০৬:২৫ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২০ এপ্রিল ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম ::
Logo কুলাউড়ায় রাস্তার উন্নয়ন কাজের উদ্বোধন করলেন এমপি শওকতুল ইসলাম Logo এসএসসি সমমান পরীক্ষার্থীদের নিয়ে বড়লেখায় ছাত্রশিবিরের দোয়া মাহফিল Logo বড়লেখায় ইন্টারন্যাশনাল স্কুলের এসএসসি পরীক্ষার্থীদের বিদায় সংবর্ধনা Logo সুর-নৃত্য-নাট্যে মণিপুরি থিয়েটারের বর্ণিল বিষু উৎসবের সমাপ্তি Logo দুর্নীতিবিরোধী বিতর্কে জুড়ীতে চ্যাম্পিয়ন মক্তদীর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় Logo বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমছে, আর দেশে বাড়ছে, খুবই দুঃখজনক: জামায়াত আমির Logo জ্বালানি তেলের জন্য সড়কেই রাত কাটাতে বাধ্য হয় বাইকাররা Logo চা বাগানের ৪ হাজার ৬শ’ ৬৮ জন অসচ্ছল শ্রমিক পাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ ভাতা Logo কুলাউড়ায় সাংবাদিকদের ঐক্যবদ্ধ প্ল্যাটফর্ম গঠনের আহ্বান জানান শওকতুল ইসলাম এমপি Logo জুড়ীতে ৩৭০০ কৃষকের হাতে পৌঁছাল সার ও বীজ

কুরআন ও হাদীসে কুরবানীর বিধান

মুফতি মাজহারুল ইসলাম, ষাটমা কন্ঠ:
  • আপডেট সময় : ০৬:৩৫:৫৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ জুন ২০২৫
  • / 316
যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যের সর্বশেষ খবর জানতে ভিজিট করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

কুরবানী

কুরবানী ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ বিধান এবং বিশেষ ধরনের ইবাদত। কুরবানীর একটি ইসলামী ধারণা এবং একটি জাহেলি ধারণা রয়েছে। জাহেলি ধারণা হল, কোন মূর্তি বা দেব-দেবীর সন্তুষ্টি লাভের জন্য কিংবা জিন-শয়তান বা কোন অশুভ শক্তির কাল্পনিক অনিষ্ট থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য তাদের উদ্দেশ্যে কোন কিছু উৎসর্গ করা। এটা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন কুসংস্কার এবং সম্পূর্ণ শিরক ও হারাম। তাওহীদের ধর্ম ইসলামে এর কোনো অবকাশ নেই।

পক্ষান্তরে ইসলামে কুরবানীর অর্থ হল, আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি ও নৈকট্য অর্জনের জন্য শরীয়তনির্দেশিত পন্থায় শরীয়ত কর্তৃক নির্ধারিত কোন প্রিয় বস্তু, আল্লাহ তায়ালার দরবারে পেশ করা এবং শরীয়ত-নির্দেশিত পন্থায় তা ব্যবহার করা।

এই কুরবানী আদম (আ.)-এর যুগ থেকে বিদ্যমান রয়েছে। সূরা মায়েদায় (আয়াত ২৭-৩১) আদম (আ.)-এর দুই সন্তানের কুরবানীর কথা এসেছে।  প্রত্যেক নবীর শরীয়তে কুরবানীর পন্থা এক ছিল না। সবশেষে  সকল জাতি ও ভূখন্ডের জন্য এবং কেয়ামত পর্যন্ত সবার জন্য যে নবী প্রেরিত হয়েছেন অর্থাৎ হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তাঁর প্রতি নাযিল হয়েছে সর্বশেষ ও চিরন্তন শরীয়ত, কুরআন ও সুন্নাহর শরীয়ত। এ শরীয়তে কুরবানীর যে পন্থা ও পদ্ধতি নির্দেশিত হয়েছে তার মূল সূত্র ‘মিল্লাতে ইবরাহীমী’তে বিদ্যমান ছিল। কুরআন মজীদ ও সহীহ হাদীস থেকে তা স্পষ্ট জানা যায়। এজন্য কুরবানীকে ‘সুন্নতে ইবরাহীমী’ নামে অভিহিত করা হয়।

ফার্সি, উর্দু ও বাংলা ভাষায় ‘কুরবানী’ শব্দটি আরবী ‘কুরবান’ শব্দের স্থলে ব্যবহৃত হয়। ‘কুরবান’ শব্দটি ‘কুরব’ মূলধাতু থেকে নির্গত, যার অর্থ হচ্ছে নৈকট্য। তাই আল্লাহ তাআলার নৈকট্য অর্জনের জন্য শরীয়তসম্মত পন্থায় আদায়কৃত বান্দার যেকোন আমলকে, আভিধানিক দিক থেকে ‘কুরবান’ বলা যেতে পারে। তবে শরীয়তের পরিভাষায় ‘কুরবান’ শব্দের মর্ম তা-ই, যা উপরে উল্লেখিত হয়েছে। ইসলামী শরীয়তে এই পারিভাষিক অর্থে দু ধরনের কুরবানী রয়েছে।

১. যা হজ্বের মৌসুমে নির্ধারিত স্থানে (মক্কা ও মিনায়) হজ্ব ও উমরা আদায়কারীগণ আদায় করে থাকেন। তা ‘কিরান’ বা তামাত্তু হজ্ব আদায়কারীর ওয়াজিব কুরবানী হতে পারে কিংবা ‘ইফরাদ’ হজ্বকারীর নফল কুরবানী। হাজ্বী নিজের সঙ্গে করে নিয়ে আসা ‘হাদি’ হতে পারে কিংবা হজ্ব আদায়ে অক্ষম হওয়ার বা কোন নিষিদ্ধ কর্মের জরিমানারূপে অপরিহার্য কুরবানী। তদ্রূপ মান্নতের কুরবানী হতে পারে কিংবা দশ যিলহজ্বের সাধারণ কুরবানী। এ কুরবানীর বিধান মৌলিকভাবে এসেছে সূরা হজ্ব ২৭-৩৭, সূরা বাকারা ১৯৬, সূরা মায়েদা ২, ৯৫-৯৭, সূরা ফাতহ ২৫-এ। আর হাদীস শরীফে তা বিস্তারিতভাবে উল্লেখিত হয়েছে।

২. সাধারণ কুরবানী, যা হজ্ব-উমরার সঙ্গে সম্পৃক্ত নয় এবং এ কুরবানীর স্থানও নির্ধারিত নয়। তবে সময় নির্ধারিত। যে তারিখে হজ্ব আদায়কারীগণ মিনা-মক্কায় কুরবানী করে থাকেন, সে তারিখে অর্থাৎ যিলহজ্বের দশ, এগারো ও বারো তারিখে এ কুরবানী হয়ে থাকে। পৃথিবীর সকল মুসলিম পরিবারের জন্য; বরং প্রত্যেক মুকাল্লাফ মুসলমানের জন্য এই কুরবানীর বিধান রয়েছে। কারো জন্য ওয়াজিব, কারো জন্য নফল।

এ কুরবানীর উল্লেখ এসেছে সূরা আনআমের ১৬১-১৬৩ আয়াতে এবং সূরা কাউসারের ২ আয়াতে। আর

বিস্তারিত বিধি-বিধান রয়েছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহতে।

৪. সূরা আনআমে আছেঃ-অর্থ-

‘”আপনি বলে দিন, আমার প্রতিপালক আমাকে পরিচালিত করেছেন সরল পথের দিকে, এক বিশুদ্ধ দ্বীনের দিকে। অর্থাৎ একনিষ্ঠ ইবরাহীমের মিল্লাত (তরীকা), আর তিনি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না। আপনি বলুন, নিঃসন্দেহে আমার সালাত, আমার নুসুক এবং আমার জীবন এবং আমার মৃত্যু- সমস্ত জগতের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। তাঁর কোন শরীক নেই। আর ওই বিষয়েই আমাকে আদেশ করা হয়েছে। সুতরাং আমি হলাম আত্মসমর্পণকারীদের প্রথম।”

এ আয়াতে (নুসুক)  শব্দটি বিশেষ মনোযোগের দাবিদার। (নাসিকাতুন) শব্দের বহুবচন, যার অর্থ হল আল্লাহর সন্তুষ্টি হাসিলের জন্য আল্লাহর নামে জবাইকৃত পশু। এজন্য আরবী ভাষায় এবং শরীয়তের পরিভাষায়ও কুরবানীর স্থানকে (মানসাক) বলা হয়। আরবী ভাষার ছোট, বড় নতুন-পুরাতন যেকোন অভিধানে এবং লুগাতুল কুরআন, লুগাতুল হাদীস, লুগাতুল ফিকহের যেকোন নির্ভরযোগ্য কিতাবে (নুসুক) শব্দের উপরোক্ত অর্থ পাওয়া যাবে। দৃষ্টান্তস্বরূপ কিছু প্রাচীন গ্রন্থের উদ্ধৃতি দিচ্ছি- লিসানুল আরব ১৪/১২৭-১২৮; ; আলমুফরাদাত ফী গারীবিল কুরআন ৮০২;

সূরা বাকারার ১৯৬ আয়াতেও এ শব্দটি একই অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।

উপরোক্ত আয়াতের অর্থ পরিষ্কার। হযরত ইবরাহীম (আ.)কে যে খালেছ তাওহীদ ও সিরাতে মুস্তাকীমের প্রত্যাদেশ আল্লাহ তাআলা করেছিলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতিও তা নাযিল করেছেন এবং তাঁকে আদেশ করেছেন যে, বল, আমার নামায, আমার কুরবানী, আমার জীবন, আমার মরণ সব আল্লাহর জন্য।

উল্লেখ্য, আরবী ভাষায়  (নুসুক) শব্দটি ইবাদতের অর্থেও ব্যবহৃত হয়। এজন্য ইবাদতকারীকে (নাসিক)  ও ইবাদতের পদ্ধতিকে  (মানসাক) বলা হয়। সূরা আনআমের উক্ত আয়াতে যদি (নুুসুক)  শব্দের অর্থ ইবাদত করা হয়, তবুও তাতে কুরবানী অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একাধিক হাদীসে ঈদুল আযহার কুরবানীকে (নুসুক) বলেছেন। কুরবানীর পশু জবাই করার সময় যে দুআ পড়ার কথা হাদীসে এসেছে, তাতেও ওই আয়াত রয়েছে। হাদীসটি নিচে উল্লেখ করা হল।

জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদের দিন দু’টি দুম্বা জবাই করেছেন। তিনি সময় যখন সেগুলোকে কেবলামুখী করে শায়িত করলেন তখন বললেন-

“ইন্নি ওয়াজ্জাহতু ওয়াজহিয়া লিল্লাজি ফাতারাস্সামাওয়াতি ওয়াল আরদ্বা আলা মিল্লাতি ইবরাহিমা হানিফাম মুসলিমাউ ওয়ামা আনা মিনাল-মুশরিকীন ইন্না সালাতি ও নুসুকি কি ওমাহয়ায়া ওমামাতি লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন লা’শাড়িকালাহু অভিযালিকা উমিরতু ওয়া আনা  আওয়ালুল মুসলিমিন। বিসমিল্লাহি ওয়াল্লাহু আকবার। আললাহুমমা মিনকা ওয়ালাকা, আন  মুহাম্মদিউ ওয়া উম্মাতিহি। “

– আবু দাউদ ৩/৯৫, হাদীস ২৭৯৫; মুসনাদে আহমদ ৩/৩৭৫, হাদীস ১৫০২২; সহীহ ইবনে খুযাইমা, হাদীস ২৮৯৯

কুরবানীর শুরুতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই আয়াত ও দুআ পড়া থেকে একদিকে যেমন প্রমাণিত হয় যে, কুরবানী খালেছ ইবাদত, তেমনি একথাও প্রমাণিত হয় যে, সূরা আনআমের ১৬২ নম্বর আয়াতে ‘নুসুক’ শব্দের অর্থ ঈদুল আযহার কুরবানী কিংবা ওই শব্দে কুরবানীও শামিল রয়েছে।

অপর যে আয়াতে সাধারণ কুরবানীর উল্লেখ রয়েছে তা হল সূরা কাউসারের দ্বিতীয় আয়াত। ইরশাদ হয়েছে-(বাংলা উচ্চারণ)

“ইন্না আ’তায়না কাল কাওসার ফাছল্লিলি রাব্বিকা ওয়ানহার,ইন্না শা’নিআকা হুওয়াল আবতার”

এখানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এবং তাঁর মাধ্যমে গোটা উম্মতকে সালাত (নামায) ও নাহর (কুরবানীর) আদেশ দেওয়া হয়েছে।

কোরবানির ইতিহাস:

কোরবানি প্রথা মানবজাতির আদি পিতা হযরত আদম আলাইহিস সালাতু সালাম এর দুই পুত্র হাবিল ও কাবিল এর মাধ্যমে শুরু হয়েছিল। হাবিল কাবিলের কোরবানি মানব ইতিহাসে সর্বপ্রথম কোরবানি। আল্লাহ তাআলা আদম আ: এর পুত্রদের এ কুরবানীর কাহিনী কোরআনে কারীমে বিশদভাবে বর্ণনা করেছেন। এবং প্রিয় রাসূল সা. কে এ ঘটনা উম্মতের নিকট যথাযত ভাবে বর্ণনা করার নির্দেশও দিয়েছেন। বর্ণিত আছে যে হযরত আদম (আঃ)এবং মা হাওয়া (আঃ) যখন দুনিয়া আগমন করেন। এবং সন্তান প্রজনন ও  বংশবিস্তার আরম্ভ হয়, তখন  প্রতি গর্ভে থেকে একটি পুত্র সন্তান ও  একটি কন্যা সন্তান জন্মগ্রহণ করত। তখন আদম আ. এর সন্তান ব্যতীত যেহেতু অন্য কোন মানুষই ছিল না। তাই আল্লাহ তায়ালা উপস্থিত প্রয়োজনের খাতিরে আদম আ.এর  শরীয়তে বিশেষভাবে এ নির্দেশ জারি করেন যে, একই গর্ভ থেকে যে জমজ পুত্র ও কন্যা জন্মগ্রহণ করবে, তারা পরস্পর ভাই-বোন বলে গণ্য হবে। এবং তাদের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক হারাম হবে। পক্ষান্তরে পরের গর্ভ থেকে জন্মগ্রহণকারী কন্যা প্রথম গর্ভ থেকে জন্মগ্রহণকারী পুত্র উভয়ের জন্য সহধরা বোন বলে গণ্য হবে না। একই ভাবে প্রথম গর্ভের জন্মগ্রহণকারী পুত্রের জন্য পরবর্তী গর্ভ থেকে জন্মগ্রহণকারী কন্যা সহ ধরা বোন বলে গণ্য হবে না। বিধায় এদের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক বৈধ হবে। কিন্তু ঘটনাক্রমে কাবিলের সহজাত সোহদরা বোন ছিল পরমা সুন্দরী।

এবং হাবিলের সহজাত বোন ছিল কুদসিত- কদাকার। বিবাহর সময় হলে নিয়ম অনুযায়ী হাবিলের জমজ কুশ্রী কন্যা কাবিলের ভাগে পড়ে। এতে কাবিল অসুন্তুষ্ট হয়ে হাবিলের শত্রু হয়ে যায়। এবং সে জেদ ধরে যে আমার জমজ বোনকে আমার সঙ্গে বিবাহ দিতে হবে। হযরত আদম (আঃ) এর শরীয়তের নিয়ম অনুযায়ী কাবিলের আবদার প্রত্যাখ্যান করলেন। এবং উভয়ের মতভেদ দূর করার জন্য বললেন, তোমরা উভয়ে আল্লাহর জন্য নিজ নিজ কোরবানি পেশ করো। যার কোরবানির গৃহীত হবে সেই উক্ত কন্যাকে বিয়ে করবে। তৎকালে কোরবানি গৃহীত হওয়ার আলামত ছিল আকাশ থেকে একটি অগ্নি শিখা এসে কুরবানীকে ভূষ্মিত করে আবার অন্তরিত হয়ে যেত আরজে কোরবানি কি আগুন স্পর্শ করত না বাজিয়ে বোস্মিত করত না তা প্রত্যাখান মনে করা হতো। হাবিল ভেড়া, দুম্বা পালন করত তাই সে একটি উন্নত মানের দুম্বা কোরবানির জন্য পেশ করল আর কাবিল কৃষিকাজ করত তাই সে কিছু শস্য গম ইত্যাদি পেশ করল আসমান থেকে নিয়ম অনুযায়ী অগ্নিশিখা নেমে এলো এবং হাবিলের কোরবানিতে জ্বালিয়ে দিয়ে অন্তর্হিত হয়ে গেল। আর কাবিলের কোরবানি যেমন ছিল তেমনি জমিনে পড়ে রইল। এ অকৃতকার্যতায় তার খুব দুঃখ বেড়ে গেল, এবং আত্মসমর্পণ করতে না পেরে, সে ভাইকে প্রকাশ্য বলে দিল আমি তোমাকে খুন করবো। হাবিল মার্জিত আকারে একটা নীতিগত কথা বললেন:”আল্লাহতালা তো কেবল খোদাভীর ও পরহেজগারদের কর্ম গ্রহণ করেন “।কোরবানির বস্তু বা জন্তু মুখ্য উদ্দেশ্য নয়। উদ্দেশ্য তাকওয়া। কোরআনে এ কাহিনী আল্লাহ তাআলা সূরা মায়েদার ২৭-৩১নং আয়াতে বর্ণনা করেছেন।

ইব্রাহিম আলাইহিস সালামের কুরবানী :

আমরা কোরবানির সম্পর্কে ইতিপূর্বে জেনেছি  যে, কোরবানির শুরু ও সূচনা হযরত আদম আ.এর পুত্র  হাবিল – কাবিল থেকে হয়েছিল। কিন্তু আমাদের কোরবাণীর সম্পর্ক হযরত ইব্রাহিম আ.এর পুত্র কোরবানির অবিস্মরণীয় ঘটনার সাথে। এই ঘটনাকে স্মারক হিসেবেই উম্মতে মুহাম্মদীর উপর কোরবানির ওয়াজিব করা হয়েছে। ইসলামের সেই ঘটনা পৃথিবীর ইতিহাসে এক নজিরবিহীন শিক্ষনীয় ঘটনা। কোরবানীর তাৎপর্য ও উদ্দেশ্য বুঝার জন্য এ ঘটনায় হলো একমাত্র কেন্দ্রবিন্দু।

হযরত ইব্রাহীম আ. জীবনের প্রায় পুরোটাই  কাটিয়ে দেন নিঃসন্তান অবস্থায়। তার বয়স যখন ৮৬ বছর, তখন একদিন তিনি আল্লাহ তায়ালার কাছে দোয়া করলেন। ” পরওয়ারদেগার! আমাকে সৎ পুত্র সন্তান দান কর “সূরা সাফফাত : আয়াতনং১০০।

 তার এ দোয়া কবুল হয় এবং আল্লাহ তা’আলা তাকে এক পুত্রের সু -সংবাদ দেন।

এরশাদ হচ্ছে” আমি তাকে এক সহনশীল পুত্রের সুসংবাদ দিলাম”। (সুরা  সাফফাত: আয়াত নং১০১) সহনশীল বলে এদিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, এ নবজাতক  জীবনে সবর ধৈর্য ও সহনশীলতার  এমন পরাকাষ্ঠ প্রদর্শন করবে যার দৃষ্টান্ত দুনিয়ার কেউ কোনদিন পেশ করতে পারবে না।

বৃদ্ধ অবস্থায় ইব্রাহিম আ.এর পুত্র লাভ:-

হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর স্ত্রী হযরত সারা যখন দেখলেন যে তার গর্ভে কোন সন্তান হচ্ছে না, তখন তিনি নিজেকে বন্দাই মনে করলেন। এদিকে মিশরের সম্রাট ফেরাউন তাঁর হাজারা নামনীকন্যা। অন্যমতে বাদিকে হযরত ‘ সারার ‘খেদমতের জন্য দান করলেন। হাজেরা তাকে  ইব্রাহিম আ. এর খেদমতের জন্য দিয়ে দিলেন। অতঃপর তিনি তাকে পড়িনয় সূত্রে আবদ্ধ করে নিলেন। এরপর এক পুত্র জন্মগ্রহণ করলেন, তার নাম রাখলেন, ইসমাইল। হযরত সারার গর্ভে পরবর্তীতে হযরত ইব্রাহীম এর  দ্বিতীয় পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করেন। যার নাম রাখেন, তিনি ‘ইসহাক ‘এ সময় হযরত ইব্রাহিম ইসলামের বয়স হয়েছিল ১২০ বছর ও সারার বয়স হয়েছিল 99 বছর। লালন পালনের দীর্ঘ কষ্ট সহ্য করার পর যখন বিপদে-আপদে কাজে কর্মে সন্তান পিতার পাশে দাঁড়াবার বয়সে পৌছল।

 তখন আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশ হলো পুত্রকে কোরবানি করার। এ ঘটনা কে কুরআনে কারীমে আল্লাহতালা বর্ণনা করেছেন। (সূরা সাফফাত: ১০২ )

“অতঃপর যখন পুত্র পিতার সঙ্গে চলাফেরার মতো বয়সে উপনীত হলো। তখন ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম বললেন: হে আমার পুত্র  আমি স্বপ্নে দেখেছি যে তোমাকে জবাই করেছি তুমি ভেবে দেখো কি করবে? আপনাকে যে নির্দেশ দেয়া হয়েছে আর তা আপনি আমাকে সবরকারীদের মধ্যে পাবেন”।

এবার পিতা পুত্র উভয়ে কুরবানীর জন্য প্রস্তুত হলেন।

এরশাদ হচ্ছে

” অত পর তারা যখন উভয়ে আনুগত্য প্রকাশ করলেন এবং ইব্রাহিম আ. তাকে সায়ীত করলেন”(আয়াত নং১০৩)।

তাফসীরের কিতাবে উল্লেখ করেছে, যে অবশেষে তারা উভয়ে যখন কোরবানগাহে পোছলেন, তখন হযরত ইসমাইল আলাইহিস সালাম পিতা কে বললেন, পিতা আমাকে খুব শক্ত করে ভেধেনিন

যাতে করে ছটফট করতে না পারি।  বস্ত্র ও শামলে নিন যাতে আমার রক্তের চিটা তাতে না লাগে। এতে সাওয়াব হ্রাস পেতে পারে। এছাড়া রক্ত দেখলে আমার মা অধিক ব্যাকুল হবেন। আর আপনার ছুরিটাও একটু ধার দিয়ে নিন। এবং তা আমার গলায় দ্রুত চালান। যাতে আমার প্রাণ সহজে বের হয়ে যায়। কারণ মৃত্যু বড় কঠিন ব্যাপার। আপনি আমার মায়ের কাছে পৌঁছে আমার সালাম বলবেন। যদি আমার জামা তার কাছে নিয়ে যেতে চান তবে নিয়ে যাবেন। এতে হয়তো তিনি সান্তনা খুজে পাবেন। এর পর ইব্রাহীম (আঃ) পুত্রকে চুমু খেলেন এবং অশ্রুপুর্ণ অবস্থায় তাকে বেঁধে নিলেন। এবং কাত করে এমনভাবে শায়িত  করলেন। যেন কপালের এক পাশ মাঠিতে স্পর্শ করে। এরপর তিনি স্বজোরে ছুরি চালানো শুরু করলেন। কিন্তু কাটছে না! এ অবস্থা দেখে ফেরেশতাকোল দোয়া তাসবিহ ও তাহমিদ পাঠ সহকারে চিৎকার করে বলতে লাগলো- হে আমাদের প্রভু!হে আমাদের  মাওলা! এ বৃদ্ধ লোকটির প্রতি রহম কর এবং ছোট্ট বালকের জীবন রক্ষা করো। অতঃপর  আল্লাহ তাদের প্রার্থনা কবুল করলেন এবং ডাক দিয়ে বললেন:

” আমি তাকে ডেকে বললাম, হে ইব্রাহীম! তুমি তো স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করে দেখালে। আমি এভাবে পূন্যবানদেরকে প্রতিদান দিয়ে থাকি। নিশ্চয়ই এটা একটা সুস্পষ্ট পরীক্ষা। আমি তার পরিবর্তে জবাই করার জন্য দিলাম এক মহান জন্তু”।  (সুরা সাফ্ফাত আয়াত নং ১০৪-১০৭)

 হযরত জিবরাইল আ. এক জান্নাতী দুম্বা নিয়ে উপস্থিত হলেন। অবশেষে তা’ই কুরবানী করলেন হযরত ইব্রাহিম  (আঃ)। এ থেকে এলো আমাদের এ কুরবানী। কোরবানীর মুল কথাটা হলো, বান্দার জান -মাল, ইবাদত -বন্দেগী, জীবন মরণ সবকিছুই আল্লাহ র হুকুমের সামনে সমর্পণ করা। এরশাদ হচ্ছে:

“আমার কোরবানি আমার জীবন আমার মরণ সবাই রাব্বুল আলামিনের জন্য নিবেদিত”।(সুরা আনআম : ১৬২)

 মোটকথা, আল্লাহ তাআলা হজরত ইব্রাহিম আ. এর  সুমহান ত্যাগের আদর্শকে পৃথিবীতে সুপ্রতিষ্টিত  করার জন্যই সামর্থবান মু’মিন মুসলমানের উপর কুরবানী ওয়াজিব করেছেন। এ মহান কুরবানী আমাদের সামনে সমাগত। আমরা এখন থেকে প্রস্তুতি গ্রহণ করবো এবং দোয়া করবো যেন আমরা ইব্রাহীমী আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে কোরবানি করতে পারি।

লেখক: মুফতি মাজহারুল ইসলাম,

ইমাম ও খতিব দোহালিয়া কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, 

সিনিয়র মুহাদ্দিস, দক্ষিণভাগ মোহাম্মাদিয়া দারুল হাদিস টাইটেল মাদ্রাসা টিলাবাজার।

নিউজটি শেয়ার করুন

কুরআন ও হাদীসে কুরবানীর বিধান

আপডেট সময় : ০৬:৩৫:৫৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ জুন ২০২৫

কুরবানী

কুরবানী ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ বিধান এবং বিশেষ ধরনের ইবাদত। কুরবানীর একটি ইসলামী ধারণা এবং একটি জাহেলি ধারণা রয়েছে। জাহেলি ধারণা হল, কোন মূর্তি বা দেব-দেবীর সন্তুষ্টি লাভের জন্য কিংবা জিন-শয়তান বা কোন অশুভ শক্তির কাল্পনিক অনিষ্ট থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য তাদের উদ্দেশ্যে কোন কিছু উৎসর্গ করা। এটা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন কুসংস্কার এবং সম্পূর্ণ শিরক ও হারাম। তাওহীদের ধর্ম ইসলামে এর কোনো অবকাশ নেই।

পক্ষান্তরে ইসলামে কুরবানীর অর্থ হল, আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি ও নৈকট্য অর্জনের জন্য শরীয়তনির্দেশিত পন্থায় শরীয়ত কর্তৃক নির্ধারিত কোন প্রিয় বস্তু, আল্লাহ তায়ালার দরবারে পেশ করা এবং শরীয়ত-নির্দেশিত পন্থায় তা ব্যবহার করা।

এই কুরবানী আদম (আ.)-এর যুগ থেকে বিদ্যমান রয়েছে। সূরা মায়েদায় (আয়াত ২৭-৩১) আদম (আ.)-এর দুই সন্তানের কুরবানীর কথা এসেছে।  প্রত্যেক নবীর শরীয়তে কুরবানীর পন্থা এক ছিল না। সবশেষে  সকল জাতি ও ভূখন্ডের জন্য এবং কেয়ামত পর্যন্ত সবার জন্য যে নবী প্রেরিত হয়েছেন অর্থাৎ হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তাঁর প্রতি নাযিল হয়েছে সর্বশেষ ও চিরন্তন শরীয়ত, কুরআন ও সুন্নাহর শরীয়ত। এ শরীয়তে কুরবানীর যে পন্থা ও পদ্ধতি নির্দেশিত হয়েছে তার মূল সূত্র ‘মিল্লাতে ইবরাহীমী’তে বিদ্যমান ছিল। কুরআন মজীদ ও সহীহ হাদীস থেকে তা স্পষ্ট জানা যায়। এজন্য কুরবানীকে ‘সুন্নতে ইবরাহীমী’ নামে অভিহিত করা হয়।

ফার্সি, উর্দু ও বাংলা ভাষায় ‘কুরবানী’ শব্দটি আরবী ‘কুরবান’ শব্দের স্থলে ব্যবহৃত হয়। ‘কুরবান’ শব্দটি ‘কুরব’ মূলধাতু থেকে নির্গত, যার অর্থ হচ্ছে নৈকট্য। তাই আল্লাহ তাআলার নৈকট্য অর্জনের জন্য শরীয়তসম্মত পন্থায় আদায়কৃত বান্দার যেকোন আমলকে, আভিধানিক দিক থেকে ‘কুরবান’ বলা যেতে পারে। তবে শরীয়তের পরিভাষায় ‘কুরবান’ শব্দের মর্ম তা-ই, যা উপরে উল্লেখিত হয়েছে। ইসলামী শরীয়তে এই পারিভাষিক অর্থে দু ধরনের কুরবানী রয়েছে।

১. যা হজ্বের মৌসুমে নির্ধারিত স্থানে (মক্কা ও মিনায়) হজ্ব ও উমরা আদায়কারীগণ আদায় করে থাকেন। তা ‘কিরান’ বা তামাত্তু হজ্ব আদায়কারীর ওয়াজিব কুরবানী হতে পারে কিংবা ‘ইফরাদ’ হজ্বকারীর নফল কুরবানী। হাজ্বী নিজের সঙ্গে করে নিয়ে আসা ‘হাদি’ হতে পারে কিংবা হজ্ব আদায়ে অক্ষম হওয়ার বা কোন নিষিদ্ধ কর্মের জরিমানারূপে অপরিহার্য কুরবানী। তদ্রূপ মান্নতের কুরবানী হতে পারে কিংবা দশ যিলহজ্বের সাধারণ কুরবানী। এ কুরবানীর বিধান মৌলিকভাবে এসেছে সূরা হজ্ব ২৭-৩৭, সূরা বাকারা ১৯৬, সূরা মায়েদা ২, ৯৫-৯৭, সূরা ফাতহ ২৫-এ। আর হাদীস শরীফে তা বিস্তারিতভাবে উল্লেখিত হয়েছে।

২. সাধারণ কুরবানী, যা হজ্ব-উমরার সঙ্গে সম্পৃক্ত নয় এবং এ কুরবানীর স্থানও নির্ধারিত নয়। তবে সময় নির্ধারিত। যে তারিখে হজ্ব আদায়কারীগণ মিনা-মক্কায় কুরবানী করে থাকেন, সে তারিখে অর্থাৎ যিলহজ্বের দশ, এগারো ও বারো তারিখে এ কুরবানী হয়ে থাকে। পৃথিবীর সকল মুসলিম পরিবারের জন্য; বরং প্রত্যেক মুকাল্লাফ মুসলমানের জন্য এই কুরবানীর বিধান রয়েছে। কারো জন্য ওয়াজিব, কারো জন্য নফল।

এ কুরবানীর উল্লেখ এসেছে সূরা আনআমের ১৬১-১৬৩ আয়াতে এবং সূরা কাউসারের ২ আয়াতে। আর

বিস্তারিত বিধি-বিধান রয়েছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহতে।

৪. সূরা আনআমে আছেঃ-অর্থ-

‘”আপনি বলে দিন, আমার প্রতিপালক আমাকে পরিচালিত করেছেন সরল পথের দিকে, এক বিশুদ্ধ দ্বীনের দিকে। অর্থাৎ একনিষ্ঠ ইবরাহীমের মিল্লাত (তরীকা), আর তিনি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না। আপনি বলুন, নিঃসন্দেহে আমার সালাত, আমার নুসুক এবং আমার জীবন এবং আমার মৃত্যু- সমস্ত জগতের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। তাঁর কোন শরীক নেই। আর ওই বিষয়েই আমাকে আদেশ করা হয়েছে। সুতরাং আমি হলাম আত্মসমর্পণকারীদের প্রথম।”

এ আয়াতে (নুসুক)  শব্দটি বিশেষ মনোযোগের দাবিদার। (নাসিকাতুন) শব্দের বহুবচন, যার অর্থ হল আল্লাহর সন্তুষ্টি হাসিলের জন্য আল্লাহর নামে জবাইকৃত পশু। এজন্য আরবী ভাষায় এবং শরীয়তের পরিভাষায়ও কুরবানীর স্থানকে (মানসাক) বলা হয়। আরবী ভাষার ছোট, বড় নতুন-পুরাতন যেকোন অভিধানে এবং লুগাতুল কুরআন, লুগাতুল হাদীস, লুগাতুল ফিকহের যেকোন নির্ভরযোগ্য কিতাবে (নুসুক) শব্দের উপরোক্ত অর্থ পাওয়া যাবে। দৃষ্টান্তস্বরূপ কিছু প্রাচীন গ্রন্থের উদ্ধৃতি দিচ্ছি- লিসানুল আরব ১৪/১২৭-১২৮; ; আলমুফরাদাত ফী গারীবিল কুরআন ৮০২;

সূরা বাকারার ১৯৬ আয়াতেও এ শব্দটি একই অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।

উপরোক্ত আয়াতের অর্থ পরিষ্কার। হযরত ইবরাহীম (আ.)কে যে খালেছ তাওহীদ ও সিরাতে মুস্তাকীমের প্রত্যাদেশ আল্লাহ তাআলা করেছিলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতিও তা নাযিল করেছেন এবং তাঁকে আদেশ করেছেন যে, বল, আমার নামায, আমার কুরবানী, আমার জীবন, আমার মরণ সব আল্লাহর জন্য।

উল্লেখ্য, আরবী ভাষায়  (নুসুক) শব্দটি ইবাদতের অর্থেও ব্যবহৃত হয়। এজন্য ইবাদতকারীকে (নাসিক)  ও ইবাদতের পদ্ধতিকে  (মানসাক) বলা হয়। সূরা আনআমের উক্ত আয়াতে যদি (নুুসুক)  শব্দের অর্থ ইবাদত করা হয়, তবুও তাতে কুরবানী অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একাধিক হাদীসে ঈদুল আযহার কুরবানীকে (নুসুক) বলেছেন। কুরবানীর পশু জবাই করার সময় যে দুআ পড়ার কথা হাদীসে এসেছে, তাতেও ওই আয়াত রয়েছে। হাদীসটি নিচে উল্লেখ করা হল।

জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদের দিন দু’টি দুম্বা জবাই করেছেন। তিনি সময় যখন সেগুলোকে কেবলামুখী করে শায়িত করলেন তখন বললেন-

“ইন্নি ওয়াজ্জাহতু ওয়াজহিয়া লিল্লাজি ফাতারাস্সামাওয়াতি ওয়াল আরদ্বা আলা মিল্লাতি ইবরাহিমা হানিফাম মুসলিমাউ ওয়ামা আনা মিনাল-মুশরিকীন ইন্না সালাতি ও নুসুকি কি ওমাহয়ায়া ওমামাতি লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন লা’শাড়িকালাহু অভিযালিকা উমিরতু ওয়া আনা  আওয়ালুল মুসলিমিন। বিসমিল্লাহি ওয়াল্লাহু আকবার। আললাহুমমা মিনকা ওয়ালাকা, আন  মুহাম্মদিউ ওয়া উম্মাতিহি। “

– আবু দাউদ ৩/৯৫, হাদীস ২৭৯৫; মুসনাদে আহমদ ৩/৩৭৫, হাদীস ১৫০২২; সহীহ ইবনে খুযাইমা, হাদীস ২৮৯৯

কুরবানীর শুরুতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই আয়াত ও দুআ পড়া থেকে একদিকে যেমন প্রমাণিত হয় যে, কুরবানী খালেছ ইবাদত, তেমনি একথাও প্রমাণিত হয় যে, সূরা আনআমের ১৬২ নম্বর আয়াতে ‘নুসুক’ শব্দের অর্থ ঈদুল আযহার কুরবানী কিংবা ওই শব্দে কুরবানীও শামিল রয়েছে।

অপর যে আয়াতে সাধারণ কুরবানীর উল্লেখ রয়েছে তা হল সূরা কাউসারের দ্বিতীয় আয়াত। ইরশাদ হয়েছে-(বাংলা উচ্চারণ)

“ইন্না আ’তায়না কাল কাওসার ফাছল্লিলি রাব্বিকা ওয়ানহার,ইন্না শা’নিআকা হুওয়াল আবতার”

এখানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু  আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এবং তাঁর মাধ্যমে গোটা উম্মতকে সালাত (নামায) ও নাহর (কুরবানীর) আদেশ দেওয়া হয়েছে।

কোরবানির ইতিহাস:

কোরবানি প্রথা মানবজাতির আদি পিতা হযরত আদম আলাইহিস সালাতু সালাম এর দুই পুত্র হাবিল ও কাবিল এর মাধ্যমে শুরু হয়েছিল। হাবিল কাবিলের কোরবানি মানব ইতিহাসে সর্বপ্রথম কোরবানি। আল্লাহ তাআলা আদম আ: এর পুত্রদের এ কুরবানীর কাহিনী কোরআনে কারীমে বিশদভাবে বর্ণনা করেছেন। এবং প্রিয় রাসূল সা. কে এ ঘটনা উম্মতের নিকট যথাযত ভাবে বর্ণনা করার নির্দেশও দিয়েছেন। বর্ণিত আছে যে হযরত আদম (আঃ)এবং মা হাওয়া (আঃ) যখন দুনিয়া আগমন করেন। এবং সন্তান প্রজনন ও  বংশবিস্তার আরম্ভ হয়, তখন  প্রতি গর্ভে থেকে একটি পুত্র সন্তান ও  একটি কন্যা সন্তান জন্মগ্রহণ করত। তখন আদম আ. এর সন্তান ব্যতীত যেহেতু অন্য কোন মানুষই ছিল না। তাই আল্লাহ তায়ালা উপস্থিত প্রয়োজনের খাতিরে আদম আ.এর  শরীয়তে বিশেষভাবে এ নির্দেশ জারি করেন যে, একই গর্ভ থেকে যে জমজ পুত্র ও কন্যা জন্মগ্রহণ করবে, তারা পরস্পর ভাই-বোন বলে গণ্য হবে। এবং তাদের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক হারাম হবে। পক্ষান্তরে পরের গর্ভ থেকে জন্মগ্রহণকারী কন্যা প্রথম গর্ভ থেকে জন্মগ্রহণকারী পুত্র উভয়ের জন্য সহধরা বোন বলে গণ্য হবে না। একই ভাবে প্রথম গর্ভের জন্মগ্রহণকারী পুত্রের জন্য পরবর্তী গর্ভ থেকে জন্মগ্রহণকারী কন্যা সহ ধরা বোন বলে গণ্য হবে না। বিধায় এদের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক বৈধ হবে। কিন্তু ঘটনাক্রমে কাবিলের সহজাত সোহদরা বোন ছিল পরমা সুন্দরী।

এবং হাবিলের সহজাত বোন ছিল কুদসিত- কদাকার। বিবাহর সময় হলে নিয়ম অনুযায়ী হাবিলের জমজ কুশ্রী কন্যা কাবিলের ভাগে পড়ে। এতে কাবিল অসুন্তুষ্ট হয়ে হাবিলের শত্রু হয়ে যায়। এবং সে জেদ ধরে যে আমার জমজ বোনকে আমার সঙ্গে বিবাহ দিতে হবে। হযরত আদম (আঃ) এর শরীয়তের নিয়ম অনুযায়ী কাবিলের আবদার প্রত্যাখ্যান করলেন। এবং উভয়ের মতভেদ দূর করার জন্য বললেন, তোমরা উভয়ে আল্লাহর জন্য নিজ নিজ কোরবানি পেশ করো। যার কোরবানির গৃহীত হবে সেই উক্ত কন্যাকে বিয়ে করবে। তৎকালে কোরবানি গৃহীত হওয়ার আলামত ছিল আকাশ থেকে একটি অগ্নি শিখা এসে কুরবানীকে ভূষ্মিত করে আবার অন্তরিত হয়ে যেত আরজে কোরবানি কি আগুন স্পর্শ করত না বাজিয়ে বোস্মিত করত না তা প্রত্যাখান মনে করা হতো। হাবিল ভেড়া, দুম্বা পালন করত তাই সে একটি উন্নত মানের দুম্বা কোরবানির জন্য পেশ করল আর কাবিল কৃষিকাজ করত তাই সে কিছু শস্য গম ইত্যাদি পেশ করল আসমান থেকে নিয়ম অনুযায়ী অগ্নিশিখা নেমে এলো এবং হাবিলের কোরবানিতে জ্বালিয়ে দিয়ে অন্তর্হিত হয়ে গেল। আর কাবিলের কোরবানি যেমন ছিল তেমনি জমিনে পড়ে রইল। এ অকৃতকার্যতায় তার খুব দুঃখ বেড়ে গেল, এবং আত্মসমর্পণ করতে না পেরে, সে ভাইকে প্রকাশ্য বলে দিল আমি তোমাকে খুন করবো। হাবিল মার্জিত আকারে একটা নীতিগত কথা বললেন:”আল্লাহতালা তো কেবল খোদাভীর ও পরহেজগারদের কর্ম গ্রহণ করেন “।কোরবানির বস্তু বা জন্তু মুখ্য উদ্দেশ্য নয়। উদ্দেশ্য তাকওয়া। কোরআনে এ কাহিনী আল্লাহ তাআলা সূরা মায়েদার ২৭-৩১নং আয়াতে বর্ণনা করেছেন।

ইব্রাহিম আলাইহিস সালামের কুরবানী :

আমরা কোরবানির সম্পর্কে ইতিপূর্বে জেনেছি  যে, কোরবানির শুরু ও সূচনা হযরত আদম আ.এর পুত্র  হাবিল – কাবিল থেকে হয়েছিল। কিন্তু আমাদের কোরবাণীর সম্পর্ক হযরত ইব্রাহিম আ.এর পুত্র কোরবানির অবিস্মরণীয় ঘটনার সাথে। এই ঘটনাকে স্মারক হিসেবেই উম্মতে মুহাম্মদীর উপর কোরবানির ওয়াজিব করা হয়েছে। ইসলামের সেই ঘটনা পৃথিবীর ইতিহাসে এক নজিরবিহীন শিক্ষনীয় ঘটনা। কোরবানীর তাৎপর্য ও উদ্দেশ্য বুঝার জন্য এ ঘটনায় হলো একমাত্র কেন্দ্রবিন্দু।

হযরত ইব্রাহীম আ. জীবনের প্রায় পুরোটাই  কাটিয়ে দেন নিঃসন্তান অবস্থায়। তার বয়স যখন ৮৬ বছর, তখন একদিন তিনি আল্লাহ তায়ালার কাছে দোয়া করলেন। ” পরওয়ারদেগার! আমাকে সৎ পুত্র সন্তান দান কর “সূরা সাফফাত : আয়াতনং১০০।

 তার এ দোয়া কবুল হয় এবং আল্লাহ তা’আলা তাকে এক পুত্রের সু -সংবাদ দেন।

এরশাদ হচ্ছে” আমি তাকে এক সহনশীল পুত্রের সুসংবাদ দিলাম”। (সুরা  সাফফাত: আয়াত নং১০১) সহনশীল বলে এদিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, এ নবজাতক  জীবনে সবর ধৈর্য ও সহনশীলতার  এমন পরাকাষ্ঠ প্রদর্শন করবে যার দৃষ্টান্ত দুনিয়ার কেউ কোনদিন পেশ করতে পারবে না।

বৃদ্ধ অবস্থায় ইব্রাহিম আ.এর পুত্র লাভ:-

হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর স্ত্রী হযরত সারা যখন দেখলেন যে তার গর্ভে কোন সন্তান হচ্ছে না, তখন তিনি নিজেকে বন্দাই মনে করলেন। এদিকে মিশরের সম্রাট ফেরাউন তাঁর হাজারা নামনীকন্যা। অন্যমতে বাদিকে হযরত ‘ সারার ‘খেদমতের জন্য দান করলেন। হাজেরা তাকে  ইব্রাহিম আ. এর খেদমতের জন্য দিয়ে দিলেন। অতঃপর তিনি তাকে পড়িনয় সূত্রে আবদ্ধ করে নিলেন। এরপর এক পুত্র জন্মগ্রহণ করলেন, তার নাম রাখলেন, ইসমাইল। হযরত সারার গর্ভে পরবর্তীতে হযরত ইব্রাহীম এর  দ্বিতীয় পুত্র সন্তান জন্মগ্রহণ করেন। যার নাম রাখেন, তিনি ‘ইসহাক ‘এ সময় হযরত ইব্রাহিম ইসলামের বয়স হয়েছিল ১২০ বছর ও সারার বয়স হয়েছিল 99 বছর। লালন পালনের দীর্ঘ কষ্ট সহ্য করার পর যখন বিপদে-আপদে কাজে কর্মে সন্তান পিতার পাশে দাঁড়াবার বয়সে পৌছল।

 তখন আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশ হলো পুত্রকে কোরবানি করার। এ ঘটনা কে কুরআনে কারীমে আল্লাহতালা বর্ণনা করেছেন। (সূরা সাফফাত: ১০২ )

“অতঃপর যখন পুত্র পিতার সঙ্গে চলাফেরার মতো বয়সে উপনীত হলো। তখন ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম বললেন: হে আমার পুত্র  আমি স্বপ্নে দেখেছি যে তোমাকে জবাই করেছি তুমি ভেবে দেখো কি করবে? আপনাকে যে নির্দেশ দেয়া হয়েছে আর তা আপনি আমাকে সবরকারীদের মধ্যে পাবেন”।

এবার পিতা পুত্র উভয়ে কুরবানীর জন্য প্রস্তুত হলেন।

এরশাদ হচ্ছে

” অত পর তারা যখন উভয়ে আনুগত্য প্রকাশ করলেন এবং ইব্রাহিম আ. তাকে সায়ীত করলেন”(আয়াত নং১০৩)।

তাফসীরের কিতাবে উল্লেখ করেছে, যে অবশেষে তারা উভয়ে যখন কোরবানগাহে পোছলেন, তখন হযরত ইসমাইল আলাইহিস সালাম পিতা কে বললেন, পিতা আমাকে খুব শক্ত করে ভেধেনিন

যাতে করে ছটফট করতে না পারি।  বস্ত্র ও শামলে নিন যাতে আমার রক্তের চিটা তাতে না লাগে। এতে সাওয়াব হ্রাস পেতে পারে। এছাড়া রক্ত দেখলে আমার মা অধিক ব্যাকুল হবেন। আর আপনার ছুরিটাও একটু ধার দিয়ে নিন। এবং তা আমার গলায় দ্রুত চালান। যাতে আমার প্রাণ সহজে বের হয়ে যায়। কারণ মৃত্যু বড় কঠিন ব্যাপার। আপনি আমার মায়ের কাছে পৌঁছে আমার সালাম বলবেন। যদি আমার জামা তার কাছে নিয়ে যেতে চান তবে নিয়ে যাবেন। এতে হয়তো তিনি সান্তনা খুজে পাবেন। এর পর ইব্রাহীম (আঃ) পুত্রকে চুমু খেলেন এবং অশ্রুপুর্ণ অবস্থায় তাকে বেঁধে নিলেন। এবং কাত করে এমনভাবে শায়িত  করলেন। যেন কপালের এক পাশ মাঠিতে স্পর্শ করে। এরপর তিনি স্বজোরে ছুরি চালানো শুরু করলেন। কিন্তু কাটছে না! এ অবস্থা দেখে ফেরেশতাকোল দোয়া তাসবিহ ও তাহমিদ পাঠ সহকারে চিৎকার করে বলতে লাগলো- হে আমাদের প্রভু!হে আমাদের  মাওলা! এ বৃদ্ধ লোকটির প্রতি রহম কর এবং ছোট্ট বালকের জীবন রক্ষা করো। অতঃপর  আল্লাহ তাদের প্রার্থনা কবুল করলেন এবং ডাক দিয়ে বললেন:

” আমি তাকে ডেকে বললাম, হে ইব্রাহীম! তুমি তো স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করে দেখালে। আমি এভাবে পূন্যবানদেরকে প্রতিদান দিয়ে থাকি। নিশ্চয়ই এটা একটা সুস্পষ্ট পরীক্ষা। আমি তার পরিবর্তে জবাই করার জন্য দিলাম এক মহান জন্তু”।  (সুরা সাফ্ফাত আয়াত নং ১০৪-১০৭)

 হযরত জিবরাইল আ. এক জান্নাতী দুম্বা নিয়ে উপস্থিত হলেন। অবশেষে তা’ই কুরবানী করলেন হযরত ইব্রাহিম  (আঃ)। এ থেকে এলো আমাদের এ কুরবানী। কোরবানীর মুল কথাটা হলো, বান্দার জান -মাল, ইবাদত -বন্দেগী, জীবন মরণ সবকিছুই আল্লাহ র হুকুমের সামনে সমর্পণ করা। এরশাদ হচ্ছে:

“আমার কোরবানি আমার জীবন আমার মরণ সবাই রাব্বুল আলামিনের জন্য নিবেদিত”।(সুরা আনআম : ১৬২)

 মোটকথা, আল্লাহ তাআলা হজরত ইব্রাহিম আ. এর  সুমহান ত্যাগের আদর্শকে পৃথিবীতে সুপ্রতিষ্টিত  করার জন্যই সামর্থবান মু’মিন মুসলমানের উপর কুরবানী ওয়াজিব করেছেন। এ মহান কুরবানী আমাদের সামনে সমাগত। আমরা এখন থেকে প্রস্তুতি গ্রহণ করবো এবং দোয়া করবো যেন আমরা ইব্রাহীমী আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে কোরবানি করতে পারি।

লেখক: মুফতি মাজহারুল ইসলাম,

ইমাম ও খতিব দোহালিয়া কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ, 

সিনিয়র মুহাদ্দিস, দক্ষিণভাগ মোহাম্মাদিয়া দারুল হাদিস টাইটেল মাদ্রাসা টিলাবাজার।