১০ বছরের গবেষণায় উচ্চ ফলনশীল চিকন ধান উদ্ভাবন
- আপডেট সময় : ১০:৩০:৪৯ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৪ এপ্রিল ২০২৬
- / 16
জাত ‘জিএইউ ধান ৪’ উদ্ভাবিত করেছে গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (গাকৃবি) কৃষিতত্ত্ব বিভাগের দুই গবেষক।
স্বল্পমেয়াদী, উচ্চ ফলনশীল ও চিকন আউশ ধানের জাত ‘জিএইউ ধান ৪’ উদ্ভাবিত করেছে গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (গাকৃবি) কৃষিতত্ত্ব বিভাগের দুই গবেষক। সম্ভাবনাময় প্রিমিয়াম কোয়ালিটির ধানের জাত উদ্ভাবনের মাধ্যমে গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের চারটি ধানের জাতসহ মোট উদ্ভাবিত ফসলের জাতের সংখ্যা দাঁড়ালো ৯৫টি। যা বাংলাদেশের কৃষি গবেষণা ও খাদ্য নিরাপত্তা অর্জনের ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
নতুন জাতের ধান উৎপাদনকারী দুই গবেষক হলেন- প্রফেসর ড. এম. ময়নুল হক ও প্রফেসর ড. মসিউল ইসলাম। তাদের নেতৃত্বে দীর্ঘ এক দশকের নিবিড় গবেষণা ও পরিশ্রমে ধানের জাত ‘জিএইউ ধান ৪’ উদ্ভাবিত হয়।
আউশ ধানের জাত ‘জিএইউ ধান ৪’ উদ্ভাবক প্রফেসর ড. মসিউল ইসলাম বলেন, ‘বাংলাদেশে সাধারণত আউশ ধানের ফলন আমন ও বোরো মৌসুমের তুলনায় তুলনামূলক কম হয়ে থাকে। তবে জিএইউ ধান ৪ তার ব্যতিক্রম। এ জাতটি দ্রুত পরিপক্ব হওয়ায় কৃষকরা অল্প সময়েই জমি খালি করতে পারেন এবং সহজেই একই জমিতে বছরে তিন থেকে চারটি ফসল উৎপাদনের সুযোগ পান। ফলে এটি দেশের উত্তরাঞ্চলের মঙ্গাপীড়িত এলাকায় কৃষকদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে। একই সঙ্গে দেশের প্রায় সব অঞ্চলে আউশ মৌসুমে এ জাতটি চাষযোগ্য এবং তুলনামূলক কম পানির প্রয়োজন হওয়ায় ধান নির্ভর কৃষি ব্যবস্থার জন্য এর গুরুত্ব অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। মানুষের খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দেশে চিকন চালের চাহিদা ক্রমাগত বাড়তে থাকায় সেই চাহিদার কথা বিবেচনায় রেখে তারা (গবেষকদ্বয়) প্রচলিত আউশ ধানের জাত পারিজার সঙ্গে উচ্চ ফলনশীল চিকন জাত ‘বিইউ ধান ২’ এর সংকরায়ন করেন। সেই সংকরায়নের মধ্য থেকে বহু গবেষণাধর্মী নির্বাচনের মাধ্যমে জিএইউ-৯৯৭৪-৫২-৭-২ লাইনটি কাঙ্ক্ষিত চরিত্র প্রদর্শন করে। প্রায় ১০ বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা মাঠে নিবিড় পরীক্ষার মাধ্যমে লাইনটি ধারাবাহিকভাবে আশাব্যঞ্জক ফলাফল দেয়।’
তিনি বলেন, ‘পরে ২০২২ সালের আউশ মৌসুমে এর আঞ্চলিক অভিযোজন পরীক্ষা, ২০২৩ সালে আঞ্চলিক উপযোগিতা যাচাই এবং ২০২৪ সালে বাংলাদেশ বীজ প্রত্যয়ন এজেন্সির তত্ত্বাবধানে দেশের ১০টি অঞ্চলে মাঠ পর্যায়ে মূল্যায়ন করা হয়। সব পরীক্ষায় স্বল্পমেয়াদী ও উচ্চ ফলনশীল বৈশিষ্ট্য নিশ্চিত হওয়ায় ২০২৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি জাতীয় বীজ বোর্ডের ১১৫তম সভায় ‘‘জিএইউ ধান ৪’’ নামের এ জাতটির আনুষ্ঠানিক অনুমোদন প্রদান করা হয়।’
আউশ ধানের জাত ‘জিএইউ ধান ৪’ অপর উদ্ভাবক প্রফেসর ড. এম. ময়নুল হক বলেন, ‘পুষ্টিগুণেও এই ধান বিশেষভাবে সমৃদ্ধ। এর চালে অ্যামাইলেজ এনজাইমের পরিমাণ প্রায় ২৪.৫৮ শতাংশ। যা শর্করা জাতীয় খাদ্য সহজে ভেঙে শক্তি সরবরাহ ও হজম প্রক্রিয়ায় সহায়তা করে। একই সঙ্গে এতে প্রোটিনের পরিমাণ প্রায় ৮.৩৮ শতাংশ, যা মানবদেহের গঠন, বৃদ্ধি ও কোষ মেরামতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে এটি শুধু উৎপাদনশীলই নয়, পুষ্টিমানেও সমৃদ্ধ একটি ধানের জাত। জিএইউ ধান ৪ এর দানা লম্বা ও চিকন এবং এটি তুলনামূলক কম সময়ে পরিপক্ব হয়। সাধারণত বীজ বপনের ৩ মাস থেকে ৩ মাস ১০ দিনের মধ্যেই ফসল সংগ্রহ করা সম্ভব। পুষ্ট ১০০০ ধানের ওজন প্রায় ২০ গ্রাম এবং অনুকূল পরিবেশে সহজেই হেক্টর প্রতি ৫ থেকে ৫.৫ টন পর্যন্ত ফলন পাওয়া যায়। এ জাতের ধান চাষে প্রতি হেক্টরে ২৫-৩০ কেজি বীজ প্রয়োজন হয়, যা কৃষকদের জন্য অর্থনৈতিকভাবেও সুবিধাজনক। উন্নত এ জাতটি বিভিন্ন রোগবালাই প্রতিরোধক হবার কারণে সাধারণ জাতের তুলনায় এটি গড়ে ১০-১৫% বেশি ফলন দিতে সক্ষম যা বাংলাদেশের মতো কৃষি নির্ভর অর্থনীতিতে ব্যাপক অবদান রাখতে সক্ষম।’
তিনি বলেন, ‘এ ছাড়া জলবায়ু সহনশীল হওয়ায় এটি দেশের বৈচিত্র্যময় পরিবেশে চাষের জন্য উপযোগী ও লাভজনক একটি জাত। এক্ষেত্রে বেলে দো-আঁশ বা এটেল দো-আঁশ মাটি এ জাতের চাষের জন্য ভালো। জিএইউ ধান ৪ এর জন্য বীজতলায় বীজ ফেলার উপযুক্ত সময় এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহ। এক্ষেত্রে কাদা জমিতে ২০-২২ দিনে এর চারা রোপণ করতে হয় এবং সারি থেকে সারির দূরত্ব ২০ সে.মি এবং গুছি থেকে গুছির দূরত্ব ১৫ সে.মি বজায় রাখা উত্তম।’
গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (গাকৃবি) ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. জি কে এম মোস্তাফিজুর রহমান গবেষকদেরকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের এ অসামান্য অর্জনে গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কার্যক্রম সবসময়ই কৃষকের কল্যাণ এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্য পরিচালিত হয়। ‘‘জিএইউ ধান ৪’’ উদ্ভাবন আমাদের গবেষকদের অধ্যবসায়, মেধা ও নিষ্ঠার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। এই জাতটি কৃষকদের জন্য নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি করবে এবং ভবিষ্যতে দেশের কৃষি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে বলে আমি দৃঢ়ভাবে আশাবাদী।’






















