন্যদিকে পৃথিবীর এক প্রান্তে যখন মানুষ অতিরিক্ত ভোগের প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত, অন্য প্রান্তে তখন ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও পুষ্টিহীনতা মানুষের জীবনকে বিপন্ন করছে। ব্যক্তিগত অর্জন আজ সাফল্যের অন্যতম মাপকাঠিতে পরিণত হয়েছে। তাই প্রশ্ন জাগে- আমরা কি আমাদের আকাঙ্ক্ষাকে নিয়ন্ত্রণ করছি, নাকি আমাদের আকাঙ্ক্ষাই আমাদের নিয়ন্ত্রণ করছে?

মানুষ পরিবর্তনশীলতাকে সহজে মেনে নিতে পারে না। অথচ আমাদের চারপাশের সবকিছুই পরিবর্তনশীল। মানুষের মন, রাষ্ট্র, সমাজ, জাতি, মানচিত্র, প্রযুক্তি, চিন্তা, চেতনা- এমনকি ব্যক্তিত্বও সময়ের সঙ্গে বদলে যায়। পরিবর্তনকে মেনে নিতে না পারার কারণেই মানুষের মনে জন্ম নেয় হতাশা ও দুঃখ। বুদ্ধের দর্শনে তাই অনিত্যবাদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ‘অনিত্য’ অর্থ- যা ক্ষণস্থায়ী, যা নশ্বর, যা পরিবর্তনশীল।

‘তথাগত’ শব্দটির অর্থ নিয়েও গভীর দার্শনিক ব্যাখ্যা রয়েছে। বুদ্ধ যখন রাজপ্রাসাদ ত্যাগ করে গভীর সাধনায় নিমগ্ন হলেন, তখন চরম ক্ষুধা ও শারীরিক দুর্বলতা তাঁকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল। একপর্যায়ে তিনি উপলব্ধি করলেন, চরম ভোগ কিংবা চরম কৃচ্ছ্রসাধন—কোনোটিই মুক্তির পথ নয়। সেখান থেকেই তিনি গ্রহণ করলেন মধ্যমার্গ বা মধ্যপন্থা।

মধ্যমার্গ মূলত ভারসাম্য, সংযম ও পরিমিতিবোধের শিক্ষা দেয়। অতিরিক্ত ব্যয়, অতিরিক্ত ভোগ, খাবার, বিনোদন কিংবা প্রদর্শন- এসবের আদৌ কতটা প্রয়োজন? অতিরিক্ত ভোগ শুধু নিজের আকাঙ্ক্ষাকেই আগ্রাসী করে না, অন্যের মধ্যেও একই ধরনের প্রতিযোগিতা ও অস্থিরতা তৈরি করে।

আজকের পৃথিবীতে মানসিক অস্থিরতা যেন আরেক ধরনের মহামারি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিভিন্ন প্রতিবেদনে মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যার ব্যাপক বিস্তারের কথা উঠে এসেছে। বাংলাদেশেও বিষণ্নতা ও উদ্বেগজনিত সমস্যায় বিপুলসংখ্যক মানুষ ভুগছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে এই অস্থিরতা আরও দৃশ্যমান। মানুষ নিজের জীবনকে অন্যের জীবনের সঙ্গে তুলনা করছে। অন্যের সাজানো, সুন্দর ও ‘পারফেক্ট’ জীবনের ছবি দেখে মনে হচ্ছে-আমার জীবনটাও কেন এমন নয়?

কিন্তু আমরা ভুলে যাই, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা জীবন সম্পূর্ণ জীবন নয়; সেটি জীবনের নির্বাচিত কিছু মুহূর্ত মাত্র।

বুদ্ধের শিক্ষা তাই শুধু শান্ত থাকার শিক্ষা নয়; বরং নিজেকে বোঝার শিক্ষা। নিজের মন, আকাঙ্ক্ষা, ভয়, হতাশা ও প্রত্যাশাকে পর্যবেক্ষণ করার শিক্ষা। কারণ মানুষ অনেক সময় নিজের সবচেয়ে কাছের মানুষটিকেই চেনে না-নিজেকেই।

বলা হয়, কেউ যদি চন্দনবনের মধ্য দিয়ে হেঁটে যায় অথচ চন্দনগাছ চিনতে না পারে, তবে সেই বন তার কাছে অর্থহীন। মানুষের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। নিজের ভেতরের সম্ভাবনা, অস্থিরতা ও আকাঙ্ক্ষাকে না চিনলে বাইরের পৃথিবী যতই সুন্দর হোক, শান্তি পাওয়া কঠিন।

পৃথিবী বদলেছে। বদলেছে সমাজ, প্রযুক্তি, যোগাযোগব্যবস্থা, রাষ্ট্র, অর্থনীতি ও জীবনযাপন। কিন্তু মানুষের মৌলিক অভিজ্ঞতা খুব একটা বদলায়নি। আমরা এখনো অতীত নিয়ে অনুতপ্ত হই, ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হই, বর্তমানকে উপেক্ষা করি। সুখকে ধরে রাখতে চাই, অথচ জানি-সুখও অনিত্য।

তথাগত কোনো নতুন পৃথিবীর প্রতিশ্রুতি দেননি। তিনি বরং নিজের অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির দিকে ফিরে তাকাতে বলেছেন; সেগুলোকে পর্যবেক্ষণ করতে, বিশ্লেষণ করতে এবং বুঝতে বলেছেন। বুদ্ধের প্রাসঙ্গিকতা তাই শুধু তাঁর প্রাচীনত্বে নয়; বরং মানুষের কিছু মৌলিক প্রশ্নের চিরন্তন অস্তিত্বে।

আজও আমরা সুখ চাই, কিন্তু সুখের সংজ্ঞা জানি না। আমরা সাফল্য চাই, কিন্তু সাফল্য কেন চাই-তা অনেক সময় ভেবে দেখি না। আমরা আরও বেশি চাই, অথচ কতটুকু প্রয়োজন, সেই সীমারেখা নির্ধারণ করি না।

তাই আড়াই হাজার বছর পরও প্রশ্নটি আমাদের সামনে একইভাবে দাঁড়িয়ে আছে-

আমরা কি সত্যিই জানি, আমরা কী চাই?

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

মানুষ কেন দুঃখ পায়?

আপডেট সময় : ০৯:০২:৩১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬

সৃষ্টির শুরু থেকে মানুষ আজও ঘুরে বেড়াচ্ছে এক প্রশ্নের উত্তরের সন্ধানে-মানুষ কেন দুঃখ পায়?

তথাগত গৌতম বুদ্ধ যখন বোধি বা জ্ঞান লাভ করেন, তখন তিনি চারটি আর্যসত্য উপলব্ধি করেন। এর প্রথমটি হলো-‘সর্বং দুঃখম্’; অর্থাৎ সংসারের সবকিছুই দুঃখময়। তাঁর এই উপলব্ধ জ্ঞান মানবসভ্যতার বিকাশ, চিন্তা, চেতনা ও জীবনদর্শনে গভীর প্রভাব ফেলেছে।

আজকের আধুনিক যুগে মানুষের ব্যস্ততা বেড়েছে, কাজের চাপ বেড়েছে। আমাদের সময় হয় না প্রতিবেশীর খোঁজ নেওয়ার, সময় হয় না ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সঙ্গে একটু কথা বলার। এত ব্যস্ততা ও সময়ের সংকটের মধ্যেও যে বিষয়টি বদলায়নি, তা হলো মানুষের চিরন্তন দুঃখবোধ। এই দুঃখ শুধু শারীরিক নয়, মানসিকও।

প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে মানুষকে দুঃখ ও দুর্দশা থেকে মুক্তির পথ দেখাতে কপিলাবস্তুর রাজা শুদ্ধোধন ও রানি মায়াদেবীর পুত্র সিদ্ধার্থ গৌতম মাত্র ২৯ বছর বয়সে গৃহত্যাগ করেছিলেন। তিনি অনুসন্ধান করতে থাকেন মানুষের এই সীমাহীন মানসিক যন্ত্রণার কারণ। তাঁর সেই অনুসন্ধানের কেন্দ্রীয় উপলব্ধি ছিল—সুখ, আনন্দ কিংবা প্রমোদ মানবজীবনে স্থায়ী নয়। আমরা সুখ পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় অনেক সময় নিজেরাই দুঃখের কারণ তৈরি করি। অথচ ভুলে যাই, এই পৃথিবীতে কোনো কিছুই স্থায়ী নয়; এমনকি কোনো কিছুই চিরদিনের জন্য আমাদের নয়।

বর্তমান ভোগবাদী অর্থনীতির যুগে চাহিদা পূরণের পাশাপাশি প্রতিনিয়ত নতুন চাহিদা তৈরি হচ্ছে। বিজ্ঞাপনের রঙিন আলো আমাদের মনকে আরও বেশি আকাঙ্ক্ষায় উদ্বুদ্ধ করছে। কিছু পণ্য এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা এখন কেবল প্রয়োজন মেটানোর উপকরণ নয়; বরং সামাজিক অবস্থান ও ব্যক্তিগত সাফল্য প্রদর্শনের সূক্ষ্ম মাধ্যম। কিন্তু বাস্তব জীবনে এসবের কতটুকু সত্যিই প্রয়োজন?

অন্যদিকে পৃথিবীর এক প্রান্তে যখন মানুষ অতিরিক্ত ভোগের প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত, অন্য প্রান্তে তখন ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও পুষ্টিহীনতা মানুষের জীবনকে বিপন্ন করছে। ব্যক্তিগত অর্জন আজ সাফল্যের অন্যতম মাপকাঠিতে পরিণত হয়েছে। তাই প্রশ্ন জাগে- আমরা কি আমাদের আকাঙ্ক্ষাকে নিয়ন্ত্রণ করছি, নাকি আমাদের আকাঙ্ক্ষাই আমাদের নিয়ন্ত্রণ করছে?

মানুষ পরিবর্তনশীলতাকে সহজে মেনে নিতে পারে না। অথচ আমাদের চারপাশের সবকিছুই পরিবর্তনশীল। মানুষের মন, রাষ্ট্র, সমাজ, জাতি, মানচিত্র, প্রযুক্তি, চিন্তা, চেতনা- এমনকি ব্যক্তিত্বও সময়ের সঙ্গে বদলে যায়। পরিবর্তনকে মেনে নিতে না পারার কারণেই মানুষের মনে জন্ম নেয় হতাশা ও দুঃখ। বুদ্ধের দর্শনে তাই অনিত্যবাদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ‘অনিত্য’ অর্থ- যা ক্ষণস্থায়ী, যা নশ্বর, যা পরিবর্তনশীল।

‘তথাগত’ শব্দটির অর্থ নিয়েও গভীর দার্শনিক ব্যাখ্যা রয়েছে। বুদ্ধ যখন রাজপ্রাসাদ ত্যাগ করে গভীর সাধনায় নিমগ্ন হলেন, তখন চরম ক্ষুধা ও শারীরিক দুর্বলতা তাঁকে আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল। একপর্যায়ে তিনি উপলব্ধি করলেন, চরম ভোগ কিংবা চরম কৃচ্ছ্রসাধন—কোনোটিই মুক্তির পথ নয়। সেখান থেকেই তিনি গ্রহণ করলেন মধ্যমার্গ বা মধ্যপন্থা।

মধ্যমার্গ মূলত ভারসাম্য, সংযম ও পরিমিতিবোধের শিক্ষা দেয়। অতিরিক্ত ব্যয়, অতিরিক্ত ভোগ, খাবার, বিনোদন কিংবা প্রদর্শন- এসবের আদৌ কতটা প্রয়োজন? অতিরিক্ত ভোগ শুধু নিজের আকাঙ্ক্ষাকেই আগ্রাসী করে না, অন্যের মধ্যেও একই ধরনের প্রতিযোগিতা ও অস্থিরতা তৈরি করে।

আজকের পৃথিবীতে মানসিক অস্থিরতা যেন আরেক ধরনের মহামারি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বিভিন্ন প্রতিবেদনে মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যার ব্যাপক বিস্তারের কথা উঠে এসেছে। বাংলাদেশেও বিষণ্নতা ও উদ্বেগজনিত সমস্যায় বিপুলসংখ্যক মানুষ ভুগছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে এই অস্থিরতা আরও দৃশ্যমান। মানুষ নিজের জীবনকে অন্যের জীবনের সঙ্গে তুলনা করছে। অন্যের সাজানো, সুন্দর ও ‘পারফেক্ট’ জীবনের ছবি দেখে মনে হচ্ছে-আমার জীবনটাও কেন এমন নয়?

কিন্তু আমরা ভুলে যাই, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা জীবন সম্পূর্ণ জীবন নয়; সেটি জীবনের নির্বাচিত কিছু মুহূর্ত মাত্র।

বুদ্ধের শিক্ষা তাই শুধু শান্ত থাকার শিক্ষা নয়; বরং নিজেকে বোঝার শিক্ষা। নিজের মন, আকাঙ্ক্ষা, ভয়, হতাশা ও প্রত্যাশাকে পর্যবেক্ষণ করার শিক্ষা। কারণ মানুষ অনেক সময় নিজের সবচেয়ে কাছের মানুষটিকেই চেনে না-নিজেকেই।

বলা হয়, কেউ যদি চন্দনবনের মধ্য দিয়ে হেঁটে যায় অথচ চন্দনগাছ চিনতে না পারে, তবে সেই বন তার কাছে অর্থহীন। মানুষের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। নিজের ভেতরের সম্ভাবনা, অস্থিরতা ও আকাঙ্ক্ষাকে না চিনলে বাইরের পৃথিবী যতই সুন্দর হোক, শান্তি পাওয়া কঠিন।

পৃথিবী বদলেছে। বদলেছে সমাজ, প্রযুক্তি, যোগাযোগব্যবস্থা, রাষ্ট্র, অর্থনীতি ও জীবনযাপন। কিন্তু মানুষের মৌলিক অভিজ্ঞতা খুব একটা বদলায়নি। আমরা এখনো অতীত নিয়ে অনুতপ্ত হই, ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হই, বর্তমানকে উপেক্ষা করি। সুখকে ধরে রাখতে চাই, অথচ জানি-সুখও অনিত্য।

তথাগত কোনো নতুন পৃথিবীর প্রতিশ্রুতি দেননি। তিনি বরং নিজের অভিজ্ঞতা ও অনুভূতির দিকে ফিরে তাকাতে বলেছেন; সেগুলোকে পর্যবেক্ষণ করতে, বিশ্লেষণ করতে এবং বুঝতে বলেছেন। বুদ্ধের প্রাসঙ্গিকতা তাই শুধু তাঁর প্রাচীনত্বে নয়; বরং মানুষের কিছু মৌলিক প্রশ্নের চিরন্তন অস্তিত্বে।

আজও আমরা সুখ চাই, কিন্তু সুখের সংজ্ঞা জানি না। আমরা সাফল্য চাই, কিন্তু সাফল্য কেন চাই-তা অনেক সময় ভেবে দেখি না। আমরা আরও বেশি চাই, অথচ কতটুকু প্রয়োজন, সেই সীমারেখা নির্ধারণ করি না।

তাই আড়াই হাজার বছর পরও প্রশ্নটি আমাদের সামনে একইভাবে দাঁড়িয়ে আছে-

আমরা কি সত্যিই জানি, আমরা কী চাই?