শিক্ষাব্যবস্থার এই হাল কেন?
বড়লেখায় এসএসসি ফলাফলে ৯৮ থেকে ২৩ শতাংশ
- আপডেট সময় : ০৬:৫৮:৫৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬
- / 203
বড়লেখার ২০২৬ সালের এসএসসি ফলাফল উদ্যাপনের পাশাপাশি আত্মসমালোচনারও দাবি রাখে। উপজেলার ৩৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সর্বোচ্চ পাসের হার ৯৮ দশমিক ১৪ শতাংশ, সর্বনিম্ন ২৩ দশমিক ৬৮ শতাংশ। ব্যবধান ৭৪ দশমিক ৪৬ শতাংশ পয়েন্ট। কোথাও ১৬১ পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১৫৮ জন পাস করেছে, ৩৩ জন পেয়েছে জিপিএ-৫, আবার কোথাও ৩৮ জনের মধ্যে মাত্র ৯ জন উত্তীর্ণ হয়েছে।
একই উপজেলা, একই শিক্ষা বোর্ড, একই পাঠ্যক্রম অথচ ব্যবধান আকাশ-পাতাল!
এ প্রশ্নের উত্তর শুধু শিক্ষার্থীর মেধা, অমনোযোগ বা পরিশ্রমের ঘাটতির মধ্যে খুঁজলে মূল সমস্যাকেই আড়াল করা হবে। এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত বিদ্যালয়ের পাঠদানের মান, শিক্ষকসংকট, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, প্রতিষ্ঠানপ্রধানের নেতৃত্ব, অভিভাবকের নজরদারি এবং শিক্ষা প্রশাসনের তদারকি।
ভালো ফল করা প্রতিষ্ঠানগুলো দেখিয়েছে, পরিকল্পিত পাঠদান, নিয়মিত মূল্যায়ন, দুর্বল শিক্ষার্থীর প্রতি বিশেষ নজর এবং অভিভাবকের সম্পৃক্ততা থাকলে সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সাফল্য সম্ভব। তাহলে একই উপজেলার অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো কেন পারছে না এই প্রশ্নের উত্তর এখন আর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
কোনো বিদ্যালয়ের ফল খারাপ হলে শিক্ষার্থীকে দায়ী করা সবচেয়ে সহজ পথ। কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠানে পাসের হার ৫০ শতাংশের নিচে নেমে গেলে প্রশ্নটি আর শুধু শিক্ষার্থীর নয় বরং প্রতিষ্ঠান এবং প্রশাসনেরও। নিয়মিত ক্লাস হয়েছে কি না, পাঠ্যসূচি যথাসময়ে শেষ হয়েছে কি না, শিক্ষকসংকট রয়েছে কি না, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কেমন, দুর্বলদের জন্য বিশেষ সহায়তা দেওয়া হয়েছে কি না- এসবের তথ্যভিত্তিক মূল্যায়ন কোথায়?
এখানেই উপজেলা শিক্ষা প্রশাসনের সবচেয়ে বড় দায়।
ফল প্রকাশের পর ভালো করা বিদ্যালয়কে অভিনন্দন জানানো সহজ, কিন্তু যে বিদ্যালয়ে অর্ধেকের বেশি শিক্ষার্থী ফেল করেছে, সেখানে কেন এমন হলো এই কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়াই প্রশাসনের প্রকৃত দায়িত্ব। কেবল ফলাফল সংরক্ষণ নয়, ফলাফলের কারণ অনুসন্ধান এবং প্রতিকার নিশ্চিত করাও শিক্ষা প্রশাসনের দায়িত্ব।
ধারাবাহিকভাবে খারাপ ফল করা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কার্যকর উন্নয়ন পরিকল্পনা কোথায়? শিক্ষকসংকট থাকলে তা পূরণ করতে হবে। শিক্ষক থাকার পরও পাঠদানের মান দুর্বল হলে তারও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। বছরের পর বছর একই ধরনের দুর্বল ফলাফলকে স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে মেনে নেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত প্রভাবমুক্ত রাখাও জরুরি। শিক্ষক নিয়োগ, প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কিংবা একাডেমিক সিদ্ধান্তে অযাচিত হস্তক্ষেপ হলে তার খেসারত শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থীদেরই দিতে হয়। শিক্ষাঙ্গন রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্র নয়, আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তৈরির জায়গা।
কোচিং ও প্রাইভেটনির্ভরতাও শিক্ষায় বৈষম্য বাড়াচ্ছে। সামর্থ্যবান পরিবার বাড়তি সহায়তা দিতে পারে, দরিদ্র পরিবার তা পারে না। ফলে বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ দুর্বল হলে বৈষম্য আরও গভীর হয়। তাই শিক্ষার্থীকে ভালো করতে হলে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতেই হবে এমন ব্যবস্থা কোনোভাবেই কাম্য নয়। বিদ্যালয়েই মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
এখন বড়লেখায় প্রয়োজন প্রতিটি বিদ্যালয়ের ফলাফল নিয়ে তথ্যভিত্তিক একাডেমিক পর্যালোচনা। কোন বিষয়ে বেশি শিক্ষার্থী ফেল করেছে, কোথায় শিক্ষকসংকট, কোথায় উপস্থিতি কম, কোথায় পাঠদানের দুর্বলতা সবকিছু চিহ্নিত করতে হবে। ভালো ফল করা বিদ্যালয়গুলোর কার্যকর পদ্ধতি অন্য প্রতিষ্ঠানে প্রয়োগ করতে হবে। আর দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য শিক্ষক প্রশিক্ষণ, বিষয়ভিত্তিক মেন্টরিং, দুর্বল শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত সহায়তা ও নিয়মিত একাডেমিক তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।
৯৮ দশমিক ১৪ শতাংশ থেকে ২৩ দশমিক ৬৮ শতাংশ এই ব্যবধান বড়লেখার শিক্ষা ব্যবস্থার একটি গুরুতর সতর্কসংকেত।
তাই এখনই বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা উচিত। কারণ কয়েকটি বিদ্যালয়ের ভালো ফল বড়লেখার শিক্ষা ব্যবস্থার সাফল্য নয়। সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা বিদ্যালয় ও শিক্ষার্থীকে মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ দিতে পারাই হবে বড়লেখার শিক্ষা ব্যবস্থার প্রকৃত সাফল্যের মাপকাঠি।













