০৬:১১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬

কে এই সাইফুর? এমসি কলেজের আলোচিত ধর্ষণ মামলার প্রধান আসামির উত্থান, অপরাধ ও পরিণতি

ষাটমাকন্ঠ প্রতিবেদক, সিলেট
  • আপডেট সময় : ১১:৫৫:৪৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬
  • / 127
যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের সর্বশেষ খবর জানতে ভিজিট করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

সিলেটের ঐতিহ্যবাহী মুরারিচাঁদ (এমসি) কলেজ ছাত্রাবাসে সংঘটিত বহুল আলোচিত সংঘবদ্ধ ধর্ষণ মামলার রায় ঘোষণার পর আবারও আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন প্রধান আসামি সাইফুর রহমান। আদালতের রায়ে তার মৃত্যুদণ্ড হওয়ার পর নতুন করে সামনে আসছে তার পরিচয়, ছাত্রাবাসকেন্দ্রিক প্রভাব, রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের নানা তথ্য।

মামলার এজাহার, তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নথি অনুযায়ী, সাইফুর রহমানের গ্রামের বাড়ি সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলায়। তবে ঘটনার সময় তিনি এমসি কলেজ ছাত্রাবাসের তত্ত্বাবধায়কের বাংলোকে নিজের বর্তমান ঠিকানা হিসেবে ব্যবহার করতেন। তিনি কলেজের ইংরেজি বিভাগের স্নাতক শ্রেণির একজন অনিয়মিত শিক্ষার্থী ছিলেন।

তদন্তে উঠে আসে, টিলাগড়কেন্দ্রিক ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত সাইফুর এমসি কলেজ ছাত্রাবাস ও আশপাশ এলাকায় একটি শক্তিশালী বলয় গড়ে তুলেছিলেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, তার নেতৃত্বে একটি প্রভাবশালী গ্রুপ দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করত। ছিনতাই, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ওই গ্রুপের সম্পৃক্ততার অভিযোগও ছিল।

ধর্ষণের ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে সাইফুরের কক্ষ থেকে বিপুল পরিমাণ দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার হয়। শাহপরান থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাইয়ুম চৌধুরী সে সময় জানান, তার কক্ষ থেকে একটি পাইপগান, চারটি রামদা, একটি ছুরি এবং দুটি লোহার পাইপ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় অস্ত্র আইনে পৃথক মামলা দায়ের করেন শাহপরান থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মিল্টন সরকার।

২০২০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে সংঘটিত ওই নৃশংস ঘটনায় এক দম্পতিকে এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে স্বামীকে আটকে রেখে তরুণীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করা হয় বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদের সৃষ্টি হয়। শিক্ষাঙ্গনের নিরাপত্তা, ছাত্রাবাসে অপরাধচক্রের দৌরাত্ম্য এবং রাজনৈতিক আশ্রয়–প্রশ্রয়ের বিষয়গুলো তখন জাতীয় আলোচনায় উঠে আসে।

দীর্ঘ তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক স্বপন কুমার সরকার আলোচিত মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে প্রধান আসামি সাইফুর রহমানকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

একই সঙ্গে শাহ মাহবুবুর রহমান (রনি), তারেকুল ইসলাম (তারেক) ও অর্জুন লস্করকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অপরদিকে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হওয়ায় আইনুদ্দিন (আইনুল), মিসবাউল ইসলাম (রাজন), রবিউল এবং মাহফুজুর রহমানকে খালাস দেওয়া হয়েছে।

রায়ের মধ্য দিয়ে প্রায় ছয় বছর ধরে চলা বহুল আলোচিত এ মামলার বিচারিক অধ্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্বের সমাপ্তি ঘটলেও এমসি কলেজ ছাত্রাবাসকে কেন্দ্র করে অপরাধচক্র কীভাবে গড়ে উঠেছিল, কীভাবে তারা দীর্ঘ সময় প্রভাব বিস্তার করেছে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোথায় দুর্বলতা ছিল-এসব প্রশ্ন আবারও সামনে এসেছে।

আইনজীবী ও সচেতন নাগরিকদের মতে, এই রায় শুধু একটি মামলার বিচার নয়; বরং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অপরাধ, সহিংসতা ও নারীর প্রতি নৃশংসতার বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা হিসেবেও বিবেচিত হবে। একই সঙ্গে তারা আশা করছেন, এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর আবাসিক ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা ও জবাবদিহি আরও শক্তিশালী করা হবে।

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

কে এই সাইফুর? এমসি কলেজের আলোচিত ধর্ষণ মামলার প্রধান আসামির উত্থান, অপরাধ ও পরিণতি

আপডেট সময় : ১১:৫৫:৪৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬

সিলেটের ঐতিহ্যবাহী মুরারিচাঁদ (এমসি) কলেজ ছাত্রাবাসে সংঘটিত বহুল আলোচিত সংঘবদ্ধ ধর্ষণ মামলার রায় ঘোষণার পর আবারও আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন প্রধান আসামি সাইফুর রহমান। আদালতের রায়ে তার মৃত্যুদণ্ড হওয়ার পর নতুন করে সামনে আসছে তার পরিচয়, ছাত্রাবাসকেন্দ্রিক প্রভাব, রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা এবং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের নানা তথ্য।

মামলার এজাহার, তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নথি অনুযায়ী, সাইফুর রহমানের গ্রামের বাড়ি সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলায়। তবে ঘটনার সময় তিনি এমসি কলেজ ছাত্রাবাসের তত্ত্বাবধায়কের বাংলোকে নিজের বর্তমান ঠিকানা হিসেবে ব্যবহার করতেন। তিনি কলেজের ইংরেজি বিভাগের স্নাতক শ্রেণির একজন অনিয়মিত শিক্ষার্থী ছিলেন।

তদন্তে উঠে আসে, টিলাগড়কেন্দ্রিক ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত সাইফুর এমসি কলেজ ছাত্রাবাস ও আশপাশ এলাকায় একটি শক্তিশালী বলয় গড়ে তুলেছিলেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, তার নেতৃত্বে একটি প্রভাবশালী গ্রুপ দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করত। ছিনতাই, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে ওই গ্রুপের সম্পৃক্ততার অভিযোগও ছিল।

ধর্ষণের ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে সাইফুরের কক্ষ থেকে বিপুল পরিমাণ দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার হয়। শাহপরান থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাইয়ুম চৌধুরী সে সময় জানান, তার কক্ষ থেকে একটি পাইপগান, চারটি রামদা, একটি ছুরি এবং দুটি লোহার পাইপ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় অস্ত্র আইনে পৃথক মামলা দায়ের করেন শাহপরান থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মিল্টন সরকার।

২০২০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে সংঘটিত ওই নৃশংস ঘটনায় এক দম্পতিকে এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে স্বামীকে আটকে রেখে তরুণীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করা হয় বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদের সৃষ্টি হয়। শিক্ষাঙ্গনের নিরাপত্তা, ছাত্রাবাসে অপরাধচক্রের দৌরাত্ম্য এবং রাজনৈতিক আশ্রয়–প্রশ্রয়ের বিষয়গুলো তখন জাতীয় আলোচনায় উঠে আসে।

দীর্ঘ তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) সিলেটের দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক স্বপন কুমার সরকার আলোচিত মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে প্রধান আসামি সাইফুর রহমানকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

একই সঙ্গে শাহ মাহবুবুর রহমান (রনি), তারেকুল ইসলাম (তারেক) ও অর্জুন লস্করকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অপরদিকে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত না হওয়ায় আইনুদ্দিন (আইনুল), মিসবাউল ইসলাম (রাজন), রবিউল এবং মাহফুজুর রহমানকে খালাস দেওয়া হয়েছে।

রায়ের মধ্য দিয়ে প্রায় ছয় বছর ধরে চলা বহুল আলোচিত এ মামলার বিচারিক অধ্যায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্বের সমাপ্তি ঘটলেও এমসি কলেজ ছাত্রাবাসকে কেন্দ্র করে অপরাধচক্র কীভাবে গড়ে উঠেছিল, কীভাবে তারা দীর্ঘ সময় প্রভাব বিস্তার করেছে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় কোথায় দুর্বলতা ছিল-এসব প্রশ্ন আবারও সামনে এসেছে।

আইনজীবী ও সচেতন নাগরিকদের মতে, এই রায় শুধু একটি মামলার বিচার নয়; বরং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অপরাধ, সহিংসতা ও নারীর প্রতি নৃশংসতার বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা হিসেবেও বিবেচিত হবে। একই সঙ্গে তারা আশা করছেন, এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর আবাসিক ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা ও জবাবদিহি আরও শক্তিশালী করা হবে।