০৪:৪১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম ::

দীর্ঘ নির্বাসনের অবসান, ১ আগস্ট রবীন্দ্র সদনে সংবর্ধনা

কুড়ি বছর পর কলকাতায় ফিরছেন তসলিমা নাসরিন

ষাটমাকন্ঠ ডেস্ক
  • আপডেট সময় : ০৬:২৭:০১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬
  • / 80
যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের সর্বশেষ খবর জানতে ভিজিট করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

দীর্ঘ প্রায় দুই দশক পর ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ফিরছেন বাংলাদেশের নির্বাসিত লেখক ও মানবাধিকারকর্মী তসলিমা নাসরিন। আগামী ১ আগস্ট কলকাতার ঐতিহ্যবাহী রবীন্দ্র সদনে আয়োজিত একটি সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর বহু প্রতীক্ষিত প্রত্যাবর্তন ঘটতে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন পর কলকাতায় ফেরাকে তিনি নিজেই অভিহিত করেছেন-“২০ বছর পর এক মুক্ত বাংলায় প্রত্যাবর্তন” হিসেবে।

মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ তথ্য নিশ্চিত করে তসলিমা নাসরিন জানান, দীর্ঘ নির্বাসনের পর আবারও প্রিয় শহর কলকাতার পাঠক-অনুরাগীদের কাছে ফিরতে পেরে তিনি আনন্দিত।

সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পালাবদলের পর বিজেপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার ক্ষমতায় আসায় তসলিমার এই সফরকে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে কার্যত অলিখিত নিষেধাজ্ঞার কারণে কলকাতায় প্রবেশ করতে না পারলেও এবার তাঁর সফরের পথ উন্মুক্ত হয়েছে।

তসলিমাকে সংবর্ধনা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে ‘সেক্যুলার মিশন’, ‘পশ্চিমবঙ্গের জন্য’ এবং ‘হিউম্যান রাইটস বিয়ন্ড ফ্রন্টিয়ার্স (এইচআরবিএফ)’-সহ কয়েকটি সামাজিক ও মানবাধিকার সংগঠন। আয়োজকদের ভাষ্য, মুক্তচিন্তা, মানবাধিকার ও ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সংগ্রামের স্বীকৃতি জানাতেই এ আয়োজন।

অনুষ্ঠানে তসলিমা নাসরিনের কবিতা আবৃত্তি, তাঁর রচনার ওপর ভিত্তি করে সংগীত পরিবেশনা এবং নির্বাসিত জীবনের নানা অভিজ্ঞতা নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে।

আয়োজকদের দাবি, অনুষ্ঠানে পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং প্রখ্যাত সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় উপস্থিত থাকতে পারেন। আয়োজক কমিটির সদস্য ও কলকাতা হাইকোর্টের আইনজীবী ওসমান মল্লিক এবং মোহিত রায় জানান, তসলিমা নাসরিনের পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশে আইনগত কোনো বাধা কখনোই ছিল না। তবে অতীতে বিভিন্ন সরকার রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত বিবেচনায় তাঁর সফরের অনুমতি দেয়নি। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তাঁকে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে বলেও তাঁরা জানান।

১৯৯৪ সালে তাঁর আলোচিত উপন্যাস ‘লজ্জা’ প্রকাশের পর বাংলাদেশে তীব্র বিতর্ক ও মৌলবাদী গোষ্ঠীর আন্দোলনের মুখে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন তসলিমা নাসরিন। পরবর্তীতে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানের পর ২০০৪ সালে তিনি কলকাতায় বসবাস শুরু করেন।

কিন্তু ২০০৭ সালে আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘দ্বিখণ্ডিত’ প্রকাশের পর কলকাতায় সহিংস বিক্ষোভের ঘটনা ঘটে। সেই প্রেক্ষাপটে তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার তাঁকে পশ্চিমবঙ্গ ছাড়তে বলে এবং বইটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এরপর দীর্ঘ সময় তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের আমলেও তাঁর কলকাতায় ফেরার প্রচেষ্টা সফল হয়নি। এমনকি তাঁর রচনার ওপর ভিত্তি করে নির্মিত নাটকও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছিল।

এদিকে ২০২৪ সালে ভারতে তাঁর দীর্ঘমেয়াদি আবাসিক অনুমতি (রেসিডেন্স পারমিট) নবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিলেও পরে তা নবায়ন করা হয়। ২০২৫ সালে বিজেপির রাজ্যসভার সদস্য শমীক ভট্টাচার্যও তসলিমার কলকাতায় ফেরার পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নেন।

দীর্ঘ দুই দশকের বিচ্ছেদের পর কলকাতায় তসলিমা নাসরিনের এই প্রত্যাবর্তনকে অনেকেই শুধু একজন লেখকের ব্যক্তিগত প্রত্যাবর্তন নয়, বরং মুক্তচিন্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদের প্রতীকী পুনরাগমন হিসেবেও দেখছেন। তবে এ বিষয়ে রাজনৈতিক মহলে ভিন্নমতও রয়েছে, ফলে তাঁর সফরকে ঘিরে রাজ্যের জনপরিসরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

দীর্ঘ নির্বাসনের অবসান, ১ আগস্ট রবীন্দ্র সদনে সংবর্ধনা

কুড়ি বছর পর কলকাতায় ফিরছেন তসলিমা নাসরিন

আপডেট সময় : ০৬:২৭:০১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৪ জুলাই ২০২৬

দীর্ঘ প্রায় দুই দশক পর ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ফিরছেন বাংলাদেশের নির্বাসিত লেখক ও মানবাধিকারকর্মী তসলিমা নাসরিন। আগামী ১ আগস্ট কলকাতার ঐতিহ্যবাহী রবীন্দ্র সদনে আয়োজিত একটি সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর বহু প্রতীক্ষিত প্রত্যাবর্তন ঘটতে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন পর কলকাতায় ফেরাকে তিনি নিজেই অভিহিত করেছেন-“২০ বছর পর এক মুক্ত বাংলায় প্রত্যাবর্তন” হিসেবে।

মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ তথ্য নিশ্চিত করে তসলিমা নাসরিন জানান, দীর্ঘ নির্বাসনের পর আবারও প্রিয় শহর কলকাতার পাঠক-অনুরাগীদের কাছে ফিরতে পেরে তিনি আনন্দিত।

সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পালাবদলের পর বিজেপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার ক্ষমতায় আসায় তসলিমার এই সফরকে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে কার্যত অলিখিত নিষেধাজ্ঞার কারণে কলকাতায় প্রবেশ করতে না পারলেও এবার তাঁর সফরের পথ উন্মুক্ত হয়েছে।

তসলিমাকে সংবর্ধনা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে ‘সেক্যুলার মিশন’, ‘পশ্চিমবঙ্গের জন্য’ এবং ‘হিউম্যান রাইটস বিয়ন্ড ফ্রন্টিয়ার্স (এইচআরবিএফ)’-সহ কয়েকটি সামাজিক ও মানবাধিকার সংগঠন। আয়োজকদের ভাষ্য, মুক্তচিন্তা, মানবাধিকার ও ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সংগ্রামের স্বীকৃতি জানাতেই এ আয়োজন।

অনুষ্ঠানে তসলিমা নাসরিনের কবিতা আবৃত্তি, তাঁর রচনার ওপর ভিত্তি করে সংগীত পরিবেশনা এবং নির্বাসিত জীবনের নানা অভিজ্ঞতা নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে।

আয়োজকদের দাবি, অনুষ্ঠানে পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং প্রখ্যাত সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় উপস্থিত থাকতে পারেন। আয়োজক কমিটির সদস্য ও কলকাতা হাইকোর্টের আইনজীবী ওসমান মল্লিক এবং মোহিত রায় জানান, তসলিমা নাসরিনের পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশে আইনগত কোনো বাধা কখনোই ছিল না। তবে অতীতে বিভিন্ন সরকার রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত বিবেচনায় তাঁর সফরের অনুমতি দেয়নি। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর তাঁকে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে বলেও তাঁরা জানান।

১৯৯৪ সালে তাঁর আলোচিত উপন্যাস ‘লজ্জা’ প্রকাশের পর বাংলাদেশে তীব্র বিতর্ক ও মৌলবাদী গোষ্ঠীর আন্দোলনের মুখে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন তসলিমা নাসরিন। পরবর্তীতে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানের পর ২০০৪ সালে তিনি কলকাতায় বসবাস শুরু করেন।

কিন্তু ২০০৭ সালে আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ ‘দ্বিখণ্ডিত’ প্রকাশের পর কলকাতায় সহিংস বিক্ষোভের ঘটনা ঘটে। সেই প্রেক্ষাপটে তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার তাঁকে পশ্চিমবঙ্গ ছাড়তে বলে এবং বইটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এরপর দীর্ঘ সময় তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের আমলেও তাঁর কলকাতায় ফেরার প্রচেষ্টা সফল হয়নি। এমনকি তাঁর রচনার ওপর ভিত্তি করে নির্মিত নাটকও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছিল।

এদিকে ২০২৪ সালে ভারতে তাঁর দীর্ঘমেয়াদি আবাসিক অনুমতি (রেসিডেন্স পারমিট) নবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিলেও পরে তা নবায়ন করা হয়। ২০২৫ সালে বিজেপির রাজ্যসভার সদস্য শমীক ভট্টাচার্যও তসলিমার কলকাতায় ফেরার পক্ষে প্রকাশ্যে অবস্থান নেন।

দীর্ঘ দুই দশকের বিচ্ছেদের পর কলকাতায় তসলিমা নাসরিনের এই প্রত্যাবর্তনকে অনেকেই শুধু একজন লেখকের ব্যক্তিগত প্রত্যাবর্তন নয়, বরং মুক্তচিন্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদের প্রতীকী পুনরাগমন হিসেবেও দেখছেন। তবে এ বিষয়ে রাজনৈতিক মহলে ভিন্নমতও রয়েছে, ফলে তাঁর সফরকে ঘিরে রাজ্যের জনপরিসরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।