নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি স্থানীয় সচেতন মহলের
হাওর লুটপাটকারীদের রোষানলে জুড়ীর মৎস্য কর্মকর্তা
- আপডেট সময় : ০১:১৬:৩৬ অপরাহ্ন, সোমবার, ১১ মে ২০২৬
- / 68
হাওর দখল ও অবৈধ জাল নিয়ন্ত্রণে অভিযান ঘিরে এই দ্বন্দ্ব-
মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার হাওরাঞ্চল বহুদিন ধরেই অবৈধ জাল, মাছের পোনা নিধন, বিল দখল ও জেলেদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগে আলোচিত। প্রশাসনের বিভিন্ন সময়ের অভিযানে এসব কর্মকাণ্ড কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও সম্প্রতি উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো: মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নতুন করে সামনে এনেছে হাওরকেন্দ্রিক প্রভাব ও স্বার্থের সংঘাতের বিষয়টি। স্থানীয়দের ভাষ্য, এটি শুধু একজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়; বরং হাওর এলাকায় আধিপত্য, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং অবৈধ নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার এক নীরব লড়াইয়ের বহিঃপ্রকাশ।
গত বুধবার (৬ মে ২০২৬) কাদির মিয়া নামে এক ব্যক্তি মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসকের কাছে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো: মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগে অবৈধভাবে মাছ আহরণে সহায়তা, পোনা নিধন রোধে ব্যর্থতা, বিল সেচ দিয়ে মাছ ধ্বংস এবং অসদাচরণের মতো বিষয় উল্লেখ করা হয়। অভিযোগের পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি ছড়িয়ে পড়ে এবং কয়েকটি অনলাইন প্ল্যাটফর্মেও কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ প্রকাশিত হয়। তবে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, অভিযোগের পেছনে রয়েছে আরও পুরোনো একটি বিরোধ এবং চলমান মামলা।
মামলার এজাহার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ৫ আগস্ট ২০২৫ সালে জুড়ীর কয়েকটি হাওরে জেলেদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগে কাদির মিয়ার শ্যালক হেলাল মিয়ার বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেন উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো: মনিরুজ্জামান। মামলাটি বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, খালের মুখ বাজার এলাকার একটি দোকানে জেলেদের কাছ থেকে আদায় করা টাকা জমা রাখার অভিযোগ ওঠে। স্থানীয়ভাবে অনুষ্ঠিত এক সংবাদ সম্মেলনে দাবি করা হয়, প্রায় ২ লাখ ৮২ হাজার টাকা বিভিন্ন জেলের কাছ থেকে আদায় করা হয়েছিল। এ ঘটনায় ১৩৮ জন জেলের স্বাক্ষরযুক্ত লিখিত অভিযোগ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার কাছে জমা পড়ে। পরে তদন্ত শেষে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার দাবি করে প্রশাসন এবং পরবর্তীতে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
স্থানীয় কয়েকজন জেলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দীর্ঘদিন ধরে হাওরে মাছ ধরতে গেলে বিভিন্ন পক্ষকে টাকা দিতে হতো। কেউ টাকা না দিলে তাদের জাল কেটে দেওয়া, মাছ আটকানো কিংবা ভয়ভীতি দেখানোর ঘটনাও ঘটেছে। অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, চাঁদাবাজির মামলাটি নিষ্পত্তির জন্য বিভিন্ন সময়ে সমঝোতার চেষ্টা হয়েছিল।
স্থানীয় আব্দুর রব নামে এক ব্যক্তি মামলা তুলে নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা এতে রাজি না হওয়ায় তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার শুরু হয় বলে দাবি কর্মকর্তার ঘনিষ্ঠদের। যদিও এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযোগকারী পক্ষের কয়েকজন। তাদের দাবি, “মৎস্য কর্মকর্তা দায়িত্ব পালনে নিরপেক্ষ নন, তাই সাধারণ মানুষ ক্ষুব্ধ।”
অভিযোগের তথ্য যাচাই করতে গিয়ে দেখা যায়, বিল সেচ দিয়ে মাছ নিধনের যে বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে, সেটি মূলত পিংলা ও পরতি বিলের একটি অংশ, যা প্রশাসনিকভাবে বড়লেখা উপজেলার আওতাভুক্ত। এছাড়া সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া মাছের পোনা নিধনের একটি ভিডিও জুড়ীর ঘটনা বলে দাবি করা হলেও স্থানীয় প্রশাসনের একাধিক সূত্র বলছে, ভিডিওটি গোলাপগঞ্জ উপজেলার একটি পুরোনো ঘটনার।
নদীর একপাশ দখল করে মাছ আহরণের অভিযোগের বিষয়ে জুড়ী উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাবরিনা আক্তার বলেন, “অভিযোগ পাওয়ার পর আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখি। যে অংশ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে সেটি ইজারাকৃত বিলের অন্তর্ভুক্ত। পরবর্তীতে সার্ভেয়ার দিয়ে সীমানা নির্ধারণ করা হয়েছে।”
জুড়ীর হাওরাঞ্চল শুধু মাছের উৎস নয়, এটি স্থানীয় অর্থনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বর্ষা মৌসুমে বিভিন্ন বিল ও হাওরে মাছ আহরণকে কেন্দ্র করে লাখ লাখ টাকার লেনদেন হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রভাবশালী চক্র অবৈধ জাল ব্যবহার, পোনা নিধন এবং চাঁদাবাজির মাধ্যমে এ খাত নিয়ন্ত্রণ করে আসছিল। সাম্প্রতিক সময়ে উপজেলা মৎস্য অফিসের উদ্যোগে অবৈধ কারেন্ট জাল ও ম্যাজিক জাল জব্দ, মোবাইল কোর্ট পরিচালনা এবং অভিযানের সংখ্যা বাড়ানো হলে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। এতে অনেকের স্বার্থে আঘাত লাগে বলে দাবি স্থানীয়দের।
জেলে ইউসুফ মিয়া বলেন, আগে হাওরে মাছ ধরতে গেলেই বিভিন্ন জায়গায় টাকা দিতে হতো। এখন প্রশাসনের অভিযান বাড়ায় কিছুটা স্বস্তি পেয়েছি।” আরেক জেলে বিল্লাল হোসেন বলেন, “যারা আগে হাওর নিয়ন্ত্রণ করত, তারা এখন চাপের মুখে পড়েছে। এজন্য পরিস্থিতি ঘোলাটে করা হচ্ছে।
এরই মধ্যে গত রবিবার (১০ মে) জুড়ীতে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার অপসারণ দাবিতে একটি মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে ৪০ থেকে ৫০ জনের উপস্থিতি দেখা যায়।
মানববন্ধনে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনের কয়েকজন নেতাকর্মীকেও বক্তব্য দিতে দেখা গেছে। বক্তারা অভিযোগ করেন, বর্তমান মৎস্য কর্মকর্তা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছেন। একইসঙ্গে দ্রুত তাকে প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়। তবে মানববন্ধনের পর এলাকাজুড়ে শুরু হয় মিশ্র প্রতিক্রিয়া। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেউ কর্মকর্তার পক্ষে অবস্থান নেন, আবার কেউ অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেন।
অভিযোগকারী কাদির মিয়া এ বিষয়ে বলেন, “আমি হাওরে গিয়ে দেখি মানুষ ম্যাজিক জাল দিয়ে বোয়াল মাছের পোনা ধরছে। বিষয়টি মৎস্য কর্মকর্তাকে জানালে তিনি উল্টো আমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেন। পরে আমি ক্ষুব্ধ হয়ে অভিযোগ করি।”
অন্যদিকে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো: মনিরুজ্জামান বলেন, “জুড়ীতে দায়িত্ব নেওয়ার পর রেকর্ড পরিমাণ অবৈধ জাল জব্দ করা হয়েছে। নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। যারা দীর্ঘদিন ধরে হাওরে অবৈধভাবে প্রভাব বিস্তার করেছে, তাদের বিরুদ্ধেই আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি। একটি স্বার্থান্বেষী মহল প্রশাসনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে আমার বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে মিথ্যা তথ্য ছড়াচ্ছে। আমাকে বদলি ও সামাজিকভাবে হেয় করার অপচেষ্টা চলছে। কিন্তু আমি দায়িত্ব পালনে আপস করব না।”
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে সেটি অবশ্যই তদন্ত হওয়া উচিত। তবে একইসঙ্গে অভিযোগের পেছনে কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ বা অবৈধ প্রভাব কাজ করছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তাদের মতে, জুড়ীর হাওরাঞ্চলে অবৈধ জাল, মাছের পোনা নিধন ও চাঁদাবাজির যে দীর্ঘদিনের অভিযোগ রয়েছে, তা বন্ধে প্রশাসনের কঠোর অবস্থান অব্যাহত রাখা জরুরি। একইসঙ্গে অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটনের দাবিও জানিয়েছেন তারা।

























