প্রবাসের মাটিতে বড়লেখার স্পন্দন
প্যারিসে উৎসবমুখর পরিবেশে বড়লেখা পৌরসভা ও সদর ইউনিয়নের প্রবাসীদের মিলনমেলা
- আপডেট সময় : ০৯:৫৯:৫৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬
- / 188
হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে ইউরোপের ব্যস্ত নগরী প্যারিস। চারপাশে ভিন্ন ভাষা, ভিন্ন সংস্কৃতি, ভিন্ন জীবনযাত্রা। প্রবাসের কর্মব্যস্ততা, জীবিকার নিরন্তর সংগ্রাম আর যান্ত্রিক সময়ের গণ্ডি পেরিয়েপ্রাণের মিলনমেলায় মিলিত হয় ফ্রান্সে বসবাসরত বড়লেখাবাসী। ফিরে আসে শৈশবের স্মৃতি, গ্রামের মেঠোপথ, হাটের কোলাহল, উৎসবের আনন্দ, আত্মীয়-স্বজন আর আপন মানুষের উষ্ণতা। দূরদেশে থেকেও যেন অনুভব করা যায় জন্মভূমির মাটির গন্ধ।
সেই আবেগ, ভালোবাসা আর শিকড়ের টানকে ধারণ করেই ফ্রান্সে বসবাসরত বড়লেখা পৌরসভা ও সদর ইউনিয়নের প্রবাসীদের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘মিলনমেলা-২০২৬’। ‘প্রবাসে ঐক্যের বন্ধন, হৃদয়ে বড়লেখার স্পন্দন’-এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে গত ১২ জুলাই প্যারিসের লা কুরনভ (La Courneuve) পার্কে আয়োজিত দিনব্যাপী এই আয়োজন পরিণত হয় প্রবাসী বড়লেখাবাসীর এক প্রাণের মিলনোৎসবে।
দুপুর গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে পার্কজুড়ে জমে ওঠে উৎসবের আমেজ। ফ্রান্সের বিভিন্ন শহর থেকে পরিবার-পরিজন নিয়ে একে একে হাজির হন তিন শতাধিক প্রবাসী। বহুদিন পর পরিচিত মুখের সঙ্গে দেখা, শৈশবের বন্ধুকে বুকে জড়িয়ে ধরা, আবার কারও সঙ্গে প্রথম পরিচয় হলেও একই এলাকার মানুষ হওয়ার আত্মিক টান- সব মিলিয়ে মুহূর্তেই প্রাণ ফিরে পায় পুরো আয়োজন প্রাঙ্গণ। করমর্দন, কোলাকুলি, হাসিমুখে কুশল বিনিময়, স্মৃতিচারণ আর মোবাইল ক্যামেরায় স্মৃতি ধরে রাখার ব্যস্ততায় মনে হচ্ছিল, বিদেশের মাটিতে যেন গড়ে উঠেছে বড়লেখারই আরেকটি ছোট্ট জনপদ।
অনুষ্ঠানের সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী দিক ছিল নতুন প্রজন্মের সরব অংশগ্রহণ। ফ্রান্সে জন্ম নেওয়া কিংবা বেড়ে ওঠা শিশু-কিশোরদের কাছে এটি ছিল শুধু একটি পারিবারিক মিলনমেলা নয়, বরং নিজের শিকড়কে জানার এক অনন্য সুযোগ। বাবা-মায়ের মুখে শোনা গ্রামের গল্প, আত্মীয়তার বন্ধন, ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের যে পরিচয় তারা এতদিন কেবল কল্পনায় এঁকেছে, সেদিন তার বাস্তব রূপ তাদের সামনে উন্মোচিত হয়। ফলে প্রবাসে বেড়ে ওঠা সন্তানদের মধ্যে নিজেদের পরিচয় ও সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহ তৈরি করার ক্ষেত্রেও এই আয়োজন হয়ে ওঠে তাৎপর্যপূর্ণ।

দিনটি ছিল কেবল একটি সামাজিক অনুষ্ঠান নয়; ছিল আত্মার টানে ফিরে আসার এক অনন্য উপলক্ষ। পরিচয়পর্ব, প্রাণখোলা আড্ডা, স্মৃতিচারণ আর আন্তরিক আলাপচারিতার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে এক অন্যরকম পারিবারিক পরিবেশ। মধ্যাহ্নভোজ শেষে শুরু হয় নারী, পুরুষ ও শিশুদের জন্য পৃথক ক্রীড়া ও বিনোদনমূলক প্রতিযোগিতা। শিশুদের উচ্ছ্বাস, নারীদের প্রাণবন্ত অংশগ্রহণ এবং পুরুষদের বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিযোগিতায় মুখর হয়ে ওঠে পুরো পার্ক। হাসি, করতালি আর আনন্দধ্বনিতে উৎসব যেন পায় পূর্ণতা। প্রতিযোগিতা শেষে বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হলে সেই আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে উপস্থিত সবার মুখে।

এত বড় আয়োজনের পেছনে ছিল একদল নিবেদিতপ্রাণ মানুষের নিরলস পরিশ্রম। ক্রীড়া প্রতিযোগিতা পরিচালনা, অতিথি আপ্যায়ন, খাবার পরিবেশন, শৃঙ্খলা রক্ষা, পানীয় সরবরাহ এবং সার্বিক ব্যবস্থাপনায় দায়িত্ব পালন করেন ফজলুল আলী, শামীম আহমেদ, মইনুল হক, কামাল উদ্দিন জিহাদি, কামরুল খান, আসুক আহমেদ, ইয়াহিয়া আহমেদ, মোক্তাদির মিয়া, ফয়সাল আহমেদ, কামিল আহমেদ, তারেক আহমেদ, স্বপন মাহমুদসহ আয়োজক কমিটির সদস্যরা। তাদের আন্তরিকতা, নিষ্ঠা ও সমন্বিত প্রচেষ্টায় পুরো অনুষ্ঠান সুশৃঙ্খল, প্রাণবন্ত ও সফলভাবে সম্পন্ন হয়।
আব্দুল আজিজ সেলিম, মাহমুদুর রহমান সোহাগ ও জাহেদুল ইসলাম সাথীর প্রাণবন্ত সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত সমাপনী পর্বে উপস্থিত সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বক্তব্য রাখেন লুলু মিয়া। তিনি বলেন, “জীবিকার প্রয়োজনে আমরা দেশ ছেড়ে বহু দূরে এসেছি, কিন্তু আমাদের হৃদয় আজও বড়লেখার মাটিতেই রয়ে গেছে। এই মিলনমেলা আমাদের মনে করিয়ে দেয়—দূরত্ব মানুষকে আলাদা করতে পারে, কিন্তু শিকড়, আত্মীয়তা ও ভালোবাসার বন্ধনকে কখনো বিচ্ছিন্ন করতে পারে না। আজ এখানে উপস্থিত প্রতিটি মুখ, প্রতিটি হাসি প্রমাণ করে, আমরা এখনও একটি পরিবারের মতোই ঐক্যবদ্ধ। এই ভালোবাসা, এই সম্প্রীতি এবং এই বন্ধন আগামী প্রজন্মের মাঝেও ছড়িয়ে পড়ুক এটাই আমাদের প্রত্যাশা।”

মনির আহমেদ বলেন, “দেশ থেকে হাজার মাইল দূরে থাকলেও আমরা সবাই বড়লেখার সন্তান। এই পরিচয়ই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। এমন মিলনমেলা শুধু আনন্দের উপলক্ষ নয়, বরং পারস্পরিক সহযোগিতা, সৌহার্দ্য ও সামাজিক বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করার একটি কার্যকর মাধ্যম।”
আহমেদ সেলিম বলেন, “আজকের এই উপস্থিতিই প্রমাণ করে, মানুষ যত দূরেই থাকুক, নিজের শিকড়কে কখনো ভুলে যায় না। আমরা চাই আগামী প্রজন্মও বড়লেখার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও ভ্রাতৃত্বের এই বন্ধনকে ধারণ করুক। সবার সহযোগিতা ও ভালোবাসা থাকলে আগামী বছরগুলোতে আরও বৃহৎ পরিসরে এই আয়োজন অব্যাহত থাকবে।”
সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে ধীরে ধীরে শেষ হয় আনুষ্ঠানিক আয়োজন। কেউ ফিরে যান প্যারিসে, কেউবা ফ্রান্সের অন্য শহরে। তবে সবার সঙ্গেই থেকে যায় একদিনের অমূল্য স্মৃতি, বহুদিন পর ফিরে পাওয়া সম্পর্কের উষ্ণতা, ক্যামেরাবন্দি অসংখ্য হাসিমাখা মুহূর্ত এবং আগামী বছর আবারও একত্র হওয়ার এক নীরব অঙ্গীকার।
ফ্রান্সে বসবাসরত বড়লেখাসহ পাশ্ববর্তী অন্যান্য অঞ্চলের প্রবাসীদের অভিমত, প্রবাসের জীবন কেবল জীবিকা অর্জনের গল্প নয় বরং এটি নিজের শিকড়, পরিচয় ও সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখারও এক অবিরাম সাধনা। প্যারিসে বড়লেখা পৌরসভা ও সদর ইউনিয়নের এই মিলনমেলা সেই সাধনারই এক অনন্য প্রতিচ্ছবি। এটি প্রবাসী বড়লেখাবাসীর ঐক্য, আত্মপরিচয় ও ভালোবাসার এক জীবন্ত দলিল। একই সঙ্গে নতুন প্রজন্মের কাছে নিজস্ব ইতিহাস, সংস্কৃতি ও শেকড়ের উত্তরাধিকার পৌঁছে দেওয়ার এক আন্তরিক প্রয়াস, যা ভবিষ্যতেও প্রবাসী সমাজে সম্প্রীতির এই বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করবে।
























